• প্যাভিলিয়নে প্যাভিলিয়ন
  • " />

     

    'ফ্রম সুবর্ণ এক্সপ্রেস টু এমএ আজিজ স্টেডিয়াম'

    সব থমকে গেছে যেন আপাতত। এ সময়ে প্যাভিলিয়নে প্যাভিলিয়ন সিরিজে আমরা মনে করেছি মাঠে বসে আমাদের দেখা স্মরণীয় ম্যাচের কথা। যেখানে চারপাশে উল্লাস বা স্তব্ধতা যাই থাকুক, ঘোরলাগা মুহুর্তের রেশ ছিল আমাদের। 


    প্রথম সবকিছুর গল্প সুমন বলেছিলেন তার গানে। প্রথম খেলা দেখার গল্পটা অবশ্য বাদ পড়ে গিয়েছিল সেখানে। তবে যে শহর জানে আমার প্রথম সবকিছু, খেলার মাঠের প্রথম দিনটা তো সে জানবেই। চট্টগ্রামের প্যারেড কর্নারে বাবার হাত ধরে কোন খেলাটি প্রথম দেখেছিলাম, সেটা এখন আর মনে নেই। তবে মাঠে গিয়ে প্রথম ‘ম্যাচ’ দেখার অভিজ্ঞতাটা মনে আছে ভালোমতোই।

    ২৮ অক্টোবর, ১৯৯৮। হেমন্তের সেই দিনটা সারাজীবন মনে রাখবে ছেলেটা। ঢাকা শহর এসে সেদিনই তার আশা “পুরাইসিল”। শিল্প ব্যাংক ভবনের দিকে তাকিয়ে অবাক বিস্ময়ে ছেলেটা বলেছিল, ‘এত বড় বিল্ডিংও বুঝি হয়!’ তখনো কেবল হাফপ্যান্ট ছেড়ে ফুলপ্যান্ট পরার বয়স। একটু একটু করে বড় হতে যাওয়ার স্পর্ধা। আইসিসির চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি সেবার প্রথমবারের মতো হয়েছিল বাংলাদেশে, নাম হয়ে গিয়েছিল মিনি বিশ্বকাপ। খেলাপাগল বাবা-চাচাদের হাত ধরে প্রথমবারের মতো সুবর্ণ এক্সপ্রেসে চেপে ঢাকা যাওয়া,প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ দেখা- সব অভিজ্ঞতা হয়ে গিয়েছিল সেদিন।

    তখনও মিরপুরে ক্রিকেটের পসার বসেনি। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামটি তখন ফুটবল আর ক্রিকেট ভাগাভাগি করে নিত। ভারত-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ নিয়ে সেবার উন্মাদনা ছিল তুঙ্গে। একদিকে মার্ক ওয়াহ, গিলক্রিস্ট, পন্টিং আরেকদিকে শচীন, সৌরভ-দ্রাবিড়- টিকেটের অমন আকাশচুম্বি চাহিদাটা অনুমান করতে কষ্ট হয় না। স্মৃতির দীঘিতে ডুবসাঁতার দিলে একটু একটু করে ভাসতে থাকে শাহবাগ থেকে স্রোত। খুব সম্ভবত ১ নম্বর গেট দিয়ে ঢুকেছিলাম স্টেডিয়ামে। দিবারাত্রির ম্যাচে মানুষের লাইন শুরু হয়ে গেছে সেই সকাল থেকে। বেশ তাড়াতাড়ি বের হয়েও লাইন ধরতে হয়েছিল তাই। তখনও মুঠোফোন ঠিক সুলভ হয়নি আজকের মতো। আবছা মনে পড়ে, লাইনে আমার সামনে দাঁড়ানো লোক ঢাউস সাইজের সেই নোকিয়া ফোন ব্যবহার করে কথা বলছিলেন। ব্যানার, প্ল্যাকার্ড বানানোর কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল আগের দিন থেকেই। সেসব নিয়েই ঢুকতে পেরেছিলাম। আর রোদচশমার সাথে ছিল আরেকটা জিনিস- বাইনোকুলার। বঙ্গবন্ধুর পিচ থেকে গ্যালারির দূরত্ব বেশি, বল ঠিকঠাক দেখার জন্য বাইনোকুলার নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন একজন আত্মীয়। তাই দূরবিনসমেত ঢুকেছিলাম সেই প্রথমবার, এবং শেষবারও।

    ক্লাব হাউস থেকে এরপর যে স্মৃতি, তার সবটুকু জুড়ে ছিল শচীন রমেশ টেন্ডুলকার নামের একজন। সে বছরটাই ছিল টেন্ডুলকারের, অস্ট্রেলিয়ার সাথে শারজায় অবিশ্বাস্য দুইটি ইনিংস খেলেছিলেন সেই ১৯৯৮ সালেই। শারজার ওই দুই ইনিংসের জন্য টিভি ছিল সম্বল, তখন অবশ্য ভাবিনি লিটল মাস্টারকে দেখার অপেক্ষাটা সে বছরই ফুরোবে।

    শুরুতে ভারত ব্যাট করতে নামার পর থেকে বাকি ইনিংসটা টেন্ডুলকারময়। স্মৃতিতে তো সব সাক্ষ্য নেই, স্কোরকার্ড মনে করিয়ে দিল সেই ম্যাচে ম্যাকগ্রা-ওয়ার্নবিহীন অস্ট্রেলিয়াকে শুরু থেকেই চাপে রেখেছিলেন টেন্ডুলকার। স্পিনে টেন্ডুলকার সবসময়ই ছিলেন দুর্দান্তও, ওয়ার্নকেও লাইন লেংথ খুঁজতে জেরবার হতে হতো তার বিপক্ষে। মনে আছে, সেদিনও ডাউন দ্য উইকেটে এসে স্পিনারদের মাঠছাড়া করছিলেন শচীন। আর স্কোরকার্ড মনে করিয়ে দিচ্ছে, ওয়ার্নের জায়গায় সেবার নেমেছিলেন ব্র্যাড ইয়াং নামের একজন বাঁহাতি স্পিনার। আর অকেশনার ড্যারেন লেম্যানের ওপর দিয়েও শচীন ঝাড়ছিলেন ঝাল। দেখতে দেখতে সেঞ্চুরিতে পৌঁছে গেলেন, স্টেডিয়ামে তখন গগনবিদারী চিৎকারে কান পাতা দায়। শেষ পর্যন্ত ১৪১ রানে থেমেছিলেন শচীন, সেটা মনে আছে স্পষ্ট। ভারতও ৩০০ পেরিয়েছিল, আর সেই স্কোর টপকাতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়া খাবি খেয়েছে শুরু থেকেই। বল হাতেও শচীন ভেল্কি দেখিয়েছিলেন সেদিন। স্টিভ ওয়াহকে দিয়ে শুরু, এরপর একে একে তুলে নিয়েছিলেন ৪ উইকেট। এক ম্যাচে সেঞ্চুরি আর ৫ উইকেটের অবিশ্বাস্য কীর্তিটা হয়নি একটুর জন্য। তবে সেই বয়সে তো পরিসংখ্যান বোঝার অত সাধ্য ছিল না। টেন্ডুলকার ম্যাচ শেষে দর্শকদের অভিবাদনের জবাবে হাত নাড়তে নাড়তে বেরিয়ে যাচ্ছেন, সেটাই ছিল আসলে অনেক কিছু।

     

    প্রথম ম্যাচ দেখার স্মৃতি সেটি হলেও খেলার মাঠে সবচেয়ে স্মরণীয় দিন অবশ্য আরেকটি। এরপর অনেকটা সময় কেটে গেছে। তখন আমাদের টাই পরার বয়স, গায়ে লেগে থাকা কৈশোরের গন্ধটা প্রাণপণে তাড়ানোর বয়স। সবেমাত্র স্কুলের গন্ডি পেরিয়েছি, “বেশ বড় হয়ে গেছি” ভাবনাটা কেবল মাথায় জেঁকে বসতে শুরু করেছে। খুব সম্ভবত তখন কলেজের প্রথম বর্ষের কোনো একটা পরীক্ষাও চলছিল। জিম্বাবুয়ের সাথে বাংলাদেশের টেস্ট চলছিল এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে। চতুর্থ দিন শেষ বিকেলেই বাংলাদেশ অলআউট হয়েছিল। পঞ্চম দিনের হিসেবটা সোজা, বাংলাদেশকে জিততে হলে নিতে হবে ৭ উইকেট। জিম্বাবুয়েকে জিততে হলে ৩০০র বেশি রান করতে হবে আর ড্র করতে হলে কাটিয়ে দিতে হবে গোটা দিনটা। জিম্বাবুয়ের জয়টা একটু বেশিই কষ্টকল্পনা হয়ে যাচ্ছিল। বরং প্রথম আর তৃতীয় সম্ভাবনাটাই তখন সবচেয়ে বাস্তব।

    পঞ্চম দিন সকালেই ঢুকে যেতে হয়েছিল পরীক্ষার হলে। ধূসর নিউরন ব্যস্ত দ্বিঘাত সমীকরণ মেলাতে, কিন্তু হৃদয় পড়ে আছে কিলোমিটার খানেক দূরের এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে। পরীক্ষার সময় শেষ, ঘণ্টাখানেক পর খাতা জমা দিয়েই প্রথমেই রেডিওতে শুনে নিলাম স্কোর। তখনও মুঠোফোন কলেজপড়ুয়াদের জন্য আজকের মতো সহজলভ্য হয়নি, ওই রেডিওই ছিল ভরসা। কিন্তু যে সুসংবাদের অপেক্ষায় ছিলাম, সেরকম কিছুই হলো না। টেলর-মাসাকাদজা তখনো ব্যাটিং করে যাচ্ছেন। তারপরও ঠিক করে ফেললাম, জিতি আর নাই জিতি, আজ মাঠে যাবই।

    কিন্তু বললেই তো হলো না, কলেজও ফাঁকি দিতে হবে। ক্লাস তখনও আরও দুইটি বাকি, পাক্কা দুই ঘন্টা মামলা। কিন্তু ততক্ষণ তো বসে থাকলে চলবে না। কিন্তু মিলিটারি কলেজে সবাই হুট করে চলে গেলেও পরে দিতে হবে আক্কেল সেলামি। শেষ পর্যন্ত সাহস করে পাঁচজন বেরিয়ে পরলাম ব্যাগ নিয়ে। গেটটা যখন প্রায় পেরিয়েই যাচ্ছিলাম, তখনই যেখানেই বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হলো। “এই কোথায় যাচ্ছিস-” স্যারের ডাকটা না শোনার ভান করেই দিলাম দৌড়। এক ছুটে কলেজের বাইরে, পড়িমড়ি করে রিকশা নিয়ে সোজা স্টেডিয়াম।

    এদিকে মাঠে গিয়ে দেখি আরেক কাণ্ড। গোটা শহর তখন টিকিটের খোঁজে সতর্ক, আমরা পায়ে পায়ে মাঠে ঢোকার ফিকির করি। সবাই বুঝে ফেলেছে, আজ কিছু একটা হতে চলেছে। শেষ পর্যন্ত পাশের এক দোকানেই পেয়ে গেলাম সোনার হরিণ টিকেট, পড়িমড়ি করে ঢুকে পড়লাম মাঠে। ঢুকেই দেখলাম লক্ষণ খুব একটা সুবিধার নয়, ব্রেন্ডন টেলর-হ্যামিল্টন মাসাকাদজা ঝটপট কয়েকটা চারও মেরে ফেললেন। খেলার চিন্তা বাদ দিয়ে পরের দিন কীভাবে স্যারের হাত থেকে পিঠ বাঁচানো যায় সেটা নিয়েই তখন দুশ্চিন্তা।

    তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে গেলেন টেলর। আমাদের আশার পালে আরেকটু হাওয়া লাগল। তবে সত্যিই সত্যিই যে দিনটা বাংলাদেশের হবে, সেই আভাসটা একদম স্পষ্ট হলো কিছুক্ষণ পর। পুরো ম্যাচেই টাটেন্ডা টাইবুই সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছিলেন, সেই টাইবুই আউট। ততক্ষণে সকালবেলার ফাঁকা গ্যালারির অনেকটুকুই ভরে গেছে, আমরাও আরও কয়েকজন বন্ধুবান্ধবকে পেয়ে গেলাম সঙ্গী হিসেবে। মাথার ওপর রোদ তখন তেঁতে উঠতে শুরু করেছে, গায়ে সোয়েটারটা পেঁচিয়ে নিলাম কোমরে। কে যেন কয়েকটা টিনও নিয়ে এলো (এখনকার মতো নিরাপত্তাব্যবস্থার কড়াকড়ি ছিল না তখন)। সেই টিন পিটিয়েই “বাংলাদেশ, বাংলাদেশ” স্লোগানটা চলতে থাকল সমানে। কিছুক্ষণ পর আউট হয়ে গেলেন মাসাকাদজাও। আমরা বুঝে গেলাম, জয়টা আজ শুধুই সময়ের ব্যাপার। মন বলছিল, এবার আর মুলতানের মতো কিছু হচ্ছে না।

    এরপর একটা উইকেটের সাথে সাথে উল্লাসের হর্ষধ্বনি, জয়ের সূর্যটা গনগনে আঁচ ছড়াতে শুরু করেছে ভরদুপুরে। সময়টাও যেন ঘড়িতে এখনো আটকে আছে, ঠিক ১২টা বেজে ৫৪ মিনিট। এনামুল হক জুনিয়রের বলে সিলি মিড অফে ক্রিস পোফুর ক্যাচটা ধরলেন মোহাম্মদ আশরাফুল, এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে যেন একটুকরো বিস্ফোরণ। সেই “বাংলাদেশ, বাংলাদেশ” চিৎকার, একদল কিশোরের সেই উদ্বাহু নাচ, রফিক, এনামুলদের সেই ভিক্টরি ল্যাপ- সবই যেন ভাসছে চোখের সামনে। ১০ জানুয়ারি, ২০০৫ বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে চিরস্থায়ী জায়গা পেয়ে গেছে, একজন ইউনিফর্ম পরা কিশোরের কাছেও। এরপর অনেক ম্যাচ দেখেছে সে, মাঠ থেকে সঙ্গী হয়েছে অনেক রোমাঞ্চের- কিন্তু সেদিনের রোমাঞ্চের আবেশ যেন চোখে লেগে আছে এখনও।