• ফুটবল

মরিনহোর সামনে কঠিন পরীক্ষা

যেকোনো ক্লাবের হয়ে দ্বিতীয় মৌসুমেই সবসময়ই দারুণ করেন হোসে মরিনহো। ২০১৬-১৭ মৌসুমে ৬ষ্ঠ হওয়ার পর গত মৌসুমে মরিনহোর থেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ভক্তদের প্রত্যাশার পারদটা ছিল শৃঙ্গসম। ইপিএল-এ হয়েছেন ২য়, এফএ এবং ইউরোপিয়ান সুপারকাপে হয়েছেন রানার্স-আপ। লিগে রানার্স-আপ হলেও চ্যাম্পিয়ন দলের সাথে পয়েন্টের ব্যবধান যখন ১৯, তখন আসলে ২য় হওয়াটাও একধরণের সান্ত্বনা। দ্বিতীয় মৌসুমে যেমন ভাল করেন, ৩য় মৌসুমে তেমনই খারাপ করেন ‘দ্য স্পেশাল ওয়ান’। চেলসি, ইন্টার মিলান এবং রিয়াল মাদ্রিদে বরখাস্ত হয়েছিলেন এজন্যই। তবে আজ লেস্টার সিটির বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে নতুন মৌসুম শুরু করতে যাওয়া ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এখনও ভরসা রাখছে মরিনহোর ওপর।

দলবদলে যদিও বাকি দলগুলোর তুলনায় নিষ্ক্রিয় ছিল ইউনাইটেড। একমাত্র ফ্রেড বাদে ভরসা যোগানোর মতো কাউকেই দলে ভেড়াতে পারেনি তারা। মরিনহোর ইচ্ছা ছিল একজন ডিফেন্ডার কেনার, সেটাও পূরণ হয়নি ইউনাইটেড ম্যানেজারের। আর এসবই ইউনাইটেডকে খুব বেশি এগিয়ে রাখতে দিচ্ছে না বাকিদের চেয়ে।

 

সেই ডি গিয়া, এই ডি গিয়া

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে আরও এক দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়ে বিশ্বকাপের প্লেন ধরেছিলেন গোলরক্ষক ডেভিড ডি গিয়া। নিজের প্রথম বিশ্বকাপে স্পেন এবং ডি গিয়ার থেকে উচ্চাশাই ছিল স্প্যানিশ সমর্থকদের। কিন্তু দুঃস্বপ্নের এক বিশ্বকাপ কেটেছে তার। একটা সময় তো তাকে মূল একাদশ থেকেই অপসারণের দাবি উঠেছিল। কিন্তু স্পেনে যা-ই হোক, ইউনাইটেডের ডি গেয়া অনবদ্য, দুর্দান্ত। ইউনাইটেডের ‘নাম্বার ওয়ান’ থাকছেন তিনিই। তার বদলি হিসেবে থাকছেন সার্জিও রোমেরো এবং লি গ্রান্ট।

 

রক্ষণের সমস্যা ‘জোড়ায় জোড়ায়’

ইপিএল-এর গত মৌসুমে ইউনাইটেডের রানার্স-আপ হওয়ার পেছনে রক্ষণের কৃতিত্ব ছিল অনেক। মরিনহোর দলের চেয়ে কম গোল খেয়েছিল কেবল ম্যানচেস্টার সিটি (২৬)। কিন্তু কখনোই সেন্টারব্যাকে কোন দুজন খেলবেন- তা নিয়ে নিশ্চিত ছিলেন না মরিনহো। নিশ্চিত নন এখনও। হাতে একাধিক অপশন থাকলেও এই অনিশ্চয়তার কারণে চ্যাম্পিয়নস লিগে বেশ ভুগতে হয়েছে তাদের। বারবার ভিন্ন জোড়ার সেন্টারব্যাক খেলানোয় বোঝাপড়ার অভাবটা চোখে পড়ছিল বেশ। মার্কোস রোহো, ক্রিস স্মলিং, ভিক্টর লিন্ডেলফ, এরিক বায়ি, ফিল জোন্স- মূল একাদশে কোন দুজনকে নামান মরিনহো; দেখার বিষয় এখন সেটিই।

মরিনহোর পছন্দের ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে রাইটব্যাকে খেলবেন ক্লাব অধিনায়ক আন্তোনিও ভ্যালেন্সিয়া। ওভারল্যাপ করে লুকাকুদের পাস যোগানো, বা রক্ষণের ডানপ্রান্তে আক্রমণ রুখে দেওয়া- দু’দিক দিয়েই সমান দক্ষ ইকুয়েডরের অধিনায়ক। গতি এবং শারীরিক শক্তির কারণে তার সাথে পেরে উঠাও বেশ কষ্টসাধ্য প্রতিপক্ষের জন্য। ভ্যালেন্সিয়ার বদলি হিসেবে থাকবেন মাতেও ডারমিয়ান। তবে লেফটব্যাকে কে খেলবেন- তা হয়ত নিশ্চিতভাবে জানেন না মরিনহো নিজেও। গ্রীষ্মকালীন দলবদলে দলে ভিড়িয়েছেন তরুণ ফুলব্যাক দিয়োগো দালোতকে। তবে সব ঠিক থাকলে দালোত নয়; লেফটব্যাক খেলবেন অ্যাশলি ইয়ং। গত মৌসুমে ইউনাইটেডের পর বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের হয়ে এই পজিশনে দুর্দান্ত খেলেছিলেন তিনি। বয়সটা ত্রিশের কোটার মাঝামাঝি চলে এলেও গতি, ড্রিবলিংয়ে টান পড়েনি এতটুকু। আর সেটপিসে তার দক্ষতার কথা অজানা নয় কারোই। নিজের জায়গা বদলে লেফটব্যাক পজিশনে বেশ ভালোভাবেই থিতু হয়েছেন ইয়াং। 

দালোতের সাথে ইয়াংয়ের বদলি হিসেবে থাকছেন আরেক ইংলিশ ডিফেন্ডার লুক শ। তবে মরিনহোর সাথে দ্বন্দ্বের কারণে হয়ত এই মৌসুমের অনেকটা সময় দর্শক হয়েই কাটাতে হবে তাকে। গত মৌসুমে গোল কম হজম করলেও নিজের রক্ষণ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রায়। মরিনহোকে তাই খুঁজে পেতে হবে নির্দিষ্ট একটা সমন্বয়। লিন্ডেলফ, বায়িদের কাজে লাগাতে না পারলে দোষ খানিকটা তার ওপরও বর্তাবে।

 

পগবা তুমি কার?

দুই বছর আগে বিশ্বরেকর্ড গড়ে তাকে ফিরিয়ে এনেছিল ইউনাইটেড। দু’বছর পর ইউনাইটেডের হয়ে তেমন কিছুই জেতেননি পল পগবা; তবে ফ্রান্সের হয়ে খেলেছেন ইউরো ফাইনাল, জিতে নিয়েছেন বিশ্বকাপ। কিন্তু ইউনাইটেডের জার্সিতে পারফরম্যান্সগুলো কেমন যেন মলিন। তার মত শক্তসামর্থ্য একজন, ফ্রান্সের জার্সিতে যিনি ‘আসল’ পল পগবা, আর ইউনাইটেডের জার্সিতে যাকে প্রায় খুঁজেই পাওয়া যায় না। তবে বিশ্বকাপের পর ইউনাইটেডে পগবা ভাল খেলতে না পারার দোষটা এসে চাপে মরিনহোর ঘাড়ে। ১০৫ মিলিয়ন ইউরো মূল্যের একজন মিডফিল্ডারকে রক্ষণের সামনে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেলাতেন মরিনহো। যেখানে তার আসল পজিশনই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার। আর মরিনহোর সাথে কলহের খবরটাও চাউর হয়েছে বেশ। সব মিলিয়ে ইউনাইটেডে খুব একটা সুখী নন পগবা। শৈশবের ক্লাব ছেড়ে বার্সেলোনাতে পাড়ি জমাতে ব্যাকুল তিনি- শোনা গিয়েছে এমনটাও।

তবে পগবার জন্য আশার ব্যাপার, এবার হয়ত আর রক্ষণের দিকে এতটা মনোযোগী হতে হবে না তাকে, খেলতে পারবেন পছন্দের ‘নাম্বার টেন’ রোলেই। কারণ শাখতার দোনেৎস্ক থেকে ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার ফ্রেডকে নিয়ে এসেছেন মরিনহো। ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে বায়ি-স্মলিংয়ের ঠিক সামনে খেলবেন নেমানিয়া মাতিচ। প্রতিপক্ষের আক্রমণ, প্রতি-আক্রমণ রুখে দেওয়া; সাথে পগবা-লুকাকুদের আক্রমণে সাহায্য করা- দু’দিক দিয়ে সমান পারদর্শী দুজন। তাই পগবারও লুকাকুর ঠিক পেছনে খেলা নিয়ে থাকছে না কোনো জটিলতা। দুর্গের ন্যায় শারীরিক গঠনের কারণে একটু পিছিয়েই হয়ত খেলবেন মাতিচ। আর পগবার ঠিক পেছনে থাকবেন ফ্রেড। বিকল্প হিসেবে থাকছেন মারুয়ান ফেলাইনি এবং অ্যান্ডার হেরেরা।

 

লুকাকু, সানচেজের সঙ্গী কে?

ইউনাইটেড তেমন কিছুই অর্জন করতে না পারলেও গত মৌসুমে ঠিকই ২৮ গোল করেছিলেন রোমেলু লুকাকু। ৭৫ মিলিয়নে তাকে দলে ভেড়ানোর যৌক্তিকতার প্রমাণও দিয়েছেন তিনি। তবে আর্সেনাল থেকে কেনা অ্যালেক্সিস সানচেজ মেলে ধরতে পারেননি নিজেকে একেবারেই। ইউনাইটেডের বিবর্ণ আক্রমণের পেছনে সানচেজের নিজের ছায়া হয়ে থাকাটাকেই মূল কারণ মনে করেন অনেকেই।

তবে নতুন মৌসুমে আর পুরনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন নয়, বরং নতুন দিনের প্রত্যয়েই মাঠে নামবেন সানচেজ। সাথে আছেন লুকাকু। তবে আরেক উইংয়ে কে খেলবেন- তা নিয়ে আছে যথেষ্ট শঙ্কা। অ্যান্থনি মার্শিয়ালের সাথে ব্যক্তিগত রেষারেষির কারণে তাকে হয়ত এবার খুব কমই খেলাবেন মরিনহো। ওয়েন রুনির পর ইউনাইটেডের ‘১০’ নম্বর জার্সি পাওয়া মার্কাস রাশফোর্ডকেই আরেক উইংয়ে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ডানপ্রান্তে রাশফোর্ড, বাঁ-প্রান্তে সানচেজ- এই মৌসুমে প্রতি-আক্রমণের অন্যতম ভয়ঙ্কর দল হতে পারে ইউনাইটেড। মার্শিয়াল, লুকাকু নিজেরাও কম যান না। পুরো একটা বছর একসাথে খেলায় এখন বোঝাপড়া নিয়েও তেমন সমস্যা হওয়ার কথা না।

 

চেলসি, ইন্টার মিলান, রিয়াল মাদ্রিদ- ক্লাব ক্যারিয়ারে নিজের প্রথম দুই মৌসুমে উল্লেখযোগ্য তেমন কিছুই জেতেননি মরিনহো; এমনটা হয়নি আগে। আর ৩য় মৌসুমে এসে মেজাজ হারিয়ে, ফুটবলারদের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ক্লাব ছেড়েছেন কখনও, কখনও হয়েছেন বরখাস্ত। ইউনাইটেডে নিজের ৩য় মৌসুমের আগে সেই লক্ষণগুলোই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে আবার। আক্রমণভাগে নতুন কাউকেই কিনতে পারেননি। ‘অন পেপার’ দলটা দারুণ হলেও মাঠের খেলায় বোঝাপড়ার অভাবটা প্রকট। সব মিলিয়ে এবারও হয়ত এক হতাশার চাদরে মোড়া মৌসুমই অপেক্ষা করছে ‘রেড ডেভিল’দের জন্য। হয়ত এবারই ম্যানচেস্টারের লাল অর্ধে নিজের শেষ মৌসুমে মাঠে নামছেন মরিনহো।

 

প্রেডিকশনঃ ৫ম (২০১৪ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের মত অনেকটা মরিনহোর ইউনাইটেড। এককভাবে দারুণ কিছু ফুটবলার আছে তাদের, কিন্তু দলগতভাবে একেবারেই ভাল খেলেন না তারা। আর মরিনহোর একঘেয়ে রক্ষণাত্মক ট্যাকটিক্সের কারণে হতাশ খোদ ইউনাইটেড সমর্থকেরাই। আক্রমণভাগে নতুন কাউকে না কেনাটা বেশ ভোগাবে মরিনহোকে। অন্য দলগুলোর সাথে স্কোয়াডের সামর্থ্যের বিচারে হয়ত তেমন একটা পিছিয়ে নেই তারা, তবে মাঠের খেলায় শিরোপাপ্রত্যাশী সিটির চেয়ে ঢের পিছিয়ে ইউনাইটেড)