• সিরি আ
  • " />

     

    যেভাবে ১০০ মিলিয়নের স্ট্রাইকার হলেন ভিক্টর ওসিমহেন

    যেভাবে ১০০ মিলিয়নের স্ট্রাইকার হলেন ভিক্টর ওসিমহেন    

    নাপোলি যখন ১৯৯০ সালে শেষবার স্কুদেতো জিতেছে তখন তাদের শীর্ষ গোলদাতা ছিলেন স্বয়ং ডিয়েগো ম্যারাডোনা। ২৮ ম্যাচে ১৬ গোল করেছিলেন এই আর্জেন্টাইন, লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় ছিলেন তিনে। 

    ৩৩ বছর পর যখন নাপোলি আবার স্কুদেতোতে হাত রাখছে, তখন তাদের স্টেডিয়ামের নামই ম্যারাডোনা স্টেডিয়াম। এই স্টেডিয়ামের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ এখন ভিক্টর ওসিমহেন নামের এক নাইজেরিয়ান, যিনি ইতোমধ্যে লিগে ২৭ ম্যাচে ২২ গোল করেছেন। লিগের অন্য যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে অন্তত তিন গোলের তফাৎ রয়েছে তার। নিঃসন্দেহে নাপোলির এই ঐতিহাসিক লিগ জয়ে সবচেয়ে বড় অবদান তারই। 

    ২৪ বছর বয়সী ওসিমহেন কিন্তু রাতারাতি তারকা হয়ে যাননি। তাকে দলে ভেড়াতে কোভিড মহামারীর ভেতর (জুন, ২০২০) নাপোলি তাদের ট্রান্সফার রেকর্ড, ৮১ মিলিয়ন ইউরো খরচ করেছিল। এখন তার পিছনে লাইন ধরে আছে ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় কিছু ক্লাব। ধারণা করা হচ্ছে, তার ট্রান্সফার ফি এবার ছাড়িয়ে যেতে পারে ১০০ মিলিয়ন ইউরোর ল্যান্ডমার্কও। দলবদল-কেন্দ্রিক ওয়েবসাইট ট্রান্সফারমার্কেটের মতে, তার বাজার দর এখন কাটায় কাটায় ১০০ মিলিয়ন ইউরো। 

     

    এই নাপোলি স্ট্রাইকার কি আসলেই এতটা দামী?

    ধারাবাহিক, ধারালো ও নেতাসুলভ 

    খেলার ধরনে ম্যারাডোনার সঙ্গে খুব একটা মিল নেই ওসিমহেনের। তবে তার খেলায় ম্যারাডোনার মতোই নেতৃত্বগুণ দেখছেন অনেকে। ইতালীয় ফুটবল সাংবাদিক মিনা রাজৌকি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, "মাঠে যেরকম লিডারের প্রয়োজন, সেরকম একজনই হয়ে উঠছেন ওসিমহেন। সে কখনো হাল ছাড়ে না। তার পারফরম্যান্স অবাক করার মতো। এই মুহূর্তে দল তার উপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল

    "টেকনিকাল দিকগুলোতেও সে দুর্দান্ত। এই মৌসুমে সে বেশ ধারাবাহিকও হয়ে উঠেছে। বর্তমানে সে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ স্ট্রাইকারের একজন।''

    এই মৌসুমে ওসিমহেনের ফর্ম কতটা ধারাবাহিক, সেটা যতি জানতে চান- ফেব্রুয়ারিতে এমপোলির বিপক্ষে ২-০ গোলে জেতার পথে নিজের ১৯তম লিগ গোলটি করেন তিনি, যার মাধ্যমে টানা আট ম্যাচে গোল করার রেকর্ড করেন তিনি, সিরি ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে। 

    এরমধ্যে ওসিমহেন নিজের ১০০তম ক্যারিয়ার গোলটিও করেছেন। তিনি এই ল্যান্ডমার্ক ছুঁয়েছেন লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর চেয়ে কম ম্যাচ খেলে। 

    ওসিমহেনের সক্ষমতা সম্বন্ধে তার জাতীয় দলের কোচ হোসে পেসেইরো বলেন, “তার গোল করার প্রবৃত্তি অসাধারণ। সে বুদ্ধিমান, আক্রমণাত্মক ও দ্রুতগতির। সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় থাকার চোখও তার আছে। তার গোলের সংখ্যা আরও বাড়বে, সে আরও অনেক ইতিহাস তৈরি করবে।”

    তবে বাইরে থেকে মনে হলেও একেবারে নিখুঁত মৌসুম পার করছেন না ওসিমহেন। ইনজুরিতে পরে ৫০ দিনের মতো মাঠের বাইরে ছিলেন তিনি। মিস করেছেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম লেগ। ইনজুরি তার জন্য নতুন সমস্যা না। গত মৌসুমেও ৭৫ দিনের মতো ছিলেন বাইরে। গত মৌসুমে চোখে আঘাত পেয়ে আফ্রিকা নেশন্স কাপ মিস করেছিলেন। সেই চোখের ইনজুরির জন্য এখনো মাস্ক পরে মাঠে নামতে হয় তার। 

     

    মাস্কের ভিতরের ব্যক্তি 

    ওসিমহেনের উত্থান একদিনে হয়নি। এই নাইজেরিয়ান প্রথম নজর কেড়েছিলেন ২০১৫ অনূর্ধ্ব ১৭ বিশ্বকাপে। সেই টুর্নামেন্টে ১০ গোল করে সুপার ঈগলদের শিরোপা জিতিয়েছিলেন তিনি। এরপর জার্মানি থেকে ডাক আসে লাগোসের আল্টিমেট স্ট্রাইকার্স একাডেমি থাকা ওসিমহেনের। জার্মান ক্লাব ভলফসবুর্গে যোগ দেওয়ার আগে আর্সেনাল থেকেও আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন তিনি। 

    জার্মানির যাওয়ার পর প্রথমে একদমই সুবিধা করতে পারেননি ওসিমহেন। প্রথম ১৬ ম্যাচে পাননি জালের দেখা। অগত্যা তাকে লোনে পাঠায় ভলফসবুর্গ। 

    "ছেলেটিকে বিকশিত হতে দেওয়ার মতো ধৈর্য তাদের ছিল না," বলেন সাবেক ভলফসবুর্গ স্ট্রাইকার জোনাথান আকপোবরি। ওসিমহেনকে একজন কাঁচা প্রতিভা হিসেবে দেখেছেন তিনি। 

    "সে তখনই প্রডিজি ছিল। এখন সে পরিপক্ব হয়েছে এবং বেশ ভালো খেলছে। তবে ১০০ গোল করেছে দেখেই তার ব্যাপারে উপসংহার টানা ঠিক হবে না।” 

    বেলজিয়াম দল শার্লেরোইয়ে গিয়ে অবশ্য সাথে সাথেই ফর্ম খুঁজে পান ওসিমহেন। ২০ গোল করে প্রথম মৌসুমেই ক্লাবের বর্ষসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। লোনের সঙ্গে থাকা একটি ক্লজ কাজে লাগিয়ে ২০১৯ সালের মে’তে মাত্র ৩.৫ মিলিয়ন ইউরোয় ওসিমহেনকে কিনে নেয় শার্লেরোই। দুমাস পর ফরাসি দল লিলের কাছে তারা এই নাইজেরিয়ানকে বিক্রি করে ১২.৫ মিলিয়ন ইউরোয়। 

    "সে খুবই লাজুক ও নম্র স্বভাবের ছিল। খুব একটা কথা বলত না," বলেন শার্লেরোইতে তার সঙ্গে খেলা ফরাসি ডিফেন্ডার ডোরিয়ান ডারভি। 

    “১৮, ১৯ বছরেই তার লক্ষ্য ছিল বিশ্বের সেরা স্ট্রাইকার হয়ে উঠা। তার চাল-চলনেই বুঝা যেত সে কতটা নিবেদিত। ভিক্টর বেশ মনোযোগী ছিল। সবসময় মাথা নিচু করে চলত, কঠোর পরিশ্রম করত।” 

    লিলে প্রথম মৌসুমেই ১৮ গোল করেন ওসিমহেন। ডাক আসে নাপোলি থেকে। 

     

    পরবর্তী গন্তব্য প্রিমিয়ার লিগ? 

    এই মৌসুমের শুরুতে কথাচ্ছলে ওসিমহেন বলেছিলেন, প্রিমিয়ার লিগে খেলা তার অনেকদিনের স্বপ্ন। 

    বোল্টন ওয়ান্ডারার্স ও হাল সিটির হয়ে পাঁচ বছর প্রিমিয়ার লিগে খেলা স্বদেশী জে জে ওকোচাও ওসিমহেনের এই স্বপ্ন বা লক্ষ্যের ব্যাপারে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছেন। 

    নাইজেরিয়া কিংবদন্তি বলেন, “এই লিগ খেলোয়াড়দের উন্নত করে। সেজন্য আপনার খেলার সঙ্গে মিলে এমন ক্লাব খুঁজে বের করতে হবে আগে। যেমন, ম্যান সিটিতে যেতে পারে সে। যদিও হালান্ডকে নিয়ে নিয়েছে তারা। ইউনাইটেডও তার জন্য আদর্শ জায়গা হতে পারে। গত কয়েক বছর ধরেই ভালো স্ট্রাইকারের অভাবে ভুগছে তারা। আর্সেনালও আছে।” 

    ওকোচার দাবি স্ট্রাইকার হিসেবে এই মুহূর্তে আরলিং হালান্ড, কিলিয়ান এমবাপে, হ্যারি কেইনদের কাতারেই আছেন ওসিমহেন। 

     

    ওসিমহেনের দাম কত হবে? 

    ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, চেলসি, পিএসজি, বায়ার্ন মিউনিখ, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ; এই সবগুলো ক্লাবই ওসিমহেনের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। হালান্ড সিটিতে যাওয়ার পর এখন স্ট্রাইকারদের বাজারে সবচেয়ে বড় নাম ওসিমহেনই। কিন্তু তার দলবদল ফি কত হতে পারে? 

    এখানে উল্লেখযোগ্য, তিন মৌসুম আগে ওসিমহেনকে দলে ভেড়াতেই ৮০ মিলিয়নের উপর খরচ করেছিল নাপোলি। এবং তার বর্তমান চুক্তির মেয়াদ ২০২৫ সাল পর্যন্ত। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই ২৪ বছর বয়সীকে বিক্রি করে দেওয়ার মতো কোনো তাড়ায় নেই ইতালিয়ান ক্লাবটি। নাপোলির মালিক অরেলিও ডি লরেন্তিস কয়েকদিন আগে ওসিমহেনের ক্লাব ছাড়ার সম্ভাবনা সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন সাংবাদিকদের সামনে। 

    এরপরও যদি ওসিমহেন ক্লাব ছাড়েন, দলবদল ফি নিশ্চিতভাবেই ১০০ মিলিয়ন ইউরো স্পর্শ করবে, তাই না? ওকোচাও তাই মনে করেন। 

    “এই বাজারে জ্যাক গ্রিলিসের দাম ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড হলে ওসিমহেনের দাম আরও বেশি হওয়া উচিত। আর নাপোলিও বিক্রি করতে চাইবে না। তারা এমনিতেই খেলোয়াড়দের দাম অনেক বেশি হাঁকায়। ১০০ মিলিয়নের কমে ওসিমহেনকে ছাড়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছি না আমি,” বলেন ওকোচা। 

    খেলোয়াড় বিক্রি নিয়ে নাপোলির অনীহা আজকের না। দর কষাকষিতেও ভালো সুনাম ও দুর্নাম রয়েছে ক্লাবটির। স্কুদেতো জেতার পর এখন অর্থনৈতিকভাবেও বেশ চাঙ্গা অবস্থায় আছে ক্লাবটি। তাই ওসিমহেনের দলবদলের ব্যাপারে গ্রীষ্মে তারা কোনো অফার না শুনলেও সেটা অবাক হওয়ার মতো হবে না। গত জানুয়ারিতে তাই করেছে ক্লাবটি। 

    গ্রীষ্মে ইউনাইটেড, বায়ার্ন ও পিএসজির মতো ক্লাবগুলোকে ডি লরেন্তিসের কানে পৌঁছাতে হলে তাই বড় অঙ্কের বিড নিয়েই হাজির হতে হবে। আর কোনো বিডিং যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে দাম ১৫০ মিলিয়ন ইউরোতেও পৌঁছে যেতে পারে। বর্তমান সময়ে এই অঙ্কটাও অনেক ক্লাবের জন্য বড় কিছু না।