• লা লিগা
  • " />

     

    বার্সেলোনার ডাগআউটে অভিষেকে কেমন করলেন কিকে সেতিয়েন?

    বার্সেলোনার দায়িত্বে আসার পরই কিকে সেতিয়েন বলেছিলেন, ‘দল ভাল খেলবেই এই নিশ্চয়তা নিচ্ছি। বার্সার চিরপরিচিত পাসিং ফুটবল দর্শনেই দল সাজাব।’ প্রথম ম্যাচ দিয়ে সেতিয়েনকে মাপা কিছুটা অবান্তর। তবে ‘ফার্স্ট ইমপ্রেশন’ হিসেবে বলতে গেলে কথা রেখেছেন সাবেক লাস পালমাস এবং রিয়াল বেটিস ম্যানেজার। কাতালানদের ম্যানেজার হিসেবে অভিষেকে গ্রানাডাকে ন্যু ক্যাম্পে ১-০ গোলে হারিয়েছে তার দল।

    পাসিং ফুটবলের দর্শনে দলকে খেলানোর প্রতিশ্রুতি রেখেছেন সেতিয়েন- এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ বার্সেলোনার পজেশন এবং ম্যাচে পাস সংখ্যা। ম্যাচ শেষে বার্সার পজেশন ছিল প্রায় ৮৩ ভাগ, পুরো ম্যাচে কাতালানদের পাস সংখ্যা ছিল ১০০৫। এই মৌসুমে এর চেয়ে বেশি পজেশন বা পাস সংখ্যা কোনো ম্যাচেই ছিল না বার্সার। দু’দলের শক্তির বিচার এবং পয়েন্ট টেবিলের ব্যবধানের বিচারে অবশ্য স্কোরলাইন দেখে কিছুটা হতাশই হতে পারেন বার্সেলোনা সমর্থকরা। তবে এই ১০ম স্থানে থাকা গ্রানাডাই মৌসুমের শুরুতে নিজেদের মাঠে ২-০ গোলে হারিয়ে দিয়েছিল এর্নেস্তো ভালভার্দের বার্সেলোনাকে। প্রেসিং ফুটবলে সে ম্যাচে মেসিদের রীতিমত নাকানিচুবানি খাইয়েছিল তারা। ন্যু ক্যাম্পেও একই ট্যাকটিক্স খাটিয়েছে তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয় হয়েছে সেতিয়েনের ফুটবলীয় দর্শনেরই।

    ন্যু ক্যাম্পে অবশ্য ম্যাচের আগে থেকেই সেতিয়েনকে নিয়ে ইতিবাচক চিন্তাভাবনা ছিল সমর্থকদের মাঝে। সার্জিও বুস্কেটস, যিনি বার্সেলোনার আলো-বাতাসে বড় হয়েছে, সেই বুস্কেটস ২০১৮ সালে ন্যু ক্যাম্পে সেতিয়েনের বেটিসের কাছে ৪-৩ গোলে হারের পর নিজের এক জার্সি তাকে পাঠিয়ে লিখেছিলেন, ‘ফুটবলকে আপনি যেভাবে দেখেন সেজন্য আপনার প্রতি ভালবাসা।’ সেতিয়েনের প্রতি সমর্থকদের এই ইতিবাচক মনোভাব আরও বেড়ে যায় বার্সেলোনার একাদশ দেখে।

     

     

    পুরো মৌসুমে খুব সম্ভবত ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ংয়ের পর বার্সেলোনার সেরা মিডফিল্ডার আর্তুরো ভিদাল। ভালভার্দের অধীনে ‘সুপার সাব’ খেলা ভিদাল টানা পারফর্ম করলেও মূল একাদশে জায়গায় পাচ্ছিলেন না। সেতিয়েন দায়িত্বে এসে প্রথম ম্যাচেই তাকে নামিয়ে দিলেন একাদশে। এস্পানিওলের বিপক্ষে লাল কার্ড দেখা ডি ইয়ংয়ের জায়গায় নামলেন ইভান রাকিটিচ। আক্রমণে লুইস সুয়ারেজ এবং উসমান ডেম্বেলের ইনজুরির কারণে সেতিয়েন আস্থা রাখলেন বার্সেলোনার নতুন সেনসেশন ১৬ বছর বয়সী আনসুমান ফাতিতে।

    মেসি খেললেন ডানপ্রান্ত দিয়ে ‘ফ্রি রোল’-এ, আর আঁতোয়া গ্রিযমান খেললেন আক্রমণে একদম ‘রাইট থ্রু দ্য মিডল’, বা ‘নম্বর ৯’ পজিশনে; যেখানে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল তিনি। নিজেদের পজিশনে নেমেই সামর্থ্যের জানান দিলেন ভিদাল এবং গ্রিযমান। খুব সম্ভবত বার্সেলোনার জার্সিতে নিজেদের সেরাটাই দিলেন তিনি। পুরো ম্যাচ শুধু আক্রমণ নয়, বল হারালে দুর্দান্ত প্রেসিংয়ে তাদের বল কেড়ে নেওয়ার প্রবণতা চোখে পড়েছে বেশ। অবশ্য সেটা পুরো একাদশের জন্যই সত্য।

    সেতিয়েন যে একেবারে লেটার মার্কস পেয়ে উতরে গেছেন, তা অবশ্য নয়। রক্ষণে স্যামুয়েল উমতিতিকে খেলানোর সিদ্ধান্ত কিছুটা বিস্ময়করই ছিল। ক্লেমেন্ত লংলে এই মৌসুমে বার্সেলোনার অন্যতম ধারাবাহিক ফুটবলার। তার ওপর নেলসন সেমেদোর জায়গায় রাইটব্যাকে খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি সার্জি রবার্তো। জর্দি আলবাও নিজেকে হারিয়ে খুঁজছেন এখন।

     

     

    তবে খুব সম্ভবত রাকিটিচকে নামিয়েই বার্সা সমর্থকদের সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছেন সেতিয়েন। পুরো ম্যাচে ক্রোয়াট মিডফিল্ডার ছিলেন নিষ্প্রভ। শেষ পর্যন্ত তাকে বদলি করেছেন সেতিয়েন, আর তাতেই বার্সেলোনার হতাশার বদলে এসেছে সম্ভাবনার নতুন সূর্য। দায়িত্বে আসার পর সেতিয়েন বলেছিলেন, ‘লা মাসিয়া বিশ্বের সেরা ফুটবল একাডেমি। এখানে কেউ নিজেদের প্রমাণ করলে অবশ্যই একাদশে সুযোগ পাবে।’ সেতিয়েন আসার অনেক আগে থেকেই বার্সার যুবদলে নিজেকে প্রমাণ করে আসছেন রিকি পুই।

    কিন্তু ভালভার্দের অধীনে একাদশে জায়গাই পাননি তিনি। দ্বিতীয়ার্ধে রাকিটিচের বদলে তরুণ পুইকে নামিয়ে দেন সেতিয়েন। বার্সার একমাত্র গোলটা এসেছে তার কারণেই। বল হারানোর পর দুর্দান্ত প্রেসিংয়ে বল কেড়ে নিয়ে মেসিকে পাস বাড়ান পুই। গ্রিযমানকে পাস বাড়িয়ে ডিবক্সে ঢুকে পড়েন মেসি। ফ্রেঞ্চ ফরোয়ার্ড পাস ছাড়েন ভিদালকে। দুর্দান্ত এক ব্যাকহিলে গ্রানাডার তিন ডিফেন্ডারকে ছিটকে ফেলেন ভিদাল। মেসির পায়ে আসতেই ডান পায়ের মাপা শটে দলকে এগিয়ে নেন বার্সা অধিনায়ক।

    পুরো গোলের বিল্ড আপ আপনাকে হয়তো মনে করিয়ে দিতে পারে পেপ গার্দিওলার বার্সাকে। বার্সেলোনার সেই পুরনো দুর্ধর্ষ টিকিটাকায় আবারও ঘায়েল প্রতিপক্ষ। শেষ পর্যন্ত ঐ এক গোল নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে সেতিয়েনের দলকে। কিন্তু প্রথম ম্যাচ দিয়েই আশার প্রদীপের আলোটা আরও উজ্জ্বল হল সেতিয়েনকে ঘিরে।