• ক্রিকেট

আমেরিকার ডায়েরি : 'মিশন মায়ামি'

১.

“আপনারাও কি ক্রিকেট দেখতে এসেছেন?”

পাকিস্তানি রেস্টুরেন্ট ম্যানেজারের কন্ঠে কৌতুহলটা বেশ স্পষ্ট। ‘হ্যাঁ’-সূচক জবাব দিতেই জানালেন, আগের দিন থেকেই শহরে ভীড় জমাতে থাকা বাংলাদেশিদের খাবারের অর্ডার নিতে হিমশিম খাচ্ছেন। তবে ভদ্রলোকের কৌতুহলটা যে স্রেফ ব্যবসায়িক সৌজন্যবোধ থেকে নয় সেটা বোঝা গেলো পরের প্রশ্নে, “তামিমের কী অবস্থা এখন? কেমন খেলছে ও?” বাংলাদেশী ওপেনারের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স সংক্ষেপে জানিয়ে দিলেন সফরসঙ্গী মনির ভাই, “প্রথম টি-টোয়েন্টিতে সুবিধে করতে না পারলেও ওয়ানডে সিরিজে দারুণ খেলেছে।” আপন মনে মাথা নাড়তে নাড়তে ভদ্রলোক বলে চললেন, “ও তোমাদের অনেক বড় সম্পদ। ওকে দেখেশুনে রেখো। পাকিস্তানে সবাই ওকে নিয়ে কথা বলে। জানি তোমাদের সাকিব আছে, মুশফিক আছে... কিন্তু তামিম তামিমই, ও একটা ক্লাস!”

ভদ্রলোকের কথা ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটেই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের কান পর্যন্ত পৌঁছেছিলো কিনা কে জানে! তবে সেন্ট কিটসে সিরিজের প্রথম ম্যাচে শুন্য রানে ফেরা তামিমের ‘টর্নেডো’ রূপটাই ফিরে এলো ফ্লোরিডার মাঠে। 

 

মোসাদ্দেকের দেওয়া 'পবিত্র পানি'/মহিবুল্লাহ ত্বকি

 

২.

আমেরিকায় খেলতে আসছে বাংলাদেশ- এমন খবরে ভেতরে ভেতরে উত্তেজনাটা টের পাওয়া যাচ্ছিল মাস কয়েক আগে থেকেই। তবে সেটা মরে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিলো টেস্ট সিরিজে মুশফিকদের শোচনীয় পারফরম্যান্স। এক হাজার কিলোমিটার সড়কপথ পাড়ি দিয়ে ব্যাটে-বলে এমন দৈন্যতা দেখতে যাওয়া আদৌ সমীচীন হবে কিনা, প্রশ্ন ছিলো আগ্রহী মহলে। ব্যক্তিতগতভাবে অবশ্য আশাবাদী ছিলাম, ওয়ানডেতে অন্তত একটা ম্যাচ জিতলে আগ্রহটা ফিরে আসবে সবার। প্রথম ওয়ানডেতে অনায়াস জয় সেটা আনলোও, কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচেই আবার অমন হার! খেলা দেখতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে খোলা মেসেঞ্জার গ্রুপ থেকেই রাগে-দুঃখে বেরিয়ে গেলেন কেউ কেউ। দলনেতা সামি ভাই ঘোষণা দিয়ে দিলেন, শেষ ওয়ানডে জিতলে যাব, হারলে যাচ্ছি না। সে ম্যাচটাও জিতে আমাদের ফ্লোরিডা-যাত্রা একরকম চূড়ান্তই করে দিলেন মাশরাফিরা। কিন্তু আবার বাধ সাধলো দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, দুটি ম্যাচের দিনই পূর্বাভাস বলছিলো লডারহিলে বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা ৬০ শতাংশ। এদিকে আমাদের অবার্নেও টানা দুদিনের ঝুম বৃষ্টি আরও সপ্তাহখানেক চলার পূর্বাভাসে শংকা হচ্ছিলো খেলা মাঠে গড়ানো তো পরের কথা, এই আবহাওয়ায় ঘর থেকে বের হতে পারবো তো! 

কিন্তু যদি না যাই, আর যদি খেলা হয় তাহলে? ওই আফসোস কোনোদিন যাবে তো? আমেরিকার মাটিতে বাংলাদেশের খেলা দেখার এমন সুযোগ আদৌ আর কোনোদিন আসবে কি? এমন সব প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত সব জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে ‘কী আছে জীবনে’ ভেবে নিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম আমরা দশজন। 

রওনা যখন হচ্ছি, অবার্নের ঘড়িতে রাত একটা। প্রায় ১২ ঘন্টার যাত্রা যতোটা একঘেয়ে হবে ভেবেছিলাম মোটেও তা হয় নি। গানে-গল্পে দিব্যি কেটে গেলো সময়। তবে মনটা খারাপ হয়ে গেলো ভোরের দিকে। যাত্রা বিরতিতে কোন এক গ্যাস স্টেশনে থেমে ফেসবুকে একটু ঢুঁ মারতে গিয়েই থমকে যেতে হলো। দেশের চলমান পরিস্থিতির খবরে ভরে গেছে নিউজফিড। খেলা দেখার উত্তেজনা কমে গেলো আরেক দফা। 

এরপর এক ভাইয়ের ওয়ালেট হারিয়ে গেল। অ্যারিজোনা থেকে আসা মিনহাজ ভাই ফোন করে জানালেন, নিউইয়র্ক থেকে তার যে বিশাল বাহিনী আসার কথা তাঁদের ফ্লাইট বাতিল হয়ে গেছে খারাপ আবহাওয়ার কারণে। তাঁর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাটাও হওয়ার কথা ছিলো ওঁদের সাথেই। এখন একা একা কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। চলে আসতে বললাম আমাদের হোটেলে। ফোন রাখার আগে আরও একটা দুঃসংবাদ শোনালেন; ওই সময় উনি যেখানে ছিলেন সেটা ভেন্যুর কাছাকাছি, জানালেন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে ওখানটায়। খেলা হবে কিনা সে শংকা মাথাচাড়া দিলো আরও একবার। সবমিলিয়ে ষোলো আনা বাজে একটা সফর হতে যাচ্ছে- এমনটা ভাবতে ভাবতেই ইনবক্সে এক ভাইয়ের ম্যাসেজ, “মাঠে গেলে চলমান আন্দোলন নিয়ে কিছু প্ল্যাকার্ড বানিয়ে নিয়ে যেও”। পছন্দ হলো প্রস্তাবটা। আর কিছু না হোক, দেশ থেকে সাড়ে তেরো হাজার কিলোমিটার দূরে থেকে যৌক্তিক দাবীতে চলা একটি গণআন্দোলনের সাথে এতোটুকু একাত্ম হতে পারার সুযোগটাও তো কম পাওয়া নয়। 

 

৩.

খাওয়া শেষ করেই ছুটলাম কাগজ-কলমের খোঁজে। যোগাড়যন্ত সেরে লেখালেখি শেষ করতে করতে খেলার সময় হয়ে এলো। কতো আর দর্শক হবে ভেবে তাড়া অনুভব করলাম না তেমন। ভুলটা ভাঙলো স্টেডিয়ামের কাছাকাছি গিয়ে। পার্কিং লটের সামনে গাড়ির বেশ লম্বা সারি। তারও সামনে গ্যালারির প্রবেশপথে দর্শকদের আরও লম্বা লাইন দেখে মিশ্র প্রতিক্রিয়াই হলো। এতো এতো বাংলাদেশি খেলা দেখতে আসবেন- এটা অপ্রত্যাশিত ভালো লাগার ব্যাপার ছিলো, আবার এই ভীড় ঠেলে ঢুকে খেলার কতোটা পাবো সে সংশয়ও হতে লাগলো। 

ঘাসের গ্যালারিতে যুতসই একটা জায়গা খুঁজে নিয়ে যতোক্ষণে বসার সুযোগ পেলাম, দুই উইকেট নেই বাংলাদেশের। তাতে অবশ্য মার্কিন মুলুকে প্রথমবারের মতো নিজেদের জাতীয় দলকে পাওয়ার উৎসাহে খুব একটা ভাটা পড়ছিলো না বাংলাদেশিদের মধ্যে। সাথে নেওয়া প্ল্যাকার্ডগুলো বুকে ধরে আমরাও যোগ দিলাম ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ গর্জনে, সেন্ট্রাল ব্রোওয়ার্ড রেজিওনাল পার্কে শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের আবহ আনতে। 

আরও একটা ব্যাটিং বিপর্যয়ের সাক্ষী হতে যখন মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, আশা দেখাতে শুরু করলো ওয়ানডে সিরিজের ত্রাণকর্তা তামিম-সাকিবের জুটি। শেষ পর্যন্ত ১৭১ রানের পুঁজি নিয়ে আমরা আশাবাদী হলেও ততোক্ষণে বন্ধু বনে যাওয়া পাশের ত্রিনিদাদিয়ান ভদ্রলোকের মন্তব্য, “তোমরা অন্তত দশ রান কম করেছো।” জিততে পারবো কি পারবো না সে নিয়ে ছোটখাটো একটা বাজিও হয়ে গেলো তাঁর সাথে। 

আমাদের হাতের প্ল্যাকার্ডগুলো মনযোগ দিয়ে পড়ছিলেন খেলা দেখতে আসা ক’জন ভারতীয়। সংক্ষেপে তাঁদের বিষয়টা বোঝানোর চেষ্টা করলেন নাঈম ভাই। খুদে এক বাংলাদেশি বালিকা এসে ইমরান ভাইয়ের প্ল্যাকার্ডটা কেড়ে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলো। সামনে দিয়ে চলে যেতে যেতে বাংলাদেশের জার্সি পরিহিতা এক তরুণী থমকে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে নিলেন। টিভিতে খেলা দেখা বন্ধু-স্বজনরা পরে জানিয়েছেন, সরাসরি সম্প্রচারের ক্যামেরায়ও ধরা পড়েছিলো আমাদের প্রতিবাদ।

 

বাংলাদেশের পরিস্থিতি ছুঁয়ে গেল ফ্লোরিডাতেও

আমেরিকান এক তরুণ এসে মনযোগ দিয়ে পড়ছিলেন লেখাগুলো। মিনহাজ ভাই বলতেই একটা প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে ছবির জন্য পোজও দিয়ে দিলেন। ওসব নিয়ে কথার ফাঁকে আরেক আমেরিকানের সাথে টুকটাক কথা হলো ক্রিকেট নিয়েও। স্থানীয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছেন। থাকেন লডারহিলেই। আমেরিকার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ক্রিকেট চ্যাম্পিয়নশিপের (এসইসি) ম্যাচগুলো হয় ওই স্টেডিয়ামপাড়াতেই। ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহটা ওসব ম্যাচ দেখতে দেখতেই। তাঁর সাথে কথার ফাঁকে এসে যোগ দিলেন ত্রিনিদাদের আরেক তরুণ, আমার গায়ে বাংলাদেশের জার্সি দেখে জানতে চাইলেন দেশ থেকে খেলা দেখতে এসেছি কিনা। জানালাম অতদূর নয়, হাজারখানেক কিলোমিটার দূরের অ্যালাবামা থেকে এসেছি। সেটা শুনেও তাঁর বিস্ময় খুব একটা কমলো না, “ক্রিকেট এতো পছন্দ করো!” তিনি নিজেও তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের (ফ্লোরিডা আটলান্টিক ইউনিভার্সিটি) হয়ে এসইসিতে খেলেছেন একবার। তাঁদের ওই সময়কার দলটা ভারতীয়, পাকিস্তানি আর ক্যারিবীয় মিলিয়ে বেশ শক্তিশালী ছিলো বলে গর্বও করলেন। সে আসরে খেলার সুবাদেই আমাদের অবার্ন ইউনিভার্সিটিও পরিচিত তাঁর। আমেরিকায় কলেজ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের আলোচনার মধ্যেই ব্যাটিংয়ে নেমে গেলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ। 

আবু হায়দার রনির বল ডিপ মিডউইকেটে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন ফ্লেচার, সেটা হাতে নিয়েও রাখতে পারলেন না আরিফুল হক। সীমানা দড়ির সামনে বলে ক্ষুব্ধ দর্শকদের রোষানলটাও সইতে হলো ভালোরকমই। আমাদের সঙ্গী আমিনুল ভাই অবশ্য উৎসাহ দিয়ে গেলেন, “ব্যাপার না, মাথা ঠান্ডা রাখো...আবার আসবে ক্যাচ, আর মিস কোরো না।” ভাইয়ের কথা রাখতেই যেনো রোমাঞ্চকর শেষ ওভারে ডিপ মিডউইকেটে বল ভাসালেন নার্স, অনেক উঁচুতে ওঠা বলটা এবার আর মাটিতে পড়তে দিলেন না আরিফুল। ফ্লেচার-পাওয়েলরা ফিরে গিয়েছিলেন আরও আগেই। নাজমুল অপুর দুর্দান্ত শেষ ওভারে জিতে গেল বাংলাদেশ। 

আমেরিকার মাটিতে অভিষেক ম্যাচেই জয়ের আনন্দ আকাশ ভাঙলো গ্যালারিতে। ঢাউস পতাকাসহ বাংলাদেশিদের বিশাল মিছিল ঘুরলো পুরো মাঠ, সে মিছিলে নিজেও যোগ দিয়ে দেখলাম নিরাপদ সড়কের প্রত্যাশা, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার নিন্দা আর মাশরাফির জন্য হাহাকার।

আমাদের জয়োৎসবে যোগ দিলেন ক্যারিবিয় সমর্থকরাও। ‘জয় বাংলা’, ‘সাবাশ বাংলাদেশ’ বলেও পিঠ চাপড়ে, বুকে টেনে নিলেন অনেকে। অবশ্য গ্যালারি দেখে বোঝার কোনো উপায়ই ছিলো না যে এটা তাঁদের হোম সিরিজ। দুর্যোগপূর্ন আবহাওয়ার কারণে বিভিন্ন জায়গা থেকে ফ্লাইট বাতিল না হলে লাল-সবুজের দর্শক উপস্থিতি হয়তো আরেকটু বেশি হতে পারতো। 

 

৪.

তবে আবহাওয়া আটকে রাখতে পারে নি আমাদের মশিউর ভাই আর তৌহিদ ভাইকে। ফ্লাইট বাতিল হতেই ঠিক করে ফেলেছিলেন সড়কপথেই চলে আসবেন। প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্ব; প্রথম ম্যাচটা পথেই মিস করলেন, পৌঁছালেন দ্বিতীয় ম্যাচের দিন দুপুরে। ততোক্ষণে অবশ্য আমি মশিউর ভাইয়ের ভবিষ্যৎবাণীর ভক্ত বনে গেছি। টেস্টে অমন হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পরও বলেছিলেন, ওয়ানডে সিরিজ জিতবে বাংলাদেশ। ওটার পর বলেছিলেন, টি-টোয়েন্টি সিরিজেও অন্তত একটা ম্যাচ জিতবে এবং সেটা ফ্লোরিডাতেই। সেন্ট কিটসের ম্যাচ বাংলাদেশ হারবে তাই সেটা নিয়ে মন খারাপ করতেও নিষেধ করে দিয়েছিলেন, “ফ্লোরিডা থেকে তোমরা অন্তত একটা জয় দেখে ফিরবা এটা বলে দিলাম।”

সেই মশিউর ভাই একদিনের পথ পাড়ি দিয়ে যে ম্যাচ দেখতে চলে এসেছেন, সেটা কি আর হারতে পারে বাংলাদেশ! তামিম-লিটনে দারুণ শুরু। শেষে আরিফুলের ডট বল- সেজন্যই হয়তো দর্শকের বিরক্তির কারণও হলেন আরেক দফা। 

 


ওয়েস্ট ইন্ডিজ-বাংলাদেশের সমর্থকরা একফ্রেমে/ওয়ালিউল ইসলাম খান রিশাদ

 

ফিল্ডিংয়ের সময় আমরা তৌহিদ-মশিউর ভাইদের নিজস্ব এক নাচের অনুকরণে উইকেট পতনের দর্শক উদযাপনে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করছি। সে সুযোগ এরপর মিললো নিয়মিত বিরতিতেই। ফাঁকে ফাঁকে খুনসুটি চললো সীমানা দড়িতে ফিল্ডিং করতে আসা ক্রিকেটারদের সাথে। সামি ভাইয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে ‘এতো হাসো কেনো’ প্রশ্নের জবাবে কিছুটা কঠিনভাবে মুখ ফিরিয়ে নিয়েও রুবেল হাসি চেপে রাখতে পারলেন না, হাসির রোল উঠলো গ্যালারিতেও... ভক্তদের ‘ভাইঙা দেয়া’র দাবী মেনে ভাঙলেন রামদিনের স্ট্যাম্প। রাসেলের (আমার বন্ধু, ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটার নন) ডাকে সাড়া দিলেন বদলি ফিল্ডার সাব্বির, ছোট ভাই তুষারের ডাক উপেক্ষা করতে পারেন নি সৌম্য সরকার। সামি ভাইয়ের পিপাসা মেটাতে সৈকত ছুড়ে দিলেন পানির বোতল, সেটা আশেপাশের সবাই পান করলো ‘পবিত্র পানি’র মতোই ভক্তি করে। আগেরদিন পুরোটা ম্যাচ অবিরত চিৎকার করে গলা ভেঙে ফেলা নাঈম ভাই ঐ পানি পান করেই কিনা আবার আওয়াজ তুললেন, “আমার ভাই তোমার ভাই, রিয়াদ ভাই রিয়াদ ভাই”। 

ওদিকে ভয়ংকর হয়ে উঠতে থাকা আন্দ্রে রাসেলের ব্যাট কিছুক্ষণের জন্য দুশ্চিন্তার মেঘ ছড়ালো। মুস্তাফিজের বলে আরিফুলের হাতে সে মেঘ সরলেও আকাশের মেঘ ততোক্ষণে ঝমঝমিয়ে ঝড়তে শুরু করে দিয়েছে। খেলা আর না হওয়াতে সিরিজ জয়ের উদযাপনটা জমলো না সেভাবে। তবে ঐ বিরতিতেই বাংলা গানের তালে নাচে মাতলো গোটা গ্যালারি, ‘নান্টু ঘটকের কথা’ শুনে ক্যারিবীয় ভদ্রমহিলা এসে আমাদের মতিউর ভাইকে জড়িয়ে ধরে বলে গেলেন, ‘দ্যাটস মাই বয়!’

বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ছাউনির নীচে আশ্রয় নিতে গিয়ে এক মাতাল বাংলাদেশি যুবকের সাথে কিঞ্চিত ঝামেলায় জড়িয়ে গিয়েছিলাম আমরা, সে নিয়ে আমাকে উত্তেজিত হতে দেখে আগের দিনের ত্রিনিদাদিয়ান বন্ধু দৌড়ে এলেন দলবল নিয়ে। নিজেদের মান বাঁচাতেই তাঁকে ‘কিছু হয়নি’ বলে নিবৃত করলাম। আমি তাঁর বন্ধু এবং তাঁর এলাকায় বন্ধুর অপমান সে সহ্য করবে না, তা সে যেই করুক- ভিনদেশীর এমন আশ্বাসে যতোটা খুশী হলাম তারচেয়ে বেশী কষ্ট পেলাম এই বিদেশ-বিভূঁইয়ে এসেও আমাদের স্বদেশী কারও কারও গায়ে পড়ে ঝগড়া করার স্বভাবটা না বদলানোয়। সেটার আরও একচিলতে নমুনা দেখলাম পরে সাকিবের সাথে এক প্রবাসীর বিতন্ডায়। যতোটা বড় গলায় বাংলাদেশের অধিনায়ক আমেরিকা প্রবাসীদের সমর্থনের প্রশংসা করেছিলেন, ঐ ঘটনার পর সেটায় নিশ্চয়ই কিছুটা হলেও দাগ পড়েছে। 

তবু মোটা দাগে ম্যাচ দেখতে আসা বাংলাদেশিরা প্রায় সবাই দাবী জানিয়ে গেলেন- জাতীয় দল আবার আসুক এখানে, চৌষট্টি লক্ষ বর্গকিলোমিটারের দেশটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাংলাদেশিদের এমন মিলনমেলার আরও সুযোগ মিলুক অনাগত আগামীতে।

মার্কিন-মুলুকে এলেও তো আর বাংলাদেশীদের ক্রিকেট ছাড়ে না!  

 

লেখক- প্যাভিলিয়নের সাবেক সহ-সম্পাদক, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক