• সিরি আ
  • " />

     

    কেন অনভিজ্ঞ পিরলোকে বেছে নেওয়ার জুয়া খেলল জুভেন্টাস?

    চ্যাম্পিয়নস লিগ ব্যর্থতার পর কালক্ষেপণ না করে কোচ মাউরিসিও সারিকে বরখাস্ত করেছে জুভেন্টাস। নতুন কোচ নিয়োগ দিতেও খুব বেশি সময় নেয়নি ক্লাবটি। তবে নতুন কোচ হিসেবে ক্লাবের সাবেক কিংবদন্তি মিডফিল্ডার আন্দ্রেয়া পিরলোর নাম দেখে অবাক হননি এমন লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না।

    মাত্র ১০ দিন আগে বিয়াঙ্কোনেরিদের অনূর্ধ্ব-২৩ দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন পিরলো। কোচিং ক্যারিয়ারে তার অভিজ্ঞতা ওটুকুই। অনুমোদিত কোচ হতে যে থিসিস তৈরি করতে হয়, সেটাও এখনও জমা দেননি তিনি। তার আগেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং অভিজাত ক্লাবগুলোর একটি জুভেন্টাসের দায়িত্ব এসে পড়ল তার ঘাড়ে। শুন্য অভিজ্ঞতা নিয়েই তিনি এখন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, জিয়ানলুইজি বুফনদের কোচ।


    অথচ একসময় নিজের আত্মজীবনীতে কখনও কোচিং করাবেন না বলে উল্লেখ করেছিলেন তিনি। আত্মজীবনীর নবম অধ্যায়ে তিনি লিখেছিলেন, “আমার ম্যানেজার হওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই। এই চাকরিটার প্রতি আমার আগ্রহ নেই। অনেক বেশি চিন্তার চাকরি এটা…।” তবে সময়ের সাথে সাথে কোচিং নিয়ে পিরলোর ভাবনা বদলেছে। খেলোয়াড় হিসেবে মধ্যমাঠ নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি, আর সেজন্য তাকে ‘মায়েস্ত্রো’ ডাকা হত। তবে সবার মনে এখন একটাই প্রশ্ন ডাগআউটেও মায়েস্ত্রো হতে পারবেন কি পিরলো?

     

    জুভেন্টাস কেন পিরলোকে বেছে নিল?

    ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে হারের পর থেকেই জুভেন্টাসে যেন একটা সুপ্ত অশান্তি বিরাজ করছে। ঘরোয়া সাফল্য নিয়ম করে আসলেও ইউরোপে যেন কিছুতেই কোনও কাজ হচ্ছে না। ১৯৯৫-৯৬ সালের পর থেকে ইউরোপে তাদের শিরোপা খরা চলছে। আর সেই খরা মেটাতে এরপর চ্যাম্পিয়নস লিগের ‘বরপুত্র’ রোনালদোকে ইতালিতে নিয়ে আসে তারা। কিন্তু ঘরোয়া সাফল্য নিয়মিত এনে দিতে পারলেও ২০১৮-১৯ মৌসুমে ম্যাসিমিলিয়ানো আলেগ্রির ইউরোপে ব্যর্থতার পর ম্যানেজারের পদে একটা পরিবর্তনের প্রয়োজন বোধ হচ্ছিল জুভের কর্তা-ব্যক্তিদের।

    তাই আলেগ্রিকে সরিয়ে চেলসির হয়ে ইউরোপা লিগ জেতা সারিকে নিয়োগ দেয় তারা। কিন্তু যেই লাউ সেই কদু! আলেগ্রির চেয়েও নিষ্প্রাণ খেলল সারির দল। তবুও দলের তারকা খেলোয়াড়দের নৈপুণ্যে লিগ শিরোপাটা আসল। তবে ইউরোপে এসেই দলের আসল চেহারাটা বেরিয়ে গেল। ফ্রেঞ্চ লিগে টেবিলের ৭ নম্বরে থাকা দল লিওঁ-কে টপকে কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে ব্যর্থ হল জুভেন্টাস।


    আর তখনই ক্লাব সভাপতি আন্দ্রিয়া আগনেলি পিরলোকে নিয়োগ দিয়ে একরকম জুয়াই খেললেন। এর আগে আন্তোনিও কন্তেকে নিয়েও এমন জুয়া খেলেছিলেন তিনি, সেটা কাজে দিয়েছিল। এরপর মিলান সমর্থকদের চক্ষুশূল হয়ে ওঠা আলেগ্রিকে আনার সিদ্ধান্তও কাজে দিয়েছে। তাই সাবেক মিলান এবং জুভেন্টাস কিংবদন্তি পিরলোর হাতে দায়িত্ব তুলে দিতে খুব একটা স্নায়ুচাপে হয়ত ভোগেননি আগনেলি।

    ইতালিয়ান জায়ান্টরা আবারও ‘জুভেন্টাস ব্র্যান্ডে’র খেলা ফিরিয়ে আনতে চায়, সঙ্গে মাঠের খেলাতেও ক্রমাগত উন্নতির ছাপ দেখতে চায় দলটি। আর নিজের সময়ে মধ্যমাঠ শাসন করা, খেলার মোড় এক মুহূর্তে পাল্টে দিতে পারা ‘মায়েস্ত্রো’র মাধ্যমেই এই দুটি বিষয় হাসিল করা সম্ভব মনে করছে ক্লাবটি।

    ডাগআউট থেকে সুপারস্টার পিরলোর নির্দেশনায় মাঠে রোনালদো-দিবালাদের খেলা দেখাটা সমর্থকদের একটা অন্যরকম তৃপ্তি দেবে, এমনটাই আশা জুভেন্টাসের। এতে ক্লাবটির অর্থনৈতিক সুবিধাও কম নয়। সঙ্গে কোচের দায়িত্ব নিয়েই পিরলো যে বাস্তববাদিতার কথা বলেছেন, সেটির প্রয়োগ করতে পারলে মাঠে একটি দল হয়ে খেলবে জুভেন্টাস, ফলাফলেও যার ছাপ পড়বে।

     

    তবে আদৌ জুভেন্টাসে পিরলোর নতুন অধ্যায় কি সুখকর হবে?

    কোচ পিরলোর ব্যাপারে লোকের ধারণা একেবারেই নেই। তাই এই বিষয়ে কিছু অনুমান করাও কঠিন। পিরলোর সতীর্থ এবং বর্তমান জুভেন্টাস অধিনায়ক জর্জিও কিয়েলিনি তার আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, কিংবদন্তি খেলোয়াড়রা যারা ‘ভিনগ্রহের প্রাণী’র মতো খেলতেন, তারা যখন কোচ হন তখন তাদের হাড়-মাংসের মানুষদের নিয়ে কাজ করতে হয়। জুভেন্টাসে পিরলো নিজেকে কোচিং করাবেন না আর তার পর্যায়ের খুব বেশি খেলোয়াড়দেরও কোচিং করাবেন না। তাই প্রশ্ন হচ্ছে এই বিষয়টির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে তিনি কি কাজ করতে পারবেন নাকি হতাশ হয়ে যাবেন?

    তবে অনেকেই ১৪ মাস আগে সারির নিয়োগের চেয়ে পিরলোর নিয়োগকে খুব বড় জুয়া মানতে নারাজ। সারি দারুণ একটি নাপোলি দলের কোচ ছিলেন, চেলসিকে ইউরোপা লিগ এনে দিয়েছেন। তবে সারি নিজের ধারা অনুযায়ী দলকে খেলাতেন সবসময়, ফুটবলের নান্দনিকতাকে প্রাধান্য দিতেন বেশি।

    তার নান্দনিক ফুটবল জুভেন্টাসে ম্যাজিকের মতো কাজ না করেনি। মোটে একটি ট্রফি এসেছে সারির সময়ে, তাও সিরি আ শিরোপা, যেটিকে মোটামুটি পৈতৃক সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছে জুভেন্টাস। রোনালদোর সঙ্গে সারির সমস্যার আঁচ পাওয়া গেছে বেশ কয়েকবার, লিওনার্দো বনুচ্চিকে প্রায়ই দেখা গেছে সাইডলাইনে সারিকে শান্ত করতে। তার খেলার ধরন নিয়ে সমালোচনা হয়েছে নিরন্তর। তাই সারিকেও জুভেন্টাসের ডাগআউটে একটা জুয়াই বলা চলে, পিরলোর জুয়াটা সারির চেয়ে মোটেই বেশি কিছু নয়।

     

    পিরলোর কাছ থেকে কী পেতে পারে জুভেন্টাস?

    পিরলোর কোচিং অভিজ্ঞতা একেবারেই নেই, আর কোনও না কোনও পর্যায়ে এটি সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে। তবে পিরলোর আরও অনেক দক্ষতা রয়েছে, সিরি আ-কে তার মতো খুব লোকই বোঝে। আর এই বিষয়গুলোর মাধ্যমে পিরলো দলের উন্নতিতে অবদান রাখতে পারবে বলে মনে করছেন আগনেলি।

    ইতালির তিনটি বড় দলের হয়েই খেলেছেন পিরলো। সিরি আ-য় তার প্রতিপক্ষদের শক্তি-দুর্বলতা সম্পর্কে তার ধারণা অন্য অনেকের চেয়ে বেশি হওয়ার কথা। আর পিরলোর নিয়োগের কোচ পদটির প্রতি খেলোয়াড়দের শ্রদ্ধাও বাড়বে। সারির সঙ্গে খেলোয়াড়দের কিছু সমস্যা থাকলেও তেমন কিছু পিরলোর সঙ্গে হবে না বলে ধরে নেওয়াই যায়। ক্লাব কিংবদন্তি হিসেবে খেলোয়াড়, সমর্থক সবার কাছেই একটা অন্যরকম সম্মানের জায়গা থাকবে তার জন্য। যেমনটা রিয়াল মাদ্রিদে জিনেদিন জিদানের জন্য দেখা যায়।


    আর দলের অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সঙ্গেও সারির চেয়ে পিরলোর সম্পর্ক অনেক ভালো হবে, তাদের কাছ থেকে অনেক সাহায্যও পাবেন তিনি, এটা ধরে নেওয়াই যায়। কারণ ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময় জিয়ানলুইজি বুফন, কিয়েলিনি, বনুচ্চিদের সঙ্গে কাটিয়েছেন পিরলো। তাই তাদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক দল ব্যবস্থাপনায় তার অনেক কাজে লাগবে। আর জুভেন্টাসের মতো ক্লাবের মাঝে যে জয়ের ক্ষুধা থাকা দরকার, সেটাও সারির চেয়ে ভালো বোঝেন পিরলো। পেশাদার ক্যারিয়ার অসংখ্য ট্রফি জেতা পিরলোর মাঝে সেই জয়ের মানসিকতাটা রয়েছে।

    পিরলোর দলের খেলার ধরন কেমন হবে, সেটা নিয়েও অনুমান করা যায়। পিরলো যখন খেলতেন তিনি চাইতেন তার দলের দখলে বল থাকুক, ম্যাচের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইতেন তিনি। আধুনিক যুগের বেশিরভাগ কোচের ভাবনা এমনই।

    ম্যানচেস্টার সিটির পেপ গার্দিওলা বা আটালান্টার জিয়ান পিয়েরো গাসপেরিনির মতো রক্ষণ জলাঞ্জলি দিয়ে আক্রমণে ওঠার নীতিতে বিশ্বাস করেন না পিরলো। পিরলো নিজের ফুটবল দর্শন নিয়ে তার আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, “যে দল কম গোল হজম করবে, তারাই ম্যাচ জিতবে।”

    জুভেন্টাস সমর্থকদের জন্য এটি আশার বাণী হতে পারে। কারণ চলতি মৌসুমে ‘তুরিনের বুড়ি’রা ৪০ গোলের বেশি হজম করেছে, আর জয়ের অবস্থানে থেকেও ২১ পয়েন্ট হারিয়েছে।

     

    জুভেন্টাসে কী কী সমস্যায় পড়তে পারেন পিরলো?

    জুভেন্টাসের বর্তমান দলের বেশকিছু সমস্যা রয়েছে, যেগুলোর আশু সমাধান প্রয়োজন। প্রথমত দলের গড় বয়স অনেক বেশি, সেটার বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়ে হবে। মধ্যমাঠ শক্তিশালী করতে হবে, কারণ দুর্বল মধ্যমাঠের কারণে রোনালদো-দিবালারা বলের যোগান পান অনেক কম। আর মধ্যমাঠ ঠিক হলে রক্ষণের উপরও চাপ কমবে।

    রক্ষণে আর আক্রমণে জুভেন্টাস ঠিকই আছে। রক্ষণে বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনায় তরুণ ডিফেন্ডার মাথিয়াস ডি লিট রয়েছেন। সঙ্গে রয়েছেন কিয়েলিনি, বনুচ্চির মতো দুই পোড় খাওয়া কিংবদন্তি, হোসে মরিনহোর মতে যাদের হার্ভার্ডে রক্ষণের শিক্ষক হওয়া উচিৎ। আর তুরস্কের ডিফেন্সের উজ্জ্বল নক্ষত্র মারিহ দেমিরালও রয়েছেন জুভের রক্ষণে। আক্রমণে রোনালদো-দিবালা-হিগুয়াইনরা পারফর্ম করছেন নিয়মিত।

    তবে ফুলব্যাক এবং পিরলোর নিজের এলাকা তথা মধ্যমাঠ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে জুভেন্টাসকে। এখানেই জুভের পিরলোকে প্রয়োজন হবে বেশি। এই জায়গাগুলো শক্তিশালি করতে পিরলো কী মত প্রদান করেন এবং এই জায়গাগুলোর উন্নতি নিয়ে তার পরিকল্পনা কী, সেটাই জুভেন্টাসের এই দলের উন্নতির ক্ষেত্রে মুখ্য বিষয় হতে পারে।

    তবে সারির অধীনে অত্যন্ত ক্লান্তিকর একটি মৌসুমে কাটানোর জুভেন্টাসকে আবারও ফুটবল উপভোগ করা শেখানোটাই হবে পিরলোর মূল কাজ। নিজেদের সাফল্য এবং বন্ধুত্ব উপভোগ করার মাধ্যমেই আবারও সুদিন ফিরবে জুভেন্টাসে। লিভারপুলের মতো আনন্দ নিয়ে খেলতে হবে, আর তেমনটা করতে পারলে পরম আরাধ্য কিছু ট্রফিও হয়ত আসবে পিরলোর যুগে।

    বিবিসি থেকে অনূদিত

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন