• অন্যান্য
  • " />

     

    শততম টেস্টে বেইরস্টো : লড়াই ছিল বিভীষিকাময় শৈশব আর ক্যান্সারের সাথেও

    শততম টেস্টে বেইরস্টো : লড়াই ছিল বিভীষিকাময় শৈশব আর ক্যান্সারের সাথেও    

    দারুণ এক মুহুর্তের সাক্ষী হতে যাচ্ছে টেস্ট ক্রিকেট। এক রাতের ব্যবধানে বিশ্বের আলাদা দুটো জায়গায় নিজেদের শততম টেস্ট খেলতে নামবেন চারজন ক্রিকেটার। ধর্মশালায় ভারতের রবিচন্দ্রন অশ্বিন ও ইংল্যান্ডের জনি বেইরস্টো। ক্রাইস্টচার্চে নিউজিল্যান্ডের কেইন উইলিয়ামসন ও টিম সাউদি। এই চার ক্রিকেটার আছেন শততম টেস্ট খেলার দোরগোড়ায়।

    এদের মধ্যে জনি বেইরস্টোর ক্রিকেটেই হয়তো আসার কথা ছিল না। তিনি ভালোবাসতেন ফুটবল। স্বপ্ন দেখতেন লিডসের স্কটিশ কিংবদন্তি বিলি ব্রেমনারের মতো মাঝমাঠে দাপিয়ে বেড়াবেন। কিন্তু জীবন তাকে নিয়ে এলো ১০০ টেস্ট খেলার দোরগোড়ায়। যদিও জীবনটা তার রুপকথার মতো ছিল না। শৈশবের বিভীষিকা পেছনে ফেলে জীবনের এই প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন বেইরস্টো। গত বিশ্বকাপে ধর্মশালায় বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলেছিলেন নিজের শততম ওয়ানডে ম্যাচ। মাস পাঁচেকের ব্যবধানে সেই মাঠেই খেলতে নামছেন শততম টেস্টটা। 

    বেইরস্টো শৈশবেই হারিয়েছেন তার ক্রিকেটার বাবাকে। এর আগে তার মা জ্যানেটের ধরা পড়ে ক্যান্সার। ১৯৯৮ সালের  এক দুপুরে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে জনি দেখতে পান তার বাবা ডেভিড বেইরস্টোর ঝুলন্ত মৃতদেহ। মানসিক অবসাদ, অর্থাভাবে আত্মহত্যা করে বসেন সাবেক ইংলিশ ক্রিকেটার ডেভিড। ইংল্যান্ডের হয়ে ডেভিড চারটা টেস্ট, ২১টা ওয়ানডে খেললেও ২০ বছর খেলেছেন ইয়র্কশায়ার কাউন্টির হয়ে। ইয়র্কশায়ারের হয়ে লিস্ট ‘এ’, ও ফার্স্ট ক্লাস মিলিয়ে প্রায় ৯০০ ম্যাচ খেলে ১৫০০-এর বেশি ডিসমিসাল।

    বাবার মতোই উইকেটকিপার-ব্যাটার রোলটাকে বেছে নিয়েছেন জনি। ক্রিকেটার হয়ে ওঠার পেছনে মূল অবদান তার নানার। ডেভিডের মৃত্যুর পর যিনি বেইরস্টো পরিবারের ভরনপোষণ সহ নিজের মেয়ের ক্যান্সারের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন।  প্রয়াত নানার প্রতি সেই কৃতজ্ঞতা এখনো স্বীকার করেন জনি। যার কারনে ক্রিকেটে আসা, পরিবারের সেই দুঃসময়ে তাদের পাশে দাঁড়ান মানুষের কথা এখনো ভুলেননি তিনি। 

    ক্রিকেটে আসার গল্পটাও তখন শুরু তার। যদিও এর আগে লিডস ইউনাইটেডের ইয়ুথ ফুটবলে খেলেছেন। তখন বিখ্যাত ২০০৫ অ্যাশেজের হাওয়া বইছে ইংল্যান্ডজুড়ে। পিটারসেন, ফ্লিনটফ, ভনদের বীরত্ব দেখে জনিও পেলেন অনুপ্রেরণা। ইয়র্কশায়ারের দ্বিতীয় একাদশে পারফর্ম করে ২০০৯ সালে সুযোগ পান প্রথম একাদশে। বাবার মতোই উইকেটকিপিংয়ের সাথে ব্যাটিং করেছেন। সেখানে ঘরোয়া ক্রিকেটে স্বপ্নের মৌসুম কেটেছে ২০১০ সালে। সেই বছর ইয়র্কশায়ারের একমাত্র ব্যাটার হিসেবে ১০০০ রান করেছিলেন জনি। সেই পারফরম্যান্স দিয়েই ২০১১ সালে প্রথম ডাক পান জাতীয় দলে। 

    থ্রি লায়ন্সদের হয়ে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে অভিষেক হয়েছে ২০১১ সালে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে। তবে টেস্ট ক্যাপের জন্য এরপর অপেক্ষা করতে হয়েছে আরও আট মাস। সেই লর্ডস টেস্ট দিয়ে শুরু জনির। শততম টেস্টের চক্রটা এসে মিলে গেল ভারতের ধর্মশালায়। প্রায় এক যুগের এই যাত্রায় পা বাড়ানোর আগে তার মা জ্যানেটই ছিলেন ছায়াসঙ্গী।

    সেই ছোটবেলায় ক্রিকেট ব্যাট তুলে নেয়ার আগে লিডসের মাঠে মাকে নিয়ে যেতেন ফুটবল প্র্যাকটিসের জন্য। বাবাহীন সংসার চালানোর জন্য একাধারে তিনটা চাকরিও করেছেন জনির মা।  এক সাক্ষাৎকারে সোজাসাপ্টাই বলেছেন, জনির কাছে দুইবার ক্যান্সারজয়ী মা জ্যানেটই শক্তির অপর নাম। মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছেন এগিয়ে যাওয়ার শক্তি।

    বাবাকেও মিস করেন জনি। তার বাবা ডেভিড ছিলেন ইংল্যান্ডের ৪৮১ নম্বর টেস্ট ক্রিকেটার। আর জনি নিজে পরেছেন ইংলিশদের ৬৫২ নম্বর টেস্ট ক্যাপটা। একই দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন বাবা-ছেলে দুজনই। সেই সূত্রে আরেকটু বেশিই মনে পড়ে। অবশ্য ক্রিকেটার বাবার ছেলে হওয়ার জন্য তুলনাও সইতে হয়েছে তাকে। ব্যাটিং-কিপিংয়ের  সাথে খেলার ধরন, চুলের রঙ, এমনকি আচার- আচরণের জন্য তুলনা হয়েছে ডেভিডের সাথে তার। 

    তবে জনি জানতেন বাবার মতো হওয়া সম্ভব না। তাই নিজের মতোই হয়েছেন। ডেভিডের জন্ম ১৯৫১ সালে। নিজের প্রয়াত পিতার সম্মানে তাই নিজের জার্সি নম্বর হিসেবে ৫১-কে বেছে নিয়েছেন জনি। একেকটা সেঞ্চুরির পর আকাশপানে চোখ বুজে উদযাপন করেন। হয়তো বাবাকেই স্মরণ করেন তখন। জার্সির পেছনে ৫১ নম্বর নিয়েই শততম টেস্টটা খেলতে নামবেন এই উইকেটকিপার ব্যাটার। নিঃসন্দেহে আবেগের এক রোলার কস্টার রাইডে ভেসে ধর্মশালায় পাঁচটা দিন কাটবে বেইরস্টো পরিবারের।