• লা লিগা
  • " />

     

    বার্সেলোনা ডাগআউটে সেতিয়েন: সাফল্য, না হতাশার পুনরাবৃত্তি?

    জাভি হার্নান্দেজ, রোনাল্ড কোমেনদের নাম শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত বার্সেলোনার হটসিটে এর্নেস্তো ভালভার্দের জায়গায় বসেছেন সাবেক রিয়াল বেটিস ম্যানেজার কিকে সেতিয়েন। ফুটবল দর্শন, দলকে খেলানোর ধরন- সবদিক দিয়ে একজন বার্সেলোনা বা আরও ভালো করে বললে একজন ক্রুইফ অনুসারী তিনি। লাস পালমাস, বেটিসের মত দল নিয়ে বার্সা-রিয়াল মাদ্রিদকে কাঁপিয়ে দেওয়া সেতিয়েনকে মৌসুমের মাঝপথে আনার সিদ্ধান্ত কেমন হল বার্সার? সেতিয়েন কি গার্দিওলার পথে হাঁটবেন? নাকি হতাশ করবেন ভালভার্দের মত?


     ২০১৮-১৯ লা লিগার ম্যাচডে ১২-তে ন্যু ক্যাম্পে বার্সেলোনার মুখোমুখি হয়েছিল রিয়াল বেটিস। ম্যাচের আগের সপ্তাহে বার্সেলোনা এবং লিওনেল মেসির প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন বেটিস ম্যানেজার কিকে সেতিয়েন। ম্যাচের আগে প্রায় সব সাক্ষাৎকার, সংবাদ সম্মেলনে কাতালানদের নিয়ে এতটাই মজেছিলেন সেতিয়েন,  শেষ পর্যন্ত বেটিস বোর্ডের থেকে নিজ দলের ট্যাকটিক্স এবং প্রস্তুতির দিকে আরও মনযোগী হওয়ার তাগাদা শুনতে হয়েছিল তাকে। প্রত্যুত্তরে সেতিয়েন হেসেছিলেন শুধু, পাল্টা কিছু বলেননি। হয়তো জানতেন, ন্যু ক্যাম্পেই সেদিন সেতিয়েনকে নতুন করে চিনবে ইউরোপ।

    দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে সেদিন বার্সাকে ৪-৩ গোলে হারিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল সেতিয়েনের বেটিস। তবে বার্সার মাঠে জয়, ৪ গোল- এসবের চেয়ে বেশি নজর কেড়েছে বেটিসের পারফরম্যান্স। বার্সাকে তাদেরই পাসিং টোটকায় বধ করেছিলেন সেতিয়েন ‘পাস অ্যান্ড মুভ’, বল হারানোর পর পুনরুদ্ধারের ‘ফাইভ সেকেন্ড রুল’; সেদিন জার্সি না থাকলে বেটিসের খেলা দেখে তাদের সেদিন বার্সা ভেবে বসলেও ভুল হত না খুব বেশি।

    বড় ক্লাবকে হারানো অবশ্য এবারই নতুন নয় সেতিয়েনের। তার বেটিস শেষ তিন মৌসুমে দু’বার সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে হারিয়ে দিয়েছিল রিয়াল মাদ্রিদকে। বেটিসের আগেও ছোট দল নিয়ে চমক দেখিয়েছেন সেতিয়েন। লাস পালমাসকে নিয়ে অল্পের জন্য বার্নাব্যুতে জয় পাওয়া হয়নি তার। তবে ৩-৩ গোলের সেই ড্রয়ের পর ঐ ম্যাচে লাস পালমাসের পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেছিলেন সাবেক স্পেন ম্যানেজার ভিসেন্তে দেল বস্কও। ন্যু ক্যাম্পে এসে একবার সার্জিও বুস্কেটসের কাছ থেকে একটা জার্সি উপহার পেয়েছিলেন। তাতে লেখা ছিল, ‘ফুটবলকে আপনি যেভাবে দেখেন তাতে আপনার প্রতি সম্মান। আপনার জন্য শুভকামনা রইল।’

     

     

    বার্সেলোনার আগে ক্যারিয়ারে কোনো বড় ক্লাবের ম্যানেজার ছিলেন না সেতিয়েন। সিভিটাও সে অর্থে বেশ হালকাই কাতালানদের বর্তমান ম্যানেজারের। প্রথম সংবাদ সম্মেলনে সেতিয়েন নিজেই বলেছেন, তার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না যে তিনি এখন মেসিদের কোচিং করাবেন। বার্সেলোনার খেলার ধরন নিয়ে প্রশংসা করে আসা সেতিয়েন অবশ্য ৪-৩ এর ঐ ম্যাচের পরই কাতালানদের ডাগআউটে বসার স্বপ্নের কথা জানিয়েছিলেন। বছর দেড়েকের মধ্যে সে স্বপ্ন সত্যি হবে, এমনটা হয়তো ভাবেননি তিনি নিজেও।

    সেতিয়েনকে তার প্রথম ক্লাব রেসিং সান্তান্দারের সমর্থকরা ডাকেন ‘এল মায়েস্ত্রো’ হিসেবে। কোচিং করানোর স্টাইল, দলকে খেলানোর ধরন- সবকিছুতেই বার্সার একটা ছাপ লক্ষ্য করা যায় তার মাঝে। ন্যু ক্যাম্পে বার্সা-বধের পর অনুভূতি কেমন জিজ্ঞেস করতেই তিনি বলেছিলেন, ‘তারা (বার্সেলোনা) গত ২৫ বছর ধরে এমন ফুটবল খেলে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করছে। আমরা শুধু তাদের দর্শনটাই কাজে লাগিয়েছি।’ বার্সা ভক্ত সেতিয়েনের কাছে ইয়োহান ক্রুইফ একজন সাক্ষাৎ দেবদূত।

    এত বছর পরে এসেও ক্রুইফের ‘ড্রিম টিম’ বার্সাকে তাকে যেভাবে মোহাচ্ছন্ন করেছিল, তা ভুলতে পারেননি সেতিয়েন, ‘ক্রুইফের বার্সার খেলা দেখতাম আর ভাবতাম, হ্যাঁ, এভাবেই ফুটবলটা খেলা উচিত। এভাবেই খেলাতে চাই আমি। আমি খুব চাইতাম বার্সার হয়ে খেলতে যাতে পাসিং ফুটবলের এই ধাঁচটা ধরতে পারি। তাদের হয়ে খেলার জন্য হাতও কেটে ফেলতে রাজি আমি!’

     

     

    লা লিগায় দীর্ঘদিন কোচিং করানোয় বার্সার হয়ে স্পেনে মানিয়ে নিতে তেমন সমস্যা হয়তো হবে না সেতিয়েনের। ক্রুইফের সরাসরি শিষ্য না হলেও সে দর্শনেরই একজন ছাত্র তিনি। দলকে পাসিং ফুটবলে গড়ার দিকেই বদ্ধপরিকর তিনি। বেটিস, লাস পালমাসে অন্তত তাই প্রমাণ করেছেন সেতিয়েন। সচরাচর ম্যানেজার বরখাস্ত না করা বার্সেলোনা মৌসুমের মাঝপথে সেতিয়েনকে এনে যে আস্থা দেখিয়েছে তার ওপর, তাতে তার নিজের আত্মবিশ্বাসও বেড়ে যাওয়ার কথা কয়েকগুণ।

    টিকিটাকার সাথে প্রেসিং ফুটবলের এক চমৎকার মিশেলে বেটিসকে ইউরোপা লিগের সেমিতেও নিয়ে গিয়েছিলেন সেতিয়েন। বার্সেলোনা শেষ এই ঘরানার ফুটবল খেলেছিল লুইস এনরিকের অধীনে, সেবার ‘ট্রেবল’ও জিতেছিল তারা। প্রথম অনুশীলনের পরই দলে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখার কথা বলেছেন বুস্কেটস। সব মিলিয়ে সুদিন ফেরানোর জন্য সেতিয়েনেই আস্থা রাখছেন বার্সার ফুটবলাররা। 

    তবে ফুটবল দর্শন যেমনই হোক, মাঠে ফলাফল না পেলে ম্যানেজারকে শূলে চড়াতে দু;বার ভাববেন না কাতালান সমর্থকরা। স্পেনে রাজত্ব করলেও ইউরোপে বারবার মুখ থুবড়ে পড়ছিল ভালভার্দের বার্সা। এজন্যই ক্রুইফের দলের এক সাবেক ফুটবলারকে চাকরিচ্যুত করার জন্য রীতিমত মাঠেই নেমে পড়েছিল তারা। অ্যাথলেটিক বিলবাও থেকে ভালভার্দে যোগ দেওয়ার সময়ও তাকে নিয়ে আগ্রহ এবং প্রত্যাশার কমতি ছিল বার্সেলোনা সমর্থকদের।

    তবে সেতিয়েনের মত এতটাও বিবর্ণ ছিল না তার অর্জনের ঝুলি। বিলবাওয়ের হয়ে প্রতিনিয়তই বার্সা-রিয়ালকে আটকে দিয়েছিলেন ভালভার্দে, জিতেছিলেন স্প্যানিশ সুপারকাপ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজ হয়নি এসবে। বার্সার হটসিটে নিজেকে প্রমাণ করতে ব্যর্থ ভালভার্দেকে তাই বিদায় নিতে হল আগেভাগেই। ভালভার্দের পর হয়তো সমৃদ্ধ সিভি ছাড়া কোনো ম্যানেজারের ওপর আস্থা রাখার আগে দু’বার ভাববেন বার্সা সমর্থকরা। বেটিস, রেসিং যত ভাল ক্লাবই হোক না কেন, দিনশেষে বার্সেলোনার মত দলকে সামলানো যে কারো জন্য পর্বতসম চ্যালেঞ্জ। আর তাতে উতরে যাওয়াও সহজ কথা নয়।

     

     

    শুধু বার্সেলোনা নয়, ইউরোপের অন্যান্য অনেক ম্যানেজারই ছোট ক্লাবের হয়ে আলো ছড়িয়ে বড় ক্লাবে হতাশ করেছেন (ডেভিড ময়েস, রয় হজসন, উনাই এমেরি)। শুধু যে ফুটবলীয় দর্শন দিয়ে সমর্থকদের মন এবং শিরোপা জেতা যায় না, তা ভালমতই জানেন সেতিয়েন। ট্যাকটিক্স, দর্শন- সবকিছুই বার্সা সুলভ হলেও ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে সফল হতে শিরোপা জিততেই হবে তাকে- যেটা এখনও অধরাই আছে সেতিয়েনের ক্যারিয়ারে। 

    ২০০৩-এর পর প্রথমবার ম্যানেজার বরখাস্ত করার সিদ্ধান্তটা হিতে বিপরীত হতে পারে বার্সার। শুধু ম্যানেজার বদলেই যেন ভাগ্য বদল হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ, সেটা হয়তো জানেন বার্সার কট্টর সমর্থকরাও। সেক্ষেত্রে মৌসুমের মাঝপথে, আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগতে থাকা ভঙ্গুর একটি দলকে নিয়ে ঠিক কতটা পথ পাড়ি দিতে পারবেন সেতিয়েন, তা নিয়ে সংশয় আছে অনেক। রক্ষণ, মাঝমাঠ, আক্রমণ- মেসি, টের স্টেগান ছাড়া দলের কেউ নেই ফর্মে। এমন একটা দলকে মৌসুমের মাঝপথে সেতিয়েন পুনরুজ্জীবিত করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অবশ্য ধোঁয়াশা আছে বেশ। 

    মৌসুমের মাঝপথে বার্সার ডাগআউটে আসতে জাভি-কোমেন মানা করে দিলেও হয়তো গ্রীষ্ম পর্যন্ত অপেক্ষা করাটাই শ্রেয়তর হত কাতালানদের জন্য। দলবদলের ডেডলাইন ডে-র শেষদিকে ফুটবলারদের দলে ভেড়ানোকে অনেক সময় ‘প্যানিক বাই’-ও বলা হয়। সে অর্থে সেতিয়েন নিজেও হয়তো বার্সার জন্য এক ‘প্যানিক বাই’-ই বটে। সুপারকাপের ব্যর্থতার ঢাকতে তাই সমর্থকদের ইচ্ছাটাকেই এগিয়ে রেখেছিল কাতালানরা।

    তবে বার্সা সমর্থকরা সেতিয়েনকে হটসিটে বসতে দেখে যতটা না খুশি, তার চেয়ে হয়তো বেশি নির্ভার ভালভার্দের প্রস্থানে। কিন্তু সেতিয়েন নিজেও জানেন, দর্শন এবং ট্যাকটিক্সের দিক দিয়ে বার্সাসুলভ হওয়া নিয়ে যত কথাই বলেন না কেন; শেষ পর্যন্ত শিরোপা দিয়েই মাপা হবে তার সাফল্য। ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটায় তাই সেতিয়েনকে হতে হবে বার্সার ‘এল মায়েস্ত্রো’, যেমনটা ছিলেন রেসিং এবং বেটিসের হয়ে।