• আফ্রিকান নেশন্স কাপ
  • " />

     

    'ছোট' মাহরেজের বড় হয়ে ওঠার গল্প

    অন্য দশটা ছেলের চেয়ে শারীরিক গঠনের দিক দিয়ে একটু ‘ছোটখাটোই’ ছিলেন তিনি। শৈশবে ফুটবল খেলার সময় বহুবার শুনেছেন, ‘একে নিয়ে খুব বড় কিছু আশা করা যাবে না, কখনো পেশাদার ফুটবলারই হতে পারবে না সে’। তখন থেকেই হয়তো জেদটা চেপে বসেছিল রিয়াদ মাহরেজের মনে। জন্মস্থান ফ্রান্সের হয়ে ক্লাব ফুটবলের হাতেখড়ি হলেও মাহরেজের ফুটবল নৈপুণ্যটা সবার নজরে এসেছে ইংল্যান্ডেই। ফ্রান্সের বদলে আলজেরিয়ার হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েও শুনেছিলেন অনেক সমালোচনা। ফ্রান্সের হয়ে অনেক কিছু জেতার সুযোগ থাকলেও শুধুমাত্র নিজের বাবার স্বপ্নের কারণেই আলজেরিয়ার হয়ে খেলেছেন মাহরেজ। সব সমালোচনার জবাবটা মাঠেই দিয়েছেন তিনি। কাল অধিনায়ক হিসেবে আলজেরিয়ার হয়ে জিতেছে আফ্রিকান নেশনস কাপের শিরোপাও।

    মাহরেজের বাবা ছিলেন আলজেরিয়ান। জন্ম ফ্রান্সের ছোট্ট শহর সারসেলেসে, মাহরেজের ফুটবলের হাতেখড়িও এই শহরের ক্লাবেই। পাঁচ বছর সারসেলেসের যুবদলে খেলেছেন। ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি ও মাত্র ৭০ কেজি ওজনের মাহরেজকে ছোটবেলা থেকেই খুব বেশি গুরুত্ব কখনো দেয়নি ক্লাবটি। মাহরেজের বয়স যখন মাত্র ১৫, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার বাবা। মাহরেজের বাবা আলজেরিয়ার ফুটবলও খেলেছেন। ছোটবেলায় ছুটির মৌসুমে বাবার সাথে আলজেরিয়াতে বেড়াতে যেতেন মাহরেজরা। ওই সময় বাবা মাহরেজ ও তাঁর ভাইকে শোনাতেন নিজের ফুটবল খেলার দিনগুলোর গল্প। মাহরেজরাও আলজেরিয়ার হয়ে খেলবেন, এমন স্বপ্নই দেখতেন তাঁর বাবা। বাবা যখন ২০০৬ সালে মারা যান, তখন থেকেই ফুটবলটাকে নিজের ধ্যান-জ্ঞান বানিয়ে নিয়েছেন মাহরেজ। মায়ের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, একদিন তিনি পেশাদার ফুটবলার হয়ে দেখাবেন।

    সেই প্রতিজ্ঞা রাখতেই ২০০৯ সালে সারসেলেস ছেড়ে মাহরেজ যোগ দেন কুইমপারে। কুইমপারে থেকেছেন মাত্র এক মৌসুম। এরপর লা হার্ভেতে খেলেছেন চার বছর। ওই সময় প্রস্তাব পেয়েছিলেন পিএসজি-মার্শেই থেকেও। ফ্রেঞ্চ লিগ-২ এর অতি রক্ষণাত্মক ফুটবলে বিরক্ত হয়ে মাহরেজ চলে আসেন লেস্টার সিটিতে।  

    এই লেস্টারে এসেই পাল্টে যায় মাহরেজের ক্যারিয়ারের গতিপথ। চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম মৌসুমে লেস্টারকে প্রিমিয়ার লিগে তুলতে বড় ভূমিকা রাখেন। প্রিমিয়ার লিগে উঠে সবাইকে চমকে দিয়ে পরের মৌসুমেই শিরোপা জেতে লেস্টার। সেই মৌসুমে দুর্দান্ত পারফর্ম করা মাহরেজ প্রথম আলজেরিয়ান হিসেবে প্রিমিয়ার লিগে হ্যাটট্রিক করেন। ওই মৌসুম শেষে প্রথম আলজেরিয়ান ফুটবলার হিসেবে জেতেন প্রিমিয়ার লিগের বর্ষসেরা ফুটবলারের খেতাবও। এরপর গত মৌসুমে রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে লেস্টার ছেড়ে ম্যানচেস্টার সিটিতে আসেন মাহরেজ। সিটিতেও নিজের প্রথম মৌসুমে যেতেন লিগ শিরোপা। 

    লেস্টারে যোগ দেওয়ার সময় মাহরেজ নিয়েছিলেন আরেকটি কঠিন সিদ্ধান্ত। ফ্রান্স না আলজেরিয়া, কোন দেশের হয়ে জাতীয় দলের ক্যারিয়ার গড়বেন তিনি? ফ্রান্সের হয়ে খেললে বড় টুর্নামেন্টে শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা যে কয়েকগুণ বেড়ে যাবে, সেটা জানতেন মাহরেজ। তবে জাতীয় দলের প্রশ্নটা যখন সামনে আসে, বাবার জন্যই জন্মস্থান ফ্রান্সকে না বেছে আলজেরিয়ার হয়েই খেলার সিদ্ধান্ত নেন মাহরেজ। ২০১৪ বিশ্বকাপে মাহরেজ খেলেছেন আলজেরিয়ার হয়ে, করেছেন গোলও। ২০১৮ বিশ্বকাপে অবশ্য মূল পর্বে খেলতে পারেনি আলজেরিয়া। রাশিয়া বিশ্বকাপে ফ্রান্স শিরোপা জেতে, এই দলের অংশ হতে পারতেন মাহরেজও! ২০১৯ আফ্রিকান নেশনস কাপের মূল পর্বে খেলা নিয়ে সংশয় জেগেছিল আলজেরিয়ার। বাছাইপর্বে টোগোর বিপক্ষে গোল করেই দলকে মূল পর্বে ওঠান মাহরেজ। 

    নেশনস কাপের এবারের আসরের আগে সিদ্ধান্ত হয়, মাহরেজই নেতৃত্ব দেবেন আলজেরিয়াকে। অধিনায়ক হিসেবে সেই দায়িত্বটা দারুণভাবেই পালন করেছেন ২৮ বছর বয়সী মিডফিল্ডার মাহরেজ। এই টুর্নামেন্টে অপরাজিত থেকেই ১৯৯০ সালের পর আবার নেশনস কাপের শিরোপা উঠেছে আলজেরিয়ার ঘরে। পুরো টুর্নামেন্টে মাহরেজ করেছেন তিনটি গোল। 

    তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে সেমিতে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ৯৫ মিনিটে করা সেই ফ্রি-কিকটি। ম্যাচটি যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে গড়াচ্ছিল, তখন বক্সের একটু বাইরে থেকে মাহরেজের বা পায়ের চোখ ধাঁধানো এক ফ্রি কিকে পাওয়া গোলেই ফাইনালে ওঠে আলজেরিয়া। গতকাল রাতে ফাইনালে সেনেগালকে ১-০ গোলে হারানোয় ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন মাহরেজ। 

    যে বাবার জন্য আলজেরিয়ার হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মাহরেজ, স্বর্গ থেকে তিনি নিশ্চয়ই দেখেছেন নেশনস কাপের শিরোপা জেতার পর মাহরেজদের বাঁধভাঙ্গা উল্লাস। 

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন