• লা লিগা
  • " />

     

    এল ক্লাসিকোর আগে বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদের সামনে যে পাঁচ প্রশ্ন

    বার্সেলোনা শহরেই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে প্রায় মাস দুয়েক পিছিয়ে ১৮ ডিসেম্বর বুধবার হবে মৌসুমের প্রথম এল ক্লাসিকো। ১৬ ম্যাচ শেষে দুই দলের পয়েন্ট সমান ৩৫, গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে শীর্ষে আছে বার্সেলোনা। ন্যু ক্যাম্পের ক্লাসিকোতে তাই দুদলের সামনে সুযোগ, এককভাবে লা লিগা টেবিলের শীর্ষে উঠে যাওয়ার। ক্লাসিকোর আগে দুই দলের সামনেই আছে একাধিক প্রশ্ন। লা লিগার সবচেয়ে বড় ফিক্সচারে কোন পাঁচ বিষয় গড়ে দিতে পারে ম্যাচের ভাগ্য? 



    মেসির ওপর অতি-নির্ভরতা এবং ভালভার্দের পার পেয়ে যাওয়া

    এই মৌসুমে বার্সার অবস্থা যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অ্যাসাইনমেন্ট বা টার্ম পেপার গ্রুপের মতই। গ্রুপে যতজনই থাকুক, দিনশেষে কাজটা করতে হচ্ছে একজনকেই। লা লিগার শীর্ষে আছে তারা, চ্যাম্পিয়নস লিগ নকআউট পর্বে পৌঁছে গেছে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই। নাপোলির বিপক্ষে শেষ ষোলতে ফেভারিট তারাই। কিন্তু এতকিছুর পরও এই মৌসুমে বার্সেলোনার পারফরম্যান্স নিয়ে সন্তুষ্ট হয়তো হতে পারবেন না কাতালানদের সবচেয়ে গোঁড়া সমর্থকরাও। পিকে-বুস্কেটস-সুয়ারেজ- দলের সিনিয়ররা নেই ফর্মে, নিজেদের মেলে ধরতে পারছেন না ফিরপো-ডেম্বেলের মত তরুণরা। কিন্তু তারপরও বার্সার এতদূর আসার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ওই একজনেরই, আবারও বার্সাকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলছেন সেই লিওনেল মেসিই। লা লিগায় ১৬ ম্যাচের মধ্যে খেলছেন মাত্র ১১টি, কিন্তু তারপরও লা লিগার সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি। ন্যু ক্যাম্পে ইন্টার মিলানের বিপক্ষে গোল পাননি, কিন্তু তারপরও খেলা ঘুরিয়ে দিয়েছেন তিনিই, হয়েছিলেন ম্যাচসেরাও। মার্ক-আন্দ্রে টের স্টেগান-ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ংরাও ধারাবাহিক পারফর্ম করছেন, কিন্তু দিনশেষে ব্যবধান গড়ে দেওয়ার কাজটা করতে হচ্ছে মেসিকেই।

     

     

    গত মৌসুমে অবশ্য মেসিকে ছাড়াই ন্যু ক্যাম্পে রিয়ালকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল বার্সা। কিন্তু এক বছর বাদে সমীকরণটা বেশ ভিন্ন। ঐ ম্যাচে হ্যাটট্রিক করা ফিলিপ কুতিনিয়ো এখন বায়ার্ন মিউনিখে, আক্রমণে মেসির দুই সতীর্থ আঁতোয়া গ্রিযমান এবং লুইস সুয়ারেজও ঠিক ফর্মে নেই। অন্যদিকে অগোছালো রিয়াল এবার জিদানের অধীনে ফিরে পেয়েছে ছন্দ। ন্যু ক্যাম্পে এই মৌসুমে রীতিমত অপ্রতিরোধ্য বার্সা, হারিয়েছে ইন্টার, ডর্টমুন্ডের মত দলকে। রিয়ালের গেমপ্ল্যান থাকবে মেসিকে আটকানো। কাতালান অধিনায়ককে আটকে দিলে তখন বার্সার আক্রমণভাগের বাকিদের পারফরম্যান্সই নির্ধারণ করে দিতে পারে ম্যাচের ভাগ্য।

    রদ্রিগো, বেনজেমার সাথে রিয়ালের আক্রমণে কে? 

    প্যারিস সেইন্ট জার্মেইয়ের বিপক্ষে ইনজুরিতে পড়ে মাঠ ছেড়েছিলেন এডেন হ্যাজার্ড। ২ সপ্তাহের মাঝে ফেরার কথা থাকলেও রিয়ালের চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেছেন, নতুন বছরের আগে হ্যাজার্ডকে পাচ্ছে না রিয়াল। ক্লাসিকোতে জিদানের দলের আক্রমণভাগের বাঁ-প্রান্তে কে নামবেন, সেটা হয়তো নিজেও জানেন না এই ফ্রেঞ্চ ম্যানেজার।

    রিয়ালের শেষ তিন ম্যাচে নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়ে দাবিটা জানিয়ে রেখেছেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র। কিন্তু আক্রমণভাগে ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডের দ্বিধান্বিত হওয়ার প্রবণতা বেশ ভুগিয়েছে রিয়ালকে। এজন্যই রিয়ালের হয়ে ৫০-এরও বেশি ম্যাচ খেলা ভিনিসিয়াসের গোলসংখ্যা মাত্র ৬। যেখানে অন্যপ্রান্তে তারই স্বদেশি রদ্রিগো গোজ জায়গা পাকা করে ফেলেছেন নিজের প্রথম মৌসুমেই। ভিনিসিয়াসের ড্রিবলিং এবং গতি সমস্যায় ফেলতে পারে বার্সার রক্ষণভাগকে, কিন্তু ফাইনাল থার্ডে পাস বা শট করা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা ভিনিসিয়াসের কারণেই ভুগতে হতে পারে রিয়ালকেও।

     

     

    ক্লাসিকোতে বেনজেমা-রদ্রিগোর সাথে নামতে পারেন গ্যারেথ বেলও। ইনজুরি কাটিয়ে ফিরলেও রিয়ালের একাদশে সুযোগ পাচ্ছেন না নিয়মিত। তবে বাঁ-প্রান্তে বেল ঠিক কতটা ভয়ঙ্কর, সেটা জানা আছে জিদানের। সুযোগ আছে ইস্কোরও। বেল-হ্যাজার্ডের ইনজুরির কারণে ইস্কোকে আক্রমণে নামিয়ে দিয়েছিলেন জিদান, ম্যানেজারের আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন তিনিও। ভিনিসিয়াস, ইস্কো কেউই আক্রমণ থেকে নিচে এসে রক্ষণে সাহায্য করেন না তেমন, এই মৌসুমে ট্র্যাকব্যাক করার কাজটা দারুণভাবেই করেছেন বেল। তবে শেষ পর্যন্ত রিয়ালের বাঁ-প্রান্তে কাকে খেলাবেন জিদান, সেটা নিয়ে হয়তো ভিনিসিয়াসের মতই সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন তিনিও।

    ন্যু ক্যাম্প জুজু কাটাতে পারবে রিয়াল?

    ২০১৬ সালে শেষবার লিগে বার্সার মাঠে জয়ের দেখা পেয়েছিল রিয়াল। এরপর ২০১৭-তে স্প্যানিশ সুপারকাপ ছাড়া ন্যু ক্যাম্পে আর জিততেই পারেনি রিয়াল। গত মৌসুমে লিগ ছাড়াও কোপা ডেল রে-তেও দুবার দেখা হয়েছিল তাদের। ৪ ক্লাসিকোর তিনটিই জিতেছিল বার্সা। সব মিলিয়ে ক্লাসিকোর হারজিতের রেকর্ডে ৮৭ বছর পর রিয়ালকে (৯৫ জয়) টপকেও গেছে তারা (৯৬ জয়)। লিগে ন্যু ক্যাম্পে রিয়ালের পারফরম্যান্স নিয়ে হতাশার কথা জানিয়েছিলেন জিদান নিজেও।

     

     

    ফর্ম এবং ধারাবাহিকতার বিচারে বার্সার চেয়ে হয়তো একটু হলেও এগিয়ে থাকবে রিয়াল। লিগে মাত্র ১ বার হেরেছে তারা এই মৌসুমে। কিন্তু ম্যাচটা যখন ন্যু ক্যাম্পে, তখন কাতালান সমর্থকদের বৈরী পরিবেশে রিয়ালকে খেই হারিয়ে ফেলতে দেখা গেছে গত তিন মৌসুম ধরে। ন্যু ক্যাম্পের প্রায় এক লক্ষ ছুইঁ ছুইঁ সমর্থকের উপস্থিতি, সাথে রিয়ালের ন্যু ক্যাম্প জুজু। এবারও সেটা কাটিয়ে উঠতে না পারলে আবারও হয়তো দীর্ঘশ্বাস এবং হতাশা নিয়েই মাঠ ছাড়তে হবে জিদানের দলকে।

    মেসিকে আটকাতে পারবেন ভালভার্দে?

    খুব সম্ভবত এই মৌসুমে জিদানের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার উরুগুইয়ান মিডফিল্ডার ফেদেরিকো ভালভার্দে। তাকে জায়গা করে দিতে গত বছরের ব্যালন ডি’অর জয়ী এবং এতদিন যাকে ছাড়া রিয়ালের মিডফিল্ড ভাবাই যেত না- সেই লুকা মদ্রিচকেই বসিয়ে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন জিদান। সার্জিও রামোস থেকে শুরু করে মিয়াতোভিচ, ক্যাসিয়াস- রিয়ালের কিংবদন্তীরাও এই মৌসুমে মেতেছেন ভালভার্দে বন্দনায়। সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হলেও বক্স টু বক্সে দুর্দান্ত তিনি। ক্লাসিকোতে মেসিকে আটকানোই হবে জিদানের মূল লক্ষ্য, তবে সেজন্য কাসেমিরো, রামোসদের ওপর আস্থা রাখার সঙ্গে তার তুরুপের তাস হতে পারেন ভালভার্দেও।

    পিএসজির বিপক্ষে কিলিয়ান এমবাপ্পেকে আটকাতে ম্যান মার্কিং রোলে ভালভার্দেকে রেখেছিলেন জিদান। ফ্রেঞ্চ ফরোয়ার্ড গোল পেলেও পুরো ম্যাচে ছিলেন একেবারেই নিষ্প্রভ। ম্যাচ শেষে ভালভার্দেকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন জিদান। ওয়ান্ডায় মৌসুমের প্রথম মাদ্রিদ ডার্বিতে হোয়াও ফেলিক্সকেও কড়া মার্কিংয়ে রেখেছিলেন ভালভার্দে। ফলাফল? ৭০ মিনিটে ফেলক্সিকে উঠিয়ে নিতে বাধ্য হন ডিয়েগো সিমিওনে। মেসি অবশ্যই এমবাপ্পে, ফেলিক্সদের চেয়ে এগিয়ে, কিন্তু তারপরও তাকে থামাতে রিয়ালের ‘এক্স ফ্যাক্টর’ হবেন ভালভার্দে। বয়স মাত্র ২১ হলেও খেলায় তার পরিণতবোধ দেখে মুগ্ধ সতীর্থ টনি ক্রুস। মাঠে ব্যক্তিগত লক্ষ্যের বিচারে এবারই হয়তো ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটাই নিতে যাচ্ছেন ভালভার্দে।

     

     

    ..এবং বার্সার সেই পুরোনো রক্ষণ-দুশ্চিন্তা

    পেপ গার্দিওলা থেকে এর্নেস্তো ভালভার্দে- গত এক দশকে প্রায় সবকিছুই বদলে গেছে বার্সার। কিন্তু রক্ষণ নিয়ে স্প্যানিশ চ্যাম্পিয়নদের দুশ্চিন্তার ব্যাপারটি বদলায়নি। এই মৌসুমে লিগে খেলা ১৬ ম্যাচে ৪৩ গোল করেছে ভালভার্দের দল, কিন্তু গোল হজমও করেছে ২০টি। বিপরীতে লা লিগার অন্য দুই রাঘব বোয়াল রিয়াল ও অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ গোল হজম করেছে যথাক্রমে ১২ ও ১০টি করে। অবশ্য এজন্য ইনজুরিকেও দুষতে পারেন ভালভার্দে। উমতিতি-পিকে-লংলে-আলবা-ফিরপো-সেমেদোদের প্রত্যেকেই ইনজুরিতে পড়েছেন এবার। অবশ্য মৌসুমে এখন পর্যন্ত নিজেদের সবচেয়ে বড় ম্যাচের আগে সব ডিফেন্ডারকেই পাচ্ছেন ভালভার্দে।তারপরও রিয়ালের ফরোয়ার্ডদের আটকানো নিয়ে দুশ্চিন্তা হয়তো থেকেই যাচ্ছে তার।

    এর অন্যতম কারণ সার্জিও বুস্কেটসের ফর্মও। কিছুটা অবাক করেই এই মৌসুমে স্বরূপে নেই তিনি। বেশ কয়েক ম্যাচে তাকে বসিয়ে আর্তুরো ভিদাল, ইভান রাকিটিচদেরও খেলিয়েছেন ভালভার্দে। ডিপ লাইং মিডফিল্ডার হিসেবে রক্ষণে বুস্কেটস যেমন সাহায্য করতেন, সেটা এবার পাচ্ছে না বার্সা। সাথে আছে পিকেদের ধারাবাহিকতার অভাব। মার্ক-আন্দ্রে টের স্টেগান দুর্দান্ত খেললেও তাই বেশ কয়েক ম্যাচে রক্ষণের কারণেই পয়েন্ট খোয়াতে হয়েছে বার্সাকে। ন্যু ক্যাম্পে রিয়ালের বিপক্ষে পিকেদের পারফরম্যান্সও গড়ে দিরে পারে ম্যাচে বার্সার ভাগ্য।

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন