• ক্রিকেট, অন্যান্য
  • " />

     

    টেস্টের ভবিষ্যৎ কী? সাবেক, বর্তমান ক্রিকেটাররা কী ভাবছেন?

    টেস্টের ভবিষ্যৎ কী? সাবেক, বর্তমান ক্রিকেটাররা কী ভাবছেন?    

    টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে টি-টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোর দৌরাত্ম্যের কারণে উঠেছিল প্রশ্ন। আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের সাফল্য সেই শঙ্কা কিছুটা ধামাচাপা দিলেও দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন এক সিদ্ধান্ত হুট করেই ফিরিয়ে এনেছে সেই চিন্তা। নিউজিল্যান্ড সফরে একেবারেই আনকোরা এক দল পাঠাচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা; সেটাও এমন একজনকে অধিনায়ক করে যিনি প্রোটিয়াদের হয়ে অভিষেক হওয়া তো দূরের কথা, কখনও স্কোয়াডেও ডাক পাননি। কারণ? এসএটি২০! নিজেদের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে তাদের বড় বড় খেলোয়াড়দের ধরে রাখতে নিজেরাই টেস্টের স্কোয়াড থেকে নাম ছুটিয়ে নিয়েছে ক্রিকেট দক্ষিণ আফ্রিকা।

    নিউজিল্যান্ড সফরের জন্য ২৮ বছর বয়সী নিল ব্র্যান্ডকে অধিনায়ক করে দল ঘোষণা করেছেন। চলতি ভারত সিরিজের দল থেকে সেখানে আছেন সদ্য অভিষিক্ত ডেভিড বেডিংহাম, কিগান পিটারসেন, জুবায়ের হামজা যিনি কি না আবার দলে এসেছেন বাভুমা ইনজুরিতে পড়ায়। দক্ষিণ আফ্রিকার এমন সিদ্ধান্ত যেন হুট করেই লাল বলের খেলাটা নিয়ে তুলেছে অসংখ্য প্রশ্ন। দক্ষিণ আফ্রিকার মত একটা দল যদি টেস্টকে এতটাই ঠুনকো ভাবে যে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের আওতায় থাকা একটা সিরিজেও তাদের প্রথম সারির খেলোয়াড়দের না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে দুবার না ভেবে তাহলে খেলাটার আসলে মূল্য কোথায়? সাবেক, বর্তমান ক্রিকেটার - সবাই তাই এই বিতর্কে আবারও সরব। টেস্টের দিন কি তাহলে সত্যিই ফুরিয়ে এল?

     

    'বিগ থ্রি'-এর দায়বদ্ধতা কতটুকু?

    দিন ফুরিয়ে এল না-কি, দিন ঘনিয়ে আনতে বোর্ডগুলোও মরিয়া? ভাবার বিষয় আছে সেখানেও। আইসিসির বিগ থ্রি - ভারত, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার আধিপত্য নিয়ে এর আগে কম কথা হয়নি। কিন্তু এই তিন বোর্ডের অর্থবিত্তের ভাগ বাটোয়ারা যে একদিন খেলাটার জন্য হানিকর হয়ে উঠবে সেটা আঁচ করতে কাউকে রকেট বিজ্ঞানী হতে হয়নি। আইসিসি থেকে পাওয়া অর্থের বণ্টনের পর অন্যান্য বোর্ডগুলোর পাওয়া অর্থে রয়েছে বিশাল তফাৎ। অন্যান্য বোর্ডগুলো তাই নিজেদের দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোকে ঢেলে সাজাতে উঠে পড়ে লাগবে সেটা তো বলাই বাহুল্য।

    ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ থেকে পাওয়া অর্থ দিয়েই যে নিজেদের ক্রিকেট কাঠামোর উন্নয়ন করা সম্ভব সেই পথটা ভারত দেখিয়েছে তাদের আইপিএল দিয়ে। অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ অনেক আগে থেকেই নতুন নতুন উদ্ভাবন দিয়ে তাদের লিগকে জাঁকজমকপূর্ণ করার কম চেষ্টা করেনি। তারাও লিগ ঢেলে সাজিয়ে, নারীদের আলাদা লিগকে সমান গুরুত্ব দিয়ে বিগ ব্যাশকে নিয়ে গিয়েছে অন্য উচ্চতায়। ইংল্যান্ডের ভাইটালিটি ব্লাস্টের কাটতিতে কিছুটা ভাটা পড়ার পর তো তারা ‘দ্য হান্ড্রেড’-এর মত যুগান্তকারী এক ফরম্যাটের লিগই বানিয়ে বসল; আর সেটা এখন ঠিকই জনপ্রিয়তার তুঙ্গে।

    বিগ থ্রি-এর দেখানো পথে দক্ষিণ আফ্রিকার মত দেশগুলো যে হাঁটবে সেটাই স্বাভাবিক। তবে এখানে একটা প্রশ্ন উঠতেই পারে - ভারত, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া তো টেস্টকে কোনও অংশে কম গুরুত্ব দিচ্ছে না। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া তো টেস্টের প্রচারণাকেই এখনও তাদের গুরুত্বের তালিকায় শুরুর দিকে রাখে। এই তো পাকিস্তানকে আপ্যায়ন করার সিরিজেই পার্থের নতুন অপ্টাস স্টেডিয়ামে ওয়াকার সেই দিনগুলোকে ফিরিয়ে আনতে নতুন আঙ্গিকে সাজিয়েছে; নাম দিয়েছে ‘দ্য ওয়েস্ট টেস্ট’। আর বক্সিং ডে টেস্ট নিয়ে তো তাদের উন্মাদনার শেষ নেই। এবারও এমসিজিতে এক লাখের ওপর মানুষ পাকিস্তানের বিপক্ষে তাদের জয়টা উপভোগ করেছে। কিন্তু এই তিন দেশ যে টেস্টের প্রচারণায় টাকা ঢালার সুযোগ পাচ্ছে সেটা তাদের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোর কাটতির জন্যই। ইংল্যান্ড কীভাবে একজন অ্যান্ডারসন, একজন ব্রডকে বছরের পর বছর টেস্ট খেলিয়ে তাদের টেস্ট বিশেষজ্ঞ হিসেবে রাখতে পারে? ভারত কেন চেতেশ্বর পুজারাকে নিজেদের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ চলাকালীন সময়েও ইংল্যান্ডে কাউন্টি খেলতে উদ্বুদ্ধ করতে পারত? অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খাওয়াজা, লায়নরা অনায়াসে শুধু টেস্ট খেলা চালিয়ে যেতে পারেন কীভাবে? উত্তরটা সহজ - তাদের বেতন কাঠামো।

    টেস্ট খেলোয়াড়দের বেতনের প্যাকেজটা সেই তিন দেশে যথেষ্ট লোভনীয়। অন্য বোর্ডগুলোর পক্ষে সেটা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কারণ আর কিছু না - বেশি দিন ব্যয় করেও অর্থ আয়টা ওই দেশগুলোতে সেই অর্থে হয় না। আর আইসিসি থেকে পাওয়া লভ্যাংশের অসম বণ্টন তো আছেই। এই অসমতা উৎরিয়ে বোর্ডগুলো যে চাচা আপন প্রাণ বাঁচা মন্ত্র জপবে সেটা আঁচ করাই যাচ্ছিল; হলও তাই। ক্রিকেট খেলাটাই কি জৌলুশ হারাবে কি না সেটা নিয়েও এখন জাগতে পারে প্রশ্ন।

    আপনি বলতেই পারেন টি-টোয়েন্টির মত বিনোদন আর কয়টা ফরম্যাটে পাওয়া যেতে পারে! সেটা নিয়েও বিতর্ক থাকতে পারে। পাঁচ দিনের শারীরিক, মানসিক, ক্রিকেটীয় প্রজ্ঞার চূড়ান্ত পরীক্ষার পরও একটা দাঁত কামড়ানো ড্র দেখতে পারাটাও ক্রিকেটের কট্টর ভক্তদের কাছে অসীম আনন্দের। তবে একটা বিষয়ে হয়ত দ্বিমত কারও সেই অর্থে থাকবে না - টেস্টের জন্য আপনি যদি আপনার খেলার বেসিক নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে কাজ না করেন, ক্রিকেটার হিসেবে আপনি পস্তাবেন। আর আমরা দর্শকরা সেই মানের খেলা উপহার পাব না।

     

    ক্রিকেটাররা কী বলছেন?

    এসব শঙ্কা থেকেই টেস্টের কথা নতুন করে ভাবার ডাক দিয়েছে অনেক ক্রিকেটারই। অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক প্যাট কামিন্স তো আশা করছেন যেন এটা শুধুই একটা অধ্যায় ছাড়া আর কিছু না হয়। তবে ওপরমহলের দিকেও আঙুল তুলতে পিছপা হননি অজি অধিনায়ক, “আইসিসি বলুন আর শীর্ষ দেশগুলো যারা প্রচুর টাকা কামাচ্ছে - তাদের উচিৎ ছিল টেস্টের জন্য এমন একটা বেতন কাঠামো তৈরি করা যেটাকে সোজা কথায় প্রিমিয়াম বলা যায়।” তবে সাবেক অজি অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ সরাসরি আঙুল তুলেছেন দক্ষিণ আফ্রিকা বোর্ডের দিকে, “ অবশ্যই তাদের এটা নিয়ে কোনও পরওয়া নেই!” নিউজিল্যান্ডকেও প্রোটিয়ারা অসম্মান করছে বলে মনে হয় তার, “আমি জানি না নিউজিল্যান্ড কেন এই সিরিজ খেলতে সম্মত হয়েছে। যেই দেশ আপনাদের ক্রিকেটকে বিন্দুমাত্র সম্মান দিচ্ছে না তাদের সাথে আপনি কেন খেলবেন, আমাকে বলুন তো।”

    টেস্টের প্রতি অগাধ ভালবাসা থেকেই হয়ত বিষয়টা এখনও হজম করে উঠতে পারছেন না ওয়াহ। তবে তার মত অতটা উত্তপ্ত না হয়ে বিষয়টাকে ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখার চেষ্টা করছেন অজি ওপেনার উসমান খাওয়াজা। দক্ষিণ আফ্রিকার সিদ্ধান্তটা তার কাছে কোনও ক্ষেত্রে অর্থবহই মনে হচ্ছে, “ সত্যি বলতে কি অন্য কয়েকটা দেশ কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাঙ্গন থেকে আমাদের মত টাকা পাচ্ছে না। এটা একদম কড়া সত্য। আমি তো অন্যান্য দেশের অনেক ক্রিকেটারের সাথেই কথা বলেছি। তাদের গড় বেতন, তাদের কেন্দ্রীয় চুক্তির কাঠামো - এসব নিয়ে কথা বলেছি।” ফক্স ক্রিকেটকে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে খাওয়াজা পরে এটাও জানিয়েছেন যে ফ্র্যাঞ্চাইজি খেলতে চাওয়াটাই তাদের জন্য অনেকাংশেই সঠিক সিদ্ধান্ত, “ আমি যদি আজ ওই ক্রিকেটারগুলোর জায়গায় থাকতাম তাহলে আমি কী করতাম? একদিকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে আমি পাচ্ছি কোনোরকম চলে যাওয়ার মত বেতন, অন্যদিকে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেললেই পাচ্ছি কাড়ি কাড়ি টাকা। দুঃখিত, কিন্তু আমি তো আগেপিছে না ভেবে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে টি-টোয়েন্টিই খেলতাম! দেখুন, দেশের জন্য আমি খেলতে ভালোবাসি। কিন্তু আপনার দিকে তো আপনার বৌ-বাচ্চাও চেয়ে থাকে। একই কাজ করার পর দুজন দুরকমের বেতন পাচ্ছে। আপনি তো তখন যারা বেশি বেতন দেয় তাদের কোম্পানিতেই যেতে চাইবেন তাই না!”

    তবে একটা জায়গায় কামিন্স, ওয়াহ, খাওয়াজারা একমত। টেস্ট ক্রিকেটকে বাঁচাতে তারা সকলেই চান বোর্ড নির্বিশেষে একটা ‘প্রিমিয়াম’ বেতন কাঠামো দাঁড় করাতে যাতে করে শুধু টেস্ট খেলেও আরাম আয়েশে জীবন কাটানো যায়। এই টেস্ট খেলোয়াড় হওয়ার জন্য যেই ত্যাগ-তিতিক্ষার পথ পাড়ি দিতে হয় বেতনটা সেটার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় মোটেই। বোর্ডগুলোর স্বচ্ছতাও এখানে জরুরী বলে মনে করেন তারা। বোর্ডগুলো আদৌতে তাদের খেলোয়াড়দের দেখভালের পেছনে কতটা খরচ করছে সেটা নিয়ে শংকার জায়গা থেকেই এই প্রশ্নগুলো তুলেছেন তারা।

    প্রশ্নগুলো বড্ড প্রাসঙ্গিকও বটে। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট থাকতেই এসেছে। তাকে নিয়ে হুট করে সব তোলপাড় করে দুই কূল হারানোটা হয়ত ক্রিকেটের জন্যই কাম্য নয়। তাকে কিছু জায়গা ছেড়ে দিয়ে ক্রিকেটের গোড়াপত্তনের সেই আদিসত্ত্বাকে কীভাবে জিইয়ে রাখা যায় সেটা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে আবারও।