• সেরা ফুটবল ক্লাব
  • " />

     

    শ্যাপোকোইন্সের জন্য ভালোবাসা


    মিউনিখের বিবর্ণ তুষার আর মেদেইনের দুর্গম গিরি। কিছু নিথর হয়ে যাওয়া দেহ, জ্বালানির পোড়া গন্ধ। বিমানের পলকা দেহ দুমড়ে চুমড়ে যাওয়া, থেকে থেকে ভেসে আসা আর্তচিৎকার। সময়ের ব্যবধানটা কত? ৫৮ বছর তো কম কথা নয়। মিউনিখে ১৯৫৮ ফেব্রুয়ারির ওই ভয়াল দুপুরটা এভাবে ফিরে আসবে মেদেইনের আততায়ী সকালে? শুধু কি একটা বিমান দুর্ঘটনা? আসলে তো একটা জমাট বাঁধতে থাকা স্বপ্ন গুড়ো গুড়ো হয়ে যাওয়া। একটা পরিবারের এপিটাফ, সবুজ মাঠকে জীবনের ধ্রুবতারা করা একদল মানুষের কল্পনা হয়ে যাওয়া। আরেকটি মিউনিখ ট্র্যাজেডি যেন ফিরে এলো কলম্বিয়ার মেদেইনে। 


    ২ 

     

               শুন্য ড্রেসিংরুমে তিনজন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না, তাঁদের সতীর্থেরা আর কেউই বেঁচে নেই


    ফেসবুক-টুইটারে ভিডিওটা এখন ভাইরাল। কোপা সুদামেরিকানার সেমিফাইনাল শেষ হয়ে গেছে খানিক আগে। ড্রেসিংরুমে "জয়তু শ্যাপে" বলে উল্লাসে চেঁচাচ্ছে সবুজ জার্সির খেলোয়াড়েরা। এ ওকে জড়িয়ে ধরছেন, হাতের কাছে যার যা আছে তাই নিয়ে চলছে তুমুল কনসার্ট। সান লরেঞ্জকে হারিয়ে ফাইনালে চলে গেছে, কয়েক মাস আগেও সেটি কে ভেবেছিল? শ্যাপেকোইন্স নামের ক্লাবটাকে তো টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই কেউ গোণায় ধরেনি। সবাইকে স্তম্ভিত করে তারাই চলে গেল ফাইনালে। সেই ভিডিওর অনেকেই এখন শুধু স্মৃতি, বিশ্বাস করা যায়? যে ড্রেসিংরুমে পাঁচদিন আগেও ছিল জীবনের সমুদ্র সফেন, সেখানে এখন শুধুই শ্মশানের নীরবতা। 

     


    সকাল বেলাই ঘুম ঘুম চোখে মুঠোফোনটা হাতে নিয়ে চমকে উঠলেন ডেভিড ডি গিয়া। ক্লেবার সান্তানার সঙ্গে একসময় খেলেছেন অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদে। বয়সের ব্যবধান অনেক, কিন্তু খুনসুটি-দুষ্টুমি আর সেসব মানে? সেই সান্তানাই আছেন নিখোঁজ আরোহীদের মধ্যে! ৮১ জন আরোহী নিয়ে কলম্বিয়ার মেদেইনের পর্বতে বিধ্বস্ত হয়েছে যে বিমান। বিহবল ডি গিয়া আবিষ্কার করলেন, সান্তানা এখন শুধুই স্মৃতি। 

     

    ৪ 
    ডেভিড লুইজও চমকে গেলেন খবরটা দেখে। আর্থার মিয়া তো শুধু তাঁর সতীর্থ ছিল না, এর চেয়েও তো অনেক বেশি। ভিতোরিয়াতে দুজনের দুরন্ত কৈশোরের অনেকটা সময় কেটেছে একসঙ্গে। কত হাসি-কান্না-আনন্দ-বেদনার স্মৃতি। একটা সময় অমোঘ নিয়মে দুজনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। তাই বলে মিয়া এভাবে চলে যাবেন? কিছু না বলে? লুইজের কাঁপা কাঁপা হাতের টুইট, "আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না। তুমি তো আমার ছোট ভাইয়ের মতো ছিলে।' 



    মিয়া, সান্তানাদের তো এত তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার কথা ছিল না। মেদেইনে তো তারা ইতিহাস গড়বেন- পান্ডুলিপিটা এভাবেই লেখা থাকার কথা। ছয় বছর আগে যে ক্লাবটা ছিল চতুর্থ বিভাগে, মাত্র দুই বছর আগে যারা মাত্র দ্বিতীয়বার উঠে এসেছে প্রথম বিভাগে, রূপকথার আশ্চর্য প্রদীপ তাদের ঘষারই অপেক্ষায়। সেমিফাইনালে সান লরেঞ্জো, তার আগে ইনদিপিদিয়েন্তের মতো ক্লাবকে হারানোর পর সুদামেরিকানার শিরোপা তো তাদের প্রাপ্য। "রূপকথা" শব্দটাতে কি আপনার হয়তো চোখ আটকে গেছে। গত এক বছরে লেস্টার সিটির তো প্রায় সমার্থকই হয়ে গিয়েছে সেটি। আরেকটু ভাবুন, আরও কিছু মনে পড়ছে? ছয় বছর আগে লেস্টার তো তৃতীয় বিভাগেই উঠে এসেছিল। সেখান থেকে কল্পনার চেয়েও সুন্দর এক গল্প লিখে প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়ন। শ্যাপোকোইন্সের সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছেন না? ব্রাজিলের লেস্টার তো তাদের এমনি এমনি বলা হয়নি! 


    ৬ 

     

                                                  দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া সেই বিমান 

                         
    ব্রাজিলের শ্যাপে শহরটা হঠাৎ করেই যেন ভুতুড়ে হয়ে গেছে। একদল প্রাণহীন ধড় যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে সেখানে। ছোট্ট শহরে যা কিছু আনন্দের, যা কিছু প্রাপ্তির, সবই তো এই ক্লাবের জন্য। খুব বেশি না, বয়স তো মাত্র ৪২। শুরুতে কত হোঁচট, বছরের পর বছর নিচু সারির লিগে খেলে যাওয়া। এরপর গত ছয় বছর থেকে একটু একটু করে সামনে এগিয়ে আসা। পালমেইরাসের ঠিক পেছনে থেকে গত বার যখন প্রথম বিভাগ শেষ হয়েছিল, গোটা শহরটাই যেন একটা কার্নিভাল হয়ে গেছে। এরপর কোপা সুদামেরিকানার ফাইনালে ওঠা, শহরবাসী অপেক্ষায় ছিল বীরবরণের। নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ বলে কথা! কে জানত, ট্রফির বদলে প্রিয়মুখদের শবদেহই তাদের জন্য অপেক্ষা করছে? যেখানে বাজার কথা উৎসবের সিম্ফনি, সেখানে এখন অনুচ্চারে ভেসে বেড়াচ্ছে বেদনার বিউগল। 


    ৭ 
    একটা ঝড় এসে মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু তছনছ করে দিয়ে গেছে। একটা ক্লাবের এতজন একসঙ্গে হয়ে গেছেন শুধুই স্মৃতি। শ্যাপোকোইন্স এমন কোনো বড় ক্লাব নয়। বাসবি বেবসদের হারিয়েও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড একটু একটু করে আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছিল। কিন্তু শ্যাপোকোইন্সের মতো ক্লাব কি সেটা পারবে? সেই উত্তর তুলে রাখা যাক ভবিষ্যতের জন্য। আপাতত দুইটা খবর শুনুন। সুদামেরিকানার ফাইনালের প্রতিপক্ষ কলম্বিয়ার অ্যাটলেটিকো ন্যাশিওনাল অনুরোধ করেছে, এ বছরের ট্রফিটা যেন শ্যাপোকোইন্সকে দিয়ে দেওয়া হয়। ব্রাজিলের প্রথম বিভাগের সব ক্লাব ঘোষণা দিয়েছে, শ্যাপোকোইন্স চাইলে তাদের খেলোয়াড়দের নাম লেখাতে পারে। 


    বিমান ধ্বংস হয়, ভালোবাসা হয় না। 
     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন