• " />

     

    বিষাদ ক্যালিপসো সুর

    ১.

    ‘হুইস্পারিং ডেথ’ বোলিং ছেড়েছেন আজ কতকাল! ‘বিগ বার্ড’দের দিন ফুরিয়ে গেছে সেই কবে। চশমা পরা সেই অধিনায়ক নেই, নেই চুইংগাম চিবোনো বোলারদের সেই ত্রাস। ক্রিকেটের বরপুত্র নেই। অদ্ভূত স্ট্যান্সের সেই ব্যাটসম্যানের বয়সটাও নাকি বড্ড বেশী হয়ে গেছে! সব নেই এর ভীড়ে কি হারিয়ে গেছে ক্যারিবীয় ক্রিকেটের সেই সোনালী দিনগুলিই! ক্যালিপসো ছন্দে ছেদ পড়েছে, তানপুরায় সুরটা বাঁধবে কে! ক্রিকেটবিশ্বের প্রচন্ড প্রতাপশালী সেই শাসকের দল আজ ‘শোষিত’ই তো হয়, অহর্নিশ! প্রতিপক্ষের কাছে তো অবশ্যই। তবে সবচেয়ে বড় লড়াইটা কি নিজেদের সঙ্গে নিজেদেরই নয় তাদের?

     

    এ লড়াইটাই বা চলবে আর কতোকাল? লড়াইয়ে কি আসলেই জিতবেন জ্যাসন হোল্ডাররা?

    নাকি ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটই হয়ে পড়বে রূপকথা, সেই সোনালী দিনগুলির মতো!

     

    ২.

    অক্টোবর, ২০১৪। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভারত সফর। সফর শুরুর আগেই ত্রিমুখী বিরোধে জড়িয়ে পড়লো ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট। ক্রিকেট বোর্ড, ক্রিকেটারদের সংস্থা, ক্রিকেটাররা। ঝামেলার উৎস ওই টাকা! সিরিজ চলছে, এদিকে চলছে অবিশ্বাসের এক লড়াই। কখনও সমাধান হচ্ছে বলা হচ্ছে, কখনও হুমকি দিচ্ছে একপক্ষ আরেক পক্ষকে। ধর্মশালায় চতুর্থ ওয়ানডে যখন খেলছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, তখনোই খবর এলো, সিরিজ বাতিল করা হয়েছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ফিরে যাবে সিরিজের মাঝপথেই। বিসিসিআই ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের (ডব্লিউআইসিবি) সঙ্গে সকল দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বাতিল করলো, ক্ষতিপূরণ চাইলো ৪২ মিলিয়ন ইউএস ডলার!

     

    টাকার অঙ্কটা তো কিছুই নয়, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের আসল ক্ষতির কাছে!

     

    যে ক্ষতির মূলে আসলে ‘অবিশ্বাস’। ক্রিকেটারদের বিশ্বাস করে না বোর্ড। বোর্ডকে বিশ্বাস করেন না ক্রিকেটাররা। বোর্ডের সঙ্গে ‘অবিশ্বাসের সম্পর্ক’ ক্রিকেটারদের সংস্থার। এ সংস্থাকে আবার বিশ্বাস করেন না ক্রিকেটাররা! কোচ ফিল সিমন্সকে অবিশ্বাস করেছিল বোর্ড। সিমন্সেরও বিশ্বাস নেই খুব একটা, বোর্ডের ওপর!

     

    এখন আবার ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ’ ধারণাটার প্রতিই অবিশ্বাস অনেকের। ‘ক্যারিকোম’- ক্যারিবীয় কমিনিউটির সংস্থার প্রতিই তো আস্থা হারিয়ে ফেলছেন অনেকেই! নিজের দেশের প্রতি যে ‘উৎসর্গ’ নিয়ে খেলেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে নামলে নাকি সেটি হারিয়ে যায় প্রায়ই!

     

    ২০১৪ সালে ভারত সফর বাতিলের পর একই প্রস্তাব এসেছে দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটি থেকে, যেমনটা এসেছিল ১৯৯৭ সালে। একটা অন্তর্বর্তীকালীন বোর্ডের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে নতুন বোর্ড গঠন করতে বলা হয়েছিল তখন, যেমন বলা হয়েছে এই বাতিল সিরিজটার পরে!

     

    এর কোনোটিই তখন হয়নি, এখনও না।


    ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের সমস্যাও শুধুই বেড়েছে!  

     

    ওই ১৯৯৭ সালের সিরিজটার পর। কী হয়েছিল সে সিরিজে?

     

    ৩.

    ওয়েস্ট ইন্ডিজ তখনও ভঙ্গুর নয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে তখনও একঝাঁক তারকা। তবুও গোলমালটা বাঁধলো। অধিনায়কত্ব নিয়ে। কোর্টনি ওয়ালশ নাকি ব্রায়ান লারা? নির্বাচকরা লারাকে বানালেন অধিনায়ক। সে সিদ্ধান্ত বদলে গেল বোর্ডসভায়। ওয়ালশ হলেন অধিনায়ক। ডব্লিউআইসিবির পরবর্তী সভা প্রত্যাখ্যান করলো ত্রিনিদাদ এন্ড টোব্যাগো। তাদের 'জাতীয় হিরো'কে যে যোগ্য সম্মান দেয়নি তারা!

     

    পাকিস্তান সফরে গিয়ে হোয়াইটওয়াশ হলো ক্যারিবীয়রা। ব্রায়ান লারা করলেন ৬ ইনিংসে ১২৯ রান, ২১.৫ গড়ে। মাসতিনেক পর ইংল্যান্ড যখন ক্যারিবীয় সফরে গেল, লারা ততদিনে ওয়ালশের কাছ থেকে অধিনায়কত্ব নিয়ে নিয়েছেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতলো ৩-১ এ। তবে ভাঙ্গনের সুরটা বোধহয় রয়েই গেল, যা শুরু হয়েছিল সেই পাকিস্তান সফরের আগে! অভিযোগ ছিল, ক্রিকেটাররা পাকিস্তান সফরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য খেলেননি। খেলেননি একাট্টা হয়ে, পূর্বসূরিদের মতো।

     

    ব্রায়ান লারা চেষ্টা করে গেছেন ২০০৭ সাল পর্যন্ত। তবে বোর্ডের সঙ্গে সম্পর্কটাই তিক্ত হয়েছে শুধু। খেলোয়াড়-বোর্ডের দূরত্বটা বেড়েছে দিন দিন। যে দূরত্ব এখন আকাশসমান।  

     

    ক্লাইভ লয়েড, কার্টলি অ্যামব্রোস, ফিল সিমন্স, স্টুয়ার্ট উইলিয়ামস, কোর্টনি ওয়ালশ। পাকিস্তানের সেই ‘বিতর্কিত’ সফরে ছিলেন এঁরা সবাই। খেলোয়াড় হিসেবে বা কর্মকর্তা হিসেবে। অস্ট্রেলিয়া সফরেও ছিলেন তাঁরাই। কেউ কোচ, কেউ পরামর্শক, কেউ নির্বাচক হয়ে। কাছ থেকেই হয়তো দেখলেন, তাঁদের ওয়েস্ট ইন্ডিজের আরও পতনতলে যাত্রাটা! যে যাত্রার শুরুটা হয়েছিল হয়তো সেই সফর দিয়েই!

     

    ১৯৯৭ সালে লয়েড যখন দলের ম্যানেজার, তখন বলেছিলেন, ‘আমাদের ক্রিকেট নীচের দিকেই নেমেছে কিছুদিন ধরে। পতন ঠেকাতে অবশ্যই দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে’।

     

    আর এখন বলছেন, ‘আমাদের ক্রিকেটের কাঠামোর দিকে আরও বেশী নজর দিতে হবে। ক্রিকেটাররা কিভাবে অল্প বয়স থেকেই গড়ে উঠতে পারে, তা দেখতে হবে’।

     

    ১৮ বছর পর লয়েডের শব্দচয়ন হয়তো বদলেছে, কিন্তু সুরটা নয়!

     

    ১৮ বছর ধরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটটাও তো শুধু খারাপের দিকেই গেছে!

     

    ৪.

    আইসিসির টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ শুধু বাংলাদেশের ওপরে এখন। ওয়ানডেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের নীচে শুধু আফগানিস্তান, আয়ারল্যান্ড ও জিম্বাবুয়ে। ইংল্যান্ডের সঙ্গে সিরিজ ড্র করে একটা আশার গান শুনিয়েছিলেন হোল্ডাররা, তবে তা মিলিয়ে গেছে অস্ট্রেলিয়া সফরে। গত বছর ১০টি টেস্টে ইংল্যান্ডের সঙ্গে একটি জয়ই সম্বল। হারতে হয়েছে আটটি টেস্টই!


    অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বৃষ্টিবিঘ্নিত সিডনি টেস্ট ছাড়া দুইটিতেই হেরেছে বিশাল ব্যবধানে। শুধু বিশাল ব্যবধানে নয়, এর চেয়ে সহজভাবে ক্যারিবীয়দের হারানোর কোনো সূত্র বোধহয় অস্ট্রেলিয়ানরাই জানতেন না!

     

    হোবার্ট টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে ৩০টির বেশী টেস্ট খেলা ক্রিকেটার ছিলেন মাত্র ৫ জন। দীনেশ রামদিনকে সরিয়ে যে জ্যাসন হোল্ডারকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তাঁর বয়স মাত্র ২৪! সব মিলিয়ে টেস্ট খেলেছেন মাত্র ১৩টি!

     

    ক্রিস গেইল টি-টোয়েন্টি খেলে বেড়ান। টি-টোয়েন্টি খেলেন ডোয়াইন ব্রাভো, কাইরন পোলার্ডরা। ২০১৫ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে মাত্র ৫টি টি-টোয়েন্টিই খেলেছিলেন ব্রাভো ও পোলার্ড। গেইল টেস্ট খেলেন না। গেইলরা বোর্ডের সঙ্গে চুক্তি করেন না। টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক ড্যারেন স্যামি আবার বাদ পড়েন কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে। তাও আবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগেই! আন্দ্রে রাসেলেরও মনোযোগ টি-টোয়েন্টির দিকে। চুক্তি থেকে বাদ পড়েছেন অথবা নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন তিনিও!

     

    আর হ্যাঁ, বাদ পড়েছেন শিবনারাইন চন্দরপলও। বয়সটা যে ‘বেশী’ তাঁর! ঠিক যেমন ধারাভাষ্যের চুক্তি থেকে বাদ দেয়া হয়েছিল টনি কোজিয়ারকে। ওই বয়সের ‘অজুহাত’ তুলেই!

     

    ৫.

    ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট বোর্ড হয়তো ঢেলে সাজানো হবে। ক্রিকেটারদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব হয়তো ঘুচে যাবে বোর্ডের, ক্রিকেটারদের সংস্থার। ক্রিস গেইল না হোক, অন্য কোনো বিস্ফোরক ব্যাটসম্যানকে পাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, যিনি টেস্ট খেলবেন। ব্রাথওয়েইট, ব্রাভোদের (ড্যারেন) কেউ একজন হয়ে উঠবেন নতুন চন্দরপল। হোল্ডার হয়তো এনে দিবেন রূপকথার এক সকাল। যে সকালে থাকবে সেই ক্যারিবীয় সোনালী দিনের প্রতিচ্ছবি, সেই ক্যালিপসো সুরের আবেশ! ওয়েস্ট ইন্ডিজ পাবে আরেকজন ‘হুইস্পারিং ডেথ’। চুইংগাম চিবোতে চিবোতে বোলারদের ত্রাস হবেন কেউ! ওয়েস্ট ইন্ডিজ পাবে তাদের হারানো রাজপুত্রকে!

     

    কিন্তু যদি না হয় এমন?

     

    ওয়েস্ট ইন্ডিজ তখন থাকবে না। টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ে এখনকার তলানীতে থাকা দলটা চলে যাবে র‍্যাঙ্কিংয়ের বাইরে। হয়তো বার্বাডোজ, হয়তো ত্রিনিদাদ এন্ড টোব্যাগো তখন আলাদা নামে খেলবে ক্রিকেট। হয়তো আরও অনেক বছর পর তাঁরাও আসবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে।

     

    তবে দেশ, জাতি ভুলে শুধু ক্রিকেটের বন্ধনে গড়া একটা ‘নতুন জাতি’ তখন যে থাকবে না! শুধু ক্রিকেটের জন্য একত্ব হওয়া একটা দল যে থাকবে না।

     

    তখন কেউ যে কোনো এক পতাকা দেখে ভাববে না, সেটা এক দেশের পতাকা, যে দেশটা ক্রিকেটকে ভালবাসে, খুব বেশীই ভালবাসে! নাহলে কি আর পতাকায় স্ট্যাম্প থাকে!

     

    ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আসলেই কি হারিয়ে যাবে অকুল পাথারে!


    ক্রিকেট-সাগর কি আবার উত্তুঙ্গ হবে না, তোমাদের জোয়ারে!

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন