• " />

     

    রিভার্স সুইপের রোষানল: অ্যালেক্স ক্যারি যদি মুশফিকের বাংলাদেশের জার্সিতে খেলতেন...

    রিভার্স সুইপের রোষানল: অ্যালেক্স ক্যারি যদি মুশফিকের বাংলাদেশের জার্সিতে খেলতেন...    

    পরিবারের পাশে যখন থাকা হয়, তখন অন্তত ক্রিকেটের বাইরে থাকা যায়। ক্রিকেটময় জীবনের বাইরে থাকার আকাঙ্ক্ষা অনেক সময়ই ক্রিকেটারদের মুখে শোনা যায় এভাবে। কিন্ত অ্যালেক্স ক্যারির যে ঘরেও শান্তি উধাও হয়ে যায় মাঝেমধ্যে! ক্রিকেট তো চলেই আসে, সমালোচনার তীরও ছুটে আসে, সেটিও আবার তার বউয়ের তরফ থেকেই! 

    গলে শ্রীলংকার বিপক্ষে এক টেস্টে রিভার্স সুইপ খেলতে যান ক্যারি। সর্বনাশ, হয়ে গেলেন আউট। তার আগের টেস্টও অজিরা খেলেছিল গলে। স্পিনারদের স্বর্গ বলে পরিচিত সেই গলে ক্যারি তার ইনিংসের প্রথম যে ১২ বল খেলেছিলেন, তাতে সুইপ আর রিভার্স সুইপের বাইরে আর কোন শটই খেলেননি। ৪৫ রানের যে ইনিংস খেলেছিলেন, তাতে ২৯ রান এনেছিলেন সুইপ ও রিভার্স সুইপ খেলেই। 

    একইসাথে সাফল্য যেমন পাচ্ছিলেন, ব্যর্থতাও এসেছিলো রিভার্স সুইপে। আর আধুনিক ক্রিকেটের যুগে এসেও রিভার্স সুইপের ব্যর্থতাতেই আলো পড়ে বেশি। ক্যারি রিভার্স সুইপে আউট হওয়া নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শোনান, তার সে শটের সবচেয়ে বড় সমালোচক তার বউই! ক্যারি জানিয়েছিলেন, “আমার স্ত্রী রিভার্স সুইপের সবচেয়ে কঠোর নিন্দুক। সে বলে 'দোহাই লাগে, রিভার্স সুইপটা আবার খেলবে না'। আমি ভদ্রভাবে তাকে বুঝানোর চেষ্টা করি এই বলে যে 'তুমি ক্রিকেট খেলনি কখনো'”।

    ২০২২ সালে শ্রীলংকা সিরিজের ওই দ্বিতীয় গল টেস্টে ক্যারি যখন রিভার্স সুইপ খেলতে যান, তখন তিনি ৬০ বলে ২৮ রানে ক্রিজে সেট। সেসময়ই এমন শটে বিপদ ডেকে আনেন, বাঁহাতি স্পিনার প্রাবাথ জয়সুরিয়ার বলে ক্যাচ দিয়ে ফিরেন প্যাভিলিয়নে। ওই টেস্টের পর অস্ট্রেলিয়া ঘরের মাঠে টেস্ট খেলেছে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে। সেখানে ক্যারিকে রিভার্স সুইপে আউট হতে দেখা যায়নি। 

    কিন্ত যে-ই আবার ফিরলেন উপমহাদেশে, হাজির রিভার্স সুইপ, হাজির সেই আউটের ধরন! ২০২৩ সালের বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফিতে পুরো সিরিজে তিনবার আউট হয়েছিলেন এই রিভার্স সুইপের কবলে পড়েই। প্রথম টেস্টের দুই ইনিংসেই তো তাকে সাজঘরে ফিরতে হয়েছিল একই উপায়ে আউট হয়ে! দুবারই ডানহাতি স্পিনার রবিচন্দ্রন অশ্বিনের বলে। আরেকবার বাঁহাতি জাদেজার বলে। তিনবারের মধ্যে দুবার তো দশ বল খেলে ইনিংসে থিতু পর্যন্ত হননি, একবার আউট হয়েছেন ৬ষ্ট বলে, আরেকবার ১০ম বলে। 

    নাগপুরে প্রথম টেস্টে দু-দুবার রিভার্স সুইপে প্রাণ খোয়াবার পরে ক্যারি বলেছিলেন, ‘মাঝেমধ্যে এটি আমার সর্বনাশের কারণ হতে পারে ঠিক, তবে সেটি মাঝেমধ্যে আমাকে সফলতাও পাইয়ে দিবে।’ এরপর মজা করে বলেছিলেন, শটটা খেলা কমিয়ে দিবেন কিছুটা, তার বউ যে নারাজ হচ্ছেন বারবার! ক্যারি তার প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী ছিলেন যথেষ্ট। ভারতেই বারবার আউট হওয়া সত্ত্বেও রিভার্স সুইপ তাকে খেলতে দেখা গিয়েছিল হরহামেশাই, সফলও হয়েছিলেন বটে। ২০২৩ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশীপের ফাইনালে আবার ভারতের সামনে পড়লেন ক্যারি, কিন্ত এবার মাঠের ঠিকানা ইংল্যান্ড। সেখানে স্পিনের সরদারি নেই ততটা। প্রথম ইনিংসে ক্যারি যখন ৪২ রানে পৌঁছে গেছেন, তখনই প্রথম ভারতের একমাত্র স্পিনার জাদেজার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। 

    প্রথম বলটা ডট, দ্বিতীয় বলটা সীমানাছাড়া করলেন। দুটি বল গেল কী গেল না, তৃতীয় বলটায়ই বের করে আনলেন সেই রিভার্স সুইপ! আগের বলটায়ই ছক্কা মেরে ফেলা সত্ত্বেও, সেই রিভার্স সুইপের জন্যেই ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ফিল্ডার রাখা থাকলেও। আবারও জাদেজার শিকার, রিভার্স সুইপের জালে বন্দী ক্যারি। আসলেই তো এই উল্টো ধরনের সুইপ যাকে বলতে পারি, সেটির জালেই আটকা পড়ে আছেন ক্যারি। সবশেষ ৭ ইনিংসের ৪টিতেই আউট হয়েছেন যে শট খেলে, সেটির নাম এই রিভার্স সুইপই! 

    ওই শ্রীলংকা সফর দিয়েই শুরু। সে সফর থেকে ধরলে সবশেষ ১২ ম্যাচে তিনি যে ১৪ ইনিংসে ব্যাট করেছেন, তার মধ্যে যে ১১ বার আউট হয়েছেন, ৫ বারই আউটের কারণ রিভার্স সুইপ। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশীপের ফাইনালের মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এমন শট খেলে যে আউট হলেন, তিনি যদি বাংলাদেশের হয়ে খেলতেন, এখন কী হতো? আপনি জানেন।

    রিভার্স সুইপ আধুনিক ক্রিকেটে বড়সড় একটা অস্ত্রই। এমনিতেই বাংলাদেশি ব্যাটাররা খুব একটা পারদর্শী নন এতে, তেমন খেলতে দেখা যায় না শটটা। একজনের পছন্দের শট ছিল সেটি, মুশফিকুর রহিম। কিন্ত কয়েকবার রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে আউট হয়ে গিয়েছিলেন মুশফিক। ব্যাস। ক্যারির বেলায় এক বউ নিন্দুক ছিলেন, মুশফিকের বেলায় তো সেই 'বউ'য়ের সংখ্যা অজস্র! 

    মুশফিককে কেন রিভার্স সুইপ খেলতেই হবে? এমন প্রশ্নই ক্রিকেট আকাশে শুধু ঘুরে বেড়াচ্ছিলো। মুশফিকের তা খেলায় আপত্তি ছিল না। ক্যারির মতোই একই সুরে মিডিয়ায় জানিয়েছিলেন একবার, '‘নিশ্চিতভাবে আমি মনে করি এটা আমার খুব পছন্দের শট, একই সঙ্গে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ শটও। তবুও আমি ভবিষ্যতে এই শট খেলা থেকে বিরত থাকব না।’

    সবশেষ যতদূর মনে পড়ে, রিভার্স সুইপে আউট হয়েছিলেন ২০২২ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে এক টেস্টে। দর্শক, বিশ্লেষক, সাংবাদিক মহলের একটা বড় অংশ- সমালোচনার আগুনে তখন তাকে পড়তে হয়েছিল সব পক্ষ থেকেই। মুশফিকের গায়ে কী সেই আগুনের তাপ লেগেছিল? হয়তো। এরপর থেকে আর খুব বেশি রিভার্স সুইপ খেলতে দেখা যায়নি তাকে, চোখের দেখা আর স্মৃতিতে ভরসা রেখে বলতে পারি তা। 

    মুশফিকের বেলায় অবশ্য তার ঘরে শান্তি আছে, সমালোচকদের দিকে তীর ছুড়ে দিতেই বরং আছেন তার স্ত্রী। ক্যারির ক্ষেত্রে উল্টো, তবে সমালোচনার হয়তো তার মস্তিস্কে প্রবেশাধিকারই নেই৷ কিন্ত, শেষ পাঁচ টেস্টে চারবার রিভার্স সুইপ খেলে আউট হয়েছেন যেমন ক্যারি, সেভাবে যদি মুশফিক আউট হতেন! কিংবা ক্যারি যদি বাংলাদেশের জার্সি গায়ে খেলতেন। কী হতো তখন, আপনি জানেন। ক্যারিও হয়তো জানেন। জানলে হয়তো ভাবতেই পারেন, ভাগ্যিস, অ্যালেক্স ক্যারি বাংলাদেশের হয়ে খেলে না!