• ওয়েস্ট ইন্ডিজের বাংলাদেশ সফর ২০২১
  • " />

     

    জশুয়া ডা সিলভা ও একটি কালো আর্মব্যান্ড

    জশুয়া ডা সিলভা ও একটি কালো আর্মব্যান্ড    

    আন্দ্রিয়া ভারাটকে শেষ দেখা গিয়েছিল ২৯ জানুয়ারি, একটা ট্যাক্সিতে উঠতে। এরপর ৪ ফেব্রুয়ারি মরদেহ পাওয়া যায় ত্রিনিদাদের ২৩ বছর বয়সী এই নারীর, ততদিনে চেনা যায় না তাকে। ভারাটের বাবার মতে, অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে তার মেয়েকে। ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোব্যাগোতে শুরু হলো আন্দ্রিয়ার বিচারের দাবি।

    আন্দ্রিয়া হত্যার প্রতিবাদ জানাতে ১১ ফেব্রুয়ারি শুরু মিরপুর টেস্টের দ্বিতীয় দিন জশুয়া ডা সিলভা নামলেন কালো একটা আর্মব্যান্ড পরে। 

    ****

    প্রথমে ক্ষিপ্ত, এরপর যেন বিমর্ষ। তাইজুলের ইসলামের ভেতরের দিকে ঢোকা বলটা মিস করে যে গতিতে ঘুরে দাঁড়ালেন, এরপর ড্রেসিংরুমের পথে হাঁটা দিলেন কয়েকগুণ কম গতিতে। জশুয়া ডা সিলভা এরপর কয়েকবার ব্যাট দিয়ে হেলমেটে আঘাত করলেন, সেঞ্চুরি থেকে ৮ রান দূরে থামা তার হতাশা যেন কাটছিলই না। সীমানা পার হওয়ার আগে ব্যাটটা একবার উঁচিয়ে ধরলেন ড্রেসিংরুমের পথে, সে ব্যাটের ভার যেন কয়েকগুণ হয়ে গেছে তখন। 

    ক্যারিয়ারে মাত্র তৃতীয় টেস্ট এটি তার, ব্যাটিংয়ে ৫ম ইনিংস। সেঞ্চুরির এতো কাছে এই প্রথম এলেন, ১৯ ম্যাচের প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ারেও তার সেঞ্চুরি এখন পর্যন্ত মাত্র একটি। ২২ বছর বয়সী ডা সিলভার কাছে সেঞ্চুরিটা হতে পারতো অনেক তাৎপর্যপূর্ণ কিছু, এতো কাছে এসে থামলে হতাশাটা তো স্বাভাবিকই।

    “হাফ সেঞ্চুরি পেয়েছি, তবে এটা যথেষ্ট না। ৯২ রানে আউট হয়েছি। আমি বিধ্বস্ত ছিলাম, হয়তো ফেরার পথে দুই-এক ফোঁটা চোখের জলও পড়েছে। টেস্ট ক্রিকেট মানেই হলো কতক্ষণ ব্যাটিং করছেন, সে ব্যাপারটি। লম্বা সময় ব্যাটিং করলে ব্যাপারটা সহজ হয়ে যায়। আপনাকে মুখ চেপে থাকতে হবে, কিন্তু এরপরই রান আসতে শুরু করবে”, ডা সিলভা টেস্ট ক্রিকেটের ব্যাপারটা যেন বুঝে গেছেন এরই মাঝে। 

    তার ৯২ রানের ইনিংসেও ছিল পরিণতবোধের ছাপ। 

    ****

    ডা সিলভা বা ডি সিলভা-- এই ‘সারনেম’টা পর্তুগিজদের। অর্থ-- বন-জঙ্গলে থাকেন, বা সেখান থেকে এসেছেন এমন কেউ। ক্রিকেটের বিখ্যাত ‘ডি সিলভা’ একজন শ্রীলঙ্কান-- এতটুকু বললেই হয়তো অরবিন্দ মুখে চলে আসবে আপনার। তবে জশুয়ার সঙ্গে পর্তুগালের যোগাযোগটা শুধু নামে নয়, আরও ‘প্রত্যক্ষ’। ডা সিলভার জন্ম ত্রিনিদাদে, তবে মায়ের দিকের পরিবার ‘কানাডিয়ান পর্তুগিজ’। সে পরিবার পর্তুগালের মাদেইরা দ্বীপ থেকে আসা। মাদেইরা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর জন্মস্থান, অস্ট্রেলিয়ান টেস্ট ক্রিকেটার মইসে হেনরিকসেরও। 

    ২০১৭ সালে কাইরন পোলার্ড স্কলারশিপ প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে ডা সিলভা ইংল্যান্ডে খেলতে গিয়েছিলেন ক্লাব ক্রিকেট। বছর তিনেক পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের রিজার্ভ স্কোয়াডের সদস্য হিসেবে আবারও ইংল্যান্ড গেলেন তিনি। মাঝে ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোব্যাগোর ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, দীনেশ রামদিনের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হয়েছেন নিয়মিত সদস্য। 
     


    ২০১৯-২০ মৌসুমে ঘরোয়া প্রথম শ্রেণিতে ৮ ম্যাচে ৫০.৭০ গড়ে ৫০৭ রান করা ডা সিলভার ইংল্যান্ড সফরে প্রস্তুতি ম্যাচে ১৩৩ রানের অপরাজিত ইনিংস খেললেও সুযোগ পাননি শেষ পর্যন্ত। ব্যক্তিগত কারণে শেন ডাওরিচের দেশে ফিরে গেলে ওয়েলিংটনে অভিষেক হয়েছে তার, ফলো-অনে পড়া ইনিংসে করেছিলেন ৫৭ রান। 

    শুধু পর্তুগালের সঙ্গে যোগের সূত্র নয়, গায়ের রঙেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের ‘চিরায়ত’ ক্রিকেটারদের থেকে আলাদা তিনি। ১৯৭৩ সালে জিওফ গ্রিনিজের পর এই প্রথম ওয়েস্ট ইন্ডিজে জন্ম নেওয়া শ্বেতাঙ্গ কোনো ক্রিকেটার টেস্ট খেলছেন তাদের হয়ে।  

    ****

    চট্টগ্রামে প্রথম ইনিংসে যখন ব্যাটিংয়ে নামেন, ১৫৪ রানে ৫ উইকেট নেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের। জেরমাইন ব্ল্যাকউডের সঙ্গে তার জুটি ছিল ৯৯ রানের, ৪২ রানের ইনিংসে খেলেছিলেন ১৪১ বল। পরের ইনিংসে করেছিলেন ৫৯ বলে ২০, তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রথমটির চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেটি। এনক্রুমাহ বনারের সঙ্গে কাইল মেয়ার্সের জুটি ভাঙার পর যদি জলতরঙ্গের কোনও আভাস পায় বাংলাদেশ, একদিকের দৃঢ় রক্ষণের স্লুইসগেট বন্ধ করে দিয়েছিলেন তিনি, সঙ্গে মেয়ার্সকে দিয়েছিলেন দানবীয় মোডে চলে যাওয়ার অপশন। 

    মিরপুরে প্রথম ইনিংসে নেমেছিলেন প্রায় চট্টগ্রামের মতো অবস্থাতেই, এবার বনারের পর আলজারি জোসেফের সঙ্গে তার দুটি জুটি তো তৈরি করেছে তাদের দাপটের ভিত। এ ইনিংসে স্পিনের বিপক্ষে ক্ল্যাসিক ব্যাটিং করেছেন তিনি, ফ্রন্টফুট বা ব্যাকফুটে গিয়েছেন পুরো ‘কমিটেড’ হয়েই। বলের লেংথকে নিজের বিপক্ষে যেতে দেননি, পিচের অনিশ্চয়তার ডেঞ্জার জোনকে এড়িয়ে চলেছেন দারুণভাবে। 

    স্পিনে বরাবরই তিনি ভাল ব্যাটসম্যান, ম্যাচশেষে ডা সিলভার এ কথায় তার আত্মবিশ্বাসই ঠিকরে পড়ে, যেমন এ ইনিংসে ছিল। ব্যাটিং কোচ মন্টি দেশাইয়ের সঙ্গে আলাদা করে কাজ করেছেন, লাইন-লেংথ দ্রুত পড়ে সামনে বা পেছনে-- দুটিতেই ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে। 

    অবশ্য চট্টগ্রামের দ্বিতীয় ও মিরপুরের প্রথম-- দুই ইনিংসেই তিনি আউট হয়েছেন একই ধরনের বলে-- আর্ম বল, যেটা লাইন ধরে রেখে ডিফেন্স চিড়ে ভেতরে ঢোকে। ডা সিলভার আশা, তৃতীয়বার আর এই বলটা ফাঁকি দেবে না তাকে। 

    টানা দুইবার এমন আউট তাকে ‘পরিণত’ করে তুলেছে। 

    ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই বাংলাদেশ সফরের গল্পটা বদলে গেছে চট্টগ্রামেই। এই স্কোয়াডের অন্তত টেস্ট পারফরম্যান্স বলছে, শীর্ষসারির বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার না থাকলেও ডা সিলভাদের মতো কয়েকজন দারুণ চ্যালেঞ্জ জানাবেন তাদের। ডা সিলভা আরেকবার বলেছেন, এখানে যারা এসেছেন তারা মোটেও দ্বিতীয়সারির নন, বরং এ পর্যায়ে খেলার জন্য যথেষ্ট যোগ্য। এই যোগ্যদের তালিকায় ডা সিলভা থাকবেন ওপরের দিকেই।

    ****

    কালো শোকের রঙ, কালো প্রতিবাদের রঙ। 

    ২০০৩ বিশ্বকাপের ১০ ফেব্রুয়ারি, ক্যারিয়ার শেষের শঙ্কা নিয়েও নামিবিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে কালো আর্মব্যান্ড পরে নেমেছিলেন দুই জিম্বাবুইয়ান ক্রিকেটার-- শ্বেতাঙ্গ অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, কৃষ্ণাঙ্গ হেনরি ওলোঙ্গা। জিম্বাবুয়ের স্বৈরশাসনের প্রতিবাদ আর গণতন্ত্রের শোক জানিয়েছিলেন তারা। ২০১৪ সালের নভেম্বরে ফিলিপ হিউজ মারা যাওয়ার পর থেকে অবসর পর্যন্ত প্রতিটি ম্যাচে তার স্মরণে কালো আর্মব্যান্ড পরে নামতেন মাইকেল ক্লার্ক। 

    “এই দিনটা আন্দ্রিয়া এবং ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোব্যাগোর নারীদের জন্য! 
    আমরা নীরব ছিলাম, কতো ট্র্যাজেডিকে মিলিয়ে যেতে দিয়েছি। নীরবতা আর বসে থাকা গ্রহণযোগ্য নয় এখন আর। আমাদের আওয়াজ পৌঁছাতেই হবে, আমাদের নারীদের অবশ্যই সম্মান দিতে হবে, রক্ষা করতে হবে। পুরুষদের আরও শিক্ষিত করার পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ হয়। আমি ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোব্যাগোর জনগণ এবং ভারাট পরিবারের সঙ্গে একাত্মতা জানাই”, দিনের খেলাশেষে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেছেন ডা সিলভা। 

    প্রায় ১৫ হাজার কিলোমিটার দূরে থেকে বার্তাটা ঠিকই দিয়েছেন ডা সিলভা, সেঞ্চুরি থেকে ব্যবধানটা আপাতত ৮ রানের থাকলেও। 
     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন