• ক্রিকেট

সাকিব কতোটা ভাল অলরাউন্ডার? (পর্ব-২)


পর্ব-১ পড়ুন এখানে



পরিক্রমণ

ক্যারিয়ারের যোগফল পরিসরটা বোঝালেও সবটা আদতে প্রকাশ করতে পারে না। বিশেষ করে, সবার ম্যাচসংখ্যা আর ক্যারিয়ারের পর্যায় সমান নয় বা ছিলও না। একই মাপকাঠিতে নিয়ে এলে কেমন দেখায়, সেটা তুলে ধরতেই ম্যাচ ধরে ধরে অগ্রসর হওয়া। এতে সুবিধা হল, অনেক সত্য আর ব্যাপ্তি চোখের সামনে চলে আসে। সময় (বা ম্যাচসংখ্যা)-এর সাথে উত্থানপতন, ফিরে আসা জীবনের চিত্রটিকেই যেন তুলে ধরে, সাথে কিছু সুনির্দিষ্ট প্যাটার্নও আমরা দেখি।

 

 

এই গ্রাফগুলো মূলত ‘ম্যাচ-বাই-ম্যাচ’ এর ক্রমোন্নতি (শেষেরটি বাদে)। X-অক্ষ অথবা হাতের ডানদিক ধরে ম্যাচ সংখ্যা আর Y-অক্ষ বা ওপরের দিকে অর্জনের সংখ্যাগুলো (শেষ গ্রাফটি বাদে) এগুচ্ছে। প্রথম অংশে সাকিবের বর্তমান ম্যাচসংখ্যা ৫৪-তে সবাই কী অবস্থায় ছিল, সেটা দেখা যাক। পরে আমরা এই লাইনকে ক্যারিয়ারের প্রেক্ষিতে বাড়িয়ে নেবো। দেখার সুবিধার্থেই প্রধানত বোলার হিসেবে থাকা ওয়ার্ন, ভাস, ব্রড এই তিনজনকে বাদ দেয়া হয়েছে এই গ্রাফ থেকে।

২.১

২০০৭ সালে নিউজিল্যান্ড সিরিজের আগে জেমি সিডন্সের আকস্মিক ঘোষণা এবং সাকিবেরও পাঁচোর্ধ্ব উইকেট-প্রাপ্তি দিয়েই এ ক্রিকেটারের অলরাউন্ড যাত্রা যেন শুরু। সবুজ মোটা দাগটি সাকিবের বোলিং-ক্যারিয়ার লাইন, ম্যাচের সঙ্গে যা উইকেটসংগ্রহ দেখাচ্ছে। সপ্তম ম্যাচটিতে যে লাফটা দিয়েছেন, সেটাই ছিল নিউজিল্যান্ডের সাথে দেশের মাটির সেই সিরিজে।

 

 

বোলার বোথামের শুরু থেকেই বেশ দাপুটে ছিলেন। তবে ৫৪ ম্যাচের কাছাকাছি মুহুর্তে ইমরানও বোথামের সমানতালেই চলেছেন, আর হ্যাডলি টপকে গেছেন তাদের। হ্যাডলি ও ইমরান, দুইজনই নিয়মিত হারে উইকেট নিয়েছেন এই সময়ে। এই তিনজনই প্রায় ২৫০ এর মতো উইকেট নিয়ে ফেলেছিলেন এই ৫৪ ম্যাচে।

পোলক হ্যাডলি-ইমরানের সে লাইন ধরে এগুলেও শেষভাগে মাত্রাটা কমে দ্বিতীয় দলে চলে গেছেন। কপিল এখানে সুস্থির পারফরমার, আর কেয়ার্নস পথ হারিয়ে শেষে ঠাঁই পেয়েছেন এখানে। দুশো-উইকেটের-আশেপাশে-র এই দলে সাকিবও আছেন, ক্যারিয়ার-লাইনে দুটো ছোট্ট  প্রত্যাবর্তন নিয়ে। ভেট্টোরির ট্র্যাজেক্টরিটা খানিক ট্র্যাজিক। ৫০-ম্যাচের কাছের সময়টা দেখা যাচ্ছে উইকেট শিকারে ট্র্যাক হারানোর; দ্বিতীয় দলথেকে হঠাৎ চ্যূত হয়ে তৃতীয় দলে। অন্যদিকে ঠিক বিপরীত অবস্থা ফ্লিনটফের। দুজন অবশেষে পৌঁছান দেড়শ উইকেটের মাইলফলকে।

বোলার হিসেবে সাকিব সবাইকে ছাড়িয়ে না গেলেও বেশ ভালভাবেই উল্লেখযোগ্য বোলারদের তালিকায় আছেন।

 


পর্ব-১ পড়ুন এখানে



 
২.২

ব্যাটিংয়ের এই চিত্রটা সাকিবের জন্য আরও আশাব্যঞ্জক। সোবার্স এখানে আছেন সবার ওপরে। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেঞ্চুরিকেই তিনি বানিয়েছিলেন রেকর্ডগড়া ট্রিপলে, পরের ম্যাচগুলোতে তার রানক্ষুধা ১৭ ম্যাচের আশেপাশে রানের হিসেবে বিশাল এক লাফ দিয়েছে, এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি (সাড়ে চার হাজারের বেশি রান নিয়ে অনেকাংশেই এগিয়ে ছিলেন তিনি)।

এই অতিমানবীয় লাফ দেওয়া ক্রিকেটারের ঠিক পরের জনই সাকিব, এবং বেশ সুস্থির লাইনেই এগুচ্ছেন তিনি। ক্যালিসও নির্দিষ্ট একটি মাত্রায় এগোচ্ছিলেন, কিন্ত পঞ্চাশের কাছাকাছি তার রানের ‘লিপ’ দেখা যাচ্ছিল। ৫৪ ম্যাচে এ দুজনের রান সাড়ে তিন হাজারের ওপর।

 

 

এর পরের গ্রুপটিতে দেখা যায় বোথাম, কেয়ার্নস আর ফ্লিনটফকে। পৌনে তিন থেকে তিন হাজার রানের সীমানায় তারা পৌঁছেছিলেন প্রায় একই ছন্দ মেনে। বোথাম ব্যাটিংয়েও বাকি তিন “ফ্যাব-ফোর”-এর থেকে ভাল শুরু করেছিলেন। বাকি তিনজনকে চতুর্থ দলটিতে দেখা যায় এ সময়, দুই হাজারি রানের ক্লাবে। পোলকও কাছাকাছি থেকে শেষ করেছিলেন। ভেট্টরি মাত্র তার ব্যাটিং সত্ত্বা নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন এ সময়, হাজারের ওপরে রান নিয়ে।

এখানে উল্লেখ্য যে, ক্যালিস ও সোবার্স (ক্যারিয়ারের প্রথম ও মধ্যমভাগে)-এর মত সাকিবও মিডল, টপ-মিডল অর্ডার সামলান। এ তালিকার বাকিদের ব্যাটিং পজিশন আরো নীচের দিকে, বিষেশত পোলক আর ভেট্টরির। ৫৪ টেস্টে সাকিব আর সোবার্সেরই কেবল ডাবল সেঞ্চুরি (সোবার্সের আসলে ট্রিপলও ছিল) আছে, আর ক্যালিস ১৮০-পেরুনো একটি ইনিংস খেলে ফেলেছিলেন।

৫৪-ম্যাচের এই চিত্র দেখাচ্ছে যে সাকিব বেশ নিষ্ঠার সাথেই তার ব্যাটিং, বোলিং দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন, মোটামুটি শীর্ষভাগে থেকেই এবং একই মাত্রা বজায় রেখে।

 

২.৩

এবার দৃষ্টিসীমা আরেকটু বাড়ানো যাক। পুরো ক্যারিয়ারকে ম্যাচ ধরে ধরে দেখলে গতিপথটুকু আরো অনুমেয় হবে। বোলিংয়ের ভাগে আমরা বোলারদের এই গ্রাফে আবার ফিরিয়ে আনবো, তাদের উইকেট নেওয়ার মাত্রাটা বুঝতে।

 

 

প্রথমেই দেখা যায়, ব্যাটিংয়ে জ্যাক ক্যালিসের সুদীর্ঘপথ, ১৩ হাজারের ওপর রানের প্রশংসনীয় এক অর্জন। এতে বেশ “কোয়ালিটিটিভ ব্যাটিং লিপ”-ও আছে। একবার ৫০ ম্যাচের পর, এরপর ৭০ ম্যাচের পর, তারপর ১০০ ম্যাচের পর এবং ১২৫-এর পর বেশ একটা ভাল ধারাতে রান করে গেছেন এই ব্যাটিং জিনিয়াস। সোবার্সও তার অসাধারণ রানের ধারা ধরে রেখেছেন প্রায় পুরো ক্যারিয়ারজুড়েই।

লম্বা সময় সার্ভিস দেওয়া এর পরের ক্রিকেটারটি হচ্ছেন কপিল দেব, হাজার পাঁচেক রান নিয়ে। তবে বেশ ভাল ব্যাটিং সত্ত্বা নিয়ে বোথাম তার আগেভাগে (ত্রিশ ম্যাচ আগেই) প্রায় সমান রান করে ফেলেছেন। ফ্লিনটফ আর কেয়ার্নস ক্যারিয়ারজুড়ে একই কার্ভ ধরে এগিয়েছেন, কেয়ার্নস থেমেছেন আগেভাগে, ফ্লিনটফও অসময়ে। ইমরান এগিয়েছেন ঠিক কপিলের পথেই, তবে তার ক্যারিয়ারও সংক্ষিপ্ত হওয়ায় তিনি থেমেছেন হাজারখানেক কম রানে। তবে থামার আগে তার ব্যাটিং কার্ভ উর্ধ্বমুখিই ছিল। হ্যাডলি প্রায় কাছাকাছিই থেমেছেন, তবে ব্যাটিং কখনোই তার প্রধান কাজ ছিল না। এখানে হ্যাডলিরই ছায়া মাড়াচ্ছিলেন পোলক; শেষ অংশটুকুতে ব্যাটিং-ও ভাল হচ্ছিল, তবে লোয়ার-মিডল অর্ডারে ব্যাটিং করে থেমেছেন সেই চারের আগেই। রূপান্তর ছিল ভেট্টরির ক্ষেত্রেও, তিনটি লিপ আছে তার পারফরম্যান্সে, এবং ক্যারিয়ারের এক পর্যায়ে স্বদেশী হ্যাডলিকে ছাড়িয়েও গেছেন তিনি।

 

 

 

২.৪

বোলিংয়ের ক্যারিয়ার লাইনের ক্ষেত্রে হ্যাডলি আর কপিলের অর্জন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কপিল লম্বা সময় ধরে প্রায় একই মাত্রায় উইকেট নিয়েছেন, তবে দুটি সুক্ষ্মভাগ আছে, ৬০ ম্যাচের পরে মাত্রা কমেছে, তবে সে লাইনের কার্ভ সুস্থির একটা ধারা বজায় রেখেছে। হ্যাডলি প্রায় ৫০ ম্যাচ আগেই কপিলের সমান উইকেট নিয়ে ফেলেছেন (তার গড়া এই বোলিং রেকর্ডই ছয় বছর পর ভেঙে কপিল অবসর নিয়েছেন)। হ্যাডলির ক্ষেত্রে যেটা দেখার মতো বিষয়, ৬০ টেস্ট শেষে যেখানে কপিলের উইকেট কার্ভ মন্থর হয়েছে, হ্যাডলির তীব্রতা বরং বেড়েছে। ফাস্ট বোলারদের জন্য এটি বিরলই বটে। হ্যাডলি আবার যার রেকর্ড ভেঙে এসেছেন, সেই বোথামের বোলিং ক্যারিয়ার কার্ভ ঠিক উল্টো। সবচেয়ে সেরা শুরু করার পর ৬০ ম্যাচের পর একটা খরা গেছে তার, সেটা কাটিয়ে উঠলেও ৮০ ম্যাচের পর চোখে পড়ার মত মন্থর হয়ে পড়েছে যেটা (শেষ ৩২ ম্যাচে মাত্র ৪০ উইকেট)। ইমরানেরও ৬০ ম্যাচ পর একটি প্যাচ আছে, এবং ৭৫ ম্যাচের পরের অংশে সেটা বেশ গতিহীন। ইনজুরির কারণে ইমরানের পুরোদস্তুর ব্যাটসম্যান বনে যাওয়াটাও তার ক্যারিয়ার গ্রাফে স্পষ্ট।

পোলক ক্যারিয়ার শুরু করেছেন কপিলের প্রজেকশন লাইনে, কিন্ত কপিলের দ্বিতীয়ভাগের মত মন্থর না হয়ে একই ট্র্যাজেকটরি ধরে বোথামকে অতিক্রম করে ৪০০-এর ওপরে উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ার শেষ করেছেন। ফ্লিনটফের বোলিং কিছুটা কম চমকপ্রদ, তবে শুরুর তুলনায় মাঝে বেশ উন্নতি ছিল। ইনজুরি এক্ষেত্রে বেশ ভালই বিচ্যূত করেছে সম্ভাবনা থেকে।  পুরোদস্তুর বোলারদের গ্রাফে ফিরিয়ে আনলে শেন ওয়ার্ন যোজন দূরে অর্জন নিয়ে আছেন। তবে তার ট্র্যাজেক্টরির সাথে হ্যাডলি, বোথাম আর ইমরানের চলাটা ইঙ্গিত দেয় এই তিন অলরাউন্ডারের বোলিং সক্ষমতাকে। অন্য বোলারদের মধ্যে ভাস ভেট্টরির প্রায় সমান, কিন্তু একটি স্থির পারফরম্যান্স গ্রাফ ধরে এগিয়েছেন। তবে ব্রডের বোলার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করাটা বেশ আঁচ করা যায় এই লাইনে।

সোবার্স আর ক্যালিসের শুরুটা একই হলেও যাত্রাপথ বদলে গেছে পরে। দ্বিতীয়ভাগে সোবার্সের বোলিং অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং তা একই মাত্রা শেষতক ধরে রেখেছে। ক্যালিস অন্যদিকে ব্যাটিংয়েই বেশি মনোযোগী হয়েছেন, অনেক ম্যাচে বোলিং পর্যন্ত করেননি। ফলে খুব স্লথ গতিতে ৩০০-এর খানিক আগেই তার উইকেটসংখ্যা থেমে গেছে। 
সাকিব শুরু করেছেন ইমরান আর হ্যাডলির মাত্রাতে, এরপর ভেট্টরির সাথে কিছুদিন সমান তালে, পরে তাকে ছাড়িয়েছেন। এখন প্রায় কেয়ার্নস আর কপিলের মাঝামাঝি কপিলের ৬০-ম্যাচ-পূর্বক ট্র্যাজেক্টরিতে আছেন।

২.৫

সাকিবের প্রজেকশন লাইন থিওরেটিক্যালি এখনকার অবস্থান থেকে কোথায় যেতে পারে? 

দুটো ব্যাপার দেখার আছে- কতদূর এবং কোন কার্ভ ধরে তিনি যাচ্ছেন, সেটা। সাকিবের অন্যমাত্রার অর্জন আর তার ক্যারিয়ারে অস্বভাবিকভাবে কোন ব্যাডপ্যাচ না থাকার কারণে বাকি সময়ে পারফরম্যান্সজনিত শঙ্কা প্রায় নেই বললেই চলে। এর বাইরে বিবেচ্য ইনজুরি ও ফিটনেস এবং তার চেয়েও বড় আতঙ্ক আমাদের সংস্কৃতিতে তার পরিচর্যার প্রেক্ষিত (এশিয়া কাপে তার ইনজুরির ম্যানেজমেন্ট ও সময় অসময়ে ‘খেলতে হবেই’ চাপ স্মরণযোগ্য)। তবে আরেকটি বিষয়ও বেশ বিবেচ্য, সেটা আমরা এর পরের অংশেই দেখবো।

সেটা ব্যাটিং নাকি বোলিং কার্ভ। এটি হিসেব করলে ব্যাটিংয়ে এখন (৫৪-ম্যাচ পরিস্থিতিতে) ক্যালিসের চেয়েও এগিয়ে আছেন সাকিব, কিন্ত এর পরে ক্যালিসের মত লিপ সম্ভব হবে কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়া কঠিন। এর পেছনে দুটি কারণ- বিশেষত ব্যাটিং টেকনিক ও টেম্পারমেন্টের আলোকে ক্যালিস অনেকদূর এগিয়ে, আর সাকিবের বোলিং-লোড ক্যালিসের চেয়ে অনেকগুণ বেশি। বোথাম এবং ইমরান তার পরের অর্ডারে ব্যাটিং করেও ভাল টেকনিকের সুবিধা পেয়েছেন ব্যাটিং রেকর্ডে। তবে ব্যাটিংয়ে ওপরের অর্ডারে থাকায় তার সুযোগ বেশি আসবে অন্যদের তুলনায়, সঙ্গে তামিম এবং মুশফিকের ফর্ম ও সঙ্গ এতে ভূমিকা রাখবে, এবং সাকিবের টেম্পারমেন্ট নিয়ে খেলা কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ইনিংসও আছে। বাকিটা অবশ্যই সময়ের সাথে দেখার বিষয়।

তবে এসব গ্রাফ বলছে, বোলার হিসেবে উইকেট নেওয়ার নির্দিষ্ট মাত্রা ধরে রাখাটাই বেশি চ্যালেঞ্জের। গ্রাউন্ড কন্ডিশন, ম্যাচ কন্ডিশনের সরাসরি প্রভাব থাকে এতে। আর ইনজুরিও প্রথম হানাটা দেয় বোলিংয়েই। তবে লক্ষণীয় হচ্ছে ২০০ ও ৩০০০-এর ডাবলের তালিকাটিতে ফাস্ট, মিডিয়াম ফাস্ট বোলারেরই আধিক্য। ওয়ার্ন বাদে সোবার্স এখানে স্পিনার (যিনি মিডিয়াম পেস বোলিংও করেছেন), আর আছেন ভেট্টরি। ইতিবাচক দিক হচ্ছে, স্পিনারদের ইনজুরির ঝুঁকিটা অন্য বোলারদের তুলনায় কম কিছুটা হলেও। আরেকটি ব্যাপার সামনের পারফরম্যান্সে ভূমিকা রাখতে পারে- সাম্প্রতিককালে হোম কন্ডিশনে স্পিনিং কন্ডিশন ব্যবহারের স্ট্র্যাটেজি সাকিবের উইকেট বাড়ানোর পক্ষে যাবে। তাইজুল-মিরাজের উত্থান উইকেট নেওয়া বোলিং সঙ্গীর অভাবটা পূরণ করতে পারবে, যেটা ইতিবাচক। তবে ব্যাটিং-লোড এর নেতিবাচক প্রভাবও হিসেবে রাখার মত।

আরেকটা যে ব্যাপার গ্রাফ বা পরিসংখ্যানে আসেনি, সেটা হচ্ছে অধিনায়কত্বের ভার। বিস্তারিত আলোচনাটি কোয়ালিটিটিভ বলে প্রাসঙ্গিক ও খুব সংক্ষিপ্ত দুই-একটি পয়েন্ট উল্লেখ করা যেতে পারে। ইমরান, কপিল, ভেট্টরির অধিনায়কত্ব বেশ পজিটিভ ফ্যাক্টর ছিলো তাদের ফর্মে, সামনে থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা। অন্যদিকে বোথামের ওপর তা ছিল মারাত্মক নেতিবাচক। পোলক, সোবার্সের নিজেদের পারফরম্যান্সে খুব স্পষ্ট ছাপ না দেখা গেলেও তাদের অধিনায়কত্বের অভিজ্ঞতাটি মোটেও সুখকর ছিল না। সাকিবের অধিনায়কত্বের প্রথম স্পেল বলে, সাকিব প্রথম দলেই আছেন। তবে আমাদের বোর্ড সংস্কৃতিতে অনেক বাহ্যিক ফ্যাক্টরও আশঙ্কাজনক হয়ে দাঁড়ায় সময়ে-অসময়ে।
 
২.৬

এর বাইরে যে আরেকটি বিষয় বড় বিবেচ্য, তা হচ্ছে সময়। আরেকটু বিস্তারিত দেখলে টেস্ট আয়োজনে আইসিসির গভর্নেন্স, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট-রাজনীতি ও আর্থিক ব্যাপার, এবং আমাদের বোর্ডের ভিশন, ম্যানেজমেন্ট ও কূটনৈতিক দক্ষতা এতে চলে আসবে। সংক্ষেপে বলা যায়- ক্যারিয়ারে লক্ষপূরণের পথে সাকিব বা বাংলাদেশ কি যথেষ্ট ম্যাচ পাবে সামনে?

প্রথম পর্বে আমরা শুরুই করেছিলাম এই লাইনটি দিয়ে “পর্যাপ্ত ম্যাচ সংখ্যা বড় অর্জনের প্রথম শর্ত”। এই সংক্ষিপ্ত তালিকারই ক্যালিস, ওয়ার্ন, কিংবা আশির দশকের কপিল দেখিয়েছেন ম্যাচসংখ্যা কী প্রভাব রাখতে পারে ক্যারিয়ার লাইনে। এখন পারফরম্যান্স দিয়ে দলে জায়গা ধরে রাখা আর ফিটনেস দিয়ে লম্বা সময় টিকে থাকার শর্তের পাশাপাশি আরেকটি অবশ্যম্ভাবী কিন্ত ক্রিকেটারের নাগালের বাইরের শর্ত হচ্ছে সেই লম্বা সময়ে ম্যাচ সংখ্যা। এটা বোঝার জন্য নিচের গ্রাফের দিকে তাকানো যাক-

 


 

এই গ্রাফটিতে ডানদিকে ম্যাচ সংখ্যা আর ওপরের দিকে সময়ের হিসেবে প্রতি ম্যাচের মধ্যে সময়ের দূরত্বটি হিসেব করা হয়েছে। সাকিবের ক্যারিয়ারের ১১ বছর লাল লাইন দিয়ে টানা হয়েছে।  এই গ্রাফটিতে সুস্পষ্ট- ক্রিকেট দুনিয়ার মত এখানেও ক্রিকেটারদের দুটি দল মোটা গন্তব্যে বিভক্ত। বছর হিসেবে একদল বেশি ম্যাচ পেয়েছেন, আরেকদল পাননি। বামদিকের দলে ইমরান সময়ের হিসেবে সবচেয়ে লম্বা ক্যারিয়ারের অধিকারী, তবে শুরুর দিকে বিরতি ও মাঝে ইনজুরির দায় রয়েছে কম ম্যাচসংখায়। সোবার্সের ক্ষেত্রে ধর্তব্য যুগের পার্থক্যে কম ম্যাচের রীতিকে। তবে হ্যাডলি ও কেয়ার্নসের ক্ষেত্রে সমসাময়িকদের চাইতে অনেক কম ম্যাচ পাওয়ার কারণটা শুধু ব্যাক্তিগত নয়, দলটা আশি ও নব্বই দশকের নিউজিল্যান্ড বলেও। হ্যাডলি বনাম কপিল আর কেয়ার্নস বনাম পোলক এর তুলনাই বলে দেয় হিসেবে ক্রিকেটের ‘ছোটদল’-‘বড়দল’ বিভাজন কিভাবে ব্যক্তিক্ষেত্রেও বাধার দেয়াল তুলে দেয়। সে ধারাটা হালে আরো গেঁড়ে বসেছে বাণিজ্যিক-সিন্ডিকেশন যোগ হওয়ায়। সেই বিদ্রুপাত্মক ব্যবস্থার সাথে মজা করেই যেন এই ৩০০০ ও ২০০-এর ডাবলের সর্বশেষ দুই সদস্যই জ্বলজ্বল করছেন।

স্টুয়ার্ট ব্রড আর সাকিব আল হাসান ২০১৮-তে এই ডাবল অর্জন করলেন, মজার ব্যাপার হল তাদের অভিষেকও একই বছর (ব্রড সাকিবের ৬ মাস পরে ক্যারিয়ার শুরু করেন)। একই টাইমফ্রেমে থাকার পরও ব্রডের ম্যাচসংখ্যা (১২৪)  সাকিবের (৫৪) দ্বিগুণেরও বেশি।  সাকিবের ইনজুরির ইতিহাস তেমন লম্বা নয়, আর দলের অটোমেটিক চয়েসও। তত্ত্বের খাতিরে বিশ বছর ক্যারিয়ার দৈর্ঘ্য ধরলেও এই ট্র্যাজেক্টরিতে একশ ম্যাচও পূরণ হবে না তার। ফলে রান বা উইকেটের অনেক মাইলফলকই বেশ কঠিন চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়বে ক্যারিয়ারের সেরা সময় পার করা একজন ক্রিকেটারের জন্যও। সাকিবসহ তার দলের তামিম, মুশফিকের অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে খেলার সুযোগ হয়নি, ১৫ বছরে ভারতের মাটিতে একটি টেস্ট খেলেছেন, ইংল্যান্ডে পরে আর কবে খেলতে পারবেন তার উত্তর নেই। ক্যারিয়ারের দশ বছর পর সাকিবের অস্ট্রেলিয়ার সাথে খেলার সুযোগ হয়েছে, সব দলের সাথে ৫ উইকেট সেই এক সুযোগে নিশ্চিত করেছেন। এর সাথে স্থানীয় সংস্কৃতিতে কিছু অযাচিত বাহ্যিক হস্তক্ষেপ, চাপ, মিস-ম্যানেজমেন্ট যোগ করলে তো কথাই নেই!

সেসব বাদ দিলে, আপাতত সাকিবের পরবর্তী মাইলস্টোন হচ্ছে ৩০০ উইকেট ও ৩০০০ রানের ডাবল। সেটা ছাড়িয়ে একদিন ৪০০-৪০০০। রানের খাতাটা কোনদিন ১০,০০০-এর আশেপাশে নিতে পারলে সেটা হবে পরম পাওয়া। 


পর্ব-১ পড়ুন এখানে


 

*পরিসংখ্যান ওয়েস্ট ইন্ডিজের বাংলাদেশ সফরে চট্টগ্রাম টেস্ট পর্যন্ত