• নিদাহাস ট্রফি ২০১৮
  • " />

     

    স্তব্ধ প্রেমাদাসায় অতিমানব মাহমুদউল্লাহ

    স্তব্ধ প্রেমাদাসায় অতিমানব মাহমুদউল্লাহ    

    শ্রীলঙ্কা ১৫৯/৭, ২০ ওভার (কুশাল ৬১, থিসারা ৫৮, মুস্তাফিজ ২/৩৯, সাকিব ১/৯, মিরাজ ১/১৬)

    বাংলাদেশ ১৬০/৮, ১৯.৫ ওভার (তামিম ৫০, মাহমুদউল্লাহ ৪৩*)

    ফল- বাংলাদেশ ২ উইকেটে জয়ী 


    এর চেয়ে অতিমানবীয় কিছু করতে পারতেন না মাহমুদউল্লাহ। এর চেয়ে নাটকীয় শেষ দেখেছে কটা টি-টোয়েন্টি ম্যাচ? যে ম্যাচটা শেষ ওভারে বাংলাদেশ ছেড়ে আসতে চেয়েছিল চার বল বাকি থাকতে, যে চার বলে প্রয়োজন ছিল ১২ রান, মাহমুদউল্লাহ করলেন সেটাই, তাও এক বল বাকি রেখেই। আর প্রেমাদাসাকে স্তব্ধ করে ১৮ বলে ৪৩ রানের ইনিংস খেলা মাহমুদউল্লাহ হয়ে উঠলেন অতিমানব। শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে রবিবারের ফাইনালে ভারতের সঙ্গী বাংলাদেশই। 

    নাটকের শুরু ১৯তম ওভারের শেষের বলে। সিঙ্গেল চুরি করতে গিয়ে রান-আউট মেহেদি, শুধু একটা উইকেট আর ডট বলই নয়, এর মানে শেষ ওভারের প্রথম বলে স্ট্রাইকে নতুন ব্যাটসম্যান মুস্তাফিজ। উদানা তাকে শর্ট বল দিলেন, শ্রীলঙ্কা নিল রিভিউ। পরের বলে আবার শর্ট, সিঙ্গেল নিতে গিয়ে রান-আউট মুস্তাফিজ।  নিয়মানুযায়ী কাঁধ উচ্চতায় একাধিক বাউন্সই গণ্য হবে নো বল হিসেবে, বাংলাদেশী ক্রিকেটাররা বলছেন, নো-বলের সঙ্কেত দিয়েছেন স্কয়ার লেগে থাকা আম্পায়ার, তবে এদিকের আম্পায়ার দেননি কিছুই। ঝামেলার শুরু সেখানেই। প্রথমে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ক্রিকেটারদের সঙ্গে ঝামেলা বাঁধল শ্রীলঙ্কান ফিল্ডারদের, এরপর মাঠের বাইরে থেকে অধিনায়ক সাকিব উঠেই আসতে বলছিলেন ক্রিজ ছেড়ে অনেকদূর এগিয়ে আসা মাহমুদউল্লাহকে! 

    শেষ পর্যন্ত মাহমুদউল্লাহ মাঠ ছাড়েননি। ৩য় বলে চার মেরেছেন মাহমুদউল্লাহ, ৩ বলে এরপর প্রয়োজন ছিল ৮ রানের। এরপরের বলে মাহমুদউল্লাহ নিলেন ডাবলস। ২ বলে প্রয়োজন ছিল ৬। এবারই অতিমানব হয়ে ওঠার পালা মাহমুদউল্লাহর, উদানার লেগস্টাম্পের ওপর ফুললেংথের বলে ফ্লিক করে মারলেন ছয়। উদ্বাহু মাহমুদউল্লাহ মত্ত উল্লাসে, জার্সি ছেড়ে মাঠে ঢুকে গেছেন সাকিব! 

    অবিশ্বাস্য দৃশ্য, অবিশ্বাস্য বাংলাদেশ! 

    ১৬০ রানের তাড়ায় শুরুটা মনমতো হয়নি বাংলাদেশের, দনঞ্জয়ার অফস্টাম্পের অনেক বাইরের বলে তাড়া করতে গিয়ে মিড-অফে সহজ ক্যাচ বনেছেন লিটন কোনও রান না করেই। দনঞ্জয়ার ফ্লাইটে বেসামাল হয়ে স্টাম্পড হয়েছে সাব্বির। তবে পাওয়ারপ্লেতে উঠেছে ৫০ রান, ৮ম ওভারে প্রথম ছয় মেরেছেন তামিম ইকবাল। 

    তামিমের সঙ্গে এরপর জুটি বেঁধেছেন মুশফিক, ১০ ওভারে বাংলাদেশ তুলেছিল ৮০ রান। গুরুত্বপূর্ণ এক ফিফটি করেছেন তামিম, ১০ ওভারে বাংলাদেশ তুলেছে ৮০ রান।  অ্যাপোনসোকে জোরের ওপর খেলতে গিয়ে সোজা মিড-অফে ক্যাচ দিয়েছেন ইনফর্ম মুশফিক, ২৫ বলে ২৮ রানে, ভেঙেছে ৬৪ রানের জুটি। 

    তামিম ছিলেন ফিফটি পর্যন্ত, ৪১ বলে সেটা পূরণ করার পরের বলেই ডাউন দ্য গ্রাউন্ডে এসে খেলতে গিয়ে এজড হয়েছেন গুণাথিলাকার বলে। স্বাভাবিক পজিশন থেকে নিচে নামা সৌম্যর ক্যাচও উইকেটের পেছনে পেরেরা নিয়েছেন কয়েকবারের চেষ্টায়, এবার বোলার মেন্ডিস। ১৩ থেকে ১৫- এই ৩ ওভারে বাংলাদেশ হারিয়েছে ৩ উইকেট, উঠেছে মাত্র ১৫ রান। শেষ ৫ ওভারে ৫০ রান প্রয়োজন ছিল, একদিকে দাঁড়িয়ে ছিলেন মাহমুদউল্লাহই। এরপরই সব গিয়ে ভিড়েছে ওই নাটকে। 

    প্রথম ইনিংসেও শ্রীলঙ্কা লিখেছিল প্রত্যাবর্তনের দারুণ গল্প। পাওয়ারপ্লেতে ৩৪ রানে ৪ উইকেট, টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বাজে। এরপর ৪১ রানে ৫ উইকেট, আরও বাজে শুরু। শ্রীলঙ্কা এই বিভীষিকা কাটিয়ে উঠেছে দুই পেরেরা : কুশাল ও থিসারার ঝড়ো ফিফটিতে। দুইজনের ৬ষ্ঠ উইকেট জুটিতে এসেছে ৯৭ রান, তারা এতোটাই ভয়ঙ্কর ছিলেন যে ২ ওভারে ৯ রান দেওয়া সাকিব বোলিংয়ে আসেননি আর, বোলিং করাননি আরেক বাঁহাতি স্পিনার নাজমুল অপুকে দিয়েও। ১ম ১০ ওভারে ৫৩ রান তোলা শ্রীলঙ্কা শেষ ১০ ওভারে তুলেছে ১০৬ রান। 

    দুই পেরেরার জুটির আগে শুরুটা দুর্দান্ত ছিল বাংলাদেশের। এ ম্যাচ দিয়ে ফিরলেন সাকিব, ফিরলেন অধিনায়কত্বে, প্রথম ওভারে বোলিংয়ে আসলেন, নিলেন প্রথম উইকেটও। জায়গা বানিয়ে বড় শট খেলতে গিয়ে আকাশে তুলেছেন গুণাথিলাকা, দৌড়ে ভাল ক্যাচ নিয়েছেন সাব্বির। এরপর মুস্তাফিজ চমক। প্রথমে তার ক্রস-সিমের স্লোয়ারে পুল করতে গিয়ে শর্ট মিড-উইকেটে ক্যাচ দিয়েছেন ইনফর্ম কুশাল মেন্ডিস, সে ওভারটা মুস্তাফিজ নিয়েছেন উইকেট মেডেন। সোজা সিমের ডেলিভারিতে শনাকা ব্যাট ছুঁয়ে দিয়েছেন উইকেটের পেছনে ক্যাচ। জীবন মেন্ডিসও ব্যর্থ, সুইপের চেষ্টায় শর্ট ফাইন লেগে ক্যাচ দিয়েছেন মিরাজের বলে। 

    কুশাল ও থিসারা এরপর জুটি গড়েছেন ধীরে ধীরে, সময় নিয়ে। ২৪ বলের বাউন্ডারি খরা গিয়েছে, মিরাজ ৪ ওভারে ১৬ রানে ১ উইকেটের দারুণ স্পেল শেষ করেছেন। ১৩তম ওভারে মুস্তাফিজের বলে ইনিংসের প্রথম ছয় মারলেন কুশাল, ১৮ রান এলো সে ওভারে, ঝড় শুরু হলো সেটা দিয়েই। 

    পাওয়ার হিটিংয়ে অসাধারণ প্রদর্শনী সাজালেন দুইজন মিলে, শর্ট-ওয়াইড যেরকম বলই নিজেদের অঞ্চলে পেয়েছেন, পাঠিয়েছেন বাউন্ডারিতে। ৩২ বলে ফিফটি করেছেন কুশাল, থিসারা নিজের প্রথম ফিফটি ছুঁয়েছেন ৩৩ বলে। মাহমুদউল্লাহর এক ওভারে মাঝে এসেছে ৪ রান, এছাড়া সর্বনিম্ন ওভারটিও ৯ রানের। মুস্তাফিজের করা ১৭তম ওভারে এসেছে ১৭ রান, দারুণ শুরুর পরও ৪ ওভারে ৩৯ রান গুণেছেন তিনি। সৌম্যর বলে মিসটাইমিংয়ে ৪০ বলে ৬৫ রান করা কুশাল ক্যাচ দিলে ভেঙেছে সে জুটি, ৩৭ বলে ৫৮ রান করে রুবেলের বলে ক্যাচ দিয়েছেন থিসারা। 

    সেই পেরেরারা বা গোটা প্রেমাদাসাকে স্তব্ধ করে শেষ গর্জনটা শোনা গেছে মাহমুদউল্লাহরই। বাংলাদেশেরই।