• বঙ্গবন্ধু বিপিএল
  • " />

     

    রাসেলের মঞ্চ তৈরি করবেন না, তাহলে ডুববেন হতাশায়

    ইমরুল কায়েস মাটিতে পা ছুঁড়ে কারও ওপর হতাশা ঝাড়ছিলেন। একটু আগে এ অঞ্চলেই দারুণ এক ডাইভিং ক্যাচ নিয়েছেন তিনি, মোহাম্মদ নওয়াজের সে ক্যাচটা হতে পারত ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়া এক মুহুর্ত। তবে ইমরুল যখন হতাশা প্রকাশ করছেন, তখনও রাজশাহী রয়্যালসের ৮ রান প্রয়োজন। বাকি ২ উইকেট। আন্দ্রে রাসেল স্ট্রাইকে, আগের ওভারে মেহেদি হাসান রানা দিয়েছেন ২৩ রান। কিন্তু ইমরুল হয়তো ততক্ষণে জেনে গেছেন- সব শেষ। 

    রাসেলের ব্যাটিং হয়তো একটা বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে। বোলিংয়ে নাসুম আহমেদ হোক, বা আসেলা গুনারত্নে, বা অন্য কেউ- ইমরুল জানেন- কিছুতেই কিছু আসবে যাবে না আর। একটা ডেলিভারি বদলে দিতে পারে সবকিছু- এ বিশ্বাসটা যেন উঠে গেছে তার। 

    রানার সেই ওভারের আগেরটিতে রুবেল হয়তো নিজের ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন। প্রথম বলে কামরুল ইসলাম রাব্বির মতিভ্রম হলো, রাসেলকে স্ট্রাইক দেওয়ার বদলে তুলে মারতে গেলেন। সে ক্যাচটা নিতে আরেকটু হলেই ইমরুল আর রায়াদ এমরিতের একটা সংঘর্ষ হয়ে যেত, শেষ মুহুর্তে হাত বাড়িয়ে এমরিত সেটি নিয়েছেন। রুবেল এরপর টানা চারটি ডট করলেন রাসেলকে, বারদুয়েক রাসেল ককিয়ে উঠলেন পায়ের ব্যাথায়। রুবেল, ‘দ্য নিউ টো-ক্রাশার’। সে বিশ্বাসেই কিনা শেষ বলটিও ফুললেংথে করলেন। কিন্তু বুম! 

    রাসেল অনেক আগেই ফ্রন্টফুট সরিয়ে নিয়েছেন, নিজেকে দিয়েছেন বেশ খানিকটা জায়গা। রুবেলের বলটা পড়তে দিলেন না, লো-ফুলটস বানিয়ে পাঠিয়ে দিলেন অনেকদূর। রুবেল তখন হাঁফ ছাড়ছেন, লম্বা এক দৌড়ের পর কেউ যেমন করেন। দৌড়ে কততম হলেন, সেটি ভাবার যেন সময় নেই তখন। 

    ইমরুল-রুবেল-এমরিত-গুনারত্নে-রানা, এদিন কারোরই কিছু করার ছিল না আদতে। যদি আপনি ধ্বংসাত্মক শব্দটার মানে খুঁজতে চান, তবে রাসেলের এই ইনিংসটার দিকে তাকাতে পারেন। যখন নেমেছিলেন, তখনও ৪০ বলে প্রয়োজন ৮৪ রান। ওভারপ্রতি ১২.৬ হারে। রাসেলের এমন মঞ্চ পছন্দ, আরেকবার মনে করিয়ে দিলেন, “আমি এমন পরিস্থিতিতে খেলতে ভালবাসি। ১২-১৩-১৪ রান দরকার যখন প্রতি ওভারে, এমন পরিস্থিতিতে। এমনকি ১৫-১৬ হলেও। আমার এমন চ্যালেঞ্জ নিতে ভাল লাগে। আমি জানি আমি শক্তিশালি, এবং আমার শান্ত থাকতে ভাল লাগে। আমি উদার মনে থাকতে ভালবাসি, (এ কারণে মাঠে নামার) আগে থেকে কোনও পরিকল্পনা করি না।”

    ক্রিজে গিয়ে তার পরিকল্পনা ছিল একদিকে টিকে থাকা, মিসটাইমিং যাতে না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা। গ্যাপ কাজে লাগানোর চেষ্টা করা, আর হ্যাঁ, ফিল্ডারের নাগালের বাইরে দিয়ে মারা। 
     


    “দুইদিন পর বড় একটা ম্যাচ আছে। তো পার্টিটা সেটার জন্য তুলে রাখলাম।”


    রাসেলের আদর্শ মঞ্চ আরও আদর্শ হয়ে উঠলো শীঘ্রই। ৩০ বলে দরকার ৭৬। নওয়াজ গুরুত্বপূর্ণ ২ ছয় মেরে ফিরে গেলেন, এক ছয়ের পর রেজাকে কী যেন পেয়ে বসল। রাব্বিও নিজেকে অন্য কিছু ভাবতে শুরু করলেন ব্যাটসম্যান হিসেবে। রাসেল এতক্ষণ ধরে চাপ নিতে চাননি, কিন্তু এবার যে তাকে রেখে সবাই ফিরে যাচ্ছেন! 

    রেজার আউটে তাই হতাশা লুকোতে পারেননি, “এ কারণে আমাদের এক ব্যাটসম্যান যখন ডাউন দ্য গ্রাউন্ডে এসে খেলতে গিয়ে আউট হলো (রেজা), তখন আমি হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। কারণ আপনাকে শুধু দাঁড়িয়ে থাকতে হবে সেখানে। ডেথ ওভার বলে বোলার এরই মাঝে চাপে পড়ে গেছে। আপনাকে সুযোগ নিতে হবে। আমার মানসিকতা হচ্ছে- চাপ নেওয়া যাবে না।” 

    অন্যদিকে একজনকে লাগতো রাসেলের, যিনি শুধু ক্রিজটা ধরে রাখতে পারবেন। আবু জায়েদ রাহি সেটি করলেন, “শেষ পর্যন্ত থাকতে হতো। আমি উইকেট পড়া নিয়ে চিন্তিত ছিলাম না। কিন্তু তারপর যখন একে একে পড়া শুরু করলো, তখন একটু চাপে পড়েছিলাম। একদিকে একজনকে শুধু দাঁড়িয়ে থাকতে হতো, আরেকদিক থেকে আমি আমার কাজটা করতাম। রাহি সেই দাঁড়িয়ে থাকার কাজটা করেছে।” 

    রাহি প্রথম বলেই স্ট্রাইক ফিরিয়ে দিয়েছিলেন রাসেলকে, রানার সে ওভারকে এরপর কাজে লাগিয়েছেন রাসেল। শেষ বলে রাহি নিজেও মেরে বসলেন একটা বাউন্ডারি। রাসেলের কাছে সেই ৫ রানেরও গুরুত্ব অনেক, “সব রানই গুরুত্বপূর্ণ। ৪-৫ রান করলেও। এরকম রানতাড়ায় এগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হয়ে যায়। এ কারণেই আমাদের ক্যাচ নেওয়া ও সোজা বল করা গুরুত্বপূর্ণ যতখানি সম্ভব।”

    রাহি তার কাজটা করলেন। রাসেল তার কাজটা। অবশ্য তখনও একটু বাকি ছিল। কিন্তু শেষ ওভারে ৮ রান প্রয়োজন হলেও ইমরুল জেনে গেলেন, আর কিছু বাকি নেই। হয়তো আপনিও জানেন তখন, রাসেল শেষ না করে আসবেন না। গুনারত্নে ক্রিজ ঘেঁষে প্রথম দুই বল ডট করলেন, আম্পায়ার চাইলে হয়তো নো দিতে পারতেন সেগুলোও। তৃতীয় বলটা ওয়াইড, এটাও রিটার্ন ক্রিজ স্পর্শ করেছিল গুনারত্নের পেছনের পা। 

    আম্পায়ার এরপরের বলটা নো দিলেন, রাসেল টেনে ছয় মারলেন। খেল খতম। অবশ্য এক চিলতে হাসি, আর সবার সঙ্গে আলিঙ্গনের পর আকাশপানে তাকানো- রাসেলের উদযাপন থাকলো এতটুকুই। বাকিটুকু তিনি রাখতে চান ফাইনালের জন্য, “উদযাপন করতে যাওয়ার মতো একটা ক্লাব থাকলে ভাল হতো, জানেন। কিন্তু ব্যাপার না। দুইদিন পর বড় একটা ম্যাচ আছে। তো পার্টিটা সেটার জন্য তুলে রাখলাম।”

    খুলনা টাইগার্স, শুনতে পাচ্ছেন তো? রাসেলকে সে পার্টির সুযোগটা করে দিলে কিন্তু ইমরুলের মতো সব শেষ হয়ে যাওয়ার ওই হতাশায় ডুবতে হবে, শেষের কিছু বাকি থাকলেও।  

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন