• উইম্বলডন ২০১৭
  • " />

     

    ফেদেরার আজও চমৎকার!


    সে এক সময় ছিল বটে। জিনেদিন জিদানের ফরাসী সৌরভে তখন বিশ্ব মাতোয়ারা। শচীন, লারা তখন ফর্মের তুঙ্গে, বাংলাদেশের তখনও বিশ্বকাপেই খেলা হয়নি, ডোনাল্ড ট্রাম্প তখনও পরিকল্পনা করছেন কীভাবে আবাসন ব্যবসা ফুলেফেঁপে বড় করা যায়। ১৬ বছরের একটা ছেলে পা রাখল উইম্বলডনের জুনিয়র সার্কিটে, শিরোপা জিতল প্রথমবারেই। তখনও কি কেউ ভেবেছিল, প্রায় ২০ বছর পরে সেই ছেলে এই কোর্টে আবার বিজয়ীর বেশে ফিরবে? 

     

    ২ 
    ২০০৩ সালের কথা। তখনও জিদান সৌরভ ছড়িয়ে যাচ্ছেন; মেসি-রোনালদোরা অবশ্য আসেননি রঙ্গমঞ্চে। শচীন, লারাদের উইলো চলছে সমানে, বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ের অপেক্ষা তখনো অবশ্য ফুরোয়নি। ১৬ বছরের সেই ছেলে আর কিশোর নেই, তবে কৈশোরের লাবণ্য মুখ থেকে একেবারে যায়নি। লম্বা চুল, প্রাণখোলা হাসির মতোই সপ্রাণ তাঁর টেনিস। এর আগেই টুকটাক কিছু টুর্নামেন্ট জেতা হয়েছিল, তবে গ্র্যান্ড স্লাম ছিল অধরা। সেই যে উইম্বলডনের সঙ্গে গাটছঁড়া বাঁধল, ১৩ বছর পরে এসেও সেটা আগের মতোই অটুট। এর মধ্যে কত কিছু হয়ে গেছে, কত কিংবদন্তি এসেছেন-গেছেন, কিন্তু ঘাসের সঙ্গে সেই তরুণের মিতালি কমেনি এতটুকু। এত বছর পরেও তাই সেই উইম্বলডনে এসে তিনি অশ্রু সংবরণ করতে পারেন না। উইম্বলডন যে তাঁর কাছে সেই আগের মতোই! 

     


    কিন্তু মান্না দের সেই গানের মতো প্রশ্ন উঠতে পারে, 'তুমি কি সেই আগের মতোই আছ, নাকি অনেকখানি বদলে গেছ?' রজার ফেদেরারের সঙ্গে যাঁদের বেড়ে ওঠা, ফেদেরার যাঁদের কৈশোর-যৌবনের অনেকটা সময় জুড়ে আছে, তারা জানেন, ফেদেরার আছেন আগের মতোই। ১৩ বছর আগে তাঁর এক হাতের ব্যাকহ্যান্ড যেমন ফিলিপ্পোসিসকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল, এত বছর পর এসে সেই ব্যাকহ্যান্ডের উত্তর জানা থাকে না চিলিচেরও। সেবার রডিক যেন তাঁর ফোরহ্যান্ড ঠেকাতে পারেননি, এবারও সেই ঠিক বেসলাইনে চুমু খেয়ে যাওয়া ফোরহ্যান্ডের জবাব দিতে পারেন না বার্ডিচ। সেবার ফাইনালে হারিয়েছিলেন ছয় বছরের বড় ফিলিপ্পোসিসকে, এবার হারিয়েছেন সাত বছরের ছোট চিলিচকে- পার্থক্য বলতে শুধু এটুকুই। নয়তো সেই সার্ভ, সেই ভলি, সবকিছু তো আগের মতোই ফ্রেমে বাঁধা মোনালিসার মতোই বাঙময়। চুলটা বেশ ছোট করেছেন, চার সন্তানের বাবা হয়েছেন- পার্থক্য তো শুধু এটুকুই! 

     


    ৪ 
    অথচ দুই বছর আগে কথাটা বললে অনেকে হয়তো হা রে রে করে তেড়ে আসতেন। 'ফেদেরার-যুগের' এপিটাফ লিখে ফেলার জন্য তর সয়নি অনেকের। ২০১২ সালের পর যাঁর কোনো গ্র্যান্ড স্লাম নেই, তাঁর জন্য সমালোচনাটা ঠিক অযৌক্তিক নয়। সেই যে ১৭-র গেরোতে আটকে গিয়েছিলেন, সেখানেই ফেদেরার-রাজত্বের সূর্যাস্ত দেখে ফেলেছিলেন অনেকে। ব্যাকহ্যান্ডের জোরটা যেন আগের মতো নেই, কোর্টে ঠিক অতটা দ্রুত নন, পাঁচ সেটে খেলা গেলে ক্লান্ত হয়ে পড়েন- গ্র্যান্ড স্লামে একের পর এক ব্যর্থতার এমন কত শত ময়নাতদন্ত হতে লাগল। তবে ফেদেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন গোপনে গোপনে, অনেকটা অলক্ষ্যে। 



    গত বছর বেশ অনেকটা সময় চোটের জন্য কোর্টের বাইরে ছিলেন। যমজ সন্তানদের স্নান করাতে গিয়ে হাঁটুতে বেশ ভালোমতো চোট পেয়েছিলেন, পিঠের চোটও ভোগাচ্ছিল বেশ। এমনিতে সৌভাগ্যই বলতে হবে, চোট সেভাবে কখনোই লম্বা সময় ধরে ভোগায়নি তাঁকে। সার্জনের ছুরির নিচেও তো যেতে হয়েছে ৩৪ বছর বয়সে গিয়ে। সেটাই কি তাঁর জন্য শাপেবর হয়ে এসেছিল? ক্যারিয়ারে তখন অতৃপ্তি বলতে সেভাবে কিছু নেই। উইম্বলডন, অস্ট্রেলিয়ান আর ইউএস ওপেন ক্যারিয়ারের ট্রফি ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেই ঘরে নিয়ে এসেছিলেন। যে ফ্রেঞ্চ ওপেনটা বাকি ছিল, সেটাও ২০০৯ সালে পাওয়া হয়ে গেল। ফেদেরার তখন ঘাসের দলেও আছেন, মাটির দলেও আছেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতেই পারে, তাঁর তো তখন র‍্যাকেট তুলে রাখাই উচিত। কিন্তু ফেদেরার ভাবলেন অন্য কিছু। 


    ৬ 
    বয়সটা পক্ষে নেই, তা জানতেন ভালোমতোই। অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে রাফায়েল নাদালের সঙ্গে দ্বৈরথটা যখন সেই হারানো যুগের নস্টালজিয়া ফিরিয়ে এনেছিল, ফেদেরার জানতেন তাঁর খেলতে হবে বেছে বেছে। অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জেতার পরেও তাই ফ্রেঞ্চ ওপেনের লোভ সংবরণ করেছিলেন। নিজের প্রিয় ঘাসের কোর্টে ফিরলেন আরও ধারালো হয়ে। পুরো টুর্নামেন্টে একটা সেটও তাই হারেননি, প্রতিটা ম্যাচেই এক মুহূর্তের জন্য লাগামটা হাতছাড়া করেননি। টাইব্রেকারে আগের চেয়েও যেন স্নায়ু অনেক বেশি শীতল, ফাইনালে ধুঁকতে থাকা চিলিচকেও ছাড় দেননি এক চুলও। তবে সেই প্রতিরোধ ভেসে গেছে জয়ের পরেই, চোখের টলমল করা জল বলছিল এই উইম্বলডনের জন্য কতটা ত্যাগ স্বীকার করেছেন। কিন্তু সবার বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিলেন, বিদায়ের ঘোষণার জন্যই কি আবেগের বাঁধটা এভাবে ভেঙে যাওয়া?


    ৭ 
    সেই আশঙ্কা আসলে ছিলই। ফেদেরারকে একটা সময় যাঁর ছায়ার সঙ্গে হাঁটতে হয়েছে, সেই পিট সাম্প্রাসই তো ২০০২ সালে ইউএস ওপেন জেতার পরেই অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিংবদন্তিরা তো মাথা উঁচু করেই বিদায় নিতে চান, সেই সুযোগ পান কজন? ফেদেরারকেও তো এক সময় শেষ বলতে হবে, সেই ক্ষণ কি তাহলে এসে গেল? কিন্তু ফেদেরার তো কিংবদন্তিদের মধ্যেও আলাদা, দিগন্তরেখা ছাড়িয়েও যাঁর সীমানা আরও অনেক দূর। বয়স একটা সংখ্যা, ক্লিশে হয়ে যাওয়া কথাটা তাঁর জন্য যেন আরও অনেক বেশি লাগসই। জেতার পরেই তাই জানিয়ে রেখেছেন, পরের বছর আবার আসতে চান এখানে। কে জানে, তখন হয়তো তূণে নতুন কোনো তীর নিয়ে আসবেন, কে জানে তখন হয়তো নিজের অর্ধেক বয়সী কাউকে হারিয়েই জিতবেন শিরোপা।


    ফেদেরার-যুগের তাই অনেক কিছুই হয়তো বাকি। রজার ফেদেরার মানেই এমন একটা পরশপাথর, যাতে কেবলই লাবণ্য ধরে।  

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন