• বাংলাদেশের শ্রীলঙ্কা সফর ২০২১
  • " />

     

    শান্ত, হাসারাঙ্গা এবং সময়

    শান্ত, হাসারাঙ্গা এবং সময়    

    দিনের খেলা শেষে মাঠ ছাড়ার আগে শ্রীলঙ্কানদের কাছ থেকে অভিনন্দন পেলেন নাজমুল হোসেন শান্ত। ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা জড়িয়ে ধরলেন তাকে, শান্তর মুখেও হাসি, খুনসুটিও হলো একটু। মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভুলে দিনের শেষে পূর্বপরিচিত কারও সঙ্গে দেখা হলে যা হয়। ২০১৬ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে দুজন খেলেছিলেন, প্লে-অফে মুখোমুখিও হয়েছিল বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা। ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক অভিষেকে দুজনেরই, গলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেকে হ্যাটট্রিক করা তৃতীয় বোলার হয়েছিলেন ১৯ বছর বয়সী হাসারাঙ্গা, আর ক্রাইস্টচার্চ টেস্টে একের পর এক তখনকার অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম, এখনকার অধিনায়ক মুমিনুল হক ও ওপেনার ইমরুল কায়েসের চোটে টেস্টে নেমে যেতে হয়েছিল শান্তকে। 

    পাল্লেকেলের টেস্টের আগে হাসারাঙ্গা ৪ বছরে খেলেছেন ৩ টেস্ট, ১৮ ওয়ানডে, ১৬টি টি-টোয়েন্টি। ৭ম টেস্ট খেলতে নামা নাজমুল সীমিত ওভারে খেলেছেন ১১টি ম্যাচ। 

    খুব চমকপ্রদ ক্যারিয়ার নয় তাদের এখনও। 

    ****

    চাপ? 

    “আমি চাপে নেই, আমার দলও চাপে নেই”, প্রথম ম্যাচের আগে মুমিনুল হক সোজাসাপ্টা বলে দিলেন।

    তার অধিনায়কত্ব, হেড কোচের পজিশন নড়বড়ে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে মুমিনুল গেলেন আরও বেসিক-এ, “আমি শ্রীলঙ্কায় এসেছি, মাঠে নামব, বোলার বোলিং করবে, আমি ব্যাটিং করব, আর আমার বোলাররা বোলিং করবে, ওদের ব্যাটসম্যানরা ব্যাটিং করবে, আমাদের ফিল্ডাররা ফিল্ডিং করবে”..., মুমিনুলের বলা এটুকু কথা ছড়িয়ে পড়লো ফেসবুকে। এরপরের প্রতিক্রিয়াটা ভেবে নিতে পারেন আপনি। আদতে এরপর তিনি যোগ করেছিলেন, “আমরা আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলব। আমি আসলে এসব নিয়েই ভাবছি। আপনি যেগুলা বললেন এগুলা নিয়ে ভাবনার বিষয় না। একজন পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে আমার কাছে মনে হয় এসব নিয়ে এতো ভাবার দরকার নেই।”

    মুমিনুল চাপের ব্যাপারটা মাথায় না-ই রাখতে পারেন, শান্তও কি ছিলেন তেমনই নির্ভার? ১, ১৭, ২০, ২৫, ৪- ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দেশের মাটিতে ৫ ইনিংসে স্কোর ছিল তার এমন। নিউজিল্যান্ডে একটা টি-টোয়েন্টিতে সুযোগ পেয়েছিলেন, সেটিও অন্যদের চোটের কারণেই, সেখানে করেছিলেন ৮, আউট হয়েছিলেন বিশ্রীভাবে। কোচরা তাকে নিয়ে উচ্চাশা করেন, তার কারণে সাকিব আল হাসান তিন নম্বর পজিশন ছেড়ে দেন, ঘরোয়া টুর্নামেন্টে অধিনায়কত্ব করেন বড় দলের, রান করেন একগাদা, তার শেষ প্রথম শ্রেণির সেঞ্চুরিটিও অপরাজিত ২৫৩ রানের। কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে এলেই যেন সব গুবলেট পাকিয়ে যায় তার। 

    অথচ তিন ফরম্যাট মিলিয়ে, ৪ বছর ধরে খেলা ১৮ ম্যাচ হয়তো ডাটাসেট হিসেবে খুব বড় নয়, তবুও এই ২২-পেরুনো বয়সেও যেন সময় পেরিয়ে যাচ্ছিল তার। তিনি ছড়িয়ে পড়ছিলেন ফেসবুকে, মুমিনুলের ওই ব্যাটিং-করব-বোলিং-করব কথার মতো করে। 

    **** 

    পাল্লেকেলতে শান্তকে নেমে পড়তে হলো তৃতীয় ওভারেই, তিন নম্বর হলে যা হয়, কার্যত মাঝে মাঝে তারা হয়ে যান ওপেনার। স্পিনে ভরসা উঠে যাওয়া শ্রীলঙ্কা প্রস্তুত করেছে সবুজ উইকেট, তার এক সময়ের অ-১৯ সতীর্থ সাইফ হাসান ফিরে গেছেন। 

    এ টেস্টের আগেও আন্তঃস্কোয়াড প্রস্তুতি ম্যাচে যখন সবাই কুইকফায়ার ইনিংস খেলছিলেন, শান্ত ৫৩ রান করতে খেলেছিলেন ১১১ বল। বিপিএলে সেঞ্চুরি থাকলেও থিতু হতে, মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগে যেন তার। তামিম ইকবালের আগ্রাসী ব্যাটিং তাকে সে সুযোগটা করে দিল, দ্রুত রান তুলে তিনি শান্তর ওপর থেকে চাপ কমিয়ে দিলেন। 

    সবুজাভ উইকেটে শ্রীলঙ্কা পেসারদের যা কিছু হুমকি, তার অনেকটাই মিলিয়ে গিয়েছিল তামিমের ইনিংসে। শান্ত আঁকড়ে থাকলেন ক্রিজ। বাংলাদেশের প্রথম ২৯ রানের সবকটি একাই করেছিলেন তামিম, তার ফিফটি যখন হয়ে গেল ৫৩ বলে, প্রায় সমানসংখ্যক বল খেলে শান্তর রান তখন ২০। 


    “সারাদিনে আমি অমন কিছু চিন্তা করি নাই। আমি শুধু চিন্তা করেছি বল দেখবো, খেলবো। আমি বলের মেরিট অনুযায়ী খেলার চেষ্টা করেছি। ইনিংসটা খুব গোছানো ছিল, তাড়াহুড়ো করি নাই। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ  ছিল”, দিনশেষে বলেছেন শান্ত। 

    ৭০ বলে ৩৪ রানে ব্যাটিং করার সময় শান্ত প্রথম মুখোমুখি হয়েছিলেন হাসারাঙ্গার। দিনে ৪৯টি বল খেলেছেন তিনি এই লেগস্পিনারের, বাউন্ডারি মেরেছেন একটি-- যে ডেলিভারির ‘মেরিট’ দাবি করছিল অমন-- হাফট্র্যাকারে।

    “আমার কাছে মনে হয় মানসিকভাবে অনেক শান্ত ছিলাম। খুব বেশি চিন্তা করি নাই রান করবো বা রান করতে চাই। ব্যাটিংটা উপভোগ করেছি। যখনই ব্যাট করেছি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত- বল দেখেছি আর ব্যাটিং করেছি। কত বল খেললাম বা কতো রান করছি-- এটা নিয়ে চিন্তা করি নাই।”

    মুমিনুলের কথা নিয়ে ইন্টারনেট সরব হতে পারে, তবে সবকিছু এসে ঠেকে ওই ‘বেসিক’-এই। তামিম সেঞ্চুরির আগেই ফিরে গেছেন, মুমিনুল (চাপে থাকা আরেকজন) এসে শান্তর সঙ্গে করেছেন নতুন পরিকল্পনা। 

    “(মুমিনুল হক) সৌরভ ভাই যখন নতুন আসলো তখনও আমরা বড় কিছু চিন্তা করি নাই। ছোট ছোট করে চিন্তা করছি। দিনশেষে বড় একটা জুটি হয়েছে।” 

    ****

    সেঞ্চুরির পর শান্ত একবার ড্রেসিংরুমের দিকে তাকিয়ে মাথা নোয়ালেন। অথচ বিপিএলে সেঞ্চুরি করেও তার উদযাপন ছিল বুনো। 

    “আমি যেটা বললাম আমার বিশ্বাস ছিল আমি বড় রান করতে পারি। খুব বেশি এক্সাইটেড হওয়ার কিছু নাই। কালকে আবার ব্যাটিং আছে। যত লম্বা ব্যাটিং করা যায়। বা সামনে আরও ম্যাচ খেলবো যদি সুযোগ আসে। তাই এটা নিয়ে খুব বেশি এক্সাইটেড হওয়ার কিছু নাই”, সাদামাটা উদযাপনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি এভাবে। 

    সেঞ্চুরির পর শেষবেলায় আরও কিছুক্ষণ থেকেছেন ক্রিজে, শেষদিকে একটু ক্র্যাম্পের মতোও হচ্ছিল। তবে সেসব মানিয়ে নিয়েছেন ততক্ষণে। অধিনায়কের সঙ্গে দলকে নিয়ে গেছেন দারুণ পজিশনে। দিনের খেলাশেষে শ্রীলঙ্কা ও হাসারাঙ্গার অভিনন্দন পেরিয়ে, সতীর্থ, কোচ, সাপোর্ট স্টাফ, ম্যানেজমেন্টের করতালির মাঝে উঠছিলেন ড্রেসিংরুমে। আবার ফিরে আসতে হলো তাকে, মিডিয়া ম্যানেজার তাকে নিয়ে গেলেন ব্রডকাস্টারদের সঙ্গে একটা সাক্ষাতকারে।
     


    রাসেল আরনল্ডকে নিজের অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই বললেন, “আসলে একটু স্বস্তি পেলাম। শেষ কয়েক মাস অনেক পরিশ্রম করেছি, তবে শেষ দুই টেস্টে রান করতে পারিনি। তবে আত্মবিশ্বাস ছিল, রান করতে পারব। আজ হয়েছে, ফলে খুশি। এটা স্কিলের ব্যাপার অবশ্যই, তবে মানসিক ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। সেদিন থেকে ইতিবাচক ছিলাম আমি।”

    **** 

    রঙ্গনা হেরাথ অবসর নিয়েছেন, দিলরুয়ান পেরেরার ফর্ম পড়তির দিকে। এ টেস্টে শ্রীলঙ্কার মূল স্পিনার হাসারাঙ্গা। তবে তার বোলিংয়ে শ্রীলঙ্কা ম্যাচ জিতে যাবে-- এমন ভরসা নেই তাদের। লাসিথ এমবুলদেনিয়ার চোটের কারণে যে দুজন স্পিনারকে দলে ডাকার কথা ভাবা হয়েছিল, তাদের একজন চোটে, আরেকজন উৎরে যেতে পারেননি ফিটনেস টেস্ট। কার্যত পাল্লেকেলেতে পেস-সহায়ক উইকেট বানানোর পরিকল্পনার অন্যতম কারণ সেটিও। প্রত্যাশা মেটাতে ব্যর্থ হাসারাঙ্গাকাকে নিয়েও নিশ্চয়ই সমালোচনা হয়। 

    তবে শান্ত তাকে নিয়ে সমালোচনা দেখেন এভাবে, “সত্যি বলতে আমাকে নিয়ে কী হয়েছে খুব একটা দেখিনি। হ্যাঁ শুনেছি, ফ্রেন্ড-সার্কেল, ফ্যামিলি-মেম্বারদের কাছে শুনেছি যে এরকম হচ্ছে। আমার কাছে মনে হয় সবাই আমার কাছে  অনেক আশা করে। আমি হয়তো ভালো করতে পারি। এই জন্য হয়তো মানুষ এগুলো করে ভালো খেলার আশায়।”

    সে আশা পূর্ণ করেছেন আজ তিনি। হয়তো হাসারাঙ্গাও করবেন। তবে শান্ত বা হাসারাঙ্গা-- নিশ্চিতভাবেই তাদের একটু সময় প্রয়োজন।
     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন