• জাতীয় ক্রিকেট লিগ
  • " />

     

    ধর্মঘট, রেকর্ড, লেগস্পিন-ভজকট, নিষেধাজ্ঞা : জাতীয় লিগের আলোচিত যতো দিক

    শেষ হয়েছে ২১তম জাতীয় ক্রিকেট লিগ। বিপ টেস্ট দিয়ে শুরু, খুলনার রেকর্ড ৭ম শিরোপা দিয়ে শেষ- মাঝে বাংলাদেশের ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্ট দেখেছে আরও নানা ঘটনা। সেসবেরই আলোচিত কিছু দিকে ফিরে তাকিয়েছে প্যাভিলিয়ন...


    শুরুতে বিপ টেস্ট, মাঝে ধর্মঘটের ‘বাধা’ 

    গত আসরের মতো এবারও খেলার শুরুর আগে আলোচনায় ছিল ক্রিকেটারদের ফিটনেস ও সেটি পরিমাপের পরীক্ষা বিপ টেস্ট। আব্দুর রাজ্জাক, তুষার ইমরান, মোহাম্মদ আশরাফুল, নাদিফ চৌধুরিসহ বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার প্রথম দফা উৎরে যেতে পারেননি সেই টেস্ট। পরে সিনিয়দের জন্য রাখা হয়েছিল ‘বিশেষ বিবেচনা’। ঢাকা অধিনায়ক নাদিফসহ বেশ কয়েকজন প্রথম রাউন্ডে খেলতে পারেননি বিপ টেস্টের খড়গে আটকা পড়েই। পরে ফিরেছিলেন তারা। 

    দুই রাউন্ড পর বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্যতম এক বড় ঘটনাই নাড়িয়ে দিয়েছিল জাতীয় লিগকে। তৃতীয় রাউন্ড শুরুর আগে প্রধানত ঘরোয়া ক্রিকেটকে ঘিরে বেশ কিছু দাবি-দাওয়া নিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটে যান ক্রিকেটাররা। তিন দিনের অচলয়াতন কাটার পর পিছিয়ে যায় জাতীয় লিগের তৃতীয় রাউন্ড। তৃতীয় রাউন্ড শুরুর পরই আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রিকেটারদের বেতন-ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর ঘোষণা দেয় বিসিবি। 



    সবার ওপরে তাইবুর/প্যাভিলিয়ন



    ‘জাতীয় দল’-এর তারকারা…

    ২০১৫ সালের পর আবারও ঘরোয়া প্রথম শ্রেণিতে ফিরেছেন তামিম ইকবাল। চট্টগ্রামের হয়ে ঢাকা মেট্রোর বিপক্ষে প্রথম রাউন্ডের ম্যাচে খেলেছিলেন তিনি। যদিও পাঁজরের চোটে পরের রাউন্ড খেলতে পারেননি ফতুল্লায়, পরে জাতীয় দলের ভারত সফর থেকে পারিবারিক কারণে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া তামিম ক্রিকেটেরই বাইরে আছেন আপাতত। চার বছর পর জাতীয় লিগে ফিরেছিলেন মাহমুদউল্লাহ, ঢাকা মেট্রোর হয়ে তিনি খেলেছেন দুই রাউন্ড। তিন ইনিংসে ব্যাটিং করে দুটি ফিফটি, একটি সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনি, সঙ্গে নিয়েছিলেন ৬ উইকেট। রাজশাহীর হয়ে মুশফিকও খেলেছিলেন দুই রাউন্ড। 

    দুই বছর পর ফিরে এক রাউন্ড খেলেছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান, দুই ইনিংস মিলিয়ে খুলনার হয়ে নিয়েছিলেন ৪ উইকেট। এক রাউন্ড খেলেছিলেন লিটন দাসও, গত মৌসুমেও তিনি খেলেছিলেন এক রাউন্ডই। টেস্ট ছাড়া জাতীয় দলের বাইরে থাকা মিরাজ খেলেছেন ৪ রাউন্ড, গত মৌসুমে যিনি খেলেননি এক রাউন্ডও। ভারত যাওয়ার আগে নতুন টেস্ট অধিনায়ক মুমিনুল হকও খেলেছিলেন চার রাউন্ড।

    আর নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার আগেও জাতীয় লিগের স্কোয়াডে ছিলেন না সাকিব আল হাসান, যিনি বাংলাদেশে ঘরোয়া প্রথম শ্রেণি শেষ খেলেছিলেন ২০১৫-১৬ মৌসুমে। 
     


    বোলিংয়ে শীর্ষে রাজ্জাক/প্যাভিলিয়ন



    রাজ্জাকের রেকর্ড, রুয়েলেরও

    রাজিন সালেহ, নাবিল সামাদ, সোহাগ গাজি, নাঈম ইসলাম, তাইজুল ইসলাম, সাদমান ইসলাম- আব্দুর রাজ্জাকের যথাক্রমে ১ম, ১০০তম, ২০০তম, ৩০০তম, ৪০০তম, ৫০০তম শিকার ছিলেন তারা। রংপুরের রবিউল হক হয়ে গেলেন ৬০০তম। জাতীয় লিগের চতুর্থ রাউন্ডে মিরপুরে নতুন ইতিহাস গড়েছেন রাজ্জাক, বাংলাদেশের প্রথম বোলার হিসেবে ৬০০ উইকেটের রেকর্ড গড়েছেন তিনি। ৫ ম্যাচে ৩১ উইকেট নিয়ে এ মৌসুমের সর্বোচ্চ উইকেটও এই বাঁহাতি স্পিনারেরই। 

    রাজ্জাকের যখন প্রথম শ্রেণিতে অভিষেক, তখন রুয়েল মিয়ার বয়স ছিল ১ বছরের মতো। সেই রুয়েলও এবার গড়েছেন নতুন রেকর্ড। সিলেটের তরুণ পেসার শেষ রাউন্ডে চট্টগ্রামের বিপক্ষে নিয়েছেন ২৬ রানে ৮ উইকেট, প্রথম শ্রেণিতে যা কোনও বাংলাদেশী পেসারের সেরা বোলিং। পরের ইনিংসে আরও ৫ উইকেট নিয়ে ঘরোয়া প্রথম শ্রেণিতে রাজ্জাকের পরই সেরা বোলিংয়ের রেকর্ডও গড়েছেন তিনি। 


    লেগস্পিনার, লেগস্পিনার। লেগস্পিনার তুমি কই? 

    লেগস্পিনার নিয়ে ‘আগে-দেখা-যায়নি’ এমন নিয়ম বিপিএলে হাজির করে বেশ আলোচনায় এসেছে বিসিবি। এনসিএলও বাদ যায়নি এর থেকে। ঢাকা ও রংপুরের দুই লেগস্পিনার জুবাইর হোসেন ও রিশাদ হোসেনকে না খেলানোয় দুই কোচকে বহিষ্কারও করেছিল বিসিবি। অবশ্য সে রাউন্ডে বিসিবির দেওয়া স্কোয়াডে দলেই ছিলেন না রিশাদ। রিশাদ পরে চার রাউন্ড খেলেছিলেন, অবশ্য ভারত সফরের প্রস্তুতি ম্যাচে খেলতে এক রাউন্ডে ফিরেছিলেন ম্যাচের মাঝপথেই। প্রথম ম্যাচেই নিয়েছিলেন ৫ উইকেট, সব মিলিয়ে ৭ ইনিংস বোলিং করে তিনি নিয়েছেন সমানসংখ্যক উইকেট, ৪২.৮৫ গড়ে। আর জুবাইর ৪ ইনিংস বোলিং করে ৫২ গড়ে নিয়েছেন ৩ উইকেট। 
     


    পেসারদের সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড গড়েছেন রুয়েল মিয়া/প্যাভিলিয়ন



    শাস্তি-নিষেধাজ্ঞা 

    আম্পায়ারকে ‘গালি’ দেওয়ার অভিযোগে ‘প্রতীকি শাস্তি’ পেয়েছিলেন রংপুর অধিনায়ক নাসির হোসেন। তৃতীয় রাউন্ডের ম্যাচে তাই তাকে ছাড়াই নেমেছিল রংপুর। তবে জাতীয় দলের প্রস্তুতি ম্যাচে খেলতে ও ড্যানিয়েল ভেট্টোরির সঙ্গে কাজের জন্য ম্যাচের মাঝপথেই রিশাদ হোসেনকে ডেকে পাঠানোয় নাসির সুযোগ পেয়েছিলেন সে ম্যাচে। নেমে মৌসুমের প্রথম ফিফটিও পেয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত ৫১.১১ গরে ৪৬০ রান করে সর্বোচ্চ রান-সংগ্রাহকের তালিকায় চারে আছেন নাসির। 

    শাহাদাতের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও শাস্তি অবশ্য প্রতীকি নয়, বরং আরও গুরুতর। বল ঘষা নিয়ে সতীর্থকে পেটানো কান্ডে ম্যাচ থেকে সঙ্গে সঙ্গেই প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় তাকে, ২য় ইনিংসে ব্যাটিং-বোলিং কিছুই করা হয়নি তার। পরে ৫ বছরের নিষেধাজ্ঞা পেয়েছেন ঢাকার এই পেসার। শেষ রাউন্ডে খুলনার বিপক্ষে ম্যাচে এমন কান্ড ঘটিয়েছেন তিনি, অলিখিত ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল দুই দল। 


    ‘ক্লোজ-এনকাউন্টার’

    ২ সেশন, প্রায় ৬৩ ওভারে রংপুরের লক্ষ্য ছিল ১১৮ রান। কক্সবাজারে রাজশাহীর বিপক্ষে জয়ের হাতছোঁয়া দূরত্বে চলে গিয়েছিল রংপুর, তবে অনেক দূর গিয়েও গন্তব্যে যাওয়া হয়নি তাদের। সানজামুল ইসলামের তোপে ৬ রান দূরেই থেমেছিল রংপুর, রাজশাহী পেয়েছিল দারুণ এক জয়। জাতীয় লিগে রানের হিসেবে এর চেয়ে কম ব্যবধানে হারের রেকর্ড আছে আর দুটি। গত মৌসুমে ঢাকা মেট্রোকে ৩ রানে হারিয়েছিল সিলেট, আর বরিশালকে ৫ রানে হারিয়েছিল রংপুরই। অবশ্য শেষ রাউন্ডে এসে সেই রংপুরের কাছে হেরেই দ্বিতীয় স্তরে অবনমন হয়েছে রাজশাহীর, আর ৫ রাউন্ড শেষে তলানীতে থাকা রংপুর ধরে রেখেছে প্রথম স্তরের জায়গা। 

    জাতীয় লিগ দেখেছে আরেকটি থ্রিলার। এবারও শিকার রংপুর। মিরপুরে ২০৩ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিং করা খুলনা হুট করেই ১৭৭ রানে ৫ উইকেট থেকে পরিণত হয়েছিল ১৮৭ রানে ৯ উইকেটে। আব্দুল হালিম ও মইনুল ইসলামের শেষ উইকেট জুটি এরপর এনে দিয়েছেন খুলনাকে অবিশ্বাস্য এক জয়। উইকেটের হিসেবে সবচেয়ে সংকীর্ণ ব্যবধানে জয়ের রেকর্ড জাতীয় লিগে আছে আর ১টি- ২০০২-০৩ মৌসুমে ধানমন্ডি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সিলেটকে হারিয়েছিল এই খুলনায়। 

     

    রেকর্ড ৭ম বার শিরোপা জিতেছে খুলনা/প্যাভিলিয়ন


    এবং খুলনা… 

    মাঝে টানা তিনবার জিতে রাজশাহীকে ছাড়িয়ে ৬ বার শিরোপা জেতা হয়ে গিয়েছিল খুলনার। গত মৌসুমে রাজশাহী ধরে ফেলেছিল তাদের। খুলনা শেষ পর্যন্ত ছাড়িয়েই গেল তাদের আবারও, এবার রেকর্ড ৭ম বার চ্যাম্পিয়ন হয়ে। অবশ্য খুলনার এ রেকর্ড এককভাবে থাকবে অন্তত আরও এক মৌসুম, রাজশাহী যে এবার নেমে গেছে দ্বিতীয় স্তরেই! খুলনা, রাজশাহীর পর জাতীয় লিগে সবচেয়ে বেশি শিরোপা জয়ের রেকর্ড এবার দুইয়ে থেকে লিগ শেষ করা ঢাকার, তারা জিতেছে ৫ বার। 
     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন