• লা লিগা
  • " />

     

    মেসির ট্রান্সফার নিয়ে মুখ খুললেন বার্সেলোনা প্রেসিডেন্ট

    মেসির ট্রান্সফার নিয়ে মুখ খুললেন বার্সেলোনা প্রেসিডেন্ট    

    ১৭ মৌসুম, ৬৭২ গোল, ৩৪ শিরোপা, ৬ ব্যালন ডি’অর; নীল-মেরুন জার্সিতে লিওনেল মেসির পরিসংখ্যান থেমে যাচ্ছে এখানেই। বার্সেলোনা বোর্ডের সভাপতি আজ বিস্তারিত বিবৃতিতে জানিয়ে দিয়েছেন মেসি অধ্যায়ের অবসানের কথা। সেই সাথে জানিয়েছেন সমঝোতার পরেও কোথায় গিয়ে তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিলো, আর কেনই বা তাদের এই চুক্তি নবায়নের সমঝোতা থেকে সরে আসতে হয়েছে। লাপোর্তার বিবৃতির অংশবিশেষ এখানে তুলে ধরা হল: 


    “আমরা ক্লাবকে যেই অবস্থায় এসে পেয়েছি তা আসলে বর্ণনাতীত। লোকসানের অঙ্কটা আমরা যা ভেবেছিলাম তার থেকে অনেক বেশি। আমরা যা ভেবেছিলাম তার থেকে খরচের পরিমাণটাও অনেক বেশি। মোট বেতন ক্লাবের মোট আয়ের ১১০ শতাংশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। লা লিগার এফএফপি (ফাইন্যানশিয়াল ফেয়ার প্লে) নিয়ে কঠোর নিয়ম আছে, কিন্তু সেসবের তোয়াক্কা না করে আমাদের ক্লাবের বেতন কাঠামোতে কোনো নির্দিষ্ট সীমাই রাখা হয়নি এতদিন। ঋণের পরিমাণটাও তাই হয়ে গেছে আকাশচুম্বী। এমতাবস্থায় মেসির চুক্তি নবায়ন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।” 

    “মেসির চুক্তিটা কীভাবে করা যায় সেটা নিয়ে আমরা তাই অনেক ভেবেছি, ঝুঁকিও নিতে চেয়েছি। কিন্তু চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশের পর আমাদের মনে হয়েছে ক্লাবের জন্য সেই ঝুঁকিটা এই মুহূর্তে অনেক বেশি হয়ে যাবে।”

    “ক্লাবের টেলিভিশন সত্ত্বকে আমি ৫০ বছরের মত সময় ধরে বন্ধক রাখতে রাজি নই। আমাদের এই প্রতিষ্ঠানটা ১২২ বছর পুরনো। মেসির প্রতি আমরা আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো। কিন্ত কোনও খেলোয়াড়, কোচ বা সভাপতি এই ক্লাবের ঊর্ধ্বে নয়, এমনকি ক্লাবের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় মেসিও নয়।'' 

    "তাই এরকম ঝুঁকিপূর্ণ একটা বিনিয়োগে আমি কখনোই আগ্রহী নই। মেসিকে আমরা অবশ্যই দলে রাখতে চেয়েছিলাম কিন্তু যখনই আমরা ক্লাবের আর্থিক অবস্থা নিয়ে সবিস্তারে জেনেছি, আমাদের কাছে মনে হয়েছে যে এই চুক্তি নবায়ন করে ক্লাবের ভারসাম্যের জন্য হানিকর হয়ে উঠবে।”

    “মেসি বার্সায় থাকতেই চেয়েছিল, সদিচ্ছাটা ছিল পরিষ্কার। আমি তাই এই চুক্তির আলোচনায় সংশ্লিষ্ট ক্লাব ও মেসির প্রতিনিধিদের প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। একইসাথে মেসির জন্য আরও প্রস্তাবও এসেছে, আর লিগও শুরু হতে চলেছে। তাই সব দিক সামলে, দুপক্ষের কথা ভেবে, লা লিগার এফএফপির নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেই আমাদের দ্রুত এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এরকম মুহূর্তগুলোয় আবেগঘন না হয়ে ঠাণ্ডা মাথায় কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নিতেই হয়।” 

    “আমি কোনও মিথ্যা আশ্বাস দিতে চাই না। মেসির জন্য যে আরও প্রস্তাব এসেছে সেটা সত্য। আর লা লিগাও যেহেতু শুরু হতে যাচ্ছে, তাই সময়ের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অন্য কোনও ক্লাবে যেতে হলে তো তার সময় প্রয়োজন। আমরা প্রায় দুই মাস ধরে চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে আসছি। প্রথমে দুই পক্ষের সমঝোতায় ঠিক করা হয়েছিল যে মেসি দুই বছরের জন্য চুক্তি নবায়ন করবে, আর তাকে পাঁচ বছর ধরে সেই বেতন পরিশোধ করা হবে। মেসির পক্ষে পুরো বিষয়টা যতটা সহজ করা সম্ভব তার সবটুকুই সে করেছিল। তারপর আমরা বলেছিলাম যে তুমি পাঁচ বছরের জন্য আমাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হও। তাতেও সে রাজি হয়েছিল। মেসি পরবর্তী বার্সেলোনা নিয়ে আমাদের যেই প্রকল্প ছিল সেটা আমরা শুরু করতে চেয়েছিলাম আরও দুই বছর পরে, এখন নয়।” 

    “দুই দিন আগেই সব হিসাব-নিকাশের পর আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলাম যে মেসির চুক্তি নবয়ান করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এরপর গতকাল সেটা আমি তার বাবাকে জানাই। মেসি আমার সিদ্ধান্ত শুনে নাখোশ হয়েছিল, কারণ তার ইচ্ছা ছিল থেকে যাওয়ার। আমরাও সেটাই চেয়েছিলাম কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নির্মম।  লিগের বাকি ক্লাবগুলো চায় আর্থিক নিয়মগুলো সবাই মেনে চলুক আর মেসির ক্ষেত্রেও তাই সেটার বিকল্প কিছু করার অবকাশ নেই। আমি মেসি আর তার পরিবারকে ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা জানিয়েছি। বার্সাকে সে বিশ্বের সেরা ক্লাবের স্থানে নিয়ে গেছে, বার্সা তাই সবসময় তার নিজের ঘর হয়েই থাকবে।”  

    “মেসি বার্সার হয়ে ইতিহাস গড়েছে। বার্সাতে নিজেকে সে যে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে তা অকল্পনীয়। ক্লাবের সবচেয়ে সফল খেলোয়াড়টির নাম যেন ক্লাবের সবচেয়ে সফল সময়ের সাথে সমার্থক হয়ে গেছে। তবে সময় এসেছে সেসব পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার। নতুন এক যুগ শুরু হতে চলেছে যার পূর্বে ও পরে মেসির নাম জুড়ে থাকবে। তাই আমি আবারও বলতে চাই, আমি আপনাদের কোনও মিথ্যা আশ্বাস দিবো না। চুক্তি নবায়নের আলোচনার এখানেই সমাপ্তি।”


    বার্সার অগণিত ভক্তদের মনের গহীনে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা আশার প্রদীপ এভাবেই নিভিয়ে দেন বার্সা বোর্ড সভাপতি। একইসাথে তাদের আর্থিক অবস্থা, লক্ষ্য আর মেসির চুক্তি নবায়ন না করার সিদ্ধান্তকে ঘিরে যে ধোঁয়াশা ছিল সেটাও কিছুটা পরিষ্কার করেন তিনি। বার্সা বোর্ড এই মৌসুম থেকে ৪:১ অনুপাতে খেলোয়াড়দের চুক্তিবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থাৎ তাদের বেতন কাঠামোতে যদি ২৫ মিলিয়ন ইউরো ব্যয়ের খাতে যুক্ত হয়, তাহলে তারা ১০০ মিলিয়ন ইউরো বেতন অপসারণের লক্ষ্যে কাজ করবেন।

    একইসাথে তিনি জানিয়েছেন মেসি বার্সা ছেড়ে দিলে বেতন আর আয়ের অনুপাত ১১০ থেকে নেমে ৯৫ শতাংশে দাঁড়াবে। নতুন খেলোয়াড়দের ব্যাপারে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠায় তিনি বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি আমাদের নতুন চার খেলোয়াড়কে (মেম্ফিস ডিপাই, সার্জিও আগুয়েরো, এরিক গার্সিয়া, এমারসন) আমরা নিবন্ধন করতে পারব। তাদেরকে কিন্তু ক্লাবে আমরা ভেড়াতে পেরেছি এই কারণেই যে, তারা আমাদের প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে অবগত এবং রাজি। বিগত মৌসুমে প্রাথমিক হিসাবের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি লোকসান গুণতে হয়েছে আমাদের। আপনাদেরকে আমরা সুনির্দিষ্ট পরিমাণটা শীঘ্রই জানাব। এই বছরের আয়ের কাঠামোটা আমরা সাজিয়ে নিয়েছি, আমরা আশাবাদী ক্লাব আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়াবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।”

    মেসির বার্সা ছেড়ে যাওয়ার খবর ক্লাবের খেলোয়াড় আর কোচ কীভাবে নিয়েছেন সেই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “স্কোয়াডের বাকি খেলোয়াড়দের মধ্যে অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা কাজ করছে। কিন্তু তারা সবাই পেশাদার খেলোয়াড়, তাই তারা জানে যে অচিরেই তাদেরকে এই বিষণ্ণতা কাটিয়ে মাঠে ফিরতে হবে আর বার্সার সাফল্যে ভূমিকা রাখতে হবে। তারা বুঝতে শুরু করেছে যে এখানে এক নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে আর সেই নতুন যুগের নতুন গল্পে তাদেরই হতে হবে সম্মুখসারির নায়ক।’’

    ‘’মেসি চলে যাওয়ায় স্পন্সরশিপ খাতে অপূরণীয় ক্ষতি হবে, আর সেদিকটা নিয়ে আমাদের সবচেয়ে বেশি কাজ করতে হবে। আরও খেলোয়াড় আসবে যারা বার্সাকে নিয়ে ভক্তদের মাঝে উচ্ছ্বাসের উপলক্ষ তৈরি করে দিবে। তবে মেসির মত সেই অতিমানবীয় উচ্চতা স্পর্শ করতে হয়ত তাদের বেগ পেতে হবে।’’  

    ‘’আমি এই বিষয়ে কোম্যানের সাথে কথা বলেছি। সে ক্লাবের নিবেদিতপ্রাণ একজন কর্মী। মেসিকে ছাড়া দল গোছাতে তার হয়ত কষ্ট হবে। কিন্তু সেটাকে সে আরও একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিচ্ছে।” 

    বার্সার ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকার প্রস্থানটা তো রাজকীয়ই হওয়া উচিৎ। সেটা নিয়ে তার কী পরিকল্পনা, সে প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, “মেসি যেভাবে চায় সেভাবেই তার বিদায় অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। আর্থিক এবং স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায় সেটা মঞ্চস্থ করাটা এখন কিছুটা দুষ্কর হয়ে উঠতে পারে, তবে আমি আশা রাখছি একদিন আমরা তাকে তার প্রাপ্য অভ্যর্থনাটাই দিবো। যদি পারতাম তাহলে আমরা প্রতিদিনই তার জন্য একটা করে অনুষ্ঠান আয়োজন করতাম।’’  

    অন্যান্য ক্লাবের প্রস্তাব নিয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, “আমি জানি না মেসি কী ভাবছে। আমি জানি না কোন কোন ক্লাব তার সাথে যোগাযোগ করেছে। তবে যুক্তিসঙ্গতভাবে ভাবলে তার যে ভাল প্রস্তাবের কমতি হবে না সেটা আর বলে দিতে হয় না। তবে আমাদের যতটুকু সামর্থ্য ছিল তার সবটুকুই আমরা দিয়েছিলাম। আমাদের যা আর্থিক সামর্থ্য তার চেয়েও বেশি দেওয়ার কথা মাথায় রেখেই কিন্তু আমরা আমাদের প্রস্তাবনা সাজিয়েছিলাম।”

     

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন