• ক্রিকেটারদের আলাপ
  • " />

     

    ডিজে, ব্যাশ, চাচা-র সঙ্গে তামিম, আর সেই সময়ের গল্প

    তারা তিনজন মিলিয়ে বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন ২৮৭টি। তামিম ইকবাল এখন পর্যন্ত একাই খেলেছেন তাদের তিনজনের চেয়ে ৫৮টি বেশি। তামিম সব ফরম্যাট মিলিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি রান-সংগ্রাহক, সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরি তার, সবচেয়ে বেশি ফিফটি তার। তামিম বাংলাদেশের হয়ে ১২২টি জেতা ম্যাচ খেলেছেন, ওই ৩ জন জয়ের স্বাদ পেয়েছেন মোট ৪১ বার।  

    সংখ্যাগুলো বদলে গেছে। আদতে বদলেছে সময়। সময়কে এখনও একমাত্রিক বলেই ধরা হয়, বোধহয় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এককগুলির একটি এটি। সময়ের সঙ্গে অন্য চলকগুলোও এমনভাবে বদলে যায়-- শুধু সময় বদলে গেছে বলেই যেন অনেক কিছু বলার চেষ্টা করা হয়। 

    তোরা বা তোমরা এসব বুঝবি বা বুঝবে না, আজকালকার ছেলেমেয়ে চিন্তাই করতে পারবে না-- খুবই কমন কথাবার্তা ‘সিনিয়র’দের। মনে হয় প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি সেক্টরে এই ব্যবধানটা আছে- কাল আর আজের। তবে গল্প থাকে। যে গল্প অতীতের এক কোণা থেকে ঝটকা মেরে ঘুরিয়ে আনে আপনাকে। একেকটা ছবি ঝলক দিয়ে যায় সামনে, একটা ভ্রমণের ঝলক। আপনি বুঝতে চেষ্টা করেন- পরিস্থিতি, প্রেক্ষাপট। 

    নাইমুর রহমান দুর্জয়, খালেদ মাহমুদ সুজন, হাবিবুল বাশার সুমন-- বাংলাদেশের তিন সাবেক অধিনায়কের সঙ্গে এখনকার ওয়ানডে অধিনায়ক তামিম ইকবালের আড্ডা তেমনই এক ভ্রমণের মতো।  

    তামিম যখন মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে ইন্সটাগ্রাম লাইভের ঘোষণা দিলেন, আদতে সে লাইভে কী হবে সেটা তখন খোলাসা করেননি। এরপর বললেন তার উদ্দেশ্যটা-- যেহেতু তারা বিনোদনদায়ী বা ‘এন্টারটেইনার’, সেহেতু এই কঠিন সময়ে তারা একটু ইনসাইট শেয়ার করে দর্শকদের একটু বিনোদন দিতে চান। মুশফিক-মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে ইন্সটা লাইভের পর তামিম এলেন ফেসবুকে, যেখানে বাংলাদেশীদের উপস্থিতি বেশি। মাশরাফির সঙ্গে সেশনে একসময় ১ লাখ মানুষও সেটি দেখেছেন একসঙ্গে। এরপর এলেন তাসকিন আহমেদ ও রুবেল হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে। 

    আগেই বলে রেখেছিলেন, কয়েকজন ‘এক্স’ ক্রিকেটারকে আনতে চান- যারা তেমন কাঠামোগত সুবিধা পাননি, যারা ‘কষ্ট’ করেছেন। তামিম মাহমুদর সঙ্গে ঘরোয়াতে খেলেছেন, বাশারের অধিনায়কত্বে অভিষেক হয়েছে তার। তামিম এ প্রজন্মের, তবে আগের প্রজন্মের অবদান ভুলে যান না। তামিম সেদিনও মাহমুদের ৪৯ রানের ইনিংস দেখেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। এর আগে আতহার আলি খানের ইনিংস দেখেছেন। বাশারের ইনিংস দেখলেই লিংক হোয়াটস-অ্যাপ করেন।

    এ আড্ডায় তামিম সবাইকে ‘ভাই’ ডাকেন। তবে সে তিনজনের কাছে নাইমুর ‘ডিজে’, বাশার ‘ব্যাশ’ আর মাহমুদ ‘চাচা’। তারা সে সময়ের ডাকেই আটকে আছেন। এসব কিছু বদলায় না হয়তো।

    তবে সময়টা বদলে গেছে। অথবা সময়ের সাথে বদলে গেছে পরিস্থিতি, প্রেক্ষাপট, বদলে গেছে সংখ্যার মান, ভার। তামিম সে সময়ের গল্পটা শুনতে চান। অথবা শোনাতে চান। 

     


    ২০০৭ বিশ্বকাপে বাশার (সামনে) ও তামিম (পেছনে বাঁয়ে), সঙ্গে শাহরিয়ার নাফীস (পেছনে ডানে)


    বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক নাইমুর তাই সে টেস্টের গল্প বলেন। সে গল্পতে আসে তখন তাদের ‘অ্যানালাইসিসের’ প্রসঙ্গ। মাশরাফির সঙ্গে লাইভে তামিম বাংলাদেশ জাতীয় দলের অ্যানালিস্ট শ্রীনিবাস চন্দ্রশেকারানকে এনেছিলেন। তথ্যের মূল্য তখনও ছিল, তবে এতো সহজলভ্য ছিল না। আগেরদিনই তাসকিন বললেন উঠতি তারকাদের, “আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভিডিও অ্যানালাইসিস করা হয়, সহজেই রিড করা যায়’। তাসকিন অবশ্য নতুন কোনও তথ্য দেননি, বরং তাসকিন এ সময়েও কেন এটা বুঝতে পারেননি সেটিই বিস্ময়ের হতে পারে। 

    নাইমুরর কথা টেনে নিয়ে বাশার কিছু বলার আগেই নাইমুর বলে ওঠেন-- অরুণ লাল। এক এশিয়া কাপে যাওয়ার আগে তারা অরুণের দ্বারস্থ হয়েছিলেন, তথ্যের জন্য। অ্যানালাইসিসে তখন তাদের কাছে সম্বল ছিল প্রিমিয়ার লিগে খেলতে আসা বিদেশী ক্রিকেটাররা। প্রতিপক্ষকে বিশ্লেষণ নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের হাবভাব বুঝতেও তাদের সহায়তা প্রয়োজন পড়ত তাদের।  

    নাইমুর, বা ডিজে-- যে নামে তাকে বাশার ও মাহমুদ ডাকছিলেন-- বলেন প্রথম টেস্টে তার ৬ উইকেটের গল্প। তার অফস্পিন। বিদেশ সফরে ৫-৬ ডলারের ডিএ বা ডেইলি অ্যালাওয়েন্স, ফাস্টফুড-নির্ভরতা। প্রিমিয়ার লিগের দলবদল। তাদের গল্পে ঘুরেফিরে আসে প্রিমিয়ার লিগ। তখনও ক্লাবগুলি টাকা পরিশোধে সচেতন ছিল না। এই একটা ব্যাপার হয়তো এতো সময় পরও এখনও ‘প্রাসঙ্গিক’। 

    তবে এ দিক দিয়ে বিমান ‘নিরাপদ’ ছিল, বাশার সেখানে খেলতেন। ওল্ডডিওএইচএসে তামিম কীভাবে এলেন, খেললেন তার চাচা আকরাম খানের সঙ্গে। এই আড্ডায় অবশ্য চাচা আরেকজন- মাহমুদ। নাইমুর তাকে সে নামেই ডাকছিলেন। 

    চাচা মুলতানের গল্প বলেন। তামিম সেই টেস্টের শেষের আগেরদিন বন্ধুদের বলেছিলেন, বাংলাদেশ প্রথম জয়টা পেতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সে ম্যাচ জেতেনি, মুলতান আক্ষেপের আরেক নাম হয়ে গেছে। সে দুঃখের সময় পেরিয়ে চাচা যান ১৯৯৯ এর সেই ম্যাচের গল্পে। 

    যেখানে তিনি চোখ রাঙিয়েছিলেন ওয়াসিম আকরামকে। ‘ছোটু’ হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের ঐতিহাসিক এক জয়ের নায়ক। আকরাম পরে এশিয়া কাপে ঢাকায় খুঁজছিলেন ‘ছোটু’কে-- ‘ছোটু কাহা হ্যায়?’ 

    মাহমুদ ততক্ষণে আউট হয়ে গেছেন, আকরাম টেরই পাননি! অথচ তার পরিকল্পনায় ছিল, ‘ছোটু’কে তিনি বাউন্সার দেবেন, আউট করবেন না। নর্দাম্পটনের চোখ রাঙানির প্রতিশোধ! 

    তারা বঙ্গবন্ধুর স্যাঁতসেঁটে উইকেটে অনুশীলন করতেন, লোয়ার অর্ডারে খেলেন বলে নাইমুর-মাহমুদরা ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেতেন সপ্তাহে বারতিনেকের মতো। তারা ‘দোয়া’ করতেন, ব্যাটিং অর্ডারে যাতে অদল-বদল আসে। 

    ইংল্যান্ডের গিয়ে প্রথম বোলিং মেশিনের দেখা পেয়েছিলেন, তারা সেটির নাম দিয়েছিলেন ‘মুচকি হাসি’। কারণ মেশিনের সামনে হিমশিম খাওয়া বাংলাদেশ ব্যাটসম্যানদের দেখে নাকি অপারেটররা মুচকি হাসতেন। 

    এদিক দিয়ে বাশার নিজেকে প্রজন্মের সেতু মনে করেন-- তিনি দুই যুগই দেখেছেন। যখন এশিয়া কাপে অধিনায়ক আকরাম খান ম্যাচ রেফারিকে নির্দ্বিধায় বলেছিলেন, ‘লাগলে ম্যাচ ফি-র শতভাগই জরিমানা করো, আই ডন্ট মাইন্ড’। কারণ তখন ম্যাচ ফি বলে আলাদা কিছু ছিলই না তাদের! আবার দেখেছেন এই প্রজন্মকে উঠে আসতে, যারা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলে। তবে ২৪ ফিফটি নিয়ে 'মিস্টার ফিফটি' তকমাটা এখন আর ভাল লাগে না তার। এখন মনে হয়, সেঞ্চুরি আরও বেশি করা উচিৎ ছিল বাংলাদেশের টেস্টে প্রথম ফিফটি করা ব্যাটসম্যানের।

    নাইমুর প্রথম টেস্টে শচীন-সৌরভের উইকেট নিয়েছিলেন, চাচা মনে করিয়ে দেন, ‘ব্যাশ’-এর লারার উইকেট আছে-- ক্যারিয়ারের একমাত্র। বাশার অবশ্য আরেকদিকও মনে রেখেছেন, ‘কী মাইরটা দিসিল ভাই!’ 

    তামিম ঘুরেফিরে জানতে চান, তখন কী ড্রাইভ করত তাদের খেলার জন্য। নাইমুর বলেন-- প্যাশন। তারা এতো পেশাদার ছিলেন না, কিন্তু আবেগ ছিল। 

    লেবু, ওয়াশরুমের পানি আর হাতের ঘাম মেশানো ‘এনার্জি ড্রিংক’ও হজম হয়ে যেতো তাদের। হাফহাতা জার্সি গুটিয়ে খেলতে হতো মাহমুদদের, তবে সেটি ছিল ‘ফান’। আকরামের কখনও ব্লেজার আর ট্রাউজারস মাপমতো হতো না। তামিম বলেন, এখন যেমন মুশফিকের হয় না। তবে আকরামরা তখন বদলানোর সুযোগ পেতেন না, এখন তামিমরা না চাইলেই আরেক সাইজের জার্সি চলে আসে। 

    তবে মাহমুদ মনে করিয়ে দেন, তাদের আগের প্রজন্মের গল্প ছিল আরও অন্যরকম-- যখন নিজেদের টাকা খরচ করে খেলতে হতো। স্বাধীনতার পর যারা খেলাটা চালিয়ে নিয়েছিলেন। 

    এতো গল্পের পর নাইমুর বা ডিজে বলেন, “তবে কোনও আক্ষেপ নাই। এসব নেতিবাচক কিছু না আসলে। সময়ের সাথে সাথে সবকিছু বদলায়। তোমাদের পর আরও ভাল হবে। যখন যা ছিল। উই ট্রাইড আওয়ার বেস্ট। কোচ, অফিশিয়াল সবারই স্যাক্রিফাইস আছে।” 

    মাহমুদ বা চাচা সুর মেলান, “বাংলাদেশের জন্য খেলেছি। তখন বোর্ডেরও তো এতো টাকা ছিল না।”

    নাইমুর বলেন, “উই আর প্রাউড অফ ইউ গাইজ। এই প্রজন্মের জন্য।”

    মাহমুদ আবারও সুর মেলান, “আমরা গর্বিত তোদের জন্য।”

    বাশার বা ব্যাশ কোরাসে সঙ্গী হন, “ইয়াহ উই আর। উই আর।”

    “তোরা যেভাবে লড়িস। তোর হাত ধরে আরও এগুবে। সামনের দিকে যাব। আরও দূরে যাব। তোরা এক সময় সিনিয়র হবি। অ-১৯ বিশ্বকাপ জিতেছে, তোরাও জিতবি”, মাহমুদ বলেন। 

    তামিমের আগের ফেসবুক লাইভের চেয়ে অডিয়েন্স তুলনামূলক কম ছিল এদিন। সংখ্যা বদলায়। যেমন বদলায় পরিস্থিতি, বদলে যায় প্রেক্ষাপট।

    তবে গল্প থাকে। অনেক অনেক গল্প। যে গল্প আদতে এসব বদলের কথা বলে। সে গল্পে হয়তো সংগ্রাম আছে, ত্যাগ আছে। তবে ডিজে, ব্যাশ বা চাচাদের মুখে হাসি লেগে থাকে। যে হাসি হয়তো ছড়িয়ে পড়ে আপনার মুখেও।

    তবে সেসব গল্প না শুনেও অনেক সময়ই বলে দেওয়া যায় বা হয়-- সময় বদলে গেছে। সময় ব্যাপারটিই হয়তো এমন। 


    তামিমের শো দেখতে পারেন এখানে

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন