• " />

     

    এক যে ছিল জাদুকর...

    তাঁর আগেও লেগস্পিন ছিল, তাঁর পরেও বিলুপ্তপ্রায় হয়ে টিকে আছে,কিন্তু তাঁর মত করে লেগস্পিন কেউ করেননি। কখনও বোধহয় করবেনও না। শেন কিথ ওয়ার্ন নামটা লেগস্পিনেরই তো এক সমার্থক।


    ডেলিভারির আগে ডান হাত থেকে বলটা ঘুরিয়ে বামহাতে নেয়া, ভাবলেশহীন হেঁটে যাওয়া,ডেলিভারী স্ট্রাইডের দুইধাপ আগের এক ছোট্ট দৌড়, তারপর সেই বিখ্যাত ‘অ্যাকশন’। উইকেট পেলে সেই উদযাপন, ব্যাটসম্যান পরাস্ত হলে সেই ‘লুক’, আম্পায়ার আবেদনে সাড়া না দিলে '‘আই কান্ট বিলিভ ইউ ডিড নট গিভ দ্যাট আউট'’ এর ‘লুক’। সেই কানের দুল, সেই চুলের স্টাইল, বাম হাতের রিস্টব্যান্ড অথবা ডানহাতের সিলিকন রিস্টব্যান্ড, কিংবা ‘ডিভাইডিং ট্রাউজারস’। শেন ওয়ার্ন ক্যারিজমাটিক ছিলেন,তাই না?

     

     

    শুধু দুই হাতে না, ট্র্যাকেও শেন বল ঘোরাতে পারতেন। সাইডস্পিন, ওভারস্পিন, টপস্পিন, গুগলি কিংবা ব্যাকস্পিন। লেগস্পিন যদি একটা শিল্প হয় তবে ওয়ার্ন তার সুনিপুণ কারিগর, সুদক্ষ শিল্পী। ব্যাটসম্যানের সাথে ‘মাইন্ড-গেম’ খেলতেন। সময় নিয়ে বল করতেন, নিজে ভাবতেন, ব্যাটসম্যানকেও ভাববার সুযোগ দিতেন- “এরপরের বলটা তাহলে কি করতে যাচ্ছে!”

     

    প্রথম সাত ইনিংস বল করে ৪৫১ রান দিয়ে উইকেট পেয়েছিলেন ৫টি। অস্ট্রেলিয়া তাঁর উপর বিশ্বাস রেখেছিল। অষ্টম ইনিংসে এসে ৫২ রানে নিয়েছিলেন ৭ উইকেট। এরপরেও শেন আরো অনেক কিছু করেছেন বিশ্বাসভঙ্গের মত, তবে অস্ট্রেলিয়া সে বিশ্বাস হারায়নি। জীবনে ‘অ্যাভেইলেবল’ থাকা সত্বেও বাদ পড়েছিলেন শুধু একবার। শেন তাঁর উপর অস্ট্রেলিয়ার করা সেই বিশ্বাসের প্রতিদান দিয়েছিলেন। প্রতিদান দিয়েছিলেন '৯৩-র গ্যাটিং বল, '০৫ এর স্ট্রাউস বল, তার আগে চন্দরপলকে করা বিস্ময় বল করে। ব্যাটসম্যানকে রাউন্ড দ্য লেগ, বিটুইন দ্য লেগ, বিটিং দ্য লেগে বোল্ড করে। টেস্টে প্রথম ৭০০ উইকেট নিয়ে, অস্ট্রেলিয়াকে '৯৯ এর বিশ্বকাপ জিতিয়ে।

     

    পিচের শেনকে বোঝা সহজ ছিলনা কখনোই ব্যাটসম্যানদের জন্য। আর মাঠের বাইরের শেন? আরো দুর্বোধ্য?

     

    মাঠ আর মাঠের বাইরের শেনকে তাঁরই এক সতীর্থ বর্ণনা করেছিলেন এভাবে- “প্রত্যেকবার যখন শেন বল করে তখন সে উইকেট নিতে চায়। প্রত্যেকবার যখন ব্যাট করে তখন রান করতে চায়। আর প্রত্যেকবার যখন কোন মেয়েকে দেখে তখন তার সাথে শুতে চায়।”

     

    শেন এর প্রত্যেকটিকেই হ্যাঁ বলে এসেছেন, হয়ত শেষের বিষয়টাকে হ্যাঁ বলাটাই ছিল শেন ওয়ার্নের সবচেয়ে ‘উইক পয়েন্ট’।

     

    ক্রিকেট পিচ সম্পর্কে বাইরের মানুষকে তিনি তথ্য দিয়েছিলেন কিছু অর্থের বিনিময়ে।প্রকাশ্যে ধূমপান করে এসেছিলেন আলোচনায়। ২০০৩ এর বিশ্বকাপের আগে ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়ে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন দুই বছর, পরে যে সাজা কমে হয়েছিল এক বছর। বৃটিশ ট্যাবলয়েডগুলোর জন্য এক বিশাল খবরের জোগানদাতাই তো ছিলেন তিনি।

     

    তবে এসব কিছু তার মাঠের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলেছে কমই। তিনি বারবার ফিরে এসেছেন। ক্যারিজমা দেখিয়েছেন। ফ্ল্যাট ট্র্যাকেও ওভারের পর ওভার বল করে ম্যাকগ্রাথকে উইকেট এনে দিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রতি,ক্রিকেটের প্রতি তাঁর নিবেদন বোধহয় কখনোই প্রশ্নবিদ্ধ ছিলনা। তবে সব কিছুর পরেও মাঠের বাইরের পারফরম্যান্স অস্ট্রেলিয়াকে তার সবচেয়ে কাংখিত অধিনায়ককে পেতে দেয়নি পাকাপাকিভাবে। ক্যাপ্টেন্সির কারিশমা তিনি দেখিয়েছিলেন হ্যাম্পশায়ারের হয়ে, হালের টি-২০ তে ঘরোয়া কিছু দলের হয়ে। হ্যাম্পশায়ার তাকে সম্মান জানিয়েছে তাদের মাঠের একটা স্ট্যান্ড তার নামে করে। কেপি তার ক্যাপ্টেন্সিতে খেলবেন বলে অন্য কাউন্টি ছেড়ে এসেছিলেন, হ্যাম্পশায়ারে যখন দুজন স্লিপে দাঁড়াতেন তখন পিছন থেকে দেখা যেত দুই জার্সি নম্বর-২৩,২৪। কার কোনটা সেটা বুঝতে নিশ্চয়ই কষ্ট হয় না!

     

    সেই কেপিই ওয়ার্নিকে খেলেছিলেন বেশ দাপট সহকারে। তার আগে খেলেছিলেন লারা আর টেন্ডুলকার। আর সব দলের বিপক্ষে গড় ৩০ এর নীচে হলেও, ভারতের সঙ্গে তার বোলিং গড়টা রয়ে গেছে প্রায় ৪৭। যে সময়ে ভারতের বিপক্ষে অনেক ম্যাচ খেলেছিলেন,তখন অবশ্য তার ইনজুরী ছিল, দ্রাবিড়-লক্ষন-টেন্ডুলকার ফর্মের চূড়ায় ছিলেন। সেই লক্ষণকেও পরে অবশ্য ওয়ার্নি স্টাইলেই আউট করেছিলেন একই টেস্টের দুই ইনিংসেই।

     

    তবে পৃথিবীর আরো অনেক অনেক ব্যাটসম্যান তাকে ‘পিক’ করতে পারেননি। আম্পায়ার আবেদন প্রত্যাখ্যান করলে যেমন তিনি মাঝে মাঝে তাঁদেরও বলতেন, “হোয়াট? ইউ কান্ট পিক মি আইদার, রুডি(রুডি কোয়ার্টজন)?’’


    মাঠের বাইরের শেন ওয়ার্নও সবসময় ছাপিয়ে যেতে পারেনি মাঠের ভিতরের এক পারফেক্ট স্পোর্টসম্যানকে,যিনি কিনা ব্যাটসম্যানের ভাল শট দেখে ‘শট’ বলে হাততালি দিতেন, ইনিংস শেষে সত্যিকার অর্থেই প্রশংসা করে বলতেন, “ওয়েল প্লেইড,মেট।”

     

    ক্রিকেট ছেড়েছেন আজ বেশ কয়েকবছর। আছেন নিজের ফাউন্ডেশন নিয়ে,পোকার খেলা নিয়ে,কমেন্ট্রি নিয়ে। হয়েছেন গলফের ক্যাডিও!

     

    এবং হ্যাঁ, ডিভোর্সের পরে নতুন গার্লফ্রেন্ড (কিংবা গার্লফ্রেন্ডদের!) নিয়ে।

     

    আজ লেগস্পিন এক বিলুপ্তপ্রায় শিল্প ক্রিকেটে। তবে যখনই কোন লেগস্পিনার আসবেন তখন তাকে মাপা হবে ওয়ার্নের মাপকাঠিতে। মাইক আথারটন যেমন বলেন, “প্রত্যেক লেগস্পিনারকে ওয়ার্নের সাথে তুলনা করা হবে, প্রত্যেক লেগস্পিনারের কাছে একবারের জন্য হলেও প্রত্যাশা থাকবে তার মত নিখুঁত আর তীক্ষ্ণ হবার জন্য। আর তার মত লেগস্পিনের সব অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকার। শেনের মত এমন ‘পারফেকশনের কাছাকাছি’ আর কাউকে আমরা দেখবনা।”

     

    অস্ট্রেলিয়া নিশ্চয়ই তাদের খেলার সময় ওয়ার্নিকে মিস করে।তার প্রিয় মাঠ এমসিজি তাকে মিস করে। হ্যাম্পশায়ার মিস করে।
     

    ওয়ার্নিকে আমরা মিস করি। লেগস্পিন নামের শিল্পটা তার সবচেয়ে 'বিখ্যাত' শিল্পীকে মিস করে।


    শেন কিথ ওয়ার্নকে ক্রিকেটও মিস করে। মাঠে কিংবা মাঠের বাইরে।

     

    দুই জায়গাতেই তো তিনি ‘প্রায়’ অতুলনীয় ছিলেন!

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন