• অ্যাশেজ ২০১৯
  • " />

     

    অ্যাশেজের অস্ট্রেলিয়া ফেরার গানের দিনে কোনও রূপকথা নেই ইংল্যান্ডের

    অ্যাশেজের অস্ট্রেলিয়া ফেরার গানের দিনে কোনও রূপকথা নেই ইংল্যান্ডের    

    ৪র্থ দিনশেষে
    অস্ট্রেলিয়া ১ম ইনিংস ৪৯৭/৮ ডিক্লে. (স্মিথ ২১১, লাবুশেন ৬৭, পেইন ৫৮, স্টার্ক ৫৪*, ব্রড ৩/৯৭, লিচ ২/৮৩, ওভারটন ২/৮৫) ও ২য় ইনিংস ১৮৬/৬ ডিক্লে. (স্মিথ ৮২, ওয়েড ৩৪, আর্চার ৩/৪৫, ব্রড ২/৫৪) ; ইংল্যান্ড ১ম ইনিংস ৩০১ অল-আউট (বার্নস ৮১, রুট ৬১, বাটলার ৪১, হ্যাজলউড ৪/৫৭, স্টার্ক ৩/৮০, কামিন্স ৩/৬০) ও ২য় ইনিংস ১৯৭ অল-আউট (ডেনলি ৫৩, বাটলার ৩৪, কামিন্স ৪/৪৩, লায়ন ২/৫১, হ্যাজলউড ২/৩১)
    অস্ট্রেলিয়া ১৮৫ রানে জয়ী ও সিরিজে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে


    ১৮ বছর। 

    ১৮ বছরের অপেক্ষা অস্ট্রেলিয়ার প্রায় ফুরিয়ে এসেছিল হেডিংলিতে। বেন স্টোকস ও জ্যাক লিচ সেটা হতে দেননি। ওল্ড ট্রাফোর্ডের চতুর্থ দিন শেষেও অস্ট্রেলিয়ার সে অপেক্ষা ফুরোনোর সব আয়োজন সম্পন্ন হয়ে এসেছিল প্রায়। সেই ‘প্রায়’ দীর্ঘায়িত হলো এক সেশন, দুই সেশন। শেষ সেশনের শেষ ঘন্টায় এসে অবশে ফুরোলো সে অপেক্ষা, ইংল্যান্ড থেকে অ্যাশেজ নিয়ে ঘরে ফেরা নিশ্চিত হলো অস্ট্রেলিয়ার। 

    শেষদিনে দারুণ প্রতিরোধ গড়লেও সেটা যথেষ্ট হলো না ইংল্যান্ডের। বিশ্বকাপের অলৌকিক ফাইনাল, হেডিংলির রূপকথার পর ওল্ড ট্রাফোর্ড তাদেরকে শুনিয়ে দিল-- এ গ্রীষ্মে আর কোনও রূপকথা অন্তত এদিন বাকি নেই তাদের জন্য! ক্রেইগ ওভারটনের রিভিউয়ের ফলটা আসার আগে ও পরে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের প্রতিক্রিয়া যদি শুধু শব্দে প্রকাশ করা যেতো, তাহলে বুঝানো যেতো-- ১৮ বছরের অপেক্ষা ফুরোনোর তৃপ্তিটা! ওভালে শেষ টেস্টে ফলটা যাই হোক, ক্রিকেটের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ওই স্মারক ভস্মাধারটা উঁচিয়ে ধরবেন টিম পেইন, স্টিভ ওয়াহর পর প্রথম অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক হিসেবে, ইংল্যান্ডের মাটিতে! 

    হেডিংলিতে প্রায় জেতা ম্যাচটা ইংল্যান্ডের কাছে হেরে বসেছিল অস্ট্রেলিয়া, প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল পেইনের অধিনায়কত্বের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত। সেই পেইনের এক টোটকা দারুণভাবে কাজে লেগে গেল এদিন। ১৪ ওভার ধরে জ্যাক লিচ ও ওভারটনের ৯ম উইকেট জুটি যখন ইংল্যান্ডকে দেখাচ্ছিল ‘দ্য গ্রেট এসকেপ’-এর আরেক অধ্যায়ের স্বপ্ন, পেইন আনলেন মারনাস লাবুশেনের লেগস্পিনকে। রাফে পড়ে ঘোরা বলে ব্যাট লাগাতে বাধ্য হলেন লিচ, ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে ম্যাথু ওয়েড যেন খুলে দিলেন অস্ট্রেলিয়ার স্বপ্নের দুয়ার! অবশ্য তখনও ওভারটনের সঙ্গী হিসেবে যোগ দিতে বাকি টেস্টের সবচেয়ে ‘সমৃদ্ধ’ ১১ নম্বর ব্যাটসম্যান- স্টুয়ার্ট ব্রড, টেস্টে যার রান ৩০০০-এর ওপর! 

    তবে হ্যাজলউড সেসব মানলেন না। তার লেংথ বলটা নিপ ব্যাক করে আছড়ে পড়লো ওভারটনের প্যাডে, আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনার আঙুল তোলা হয়ে দাঁড়ালো সময়ের অপেক্ষা। এরপর মরিয়া হয়ে রিভিউ নিলেন বটে এর আগে দুইবার রিভিউ পেরিয়ে আসা ওভারটন, তবে ততক্ষণে তিনিও জানেন, অ্যাশেজ হাতছাড়া হয়ে গেছে তাদের। টিভি আম্পায়ার যখন রিভিউয়ের ফল প্রসেস করছেন, ওয়েডের হাত তখন হ্যাজলউডের কাঁধে, দুজন মিলে কোমর ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে। ওপাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে ওয়ার্নার-লাবুশেন-স্টার্করা। সামনে পেইন, হাতজোড়া বদ্ধ করে অপেক্ষায়। আর সবার পেছনে মাথায় হাত দিয়ে উঁচু-নিচু করছেন স্মিথ। ওভারটনের আউটের সিদ্ধান্তের পরের প্রতিক্রিয়াটা কল্পনা করেই নিন না একবার! 


    লেগে গেল পেইনের লাবুশেন-টোটকা


    এখন পর্যন্ত ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মোটা দাগে পার্থক্যের নাম ওই স্মিথ। অবশ্য তাতে কমছে না অস্ট্রেলিয়ার দুর্দান্ত এক বোলিং আক্রমণের মর্যাদাটা। তাদের বিপক্ষেই ইংল্যান্ড টিকে ছিল শেষ ঘন্টা পর্যন্ত, ওল্ড ট্রাফোর্ডের টেস্টটাকেও তাই মুড়িয়ে দিতে হচ্ছে রোমাঞ্চের মোড়কে। 

     

     

    দিনের শুরুতে ইংল্যান্ডের প্রতিরোধের ভার ছিল জো ডেনলি ও জেসন রয়ের ব্যাটে। দুজন মিলে প্রথম ঘন্টা হতাশ করে গেলেন অস্ট্রেলিয়াকে। রয় হয়তো এখন পর্যন্ত অ্যাশেজে তার ‘সেরা’ ইনিংসটা খেললেন, তবে সেটাও হয়তো নিশ্চয়তা দিতে পারলো না তার অনিশ্চিত টেস্ট-ভবিষ্যতের। আবারও প্যাট কামিন্সের ভেতরের দিকে ঢোকা বল, আবারও ব্যাট-প্যাডের মাঝে ইয়া বড় ফাঁক রেখে স্টাম্প হারালেন রয়। অস্ট্রেলিয়া পেয়ে গেল ব্রেকথ্রু। স্টোকস নামলেন ওল্ড ট্রাফোর্ডে রাজকীয় অভ্যর্থনা পেয়ে। তবে দিনটা এ গ্রীষ্মে ইংলিশ নায়কের নয়। কামিন্সের ব্যাক অফ লেংথ বলটা ঠেকাতে শুধু শরীর যথেষ্ট মনে করলেন না তিনি। অস্ট্রেলিয়ার আবেদন তেমন জোরালো ছিল না পেইনের ক্যাচ নেওয়ার পর, স্টোকস শুরু করলেন হাঁটা। ড্রেসিংরুমের সিঁড়িয়ে ওঠার পথে আছাড় মারলেন ব্যাটটা, তার হতাশা প্রতিধ্বনিত হলো হয়তো ইংল্যান্ডের সব দর্শকের বুকেই। 

    লাঞ্চের আগে পরে মিলিয়ে জনি বেইরস্টোকে নিয়ে আরও ৯ ওভারের মতো কাটালেন ডেনলি। এবার হাজির হলেন অস্ট্রেলিয়ান ‘গোট’- ন্যাথান লায়ন। তার বাড়তি বাউন্সে গ্লাভড হলেন ডেনলি, শর্ট লেগে ধরা পড়ার আগে। ইংল্যান্ড হারিয়ে ফেললো তাদের ব্যাটিং প্লাটুনের অর্ধেক সৈনিক। বাটলারকে নিয়ে বেইরস্টো অস্ট্রেলিয়ার ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিলেন আরও প্রায় ১৪ ওভারের মতো। ড্রিংকসের পরপরই ভাঙলো বেইরস্টোরই মনযোগের বাঁধ, মিচেল স্টার্কের বলে। লেংথ বলে ফাঁদে পড়লেন বেইরস্টো, রিভিউও তাকে বাঁচাতে পারলো না। ওভারটনকে নিয়ে এরপর বাটলারকে খেলতে হলো স্বভাববিরুদ্ধ এক ইনিংস, যেখানে আক্রমণের চেয়ে টিকে থাকা বড় কথা। 
     


    অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের পার্থক্য যিনি


    ওভারটন বাঁচলেন এলবিডব্লিউর কল থেকে, ইনসাইড-এজ হয়েছে কিনা সেটা নিশ্চিত করতে না পারলেও ইমপ্যাক্ট বাইরে ছিল বলে সিদ্ধান্ত এলো টিভি আম্পায়ারের কাছ থেকে। চা-বিরতিতে ইংল্যান্ড গেল ৬ উইকেটে ১৬৬ রান নিয়ে। আসলে রানের সংখ্যাটা ভুলে যান, এদিন রান কোনও পার্থক্য গড়বে না। 

    চা-বিরতির পর চতুর্থ ওভারে বাটলার ভুলটা করলেন। ৭৫ ওভারের পুরোনো বলটা নিয়ে কারুকার্য দেখালেন হ্যাজলউড। এর আগেই লেগব্রেকের মতো করে বল ঘুরিয়েছেন, এবার করলেন ‘অফব্রেক’! অফস্টাম্পের বাইরের বলটা ছেড়ে দিলেন বাটলার, যাকে ঘিরে ধরেছিলেন ক্লোজ-ইনের ফিল্ডাররা, হয়তো আশা করছিলেন শর্ট বলের। প্রত্যাশা পূরণ হলো না তার, ভাঙলো স্টাম্প। হ্যাজলউডের পা কোনোমতে ছিল দাগের ভেতরে, এ তথ্যটা রোমাঞ্চ আরেকটু বাড়িয়ে দেবেই বলে দেওয়া!

    আর্চার করতালিতে নামলেন, তবে তার ব্যাটিং-সামর্থ্য এখনও অদেখাই রয়ে গেল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। অবশ্য লায়নের নিচু হওয়া বলে তার করার ছিলও না কিছু। হলেন এলবিডব্লিউ। অস্ট্রেলিয়া পৌঁছে গেল প্রায় সেই লক্ষ্যে। 

    উম, কিন্তু দাঁড়ান। লিচ আছেন যে। আছে তার চশমা! প্রমোশন দিয়ে ব্রডের আগে পাঠানো হলো তাকে। ১,২ করে ১৩ ওভার কাটিয়ে দিলেন লিচ ও ওভারটন। পকেট থেকে লিচের চশমা মোচার কাপড় বের হলো, হয়তো অস্ট্রেলিয়ার অস্থিরতাও বাড়লো আরেকটু। ওভারটনের বিপক্ষে নেওয়া রিভিউ ব্যর্থ হলো অস্ট্রেলিয়ার। এরপরই পেইনের সেই সিদ্ধান্ত লাবুশেনকে আনার। আর এরপর হ্যাজলউডের সেই ডেলিভারি আছড়ে পড়া ওভারটনের প্যাডে। 

    যে ডেলিভারিতে মিলিয়ে গেল ইংল্যান্ডের মাটি থেকে অ্যাশেজ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ঘরে ফেরার ১৮ বছরের অপেক্ষা।