• " />

     

    টেনিসে এ কী বিস্ফোরণ!

    ম্যাচ পাতানোর করাল গ্রাসে ক্রিকেট-ফুটবলের মতো বিশ্বের জনপ্রিয়তম খেলাগুলোর কম ক্ষতি হয় নি। বিশেষ করে ক্রিকেটের অবস্থা একটা সময় এতোটাই শোচনীয় হয়ে পড়েছিল যে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে সামান্য অস্বাভাবিকতায়ও ‘সন্দেহজনক’ কিছুর গন্ধ খোঁজা শুরু হয়ে যেতো। সে বিচারে খেলাধুলার দুনিয়ায় ‘অভিজাত’ শ্রেণীর সদস্য বলে বিবেচিত টেনিসের দর্শকরা এতদিন নিশ্চিন্তেই খেলা দেখে আসছিলেন। অন্তত ম্যাচের ফল আগে থেকে নির্ধারণ করে রাখা আছে কিনা- এমন দুশ্চিন্তা বোধকরি কোনদিন করতে হয় নি টেনিস অনুরাগীদের। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ান ওপেন শুরুর প্রাক্কালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ঝড় তুলে ফেলা এক খবর বলছে, ফিক্সিংয়ের কলংক টেনিসের গায়েও লেগে আছে গত বেশ ক’ বছর ধরেই। ওই খবরে আরও দাবী করা হচ্ছে, এসব কেলেঙ্কারির বিষয়ে বিশ্ব টেনিসের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে বারবার অবহিত করা হলেও রহস্যজনক কারণে তাঁরা ‘কোন ব্যবস্থা নেয় নি’।

     

    অজ্ঞাত উৎস থেকে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনলাইন মিডিয়া বাজফিডের হেফাজতে চলে আসা গোপন কিছু নথি থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, বিগত এক দশকে টেনিসের র‍্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ ৫০ জনের মধ্যে ছিলেন এমন অন্তত ১৬ জন খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে একাধিকবার ম্যাচ গড়াপেটার অভিযোগ উঠেছে যাদের মধ্যে গ্র্যান্ড স্ল্যাম বিজয়ীরাও রয়েছেন। এমনকি টেনিসের গৌরব ও ঐতিহ্যের ধারক উইম্বলডনেও ম্যাচ পাতানোর দাবী করা হয়েছে ওসব গোপন নথিতে।

     

    অভিযোগ উঠেছে এসব ফিক্সিংয়ের ব্যাপারে টেনিসের দুর্নীতি দমন বিভাগ টিআইইউকে বিভিন্ন তরফে ক্রমাগত সতর্ক করা হলেও তাঁরা কোন প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করে নি। তবে বিশ্ব টেনিসের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এটিপি’র পক্ষ থেকে এ ধরণের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে বলা হয়েছে, জুয়া সংক্রান্ত দুর্নীতির বিষয়ে তাঁরা সর্বদা ‘জিরো-টলারেন্স’ নীতি মেনে আসছেন।

     

    বিবিসি বলছে তাঁদের হাতে আসা গোপন নথিসমূহের মধ্যে ২০০৭ সালে এটিপির অধীনে করা একটি অনুসন্ধানের প্রতিবেদন রয়েছে। নিকোলাই ডেভিডেঙ্কো ও মার্টিন ভাসাল্লো আরগুয়েলোর মধ্যকার একটি ম্যাচের ব্যাপারে তদন্ত করতে অনুসন্ধানটি চালানো হয়েছিল। এই দুই খেলোয়াড়কে কোন ধরণের অনিয়মের অভিযোগ থেকে রেহাই দেয়া হলেও ওই তদন্তের উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে শীর্ষ পর্যায়ের বহু খেলোয়াড়ের সাথে জুয়াড়িদের যোগসাজশ খুঁজে পায় সংস্থাটি। এরই সূত্র ধরে রাশিয়া, ইতালি ও সিসিলিতে বাজিকরদের সিন্ডিকেটের সন্ধানও পায় এটিপি। বিবিসির প্রাপ্ত নথিসমূহের ভাষ্য অনুসারে, সেই বেটিং সিন্ডিকেট লক্ষ-কোটি পাউন্ড পর্যন্ত লগ্নি করেছে এমন কিছু ম্যাচ অনুসন্ধানের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ করা হয়েছিল। এসব ম্যাচের অন্তত তিনটি ছিল উইম্বলডনের।

     

    এটিপির ২০০৮ সালের আরেকটি গোপন নথি থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, তদন্ত পরিচালনাকারী দল উল্লেখিত ম্যাচগুলোত অংশ নেয়া ২৮ জন খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালানোর সুপারিশ করে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সে অনুসন্ধান কার্যক্রম আলোর মুখ দেখে নি। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে টেনিসের জন্য একটি দুর্নীতিবিরোধী নীতিমালা প্রণয়ন করা হলেও তাতে পূর্ববর্তী কোন দুর্নীতি নতুন করে আর অনুসন্ধান না করার কথা বলা হয়। এর ফলে সন্দেহজনক সেসব ম্যাচের তদন্ত পুরোপুরি চাপা পড়ে যায়।

     

    পরবর্তী বছরগুলোতেও ওই অভিযুক্ত ২৮ খেলোয়াড়ের অনেকের বিরুদ্ধে ক্রমাগত সতর্কবার্তা দেয়া হলেও টেনিসের দুর্নীতি দমন বিভাগ তাঁদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয় নি।

     

    ২০০৭ সালের ওই তদন্তের সাথে যুক্ত ছিলেন এমন একজন পুলিশ কর্মকর্তার সাথে বিবিসির তরফে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান দশ জন খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে তাঁরা নিয়মিত ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ পেয়েছিলেন এবং সেসব অভিযোগের পিছনে যথেষ্ট প্রমাণ ছিল বলেও তিনি দাবী করেন। বিবিসির অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে এই খেলোয়াড়রা সেই ২০০৩ সাল থেকেই ম্যাচ গড়াপেটায় জড়িত ছিলেন বলে এটিপির কাছে তথ্য ছিল। কিন্তু কি কারণে সংস্থাটির দুর্নীতি দমন কমিটি তাঁদের ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা নেয় নি সেটা এখনও পর্যন্ত রহস্যই থেকে যাচ্ছে।

     

    এদিকে ইউরোপের সব ধরণের খেলাধুলায় বেটিং কার্যক্রম নজরদারী করে এমন একটি সংস্থা ইউরোপিয়ান স্পোর্টস সিকিউরিটি অ্যাসোসিয়েশনের তরফে ২০১৫ সালেই অর্ধশতাধিক টেনিস ম্যাচকে ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করে টিআইইউকে জানানো হয়েছে। কিন্তু সংস্থাটির প্রধান নাইজেল উইলারটন এ ধরণের সহযোগিতাকে সাধুবাদ জানালেও বলছেন দোষী খুঁজে বের করার কাজ বাজিকর প্রতিষ্ঠানের নয়, “টিআউইউর কাছে আসে এমন প্রতিটি বিশ্বাসযোগ্য তথ্য উচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের দ্বারা যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়ে থাকে।”

     

    সে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে তাঁরা কি পদক্ষেপ নিচ্ছেন সেটা অবশ্য জানান নি মি. উইলারটন। ওদিকে বিবিসি বলছে টিআউইউকে ক্রমাগত যাদের ‘সন্দেহজনক’ কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে এমন আটজন খেলোয়াড় আজ থেকে শুরু হওয়া অস্ট্রেলিয়ান ওপেনেও অংশ নিচ্ছেন!

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন