• " />

     

    অসহায়ত্বের পূর্বাপর

    ছুটির দিনগুলি বাদে দিনের বেলা কার্জন হলের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে দেখবেন, দাঁড়িয়ে আছে অনেক দ্বিতল লাল বাস। এর কয়েকটিতে এখনও রয়ে গেছে মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল বা সাকিব আল হাসানের কাট-আউট। আল্পনার আদলে লাগানো আছে স্টিকার। একটা লোগোও চোখে পড়বে, চেনা হলে বুঝবেন, ২০১৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ উপলক্ষ্য করে লাগানো হয়েছিল এসব। রয়ে গেছে এখনও! সে বিশ্বকাপ কখনই শেষ, রেশটা যে রয়ে গেছে! ২০১১ সালের বিশ্বকাপের রেশটাও কি রয়ে গেছে এখনও? না থাকলেও হয়তো মনে আছে, কী আলোর রোশনাইয়ে ভরে উঠেছিল ঢাকা নামের শহরটা। অথবা চট্টগ্রাম! উৎসব লেগেছিল যে তখন! ক্রিকেট উৎসব।

    ***

    সেদিনের ভূমিকম্পটা কি টের পেয়েছিলেন? পাওয়ারই কথা। যাঁরা টের পেয়েছেন, কেউ হয়তো ছুটেছেন দিগ্বিদিক, কেউ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ঘরের কোণে বা কোনো অবলম্বনের নীচে নিয়েছেন ঠাঁই। একটা পর্যায়ে হয়তো মনে হয়েছে, সব শেষ হলো এই বুঝি! কেঁপে উঠেছিল যে পুরো বাংলাদেশ! তখন কেমন নিজেকে অসহায় লেগেছিল না? আপনি তখন চলেছেন পরিস্থিতির চাপে। এর মাঝেও কেউ ছিলেন, যাঁদেরকে ভূমিকম্প ছুঁয়ে যায়নি। হয়তো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, অথবা কানে হেডফোন চাপিয়ে শুনছেন উচ্চস্বরের কোনো মিউজিক! হতেই পারে।

    লাহোরে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটার আর ম্যাচ অফিশিয়ালদের ওপর যেদিন হামলা হলো, সেদিনও হয়তো এমনই অবস্থা হয়েছিল তাঁদের। একটা পর্যায়ে গিয়ে নিজেকে লেগেছিল চরম অসহায়! হয়তো বুঝে উঠতেই সময় লেগেছিল, কী হচ্ছে আসলে। হয়তো বুঝে ওঠার পরেও মনে হয়েছিল, কেন হচ্ছে! কিইবা আছে করার! শুধু বাসের আসনের আড়ালে আশ্রয় খোঁজা ছাড়া! তবুও সে বাসচালক দায়িত্ব নিয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন সেই বাসটাকে, গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। পরদিন, হাজার মাইল দূরে পত্রিকার পাতা খুলে কোনো এক ক্রিকেটপ্রেমীকেও হয়তো ছুঁয়ে গিয়েছিল এমন অসহায়ত্বের ঝাপটা! কেন? ক্রিকেট কেন? সে প্রশ্নের উত্তর মেলে না। শুধু অসহায়ত্বটা রয়ে যায়!

    ***

    নিউজিল্যান্ডের জন্য বাংলাদেশ এখন নিরাপদ। দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য নিরাপদ। পাকিস্তানও তো খেলে গেছে। ভারতও এসেছিল। যুব বিশ্বকাপে অংশ নেবে এমন ১৫টি(স্বাগতিক বাংলাদেশ সহ দল ১৬টি) দলের জন্যই নিরাপদ বাংলাদেশ। শুধু নিরাপদ নয় অস্ট্রেলিয়ার জন্য। মাসকয়েক আগে তাদের ‘সিনিয়র দল’ আসার আগে যেমন ‘অনিরাপদ’ ছিল বাংলাদেশ, ‘জুনিয়র’দের জন্যও নাকি আছে এমনই!

    কোনো এক কারণে অস্ট্রেলিয়ান সরকার ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে বাংলাদেশ সফর না করার পরামর্শ দিয়েছে। কারণটা নিরাপত্তাজনিত, এর বেশী কিছু জানার উপায় নেই। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী জেমস সাদারল্যান্ড কি জানেন? নাও জানতে পারেন। তাতে অবশ্য কিছু যায় আসে না এখন। অস্ট্রেলিয়া আসছে না। আইসিসি দ্বারস্থ হয়েছে আয়ারল্যান্ডের। আইরিশরা রাজিও হয়েছে আসতে। বাংলাদেশে ক্রিকেট খেলতে আসতে তাঁদের আপত্তি নেই, নিরাপত্তা নিয়েও সন্তুষ্ট তাঁরা। শুধু সন্তুষ্ট না, পূর্বাভিজ্ঞতা থেকে তাঁদের ধারণা, বাংলাদেশের মানুষরা চরম ক্রিকেটপ্রেমী। এখানে খেলতে পারাটা একটা অসাধারণ অভিজ্ঞতাই হবে আইরিশ যুবাদের জন্য! হ্যাঁ, আইরিশদের জন্যও এদেশ নিরাপদ!

     

    ***
     

    ২০০৩ বিশ্বকাপ। লোগোতে আয়োজক হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার নামই ছিল, তবে ম্যাচ ছিল জিম্বাবুয়ে আর কেনিয়াতেও। তবে নিরাপত্তা, সরকারের সঙ্গে ঝামেলা, এমন কারণ দেখিয়ে নিউজিল্যান্ড কেনিয়ায় খেলতে গেল না, জিম্বাবুয়েতে গেল না ইংল্যান্ড। কেনিয়া ‘ওয়াকওভারের’ সুযোগটা কাজে লাগিয়েছিল, সেবার তো সেমিফাইনালেই খেলেছিল স্টিভ টিকোলোর দল। তবে এই সুযোগের চেয়েও হয়তো নাইরোবি বা হারারের কোনো এক ক্রিকেটপ্রেমীর মনে ছিল একটা অসহায়ত্ব। হয়তো আন্তর্জাতিক তারকাদের কাছ থেকে দেখার, পারফর্ম করার একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। সুযোগটা যে মিস হয়ে গিয়েছিল! অথবা, তাঁর বা তাঁদের দেশ নিরাপদ নয়, ক্রিকেটের জন্য, এমনটি ভাবতে পারেননি। ভাবতে চাননি। কিন্তু কিইবা করার ছিল তখন? শুধু দেখে যাওয়া ছাড়া!

    জিম্বাবুয়ে থাকলেও কেনিয়া নেই এবারের যুব বিশ্বকাপে। তবে এদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা তো আছেন। সেই তাঁদেরকেই একরাশ ‘অসহায়ত্ব’ উপহার দিল ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। নিরাপত্তা শব্দটা কেমন বিঁধলো যেন আবার! সবকিছুর ওপরে ক্রিকেট কথাটা মেকি হয়ে গেল আবার!

    শুধু দর্শকরা নন, বিসিবির কর্মকর্তা থেকে শুরু করে আইসিসি- অসহায় কি সবাই নন? অসহায় কি অস্ট্রেলিয়ার সেই যুবাটাও নন, যিনি উপমহাদেশের কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সুইপ শটটা কদিন বেশী অনুশীলন করছিলেন? অথবা সেই স্পিনারটা, এ কন্ডিশনে চান্স পাওয়াটা যিনি সুনিশ্চিত ধরে নিয়েছিলেন প্রায়! অপেক্ষা করে ছিলেন শুধু পারফর্ম করার! হলো না! হয়তো আর কোনো যুব বিশ্বকাপে খেলাও হবে না তাঁর! হয়তো সিনিয়র হতে হতে হারিয়ে যাবেন। বিশ্বমঞ্চে পারফর্ম করা হবে আর তাঁর! সারাজীবন বলে বেড়ানোর মতো একটা গল্প হতে পারতো বাংলাদেশে খেলা এই যুব বিশ্বকাপ। হলো না তো!

    ***

    বিশ্বকাপের মতো আয়োজন শেষ হলেও হয়তো রেশটা রয়ে যায়। একটা ক্রিকেট ম্যাচ শেষ হলেও হয়তো চোখে লেগে থাকে কিছু শট বা ডেলিভারি। অথবা কোনো ক্যাচ! তখন আর কিছু করার নেই। করতে পারেন স্মৃতি রোমন্থন। সাজিয়ে বসতে পারেন গল্পের পসরা।

    অনেক নিরাপত্তার আশ্বাসেও নিরাপত্তার কারণ দেখিয়েই কোনো দল কোথাও ক্রিকেট খেলতে না গেলে কি করার আছে? আপনি আক্ষেপ করতে পারেন। গালি দিতে পারেন সে দলকে। আইসিসিকে। অথবা এদেশের নিরাপত্তা-ব্যবস্থাকে। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে নিজেকে কেমন অসহায় বোধ করবেন। সেই সেদিনের ভূমিকম্পের সময়ের মতো। অথবা লাহোরে সেদিন আক্রান্ত সেই বাসযাত্রীদের মতো! এখানে আবার সেই সাহসী বাসচালক নেই। যিনি পৌঁছে দেবেন বাসটা। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া সে বাসচালক হতে পারেনি। আইসিসি হতে পারেনি। ‘অস্থির’ বিশ্বটাই বোধহয় এমন বাসচালক তৈরী হতে দিচ্ছে না!

    আপনার এই অসহায়ত্ব আর অস্ট্রেলিয়ার ‘আসতে পারতো কিন্তু আসেনি এমন যুবদল’ এর কোনো ক্রিকেটারের মানসিক অবস্থাও হয়তো তাই!

    যদি তাই হয়, তবে দিনের শেষে কিন্তু অসহায় হয়ে পড়ছে ক্রিকেটও!

      

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন