• অস্ট্রেলিয়ান ওপেন
  • " />

     

    আমরা বেঁচে ছিলাম তাঁদের সময়ে

    "যে দিন গেছে সেদিন কি আর ফিরে পাওয়া যায়?"
    কথাটা প্রায়ই ঘুঙুর বাজিয়ে যায় আমাদের ধূসর নিউরনে। স্মৃতিমেদুরতায় ডুবে থাকতে আমরা ভালোবাসি, "আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম"-র আক্ষেপ আমাদের কখনোই যায় না। এইসব মাঘের অন্তরঙ্গ দুপুর যেন হঠাৎ করেই আমাদের নিয়ে যায় দশ বছর আগে। ওই তো লম্বাচুলের পেটা গড়নের ছেলেটার সঙ্গে মুখে হাসি লেগে থাকা সৌম্যদর্শন লোকটা প্রাণপণ লড়ছে। মেসি, রোনালদোকে তখন মানুষ কেবল চিনতে শুরু করেছে, শচীন টেন্ডুলকার তখনও খেলছেন দোর্দন্ড প্রতাপে। তখনও ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে বুঁদ হয়ে থাকার সময় হয়নি, জীবন তখনো ছিল অনেকটা নিস্তরঙ্গ। স্মৃতির সেই জাবর কাটতে কাটতেই আমরা হঠাৎ টের পাই, টাইমমেশিন আমাদের নিয়ে গেছে দশ বছর পেছনে। রজার ফেদেরার-রাফায়েল নাদালের সেই দ্বৈরথ আরও একবার ফিরে এসেছে, মঞ্চ প্রস্তুত সেই উইম্বলডন ফাইনালের মত আরেকটি মহাকাব্যিক লড়াইয়ের। কে জানে, হয়তো শেষবারের মতো! 

     


    অথচ মাসকয়েক আগেও কি দু'জন ভেবেছিলেন এরকম কিছু হবে? নাদালের একটা টেনিস অ্যাকাডেমি উদ্বোধন করতে গিয়েছিলেন ফেদেরার। ভেবেছিলেন একটা প্রীতি ম্যাচ খেলে বেশ কিছু অর্থসহায়তায় সাহায্য করবেন নাদালকে। ফেদেরার পরশুর সেমিফাইনালে জেতার পর হাসতে হাসতে মনে করিয়ে দিলেন, "তখনই মনে পড়ল আমি তো এক পায়েই হাঁটি, আর হাতের চোট তো আছেই। আর ওর ব্যথা কব্জিতে। এভাবে তো আর ম্যাচ খেলা যায় না। পরে কয়েকটা কিশোরের সঙ্গে একটু র‍্যাকেট দিয়ে বল মারার বেশি কিছু করতে পারিনি। অথচ দেখুন, এখন আমরা এখানে।"


    কে জানে, দু'জন বোধ হয় তখনই শলাপরামর্শ করে নিয়েছিলেন, নতুন বছরে একটা শেষ চেষ্টা করবেন। সকল কাঁটা তুচ্ছ করে আরেকবার জ্বলে উঠবেন। বাধা তো সামনে কম ছিল না। নোভাক জোকোভিচ, অ্যান্ডি মারে নিজেদের ধীরে ধীরে নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায়। তরুণ মিলোস রাওনিচরা আছেন, স্তান ভাভরিঙ্কারাও কাটাচ্ছেন নিজেদের সেরা সময়। সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ সময় তো ছিলই। আর কিছুদিন পরেই চুলে পাক ধরতে শুরু করবে ফেদেরারের, ৩৫ বছর বয়সে তো তাঁর কোর্টে থাকারই কথা নয়। নাদালও ত্রিশের ভুল দিকে চলতে শুরু করেছেন, চোটের ধারালো থাবা যেন আরও কয়েক বছর বয়স বাড়িয়ে দিয়েছে। গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালে একটা সময় দু'জনের হাত মেলানোটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু প্রায় ছয় বছর ধরে সেই সুযোগ তো আর আসেনি। এবারই যে আরও একবার সেই মঞ্চ সাজানো থাকবে, সেই চিত্রনাট্যটা যেন কেউ সন্তর্পণে লিখে রেখেছিলেন।  

     

      

    প্রথমবার ফেদেরারকে হারানোর পর



    দু'জন কি একজন আরেকজনকে প্রেরণা দিয়েছিলেন আগের মতো? নাদাল যখন ক্যারিয়ার শুরু করেছেন, ফেদেরার-সূর্য তখন মধ্যগগনে ওঠার ঠিক অপেক্ষায়। সেই কৈশোরের গন্ধ নিয়ে নাদাল ফ্রেঞ্চ ওপেনের সেমিফাইনালে প্রথমবারের মতো গ্র্যান্ড স্লামে হারালেন ফেদেরারকে। এরপর ফেদেরার সবাইকে ছাড়িয়ে অনেক ওপরে চলে গেছেন, তবে নাদাল নিঃশ্বাস ফেলেছেন ঘাড়ের ওপরেই। কে জানে, ফেদেরার ছিলেন বলেই হয়তো নাদাল অতোটা দুর্দান্ত হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। আবার কে জানে, নাদাল না থাকলে ফেদেরারের সেরাটা হয়তো অনেক সময়ই দেখা যেত না। এবারই তো যেন দু'জন আড়ালে থেকে পরস্পরকে পিঠ চাপড়ে দিলেন। কোয়ার্টার ফাইনালে ফেদেরার ভেরেভকে উড়িয়ে দিলেন, নাদাল পরের দিনই রাওনিচকে হারালেন সরাসরি সেটে। সেমিফাইনালে পাঁচ সেটের রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের পর ফেদেরার হারালেন ভাভরিঙ্কাকে, দিমিত্রভের সঙ্গে কোণঠাসা হয়ে গিয়েও নাদাল শেষ পর্যন্ত জিতলেন ওই পাঁচ সেটেই। এ যেন আগে থেকে ভেবে রাখা চিত্রনাট্যের গল্পই! 

     


    এবার দু'জন যখন সেমিফাইনালে পৌঁছেছেন, দিগন্তে দ্বৈরথের সূর্যটা যখন আলো ছড়াতে শুরু করেছে, দু'জনকেই বার বার মনে করিয়ে দেওয়া হলো সেটি। ফেদেরার সেমিফাইনালে জেতার পর হাসতে হাসতে বললেন, "আমি তো ওর এক নম্বর ভক্ত।" নাদালও ফাইনালে ওঠার পর কাঁপতে কাঁপতে বলছিলেন, "দারুণ, দারুণ লাগছে আমার... ঠিক বলে বোঝাতে পারব না। ঠিক আগের মতো, রজারের সঙ্গে খেলাটা সবসময়ই আমার কাছে স্পেশাল।" দু'জন সবসময়ই দু'জনের প্রশংসায় মুক্তকন্ঠ, একে অন্যকে সুযোগ পেলেই ভরিয়ে দিয়েছেন প্রশস্তিতে। আট বছর আগে এই অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনালেই পাঁচ সেটের এক ধ্রুপদী লড়াইয়ে ফেদেরারকে হারিয়েছেন নাদাল। সেদিন কান্নাভেজা চোখে ফেদেরার বলেছিলেন, আবার তিনি ফিরবেন। নাদালও নতমস্তকে হাততালি দিয়ে যেন সাহসের মশাল তুলে দিয়েছিলেন তাঁকে। ফেদেরার কি ভেবেছিলেন, সেই ফেরার জন্য আট বছর লাগবে? নাদাল কি ভেবেছিলেন, আট বছর পর ফাইনালে উঠে সেই ফেদেরারকেই পাবেন?

     

    ৫ 
    হাতছানি তো দু'জনেরই কম নেই এবার। ফেদেরার জিতলে ওপেন যুগে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি গ্র্যান্ডস্লাম জিতবেন অন্তত পাঁচবার করে। আর নাদাল জিতলে ওপেন যুগে অন্তত দুইটি করে সবগুলো গ্র্যান্ড স্লাম জেতার ইতিহাস গড়বেন। ১৮তম গ্র্যান্ড স্লামটা অনেক দিন ধরেই হাতে ধরা দিয়েও দিচ্ছে না, ফেদেরার এবার নিশ্চয় সেটি হাতছাড়া করতে চাইবেন না। নাদালও ১৫তম গ্র্যান্ড স্লাম জিতে ফেদেরারের আরও কাছাকাছি যাওয়ার এমন সুযোগ আর পাবেন কি না কে জানে! হিসেবনিকেশে চাইলে নাদালকে এগিয়ে রাখাই যায়। মুখোমুখি লড়াইয়ে ফেদেরারের চেয়ে এগিয়ে আছেন অনেকটাই। গ্র্যাণ্ড স্লাম হোক আর হার্ড কোর্ট হোক, সবখানেই পরিসংখ্যান তাঁর পক্ষে। এমনকি অস্ট্রেলিয়ান ওপেনেও তিনবার খেলেও ফেদেরারের কাছে কখনো হারেননি। ফেদেরারভক্তরা বলতে পারেন, সেই সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। বাসেলে সর্বশেষ লড়াইয়ে তো ফেদেরারই জিতেছেন, এবার নাদালের চেয়ে একদিন বিশ্রাম নেওয়ার সময়ও বেশি পাচ্ছেন। বাজিটা তো তাঁর পক্ষেই বেশি।

     

    ৬ 
    তবে আপনি, আমি খুব সম্ভবত এসব পরিসংখ্যান নিয়ে মাথা ঘামাব না। আমরা অপেক্ষায় থাকব সেই নাদালকে দেখার, হারার আগে যিনি হাল ছেড়ে দেন না। বেসলাইন থেকে দারুণ সব স্ট্রোকে, অতিমানবীয় স্ট্যামিনায় কোর্টের প্রতিটি ইঞ্চিতে যাঁর জুতোর দাগ লেগে আছে, সেই নাদালের। আমরা অপেক্ষায় থাকব ফেদেরারের সেইসব মায়াবী ফোরহ্যান্ডের, প্রায় বিরল হতে যাওয়া ধ্রুপদী সেই এক হাতের ব্যাকহ্যান্ডের। আমরা অপেক্ষায় থাকব পয়েন্টের পর নাদালের মুষ্টিবদ্ধ হাতের সেই উল্লাসের, আমরা অপেক্ষায় থাকব ফেদেরারের স্বর্গীয় সেই হাসির। আমরা জানি, আর হয়তো এমন মুহূর্ত আসবে না। আমরা জানি, আমরা বেঁচেছিলাম ফেদেরার-নাদালের সময়ে। কাল রবিবার আমাদের বয়স কমিয়ে দেবে অন্তত দশ বছর। আমরা জানি, তারুণ্যে ফিরে যাওয়ার এমন সুযোগ আর হয়তো আমরা পাব না।


    রজার ফেদেরার-রাফায়েল নাদালের কে জিতবেন, কে হারবেন- তাতে কিছু যায়-আসবে না। যে-ই হারুক, আমরাই তো জিতে যাব কাল।

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন