• লা লিগা
  • " />

     

    কমলালেবু, ন্যাপকিন ও যে সত্যিটা বলে গেলেন মেসি

    কমলালেবু, ন্যাপকিন ও যে সত্যিটা বলে গেলেন মেসি    

    লিওনেল মেসিকে আপনি আগেও কাঁদতে দেখেছেন। খুব বেশিদিন নয়, এই তো মাসখানেকও হয়নি আকাশী-নীল জার্সি গায়ে তার অশ্রু মিশে গিয়েছিল মারাকানায়। সেটা ছিল আনন্দের কান্না। এবার মেসি কাঁদলেন। এই কান্না কষ্টের। এর চেয়ে বেদনার দিন আর আসেনি মেসির জীবনে। যে বার্সেলোনা ছিল তার কাছে ক্লাবের চেয়েও বেশি, যে ন্যু ক্যাম্প ছিল তার ঘরের চেয়েও আপন, সেটাই মেসিকে ছেড়ে দিতে হলো। এমন একটা অবস্থায়, যখন মেসি নিজেই যেতে চাননি। তবে তার চেয়েও বড় কথা, মেসি ফুটবলবিশ্বকে এমন একটা বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে গেলেন, যেটা এখন নির্মম সত্যি।

    মেসির এই ক্লাবে যেভাবে এসেছিলেন, সেটার তুলনা ফুটবলবিশ্বেই আসলে খুব একটা নেই। সেই নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে যখন কিশোর মেসির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন তার হরমোনের চিকিৎসার জন্য একটা ক্লাবের সঙ্গে চুক্তির সুযোগ খুঁজছিলেন মেসির বাবা। ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারিতে কমলা দিয়ে মেসির টানা ১১৩টি, টেনিস বল দিয়ে ১৪০টি আর টেবিল টেনিস দিয়ে ২৯টি ড্রিবলিংয়ের একটা ভিডিও বানানো হলো। তখন তো আর ইন্টারনেটের যুগ আসেনি, সেই ভিডিওটেপ দেওয়া হলো রোজারিওর ব্যবসায়ী হোরাশিও গ্যাগলিওলির কাছে। গ্যাগলিওলি স্পেনের বার্সেলোনায় ব্যবসা করতেন, সেখানে তার কিছু সম্পত্তি ছিল। তিনি টেপটা দিলেন হোসে মারিয়া মিনহেলা নামের এক এজেন্টের কাছে। মিনহেলার সাথে আবার বন্ধুত্ব ছিল বার্সার সাবেক খেলোয়াড় ও ক্লাবকর্তা কার্লেস রেক্সাকের। মিনহেলা প্রস্তাব দিলেন, এই ছেলেকে পছন্দ হলে ওর হরমোন চিকিৎসার একটা ব্যবস্থা ক্লাবকে করতে হবে। আর বাবা হোর্হের জন্য একটা চাকুরি খুঁজে দিতে হবে। রেক্সাক মেসিকে সরাসরি দেখতে চাইলেন। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো উড়োজাহাজে চাপলেন মেসি। সঙ্গে বাবা, গন্তব্য আটলান্টিকের ওপার।

     

    মেসি বার্সায় এলো, রেক্সাকের জহুরির চোখ হিরে চিনতেও ভুল করল না। তখনও অবশ্য চুক্তিটা হয়নি তার সঙ্গে। কিন্তু সমস্যা হলো অন্য দিক দিয়ে। আর্জেন্টাইনদের নিয়ে বার্সা পরিচালকদের অভিজ্ঞতা ওই সময় খুব সুখকর ছিল না। হুয়ান রোমান রিকেলমে আর হাভিয়ের সাভিওলা অনেক আশা নিয়ে এসেও খাপ খাওয়াতে পারেননি ন্যু ক্যাম্পে। ম্যারাডোনার জন্যও তো তাদের কম হ্যাপা পোহাতে হয়নি। বার্সেলোনা নিজেরাও একটা ক্রান্তিকালের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। লুইস ফিগো কিছুদিন আগেই চলে গেছেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়ালে, লুই ফন গাল নতুন দল নিয়ে ঠিক সুবিধে করতে পারছেন না। জোয়ান গাসপার্ত মাত্র সেই গ্রীষ্মে দায়িত্ব নিয়েছেন ক্লাব সভাপতি হিসেবে। এর মধ্যে ১৩ বছর বয়সী ছেলেটার জন্য মাসে পনেরশ ডলার করে গুণতে হবে, যাকে দেখতে এখনো শিশুর মতো লাগে। ওর বাবার জন্য আবার চাকুরির ব্যবস্থাও করতে হবে। তার ওপর ছেলেটা বিদেশী, প্রথম বেশ কিছুদিন ক্লাবের হয় কোনো বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টেও খেলার বৈধতা পাবে না। শুধু কাতালান টুর্নামেন্টেই খেলতে পারে।   পরিচালকদের সবাইকে তো আর মাঠে আনা যায় না, রেক্সাকের বোঝাতে কষ্ট হচ্ছিল এই ছেলেকে হাতছাড়া করা চলবে না।

    এর মধ্যে মেসির বাবা অধৈর্য হয়ে উঠছিলেন। এজেন্ট মিনহেলাও চাপ দিতে থাকলেন রেক্সাককে। এক দিন দুজন টেনিস খেলার পর মিনহেলা বললেন, মেসির বাবা আর্জেন্টিনায় ফিরে পাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। রেক্সাক বুঝলেন এবার তাকে নিজ থেকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সেখানেই একটা পেপার ন্যাপকিনের ওপর লিখে দিলেন, এই ছেলেকে বার্সেলোনায় নেওয়া হলো। কে জানত, একদিন সেই তুচ্ছ পেপার ন্যাপকিন নিলামে বিক্রি করতে পারলেই কোটিপতি হয়ে যেতে পারেন রেক্সাক! এর পরেই মা দুই ভাইকে নিয়ে এলেন বার্সায়, কিছুদিন পর তাদের চলে যাওয়ার সময়ও হলো। ঘরকাতুরে মেসির নতুন জায়গায় মানিয়ে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। হোর্হে আর সেলিয়া একবার ভাবলেন, সবাইসহ আর্জেন্টিনায় ফিরে যাবেন কি না। কিন্তু মেসি নিজেই বলল, সে থাকতে চায়। মার্চ, ২০০১ সালে বার্সেলোনায় শুরু হলো মেসির নতুন জীবন। শুরু হলো ইতিহাস বদলে দেওয়া এক অধ্যায়। আর আজ চোখের জল মুছতে বার বার সেই টিস্যুই খুঁজছিলেন মেসি। কী অদ্ভুত কাকতাল!

    কিন্তু এরকম তো হওয়ার কথা ছিল না।  মেসির বিদায় নেওয়ার কথা ছিল দর্শকভর্তি ন্যু ক্যাম্পের সামনে। প্রিয় জার্সি পরে আরেকবার গোল করবেন, আরেকবার ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনিতে গর্জন উঠবে গ্যালারিতে। ইনিয়েস্তা, জাভিরা দর্শকসারি থেকে তার জন্য গলা ফাটাবেন, ম্যাচ শেষে আলিঙ্গন করবেন, সতীর্থদের কাছ থেকে গার্ড অব অনার পাবেন- মেসির বিদায়টা তো এমন হওয়ার কথা ছিল। জাভি আজও ছিলেন, ছিলেন মেসির এখনকার সতীর্থেরাও- কিন্তু সেটা খোলা মাঠে নয়, সংবাদ সম্মেলনের চার দেয়ালে। এই বিদায় তো চাকুরীজীবীদের হয়, মেসির জন্য বিদায় নেওয়ার কথা সেই ন্যু ক্যাম্প থেকে, যেখানে একের পর এক লিখেছেন অবিশ্বাস্য সব গল্প। ভক্তরা অবশ্য ছিলেন আজ, ন্যু ক্যাম্পের বাইরে দশ হাজার সমর্থক অধীর হয়ে অপেক্ষা করছিলেন মেসির জন্য। মেসি, মেসি ধ্বনি উঠল এখানেও, কিন্তু মেসি তো চেয়েছিলেন মাঠ থেকেই বিদায় নিতে।

    বিদায়বেলায় সেই ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। নিজের আবেগের দুয়ার খুলে দিয়েছেন, ব্যাকুল হয়ে বলেছেন হৃদয়ের কথা। গত একটা বছর খেলতে হয়েছিল ফাঁকা মাঠে। গোল করার পর সেই ফাঁকা গ্যালারির সামনেই করতে হয়েছে উদযাপন। কোভিডের সময় শেষে যখন আবার ন্যু ক্যাম্পে দর্শকমুখর হওয়ার কথা, তার আগেই চলে গেলেন মেসি।

    কিন্তু তার আগে নির্মম একটা বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে গেলেন ফুটবলবিশ্বকে। ‘ওয়ান ক্লাব প্লেয়ারদের’ সংখ্যা এমনিতেই এখন কমছে, মেসির বিদায়ে আরও একজন চলে গেলেন সেই ক্লাব থেকে। এখনকার যুগে টাকাই শেষ কথা, এই টাকার জন্যই সুপার লিগের মতো আইডিয়া ভর করেছিল ক্লাবগুলোর। তবে মেসির ক্ষেত্রে ব্যাপারটা নিয়তির নির্মম পরিহাসের মতো হয়ে গেছে। নিজের বেতন ৫০ শতাংশ কমাতে রাজি ছিলেন, বার্সাও নতুন চুক্তির জন্য তৈরি ছিল। কিন্তু আর্থিক নীতির মারপ্যাঁচটাই বাঁধ সাঁধল, শেষ পর্যন্ত আর চুক্তি করা হলো না মেসির। এই ক্লাব থেকেই একটা সময় বিদায় নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গত বছর সেটা হয়নি। এবার নিজেই থেকে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেটা আর হয়নি। অর্থ ব্যাপারটা ফুটবলে এমনভাবে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে, সেখানে আর আবেগের স্থান নেই। মেসির চোখের জল সব ফুটবলভক্তকেই ছুঁয়ে গেছে, কিন্তু দিন শেষে মেসি আর বার্সার মধ্যে দেয়াল তুলে দিয়েছে ফুটবলের সেই নতুন বাস্তবতাই। সেখানে লা লিগা আর বার্সার দুর্নীতিগ্রস্ত নীর্তিনির্ধারকদের ভূমিকা ত্থাকতে পারে, কিন্তু তাতে এই সত্যিটা মুছে যাচ্ছে না। মেসিদের তাই যতই আবেগ থাকুক, শেষ পর্যন্ত নতুন কোথাও গিয়েই নতুন স্বপ্নে বসত করতে হবে। মেসি চলে গেছেন, কিন্তু চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন সেই রূঢ় বাস্তবতা। 

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন