• বাংলাদেশের ভারত সফর
  • " />
    X

     

    গোলাপি বল ও দিবা-রাত্রির টেস্টের ব্যবচ্ছেদ : 'চিরায়ত' টেস্টের সঙ্গে পার্থক্য কতখানি?

    ২২ নভেম্বর প্রথমবারের মতো গোলাপি বলে দিবা-রাত্রির টেস্ট খেলতে নামছে বাংলাদেশ ও ভারত। 'চিরায়ত' টেস্টের সঙ্গে দিবা-রাত্রির টেস্টের পার্থক্য আদতে কতখানি? খোঁজা হয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তর...


    দিবা-রাত্রির টেস্ট কি আসলেই আকর্ষনীয়? 

    বলা হচ্ছে, ইডেন গার্ডেনসে প্রথম চারদিনের টিকেট বিক্রি হয়ে গেছে এরই মাঝে। অপেক্ষাকৃত ‘উপযুক্ত’ সময়ে খেলা, ফ্লাডলাইট মিলিয়ে এ টেস্ট বাড়তি আকর্ষণ জোগাবে বলেই আশা বিসিসিআইয়ের। 

    ফলের প্যাটার্নও বলছে, যুগের ‘চাহিদা’ জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে ‘নিরাশ’ করে না দিবা-রাত্রির টেস্ট। এ পর্যন্ত দিবা-রাত্রির টেস্ট হয়েছে ১১টি। ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড অ্যাডিলেড ওভালে খেলেছিল প্রথমবার, শেষ এ বছরের শুরুর দিকে ব্রিসবেনের গ্যাবায় মুখোমুখি হয়েছিল শ্রীলঙ্কা-অস্ট্রেলিয়া। মজার ব্যাপার হলো, ১১ টেস্টের একটিও ড্র হয়নি এখন পর্যন্ত। ৪ বার ইনিংস ব্যবধানে জিতেছে দল। ৩ বার দল জিতেছে রান তাড়া করে- যথাক্রমে ৩, ৪ ও ৭ উইকেটে। 

    ৫টি টেস্ট গড়িয়েছে ৫ দিনে, দক্ষিণ আফ্রিকা-জিম্বাবুয়ের ৪ দিনের টেস্টটি শেষ হয়েছিল ২ দিনের মাঝেই। ৩ দিনে শেষ হয়েছে ৩টি টেস্ট, ৪ দিনে গেছে ২টি। 

    টেস্টে ড্রয়ের হার এমনিতে কমেছে বেশ কিছুদিন ধরেই, তবে দিবা-রাত্রির টেস্টে ‘ম্যাড়মেড়ে’ ড্র কেন, শুধু ‘ড্র’-এরই অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি এখন পর্যন্ত। 

    দিবা-রাত্রির টেস্টের ‘চাহিদা’ও বাড়ছে তাই। অস্ট্রেলিয়া এরই মাঝে খেলে ফেলেছে সবচেয়ে বেশি ৫টি টেস্ট।  এ বছর অস্ট্রেলিয়া খেলবে আরও দুটি দিবা-রাত্রির টেস্ট, প্রথমে পাকিস্তানের বিপক্ষে অ্যাডিলেডে, বাংলাদেশ-ভারত টেস্ট শুরু হওয়ার ৭ দিনের ভেতর। এর আগে এতো কম সময় ব্যবধানে দুটি দিবা-রাত্রির টেস্ট হয়নি। এরপর অস্ট্রেলিয়া ডিসেম্বরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পার্থে খেলবে আরেকটি।

     


    সেশন আর বিরতির সময় কেমন হবে? 

    দিনের টেস্টের মতোই দিবা-রাত্রির টেস্টেও থাকবে তিনটি সেশন, এক ঘন্টা খেলার পর ড্রিংকস, আর দুটি বিরতি মিলিয়ে এক ঘন্টা। এমনিতে খুব ব্যতিক্রম না হলে প্রথম সেশনে ২ ঘন্টা খেলার পর লাঞ্চ, দ্বিতীয় সেশনে ২ ঘন্টা খেলার পর ২০ মিনিটের চা-বিরতি, এরপর বাকিটা সময় খেলা হয় শেষ সেশনে। তবে দিবা-রাত্রির টেস্টে বিরতির সময়টা একটু অদল-বদল হয়। 

    মূলত তৃতীয় সেশনটা হয় ফ্লাডলাইটে, সন্ধ্যা নামার পর। অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম বিরতিটি হয় চা-বিরতি, ২০ মিনিটের। একই অবস্থা সংযুক্ত আরব আমিরাত, নিউজিল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজে। এসব জায়গায় দ্বিতীয় বিরতিটি হয় ‘ডিনার’, যা ৪০ মিনিটের। 

    তবে ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম বিরতিটিই হয় ৪০ মিনিটের, যা লাঞ্চ। দ্বিতীয়টি চা-বিরতি। ভারতেও অনুসরণ করা হবে এটিই।

    অবশ্য কলকাতায় এখন বেশ আগেভাগেই সূর্যাস্ত হয়, ফলে ফ্লাডলাইটে তুলনামূলক বেশি সময় খেলতে হবে দুই দলকে।  


    প্রথম দিবা-রাত্রির টেস্ট খেলছে দুই দলই। তবে ঘরোয়া ক্রিকেটে কার কেমন অভিজ্ঞতা?  

    বাংলাদেশের গোলাপি বলে একমাত্র অভিজ্ঞতা ২০১২-১৩ মৌসুমে বিসিএলের ফাইনাল, যেটি হয়েছিল মিরপুরে। লো-স্কোরিং ম্যাচে ৩১ রানে নর্থ জোনকে হারিয়েছিল সেন্ট্রাল জোন। তবে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট স্কোয়াডে থাকা কোনও বাংলাদেশী ক্রিকেটারই সে ম্যাচে খেলেননি। 

    ভারতের অভিজ্ঞতা বলতে ২০১৬ সালে দুলিপ ট্রফি, যার চারটি ম্যাচ হয়েছিল দিবা-রাত্রির, গোলাপি বলে। ২ ম্যাচে সর্বোচ্চ অপরাজিত ২৫৬ রানসহ ৪৫৩ রান করেছিলেন চেতেশ্বর পুজারা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান ছিল মায়াঙ্ক আগারওয়ালের, যিনি ইন্দোরে করেছেন ডাবল সেঞ্চুরি। সে টুর্নামেন্টে খেলেছিলেন রোহিত শর্মা, রবিন্দ্র জাদেজারাও। ভারতের মাটিতে প্রথম গোলাপি বলে খেলা হয়েছিল সিএবি সুপার লিগে, যেখানে খেলেছিলেন মোহাম্মদ শামি, ঋদ্ধিমান সাহা। সিএবির প্রেসিডেন্ট সৌরভ গাঙ্গুলি বর্তমানে বিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট, মূলত তার উৎসাহেই গোলাপি বলে টেস্ট খেলতে নামছে ভারত।

    অবশ্য ইডেনের এই ঐতিহাসিক টেস্টের আগে বাংলাদেশ ও ভারত দুই দলই আলাদা করে পেয়েছিল গোলাপি বলে টেস্ট খেলার প্রস্তাব। ২০১৮-১৯ মৌসুমে নিউজিল্যান্ড সফরে দিবা-রাত্রির টেস্ট খেলার প্রস্তাব পেয়েছিল বাংলাদেশ। আর অস্ট্রেলিয়া সফরে একই প্রস্তাব পেয়েছিল ভারত। তবে বাংলাদেশ সেটি নাকচ করে দিয়েছিল পর্যাপ্ত ‘প্রস্তুতি’ ছিল না বলে। আর বরাবরের মতোই নতুন বিষয়ে অনীহা ছিল ভারতের। এর আগে ডিআরএসকেও সবার শেষে ‘গ্রহণ’ করেছিল তারা। 

     


    গোলাপি বল কেন? 

    ফ্লাডলাইটের কথা মাথায় রেখেই মূলত গোলাপি বলের আবির্ভাব। কৃত্রিম আলোয় লাল বল দেখা বেশ কষ্টকর, আর সাদা বলের স্থায়ীত্ব কম। সাধারণত টেস্টে একটি বল দিয়ে এক ইনিংসে খেলা হওয়ার কথা ৮০ ওভার, তবে সাদা বলের স্থায়ীত্ব এর অর্ধেকেরও কম সময়।  

    মূলত এ দুই সঙ্কট মেটাতেই গোলাপি বলের আবির্ভাব। কুকাবুরা বেশ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বানিয়েছিল গোলাপি বল। তবে ভারতে টেস্ট হবে এসজি বলে, যে কোম্পানি ইডেনের টেস্টের জন্যই প্রথমবারের মতো বানিয়েছে গোলাপি বল। তবে ফ্লাডলাইটের নিচে এ বলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটা বেশ একটা চ্যালেঞ্জই হবে ব্যাটসম্যান-ফিল্ডারদের, বিশেষত আগের অভিজ্ঞতা না থাকলে। 

    বলের উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে বাড়তি রাসায়নিক ব্যবহার করেছে তারা। অন্য এসজি বলের মতো গোলাপি বলের সিমও হাতে সেলাই করা। আর কুকাবুরার চেয়ে এসজির সিম একটু বেশি সময় উঁচু থাকে বলে জানান বোলাররা। অবশ্য ভারতে ৪০-৪৫ ওভার পর থেকে বোলারদের জন্য এসজি বল তেমন কিছু ‘দিতে’ পারে না বলেও আলোচনা আছে। 

    গোলাপি এসজি কেমন অভিজ্ঞতা দেবে তাদের, দেখার বিষয় সেটিই। 

     


    কৃত্রিম আলোর প্রভাব কেমন থাকবে? 

    ২০১৬ সালে ইতিহাসের তৃতীয় দিবা-রাত্রির টেস্টটি খেলেছিল অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকা। ১ম দিন ৯ উইকেটে ২৫৯ রান নিয়ে ইনিংস ঘোষণা করে দিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকা অধিনায়ক ফাফ ডু প্লেসি। লক্ষ্য ছিল ফ্লাডলাইটের নিচে অস্ট্রেলিয়াকে ব্যাটিং করানো। 

    এমনিতে দিনের টেস্টেও শেষবেলায় আলো পড়ে এলে সুইং বা মুভমেন্টের প্রবণতা বেড়ে যায় উপযুক্ত কন্ডিশনে, দিবা-রাত্রির টেস্টে সন্ধ্যার আগে-পরে থাকতে পারে সেরকম পরিস্থিতি। সেবার অবশ্য ১২ ওভার কাটিয়ে দিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার দুই ওপেনার, ডু প্লেসির দক্ষিণ আফ্রিকা নিতে পারেনি কোনও উইকেট।

    দিবা-রাত্রির ম্যাচে উপমহাদেশে বড় একটা প্রভাব ফেলবে শিশির, যার কারণে বোলার-ফিল্ডারদের বল গ্রিপিংয়ে মুখোমুখি হতে হয় অসুবিধার। 

    সে অনুযায়ী ইডেন গার্ডেনস আলাদা ব্যবস্থা নিয়েছে বলেও জানিয়েছে ইএসপিএনক্রিকইনফো। উইকেটে ঘাসের বাড়তি স্তরের ব্যবস্থা থাকবে, আর মাঠ শুষ্ক রাখতে বন্ধ করে দেওয়া হবে পানি ছিটানো। 


    ইনিংসভেদে ব্যাটিংয়ের প্যাটার্নও কি একই? 

    ২০১৫ সালের ২৭ নভেম্বর থেকে ২০১৯ সালের ২৬ জানুয়ারি- এই সময়ে দিবা-রাত্রির টেস্টে টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের গড় (৩০.৭৩) বেশি মিডল অর্ডার (৪-৭ নম্বর) ব্যাটসম্যানদের (২৯.৮৩) চেয়ে বেশি। বাকি সব টেস্টে সেখানে মিডল অর্ডারের (৩৫.৭৯) পারফরম্যান্স ভাল টপ অর্ডারের (৩৪.৬১) চেয়ে। এই উপাত্ত থেকে আপনি প্রশ্ন তুলতেই পারেন- পুরোনো গোলাপি বল অপেক্ষাকৃত ভাল ব্যাটসম্যানদের জন্য লাল বলের চেয়ে? 

    অবশ্য দিবা-রাত্রির টেস্টে পেসারদের দাপট একটা জবাব দিতে পারে। আরব আমিরাত ছাড়া বাকি সবকটি টেস্টই হয়েছে পেস-সহায়ক কন্ডিশনেই, পেসারদের ২৫.২২ গড়ে ২৫৭ উইকেটের বিপরীতে স্পিনাররা ৩১.৮০ গড়ে নিয়েছেন ৯৫টি উইকেট।

    ইনিংসভেদে ব্যাটসম্যানদের পারফরম্যান্সেও গোলাপি বলের টেস্টে একটু ‘অস্বাভাবিক’ ব্যাপার আছে। ‘সাধারণ’ টেস্টে চার ইনিংসে প্রতি উইকেটে ব্যাটসম্যানদের গড়ের গ্রাফটা সরলরৈখিভাবে কমেছে- ৩৫.৬৬, ২৯.৬১, ২৮.৮৩, ২২.২০। তবে দিবা-রাত্রির টেস্টে ২য় ও ৩য় ইনিংসে বেশ ভাল একটা অবনমন আছে, ৪র্থ ইনিংসে গিয়ে সেটি আবার বেড়েছে হুট করে। চার ইনিংসে গড় যথাক্রমে এমন- ৩৬.১০, ২৩.৭৬, ১৬.৪৬, ২৮.৫৮। 

    দিনের টেস্টে পিচ প্রায় পুরোটা সময়ই সূর্যের আলো পায় (বৃষ্টি বা মেঘাচ্ছন্ন কন্ডিশনের ব্যাপার বাদ দিলে), তবে দিবা-রাত্রির টেস্টে সূর্যের আলো পিচে পড়ে অপেক্ষাকৃত কম সময়ে। পিচের নিচের ময়েশ্চার বা অন্য ব্যাপারগুলির একটা প্রভাবও থাকতে পারে ইনিংসভেদে ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে। 

     


    বোলার নাকি ব্যাটসম্যানদের দাপট? 

    শুরুর দিকে ‘লো-স্কোরিং’ অ্যাফেয়ার বিবেচনা করা হলেও দিবা-রাত্রির টেস্ট দেখেছে বড় স্কোরও। ইংল্যান্ড যেমন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৫৮ রানে অল-আউট হয়েছে, পাকিস্তান ৩ উইকেটে ৫৭৯ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে দিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। তবে সব মিলিয়ে দিবা-রাত্রির টেস্টে উইকেটপ্রতি রানের হারটা কমই। ২০১৫ সালের ২৭ নভেম্বর প্রথম দিবা-রাত্রি টেস্ট শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত সর্বশেষটি সমাপ্ত হয়েছে এ বছরের ২৬ জানুয়ারি। এ সময়ে দিবা-রাত্রির টেস্টে উইকেটপ্রতি রান উঠেছে ২৭.০১ হারে, যেখানে দিনের টেস্টে এই হার ৩১.১৬। 

    গোলাপি বলের টেস্টে এ পর্যন্ত সেঞ্চুরি হয়েছে ১৬টি, একটি ট্রিপল, একটি ডাবল। পাকিস্তানের আজহার আলি দিবা-রাত্রির প্রথম সেঞ্চুরি করেছিলেন, সে সেঞ্চুরিকেই পরে ডাবল ও ট্রিপলে রূপ দিয়েছিলেন তিনি। এছাড়া ডাবল সেঞ্চুরি আছে ইংল্যান্ডের অ্যালেস্টার কুকের।