• ইংল্যান্ড-বাংলাদেশ সিরিজ
  • " />

     

    ডিআরএস তুমি কার?

    মেহেদী হাসান মিরাজ টেস্টের প্রথম উইকেটটা পেয়েছেন আগেই। আরেক অভিষিক্ত বেন ডাকেটকে বোল্ড করেছেন অসাধারণ এক ডেলিভারিতে। গ্যারি ব্যালান্স এসেছেন তখন। মিরাজের ভেতরের দিকে ঢোকা বল, দ্রুতগতির। বোলার, উইকেটকিপার, স্লিপ ফিল্ডারের আবেদন ক্রিস গ্যাফানি নাকচ করে দিলেন। মুশফিকুর রহিম ডিআরএসের দুই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আছেন একই সাথে, অধিনায়ক ও উইকেটকিপার। তিনি রিভিউ চেয়ে বসলেন সাথে সাথেই। কাভার বা মিড-অফের কোনো ফিল্ডারকে এরপর বলছিলেন, তাঁর আত্মবিশ্বাসের কথা। বল ব্যাটের আগে প্যাডে লেগেছে। স্লো মোশন রিপ্লে, আল্ট্রাএজ সঠিক প্রমাণিত করলো মুশফিককেই। ক্রিস গ্যাফানি সিদ্ধান্ত বদলে নিলেন। গ্যারি ব্যালান্স আউট, মিরাজের দ্বিতীয় উইকেট।

    গ্যাফানির ছিল ১০ম টেস্ট। মুশফিকের ৪৯তম। গ্যাফানির সঙ্গী কুমার ধর্মসেনার ৪০তম। একটু পরই দৃশ্যপটে ধর্মসেনা। তিনি আউট দেন, মঈন আলি রিভিউ নেন। ধর্মসেনাকে ‘ভুল’ প্রমাণিত করে প্রযুক্তি। মঈন বেঁচে যান। সেই যে রিভিউ নিয়ে আউট-নট আউটের খেলা শুরু হলো, চট্টগ্রাম টেস্টের প্রথমদিন শেষ পর্যন্ত দেখলো ৭টি রিভিউ, ইনিংসে রেকর্ডসংখ্যক ১০টা। টেস্টে মোট রিভিউ ২৬টা! চট্টগ্রামে যখন রিভিউ-ঘনঘটার টেস্ট চলে, তখনোই খবর, ডিআরএস ব্যবহার করতে রাজি হয়েছে ভারত। এতোদিন সব দেশ রিভিউ পদ্ধতিতে ‘সানন্দে’ রাজি থাকলেও ছিল না শুধু ভারতই। ‘শুধু’ ভারত, কিন্তু ক্রিকেটে ভারতের ‘প্রভাব’ বিবেচনা করলে ব্যাপারটা এমন, ‘শুধু’ অস্ত্র ব্যবসাটা বন্ধ করলেই তো বিশ্বে শান্তি নেমে আসে!

     

    ****

     

    এলবিডাব্লিউয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বা একই সাথে মজার (ক্রিকেট নতুন বুঝতে শুরু করা মানুষের জন্য আবার সবচেয়ে কঠিন) দিক কোনটা? এটা এমন একটা আউট, যার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্তটা দেয়া হয়, সেটা কখনো ঘটেইনি! ঘটবেও না! বল আর স্ট্যাম্পের মাঝে যদি প্যাড (কিংবা ব্যাটসম্যানের স্কোরিংয়ে কাজে আসে এমন অংশ ছাড়া শরীরের বাকি অংশ, ড্যারিল হার্পার তো একবার শচীনের শরীরের ওপরের অংশে লাগার পরও আউট দিয়েছিলেন) না থাকতো, তবে বলটা স্ট্যাম্পে আঘাত হানতো, এলবিডাব্লিউয়ের মূল ভিত্তি এটাই। ‘আঘাত হানতো’ ব্যাপারটা নির্ধারণ করবেন কে? আম্পায়ার। বল কোথায় পড়লো, কোথায় প্যাডে আঘাত হানলো, আগে ব্যাটে লাগলো কিনা, সবকিছুর পর গিয়ে ঠেকে সেই ‘অনুমান’ বা ‘রায়’ এই। সেই গুরুত্বপূর্ণ ‘রায়’টার জন্য আম্পায়ারের ‘বিশেষজ্ঞ মতের’ উপরই নির্ভর করতে হয়। অথবা হতো একসময়।

     

    সেই গুরুত্বপূর্ণ ‘রায়’টার জন্য আম্পায়ারের ‘বিশেষজ্ঞ মতের’ উপরই নির্ভর করতে হয়। অথবা হতো একসময়।

     

    হতো বলতে হচ্ছে, ডিআরএস বা ডিসিশন রিভিউ সিস্টেমের কারণে। ডিআরএসের উৎপত্তি মূলত আম্পায়ারের ভুল, ‘অবধারিত’ ভুলগুলোকে সংশোধন করা। আম্পায়ার ভুল করবেন, এটা ক্রিকেটে খুব, খুব স্বাভাবিক ঘটনা। ঘুরেফিরে সেই পুরোনো কথায় ফিরে যেতে হয়, তাঁরাও তো মানুষ! শীর্ষ পর্যায়ের আম্পায়ারদের এই ভুল করার প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই কম, ডিআরএসের আগে প্রত্যেক ম্যাচে সঠিক সিদ্ধান্তের হার ছিল ৯০-৯২ শতাংশ। ডিআরএসের পর তা বেড়ে গেছে প্রায় ৫ শতাংশ।

    আম্পায়ার একটা বড় ভুল করে বসলেন, ভুল তো ভুলই। কিন্তু খেলোয়াড়রা মানতে পারলেন না। সেই ভুলটা সংশোধনের জন্য তাঁরা চ্যালেঞ্জ করবেন। ডি আরএসের মূল ভিত্তি এটাই। কিন্তু ক্রিকেটাররা কি এভাবেই রিভিউ করেন? মুশফিকুর রহিমের প্রথম রিভিউটার মতো? না। তথ্য বলে, প্রায় ৭৫ শতাংশ সময়ই ভুলকে চ্যালেঞ্জ করা ক্রিকেটাররাই ভুল প্রমাণিত হন। আইসিসির তথ্যমতে, ২০১৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৬ সালের মার্চ, আন্তর্জাতিক ম্যাচে প্রতি ছয়টা আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের(আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত হলো সেটাই, খেলোয়াড়দের আবেদনের প্রেক্ষিতে আম্পায়ার যে সিদ্ধান্ত দেন) একটি রিভিউ করা হয়েছে। সফল হয়েছে প্রত্যেক চারটির মাঝে একটি। এলবিডাব্লিউয়ের সিদ্ধান্ত বেশী রিভিউ করা হয়, চারটার মধ্যে একটা। রিভিউ ব্যর্থ হয় পাঁচটির মধ্যে চারটিই।

     

    ****

     

    কিন্তু রিভিউ আসলে কিভাবে ব্যবহার করছে দলগুলো? হয়তো তিনি দলের সেরা ব্যাটসম্যান। রিভিউ করার ‘অধিকার’টা তাঁর বেশী। খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়। উইকেট দরকার। হোক রিভিউ। হোক ব্যর্থ, সুযোগ নিতে দোষ কি! কোনো কোনো ব্যাটসম্যান আবার সঙ্গীর সাথে আলোচনা করারও প্রয়োজন বোধ করেন না। ডেভিড ওয়ার্নার একবার রিভিউ নিলেন, রিপ্লে দেখালো, বিশাল ‘এজ’। মাইকেল ক্লার্ক তাঁকে ‘নিষেধ’ করেছিলেন, শোনেননি। পরে ক্লার্ক অবশ্য বলেছিলেন, ওয়ার্নারের সিদ্ধান্তে তাঁর সমর্থন আছে। আবার ছিলেন গ্রায়েম সোয়ান। তাঁর যেন মনে হতো প্যাডে লাগলেই ব্যাটসম্যান ‘প্লাম্ব’! পরিসংখ্যান অবশ্য সোয়ানের এলবিডাব্লিউপ্রীতিকেই সমর্থন করে। মোট উইকেটের ২৫ শতাংশের ওপরে ব্যাটসম্যানকে এভাবেই আউট করেছিলেন তিনি। স্টিভেন ফিন আবার প্রায় সময়ই অনিশ্চিত থাকেন!

    এতোকিছু ভীড়ে আবার রিভিউয়ের আসল উদ্দেশ্যটাই ‘ব্যর্থ’ হয়।

    টেস্টে ‘ব্যর্থ’ রিভিউয়ের সুযোগ দুইটি। পরে নিয়ম হলো, ৮০ ওভার পরে রিভিউ ‘নবায়ন’ হবে। তবে ১৬০ ওভারের পর থেকে আর হবে না। ওয়ানডেতে এখন একটাই সুযোগ। কিন্তু রিভিউ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে কোনো দলকে বা কোনো ম্যাচকে ভুগতে হয়েছে বেশ কয়েকবার।

    ২০১৩ সালের অ্যাশেজে স্টুয়ার্ট ব্রডের ‘আউটসাইড-এজ’টা যেমন। ব্রডের ব্যাটে লাগলো, উইকেটকিপার ব্র্যাড হ্যাডিনের গ্লাভসে লেগে স্লিপে গেল ক্যাচ, কিন্তু আম্পায়ার আলীম দার থাকলেন নির্বিকার! ভুল, সাংঘাতিক ভুল। মূলত এ ধরণের ভুলগুলো থেকে রেহাই পেতেই ডিআরএসের প্রবর্তন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার যে ততক্ষণে রিভিউ শেষ! সবাই দেখলেন, হয়তো দারও নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। কিন্তু করার নেই কিছুই!

    সে টেস্টের শেষটাও হলো আবার নাটকীয়। ব্র্যাড হ্যাডিনের ব্যাট হালকা ছুঁয়ে গেল বল, দার এবার ইংলিশদের আবেদন নাকচ করে দিলেন। শেষ মুহুর্তে রিভিউ নিলেন অ্যালেস্টার কুক, আউট হ্যাডিন। অস্ট্রেলিয়ার রিভিউ শেষ হয়ে গিয়েছিল, ব্রডের ওই ঘটনার মতো আরেকটা কিছু হোক, সেটা চাননি বলেই হয়তো আউট দিলেন না দার। ইংল্যান্ড রিভিউ নিক, তাহলেই তো হলো! কিন্তু যদি ইংল্যান্ড রিভিউটা না নিতো? যদি শেষ হয়ে যেতো ইংল্যান্ডের রিভিউ!


    প্রযুক্তি ভুল করেছে, আবার প্রযুক্তির ব্যবহারেও ভুল হয়েছে আম্পায়ারদের। ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাথান লায়ন তো প্রায় উঠেও গিয়েছিলেন নিজেকে আউট মনে করে। হট-স্পটে দাগ দেখা যাচ্ছিল, বলের গতিপথও পরিবর্তিত হয়েছিল। কিন্তু টিভি আম্পায়ার নাইজেল লং পর্যাপ্ত প্রমাণ পেলেন না, মাঠের আম্পায়ার এস রভির সিদ্ধান্তকে বদলানোর!


    ****

     

    যে রিভিউয়ের জন্য এতো হাহাকার, সেই রিভিউ পদ্ধতিই আবার ভুল করে বসে। মানে, ভুল প্রয়োগ হয়ে যায়!

    বিতর্ক ওঠে তখন। ২০১৪ সালে পাকিস্তানী ব্যাটসম্যান শান মাসুদের একটা আউট নিয়ে তো হক-আই ভুল মেনেও নিয়েছিল। ছয়টা ক্যামেরার বদলে চারটা ক্যামেরা ব্যবহার করার কারণেই বলের অনুমিত গতিপথটা ভুল দেখানো হয়েছিল বলে জানিয়েছিল হক-আই। তবে শচীন টেন্ডুলকারের রিভিউটা নিয়ে অবশ্য আত্মসমর্থন করেছিল হক-আই। ২০১১ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে সাঈদ আজমলের বলে শচীনকে এলবিডব্লিউ দিয়েছিলেন ইয়ান গোউল্ড, হক-আই দেখিয়েছিল বল মিস করে যাচ্ছে লেগস্ট্যাম্প! অবাক হয়ে গিয়েছিলেন আম্পায়ার নিজেও, তাঁর মাথা নাড়ানোর ছবিটা চাইলেই ইউটিউবে গিয়ে দেখতে পারেন

    প্রযুক্তি ভুল করেছে, আবার প্রযুক্তির ব্যবহারেও ভুল হয়েছে আম্পায়ারদের। ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাথান লায়ন তো প্রায় উঠেও গিয়েছিলেন নিজেকে আউট মনে করে। হট-স্পটে দাগ দেখা যাচ্ছিল, বলের গতিপথও পরিবর্তিত হয়েছিল। কিন্তু টিভি আম্পায়ার নাইজেল লং পর্যাপ্ত প্রমাণ পেলেন না, মাঠের আম্পায়ার এস রভির সিদ্ধান্তকে বদলানোর! পাঁচ মিনিট ধরে যতোরকমের প্রযুক্তিগত সহায়তা আছে তা ব্যবহার করেছিলেন লং, শেষ পর্যন্ত গালিতে ‘ক্যাচ’ হওয়া লায়ন এলবিডব্লিউ হয়েছেন কিনা, দেখেছিলেন সেটাও। কিন্তু লায়নকে ‘আউট’ দিতে পারেননি!

     

    ****

     

    ২০১৩ অ্যাশেজ। তৃতীয় টেস্ট। উসমান খাওয়াজাকে কট-বিহাইন্ড দিলেন আম্পায়ার টনি হিল। খাওয়াজা রিভিউ নিলেন, একটু দেরীতে। হটস্পটে কিছু নেই। ব্যাট বলের মাঝে পরিস্কার আলো। শব্দ নেই। প্যাডে ব্যাট লাগার শব্দ আছে অবশ্য কিন্তু টিভি আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনা হিলের সিদ্ধান্তকে বদলালেন না! খাওয়াজা আউট। প্রযুক্তি থাকলো, সঠিক সিদ্ধান্তটা আসলো না!

    সেই একই টেস্ট। স্টিভেন স্মিথ পেছনে এসে খেললেন গ্রায়েম সোয়ানকে। অফ-স্ট্যাম্পের বাইরে পিচ করা বল টার্ন করে ঢুকলো ভেতরে, লাগলো স্মিথের হাঁটুর ওপরে। আম্পায়ার সেই হিলই। ইংল্যান্ডের আবেদন নাকচ করে দিলেন। বড় টার্ন, হাঁটুর ওপরে লেগেছে, আম্পায়ারদের খুব সাধারণ ‘জাজমেন্ট’, নট-আউট। ইংল্যান্ড রিভিউ নিলো, হিলই সঠিক প্রমাণিত হলেন। মিলিমিটার ব্যবধানে হলো ‘আম্পায়ারস কল’। বেঁচে গেলেন স্মিথ। ডিআরএসের নতুন নিয়মে অবশ্য আউট হতেন স্মিথ। 

    তবে যেটাই হোক, হিলের ওই সিদ্ধান্তটাকে কি আপনি  ‘ভুল’ বলবেন? নিশ্চয়ই না। এরকম অর্ধেক-অর্ধেক সম্ভাবনাতে তো আম্পায়ারই ঠিক করবেন সব! ডিআরএস এরকম সূক্ষ্ণ সিদ্ধান্তগুলোকেও বদলাতে চায় না! বদলাতে চায় খাওয়াজার ওই আউটটা, স্মিথের নট-আউট নয়!

     

    সিদ্ধান্তটা বদলাতে হবে, রড! 
     

    ****

     

    ভারত এতোসব ঝামেলায় যেতে চায়নি। বারবার বিসিসিআই বা মহেন্দ্র সিং ধোনি বলে এসেছেন, ডিআরএসে যে পদ্ধতি বা প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, তা ‘বিশ্বাসযোগ্য’ নয় পুরোপুরি। তবে ভারতের মূল সমস্যা ছিল মূলত বলের গতিপথ নির্ণয় করার প্রযুক্তি নিয়ে। মানে বল প্যাডে লাগার পর স্ট্যাম্প পর্যন্ত যে ‘অনুমিত’ পথ দেখানো হয় বল-ট্র্যাকিং পদ্ধতিতে, তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে। বল পিচ করার পর থেকে প্যাডে লাগা পর্যন্ত সময়ে ছবি ধারণ করা হয়, একে বলে ‘ফ্রেম-রেট’। ফ্রেম রেট যতো বেশী, বলের অনুমিত গতিপথের সঠিক হওয়ার সম্ভাবনাও ততো বেশি। বিসিসিআইকে মূলত এই একটা জায়গাতেই সন্তুষ্ট করতে পেরেছে বলের গতিপথের এই প্রযুক্তি সরবরাহকারি প্রতিষ্ঠান ‘হক-আই’, সঙ্গে আইসিসি। ২০১১ বিশ্বকাপের সময় ‘ফ্রেম-রেট’ ছিল সেকেন্ডে ৬০-৭০। ২০১৩ সালে এ হার বেড়েছে, হক-আইয়ের ‘আল্ট্রা-মোশন’ ক্যামেরা আসার ফলে। সেটাই এখন বেড়ে হয়েছে সেকেন্ডে প্রায় ৩৪০টি ফ্রেম।

    বিসিসিআইয়ের আরেকটা ‘চিন্তা’ ছিল, বল প্যাডে লাগার সঠিক জায়গাটা নিয়ে! এটা ঠিকমতো নির্ধারণ করতে না পারলেই তো বদলে যাবে বলের গতিপথ। এটার সমাধান হয়ে এসেছে ‘আল্ট্রা-এজ’। শব্দ-নির্ভর এ প্রযুক্তি আরও সঠিকভাবে নির্ধারণ করবে ‘ইমপ্যাক্ট’, বল যে ফ্রেমে প্যাডে লেগেছে, আলাদা করা যাবে তা। কোনো বলে যদি অপারেটর ছবি ধারণ করতে ‘ব্যর্থ’ হন, হক-আই তারও বিকল্প রেখেছে। প্রত্যেক বলেরই ‘ডাটা’ রেকর্ড করে রাখা হবে, চাইলেই পরে ব্যবহার করা যাবে তা।


    প্রত্যেক ম্যাচে একটা করে ‘ব্যর্থ’ রিভিউয়ের সুযোগ পায় ব্যাটিং দল, রিভিউ সফল হলে আরেকটা। তবে ‘ক্রু-চিফ’ চাইলে যে কোনো সময় রিভিউ করতে পারেন, নিজ দায়িত্বে। আর সপ্তম ইনিংসের পর(বেসবলে নয়টা ইনিংস থাকে) ম্যানেজার ক্রু-চিফকে অনুরোধ করতে পারেন,কোনো সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার। শুধু অনুরোধ, তবে বাধ্য করতে পারবেন না।


     

    ****

     

    ভারত আপাতত মেনেছে। পরীক্ষামূলকভাবে ইংল্যান্ড সিরিজে ব্যবহার করা হবে তা। হয়তো প্রথম ডিআরএস ব্যবহার করা সিরিজের দল ভারত তাঁদের ডিআরএস অভিজ্ঞতা এবার বদলিয়ে নিতে পারবে। বেসবল যেমন অনেকদিন ‘পরীক্ষামূলক’ভাবে রিভিউ পদ্ধতি ব্যবহার করার পর এখন পুরোপুরি কাজে লাগাচ্ছে।

    ব্যাট-বল-পিচ-রান, বেসবলকে বোধহয় ছোটবেলায় হারিয়ে যাওয়া ক্রিকেটের ভাই বলা যায়! কিংবা বেসবলের রিভিউ পদ্ধতির কিছু ব্যাপার বেশ ‘আগ্রহ-জাগানিয়া’ বলেই একে টানা।

    ২০০৮ সালে ক্রিকেটে রিভিউ পদ্ধতির প্রচলন। বেসবলেও তাই। ২০১৪ সালে এসে তা পাকাপাকি করা হয়েছে, মেজর লিগের সব খেলাতেই এখন ‘ইন্সট্যান্ট রিপ্লে’ নামের এই রিভিউ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

    বেসবলে সাধারণত আম্পায়ার থাকেন চার থেকে ছয়জন। যিনি সবচেয়ে অভিজ্ঞ, তাঁকে বলা হয় ‘ক্রু-চিফ’। তিনি মূলত দল, সব আম্পায়ারদের মাঝে সংযোগকারী কর্মকর্তার ভূমিকায় কাজ করেন। আর ‘আম্পায়ার-ইন-চিফ’ থাকেন ‘হোম প্লেট’ এ। বেসবলে কিছু সুনির্দিষ্ট ঘটনায় রিভিউ করা যায়। রিভিউয়ের দায়ভার দলের ম্যানেজারের ওপর, তিনিই সিদ্ধান্ত নেবেন, কোনো ‘প্লে’ রিভিউ করা হবে কিনা। তবে তার আগে দলের ভিডিও বিশ্লেষকরা সুযোগ পাবেন পরখ করে দেখার, আসলেই কোনো ভুল হয়েছে কিনা আম্পায়ারের। এই বিশ্লেষকদের বিশেষ ভিডিও-সুবিধা দেয়া হয়, সরাসরি সম্প্রচারে যা সবসময় ব্যবহার করা হয় না। ম্যানেজার যদি ভিডিও বিশ্লেষকদের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পান, তবেই ক্রু-চিফের মাধ্যমে রিভিউ চান। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, এই রিভিউ নিয়ন্ত্রণ করা হয় নিউ ইয়র্কের একটা কেন্দ্র থেকে, যেটা স্থায়ী। মৌসুমে প্রত্যেকদিন প্রায় বারোটি খেলা হয়, সবগুলোর রিভিউ নিয়ন্ত্রণ করা হয় সে কেন্দ্র থেকে। সেখানে একজন টেকনিক্যাল অফিসার রিপ্লে দেখে তাঁর মতামত জানান আম্পায়ারদের, টেলিফোনে।

     

    অপেক্ষা, অপেক্ষা....

     

    প্রত্যেক ম্যাচে একটা করে ‘ব্যর্থ’ রিভিউয়ের সুযোগ পায় ব্যাটিং দল, রিভিউ সফল হলে আরেকটা। তবে ‘ক্রু-চিফ’ চাইলে যে কোনো সময় রিভিউ করতে পারেন, নিজ দায়িত্বে। আর সপ্তম ইনিংসের পর(বেসবলে নয়টা ইনিংস থাকে) ম্যানেজার ক্রু-চিফকে অনুরোধ করতে পারেন,কোনো সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার। শুধু অনুরোধ, তবে বাধ্য করতে পারবেন না। সাধারণত ক্রু-চিফ এসব অনুরোধ শোনেন।

    তবে সব রিভিউই হয় কিছু নির্দিষ্ট ঘটনায়। ক্রিকেটের রান-আউটের মতো ঘটনা সেগুলো। কিংবা এলবিডাব্লিউয়ের সময় বল ব্যাটে লাগলো কিনা,  অথবা বড়জোর ‘ইমপ্যাক্ট’ লাইনে ছিল কিনা। কিন্তু প্যাড না থাকলে বল স্ট্যাম্পে লাগতো কিনা(বেসবলে স্ট্রাইক জোন বলে একটা ব্যাপার আছে এমন), এরকম ‘বিশেষজ্ঞ মত’ বা ‘জাজমেন্ট’ এ প্রযুক্তির কোনো ব্যবহার নেই। সেটা নির্ধারণ করেন ওই ‘আম্পায়ার-ইন-চিফ’ নিজেই।

    ক্রিকেটের সঙ্গে পার্থক্যগুলো ধরতে পারছেন নিশ্চয়ই। ক্রিকেটের রিভিউয়ে কেন্দ্রীয় কোনো পদ্ধতি নেই, সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল অনেকাংশে। খরচের ব্যাপার আছে, খরচ বোর্ড বহন করবে নাকি আইসিসি, ‘দ্বন্দ্ব’ আছে সেখানেও।

     

    ****

     

    ক্রিকেটে প্রযুক্তির এতো আধিক্যে বোধহয় সবচেয়ে হুমকির মুখে আম্পায়ারদের ওই ‘বিশেষজ্ঞ’ মতটা। আবার এটাও হতে পারে, এতোদিন সবচেয়ে সেরা জায়গা থেকে ক্রিকেট দেখে দেখে আম্পায়াররা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, সেটা আরও ‘পরখ’ করে নেয়া যাচ্ছে প্রযুক্তি থেকে। পেশাটা হয়ে উঠছে আরও চ্যালেঞ্জিং! আম্পায়ারিংয়ে তো পরিবর্তন এসেছেই, ডিআরএস বদলে দিয়েছে আরও অনেক কিছু। অধিনায়কের ভূমিকা, উইকেটকিপার বা নন-স্ট্রাইকিং প্রান্তের ব্যাটসম্যানের ভূমিকা, কিংবা ‘ফিঙ্গার-স্পিনার’দের ভূমিকাও!

    প্রথম যখন ডিআরএস ব্যবহার করলো ইংল্যান্ড, সেটি ওয়েস্ট ইন্ডিজে। অ্যান্ড্রু স্ট্রাউস শর্ট-মিডউইকেটে দাঁড়িয়ে দেখলেন রায়ান সাইডবটমের একটা এলবিডাব্লিউয়ের আবেদন নাকচ হয়ে গেল। স্ট্রাউসের মনে হয়েছিল আউট, চাইলেন রিভিউ। রিপ্লে দেখালো, লেগস্ট্যাম্পের ইঞ্চি ছয়েক বাইরে পড়েছে বল! নিজেকে আস্ত ‘গাধা’ মনে হয়েছিল ইংলিশ অধিনায়কের, তারপরই ঠিক করে ফেললেন, রিভিউ নেয়ার আগে উইকেটকিপার আর বোলারের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। কোনটা রিভিউ নেয়া হবে, কোন বোলারকে ‘বিশ্বাস’ করা যায়, ম্যাচের পরিস্থিতি কী, ভাবতে হয় সবই। উইকেটকিপারকেও ভাবতে হয়।

     

    বদলে গেছে আম্পায়ারস কলের এমন নিয়ম, নতুন নিয়মে এটি আউট 

     

    ভাবতে হয় নন-স্ট্রাইকে থাকা ব্যাটসম্যানকেও। একটা ডেলিভারি সামলে এসে যে একটু ‘অফ’ মুডে যাবেন, উপায় নেই সেটার। দেখতে হবে বল, পিছে সতীর্থ এসে পরামর্শ চান! ব্যাপারটা খুব ভুগিয়েছিল ক্রিস রজার্সকে। এর উপর আছে রিভিউয়ের কারণে এলবিডাব্লিউয়ের আধিক্য। বাঁহাতি, কোনো ডানহাতি বোলার রাউন্ড দ্য উইকেটে বল করতে এলে অফস্ট্যাম্পের দিকে সরে গার্ড নেন। কিন্তু একবার খুব সূক্ষ্ণভাবে আউট হয়ে গেলেন, বলটা শুধু লেগস্ট্যাম্প ছুঁয়ে গিয়েছিল। রজার্স এরপর গার্ড বদলিয়ে লেগস্ট্যাম্পের দিকে নেয়া শুরু করলেন, গড়বড় হয়ে গেল খেলায়!

    স্পিনাররা অবশ্য ভিন্ন কথা বলবেন। ‘ফিংগার-স্পিনার’রা একসময় হাপিত্যেশ করে মরেছেন, ফ্রন্ট ফুটে এলবিডাব্লিউ পাওয়ার জন্য। আম্পায়াররা দিতেন না। ডিআরএসের কারণে আম্পায়ারদের মনোভাব বদলে গেছে, এখন তো স্পিনারদের ‘সোজা’ বলই বেশী বিপজ্জনক, যতো আগ বাড়িয়েই খেলেন না কেন, এলবিডাব্লিউয়ের সম্ভাবনা তো নাকচ হয়ে যাচ্ছে না!

    ড্যানিয়েল ভেট্টোরি আবার আরেকটা দিকও এনেছিলেন। আগে টেলএন্ডারদের বিপক্ষে আবেদন করলে সহজেই উইকেট মিলতো, কিন্তু এখন আর পাওয়া যায় না! সবই যে ডিআরএসের ‘ফিল্টার’ এর মধ্য দিয়ে যায়!
     

    ****

     

    ইডেন গার্ডেন বা শের-ই-বাংলা। দর্শকভর্তি এসব স্টেডিয়াম যখন উত্তেজনায় কাঁপে, আম্পায়ারদের থাকতে হয় নির্বিকার। প্রাণপণ চেষ্টা করে যেতে হয়, ‘এজ’ এর শব্দ শোনার। কিন্তু দেখা গেল, খুবই সূক্ষ্ণ ‘এজ’, খালি কানে যা শোনা ‘অসম্ভব’, বলের ‘ডেভিয়েশন’ নেই বললেই চলে। আম্পায়ার হয়তো এমন একটা আবেদন নাকচ করে দিলেন, ফিল্ডিং দলের রিভিউও শেষ! তখন? রিপ্লে দেখানো হবে এরপর, গোটা বিশ্ব জানবে, আম্পায়ারের সিদ্ধান্তটা ছিল ভুল। কিন্তু কিছু করার নেই! প্রযুক্তি তখন কী করবে! এতসব প্রযুক্তি থেকে তাহলে কী লাভ?

    নাকি কখনও এমন সময় আসবে, যখন প্রযুক্তিই নিয়ে নিবে সব দায়িত্ব! দুইদিকে কি তাহলে দাঁড় করানো হবে দুইটা যন্ত্র? অথবা মাঠের বাইরে সব ক্যামেরা দিয়েই কাজ চালানো হবে। নো-বল নির্ণয়ের জন্য আসবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি! ডিআরএস আসার পর টেস্টে দেখা যায়, অনেক সময়ই আম্পায়ারের চোখ এড়িয়ে গেছে নো বল। আসলেই কি তাই? সীমিত ওভারে নো বলের অনেক গুরুত্ব, সেখানে হয় না তো এমন! কিন্তু কিছু ছবিতে দেখা গেছে, নো বল নির্ণয় করা প্রায় অসম্ভব, এমন কিছু বোলারের অ্যাকশন আছে। মূলত যারা ‘চেস্ট-অন’ বোলার, তাঁদের পেছনের পা সামনের পা এমনভাবে ঢেকে দেয়, কিছুই করার থাকে না! ইয়ান চ্যাপেল একবার তাই বলেছিলেন, ব্যাকফুটের নো বলকে ফিরিয়ে আনা হোক!

     

    নো বল, নাকি নো-বল না? 

     

    সহসাই এমন যন্ত্র আসবে না। নো বলের জন্য না, আম্পায়ারকে পুরোপুরি হটিয়ে দেয়ার জন্যও না। কিন্তু উচ্চপর্যায়ের আম্পায়ারিং যখন প্রযুক্তি সহায়ক না হয়ে প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়বে, ক্লাব ক্রিকেটে, যেখানে প্রযুক্তি নেই, সেখানে আম্পায়াররা উৎসাহ পাবেন কিভাবে! তাঁরাই তো একদিন আসবেন এ পর্যায়ে আম্পায়ারিং করতে।

     

    ****

     

    আম্পায়াররা ভুল করেন। আম্পায়াররা ভুল করবেন। তবে যে ভুল ম্যাচকে বদলে দেয়, সেই প্রভাববিস্তারী ভুলগুলোকে যতটা সম্ভব এড়িয়ে যাওয়া যায়, ততোই তো সমৃদ্ধ হবে ক্রিকেট। সঙ্গে আবার এটাও মনে রাখতে হবে, সেই ছোটবেলায় শেখা কথাটা, আম্পায়ারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত! কিন্তু তারপরও হয়তো চট্টগ্রাম টেস্টের মতো টেস্ট আসবে। আলো কমে আসবে, আম্পায়াররা অ্যালেস্টার কুককে বলবেন, স্পিনার হলে খেলা চালানো হবে, নাহলে না। এসব সিদ্ধান্তকে রিভিউ করার মতো তো আর ‘প্রযুক্তি’ নেই! অথবা শফিউল ইসলামের শেষের আউটটার মতো। শট খেলার চেষ্টা করেছেন কি করেননি, এটা তো মাঠের আম্পায়ারই নির্ধারণ করেছেন, প্রযুক্তির সেখানে কিছু করার আছে কি আদৌ! 

     

    কিন্তু এরপরও এলবিডাব্লিউ বা ব্যাট-বলের ছোঁয়ার সিদ্ধান্তে কুমার ধর্মসেনা বা ক্রিস গ্যাফানিকে বারবার ভুল প্রমাণ করবে প্রযুক্তি। হয়তো চাপে পড়ে যাবেন তাঁরা। আলোচনা-সমালোচনা হবে। সেকেন্ড ব্যবধানে দেয়া সিদ্ধান্তটা ধীরলয়ে দেখবেন সবাই। দর্শক, ধারাভাষ্যকার। শেষমুহুর্ত পর্যন্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারবে না। এরপর সব প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে যখন সিদ্ধান্ত আসবে, মন্তব্য করে বসবেন, হয়তো ‘অসাধারণ’, অথবা ‘বাজে’! ধর্মসেনা আবার দ্বিতীয় টেস্টে নামবেন। ক্রিস গ্যাফানি যাবেন টেলিভিশন আম্পায়ারের আসনে। এস রভি নেমে আসবেন, ১৫তম টেস্টে। ভুল স্বীকার করে নেবেন সহজেই। ঘটনাবহুল আরেক ম্যাচ শেষে একজন আরেকজনকে ‘অভিনন্দন’ জানাবেন জড়িয়ে ধরে, একটা স্মারক স্ট্যাম্প বা বল রেখে দিবেন। চাপ থাকবে। মাত্র খেলা দেখা শুরু করা দর্শকও রিপ্লে দেখে, ধারাভাষ্য শুনে আম্পায়ারকে একচোট কথা শুনিয়ে দেবেন অকপটে। কেউ শুনবে না, কেন আম্পায়ার সেই সিদ্ধান্তটা দিয়েছিলেন!  

     

    আম্পায়ারদের জীবনটাই যে এমন!

    ডিআরএস থাকলেও, না থাকলেও!

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন