• " />

     

    যে আগুন ছড়িয়ে গেলো সবখানে

    যে আগুন ছড়িয়ে গেলো সবখানে    

    ‘ফুটপাথে দাঁড়িয়ে তোমরা খেলা দেখছো;

    দোকানের মধ্যে টিভি স্ক্রিন।

    বৃষ্টি এলো। মাথায় রুমাল।

    ছাতা খুললো একজন। তিনজন তাঁর গায়ে ঘেঁষে।

    একটা করে চার হচ্ছে। দূরে ফাটলো উল্লাসের বাজি।

    ফিরে যাচ্ছে অল্প রানে। সমবেত গর্জন হতাশ।’

     

    ... জয় গোস্বামীর এই কবিতার মতোই ভিজতে থেকে তুমি চায়ের দোকানটার পাশের সেলুনে মুখ গলিয়েছো স্কোর জানতে, জানি। সবাই তাই করে। আড্ডা তো বাঁধা থাকে না নির্দিষ্ট কোনো রাস্তায়, কেউ কথা বলে রাজনীতি নিয়ে, কেউ বা হাঁকায় প্রোগ্রামিং, কেউ ক্লান্ত রাত জেগে রোগী দেখে এসে। শুধু একটা, কেবল একটা ধ্রুবকই পালটায়নি সেই বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা সন্ধ্যায় অথবা ঘামে জবজবে হয়ে বাস থেকে নেমে পনেরো মিনিট হেঁটে এসে চায়ের দোকানে পৌঁছবার পর। ‘চাচা, রান কত?’- জানতে চেয়ে তুমি শঙ্কায় কী উল্লাসে তাকিয়ে থেকেছো এগারোটা লাল-সবুজ জার্সির দিকে।

     

    সুগোই বুলো রিসার্চ ইনস্টিটিউট, মালয়েশিয়ায় তুমি ছিলে না উনিশশো সাতানব্বইয়ে। হালের প্রায় তারকা খ্যাতি পেয়ে যাওয়া সংবাদের লোকেরাও খুব বেশি ছিলো না সেদিন সেই মাঠে। তবু তুমি সেদিন, সেদিনের প্রাইমারি স্কুল, রিকশায় করে বাড়ি ফেরার পথে পাগলের মতো রঙে ভাসতে ভাসতে চ্যাঁচালে চারপাশের গর্জনের সাথে গলা মিলিয়ে, ‘বাংলাদেশ! বাংলাদেশ!’

     

    তখনো স্পষ্ট হয়নি ফলোঅন-এর পুরো মানে, তখনো খেলার খবর বলতে কাগজের শেষ দিক থেকে তৃতীয় পৃষ্ঠা, তখনো ক্রিকেটে শচীন আর লারা আর আনোয়ার। আর তুমি সেদিন জানলে প্রথম, রেডিওর থেমে আসা ঘড়ঘড়ে শব্দেও লুকিয়ে থাকতে পারে অমোঘ জাদু একরকমের। লাল সবুজের পতাকায় মোড়া কয়েকটা সাদা রঙা জার্সি সেদিন নিশ্চিত করলো বিশ্বকাপে একবার অন্তত খেলা হবে তোমার। আর দিনদুয়েক পরে খালেদ মাসুদের শেষ ওভারের ছক্কা, শান্ত'র দৌড়ের সাথে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির নতুন রাজা হয়ে সেই জার্সির ছেলেরা তোমায় জানাবে, প্রতিটা বল এখন থেকে তুমিও খেলবে নিজ মনে। এগারোটা জার্সির গল্প আজ থেকে বলতে হবে তোমারও।

     

    আর হায়দরাবাদে মোহাম্মদ রফিক তোমাকে প্রথম জানাবেন, ঐ এগারোজনের জেতার গল্পও বলা যায় স্কুল সকাল আর কলোনীর বিকাল মাঠে। বিদ্যুতের প্রথম সেঞ্চুরির হারিয়ে যাওয়া সেই সুবাস পেতে পেতে হারিয়ে ফেলার গল্পটাকে ছাপিয়ে যাবেন মেহরাব হোসেন অপি। শুভ্রদেবের নাকি গলায় ‘গুডলাক বাংলাদেশ, গুডলাক!’ গাইতে গাইতেই একদিন দেখা যাবে বুকের মাঝে বাঘের ডোরা নিয়ে এগারোটা লাল সবুজ জার্সি চলে এসেছে বিশ্বকাপেও। তোমার খুঁটতে থাকা নখে সেই অভিযানের প্রথম বলেই শাহরিয়ার হোসেনের উইকেট নেবেন জিওফ অ্যালট, তবু তুমি অপেক্ষা করবে। তুমি অপেক্ষা করবে আর পত্রিকায় পড়া স্কটিশ ডেঞ্জারম্যান ওই গ্যাভিন হ্যামিলটন যখন ফিরে আসবে মঞ্জুরুল ইসলামের হাত ছুঁয়ে যাওয়া বলে রানআউট হয়ে- কেউ জানবে না, কেউ জানে নি- তুমি আর সাথে আরো বারো কোটি সেই নিশুতি রাতে দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে লাফিয়ে উঠবে অন্ধকার ঘরের সেই টিভিসেটের সামনে। কারণ শুধু ওই ওরা এগারো জনই তো নয়, তুমিও খেলেছো সেদিন।

     

    খেলেছে পুরো দেশ, নর্দাম্পটন স্পষ্ট করে দিলো সেটা। বিশাল এক পতাকা নিয়ে মাঠে ঢুকে পড়লো বাঙালিরা, আর সদলবলে তুমি চলে গেলে টিএসসির দিকে। চিৎকার, পাগলের মতো, উল্লাসের বাজি। এখন থেকে বাংলাদেশের সেই গল্প তোমার গর্ব।

     

    আর সাদা পোশাকের টেস্ট আভিজাত্য বাদ দিলে, এরপর তুমি পাষাণ হয়ে লুকিয়ে রাখবে সব পেপার কাটিং, তোমার ক্রিকেট পরিসংখ্যানের খাতায় ইতস্তত জমে ওঠা ব্যক্তি অর্জন যত ধূলোয় ভরে যায়। ঢাকা থেকে কলম্বো, বেনোনি থেকে হারারে - নিঃস্ব রিক্ত অসহায় আত্মসমর্পণ শুধু তোমার। লাল সবুজের জার্সিটা আড়ালে আড়ালে রুমাল হয়ে যায় এগারোজনের, আর তোমার স্ট্রিট ক্রিকেটের টেপ টেনিস বলে অকারণ জিত বা হার, লোডশেডিং এর সন্ধ্যায় ভিন পাড়ার বন্ধুকে এখন অপাংক্তেয় হয়ে ওঠা ল্যান্ড টেলিফোনে প্রশ্ন - ‘রান কত?’

     

    শুক্রবার দুপুরের নামাযের পরে কলোনীর নিয়মিত জমায়েত আড্ডায় মশগুল। অমুকের নতুন প্রেম, মাধ্যমিকে ফোর্থ সাবজেক্ট ছাড়াই এ-প্লাস তমুকের, তোমার হাইস্কুল পেরিয়ে ঢোকা নটরডেমের চত্বরে উঠে পড়া বন্যার পানি- তার মাঝেও সবাই, তোমার মতো হঠাৎ হাসি অনিল কুম্বলেকে মারা আকরাম খানের টানা চার বাউন্ডারিতে; সাথে আফতাব কী রাজিন সালেহ কী অলক কাপালির হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে। আজকের মতো কোনো এক ঈদের আমেজ মাখা সন্ধ্যায়, কানাডা বিপর্যয়ে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছিলো এই জনপদ- তবু তুমি, নির্বোধ অথচ সরল তুমি, সার্বজনীন এক বিষাদে আক্রান্ত হয়ে প্রশ্ন করে গেছো চলন্ত বাসে, ‘ভাই, উইকেট কয়টা গেলো?’

     

    তবু একসময় ওয়েস্ট ইন্ডিজে পেতে পেতে হারিয়ে ফেলা জয় নামের সোনার মেডেলটাকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনে মাশরাফি মিরাকল। প্রথম ভারত বধে তোমার মনে আশার দোলা, হোয়াটমোর ম্যাজিকে কি কাজ ধরছে ধীরে ধীরে? হয়তো, হয়তো না। কিন্তু তবু যেন শতবর্ষ পরে আরো একবার টিএসসি যাবার উপলক্ষ এনে দেয় ঐ এগারোটা লাল সবুজের জার্সি, আশরাফুলের কার্ডিফ। টনি গ্রেগের চ্যাঁচাতে থাকা ‘ব্যাংলাডেশ ইজ হোম!’-র সাথে সাথে নখ কামড়ানো পন্টিং- তোমার আর ষোলো কোটির নিউরনে চিরস্থায়ী এক দৃশ্য সেটা। ক্রিকেট দুনিয়ারও। পরের ম্যাচে ওই আশরাফুলই হার্মিসনদের কাঁদিয়ে দেয়া এক ৯৪-র বিস্ফোরক দিয়ে বহু দিনের তরে ভরিয়ে দেয় তোমার ক্রিকেট আড্ডার বিকাল।

     

    এরপর মিছিল আসে নিয়মিত বিরতিতেই। যত ভয়ানক বোমা হামলা, যত ধুঁকতে থাকা লোডশেডিং, যত কুশ্রী রকম ভিড়ের মাঝে বাড়তে থাকা রিকশা ভাড়া- তার সবকিছুর মাঝে তুমি স্থির হয়েছো স্টান্স নিয়ে যখন ওপাশ থেকে দৌড়ে এসেছে ব্রেট লি আর শোয়েব আখতার, ডেভিড হুকস আর জিওফ্রে বয়কটের স্লেজিং তুমি শুনে গেছো উইকেটে পড়ে থেকে, হাবিবুলের পুল আর আফতাবের স্ট্রেট ড্রাইভের পর সকলের অগোচরে হাত মুঠি করে বলেছো, ‘ফাইট টাইগার্স! ফাইট!’

     

    হয়, ফাইট হয়। ছয় রানে পাঁচ উইকেট তুলে নিয়ে লঙ্কানদের সাথে ফাইট হয়। ক্রিকেট ব্যাকরণ মেনে সুন্দরতম ৮৯ নিয়ে অলক কাপালি লড়ে যায় ক্যারিবিয়ানদের সাথে। কিন্তু শান্তি মেলে না তোমার। আর অস্ফুটে তোমার বলা ‘এতো কাছে তবু যেন, আজও কত দূর!’ শুনেই যেন আগুয়ান তামিম ইকবাল আরেক ফাইটে প্রথম রাউন্ডেই ডাউন দ্য উইকেটে এসে জহির খানকে উড়িয়ে মারেন লং অনের ওপর দিয়ে। এগারোটা লাল সবুজের ক্রিকেটের ইতিহাসে, তুমি ঠিক জানো, অমন অহংকার-অমন ঔদ্ধত্য-অমন অবলীলায় তরুণেরা দাগ রাখে নি কখনো আগে। সরকারী নিষেধ, তবু তুমি সেই আদেশ অমান্য করে সেই রাতে তাই টিএসসি ছুটে গিয়েছিলে, মনে পড়ে না তোমার? সাকিব নামের তোমাদের একান্ত সুপারহিরোর উত্থানও তো সেখান থেকেই। পালটানো সময়ে মুশফিকদের সাথে সাথে তুমিও। আফ্রিকানদের হারিয়ে দেয়া ম্যাচে ধারাভাষ্যকক্ষে ‘আশরাফুল খেললে কী হয় জানো তো? অস্ট্রেলিয়াও হারে!’ কথাটা তো তোমারই আবেগে চিরসবুজ। প্রতিটা বল তুমিও তো খেলে গেছো ভেতরে ভেতরে।

     

    ভার্সিটির হাইওয়েতে যখন জীবনের এক এক মোড় থেকে এসে মিলেছে এক একটা বাঁক, কিছু না মেলবার সেই শুরুর দিনেও যখন একসাথে চোয়াল শক্ত হয় সকলের- বোঝা যায়, ম্যাককালামের গলফ খেলার ব্যস্ততার অজুহাত শুনে দাঁত পিষেছে সবাই। বন্ধু তোমার ঘাড় ভেঙে পলাশীর মোড়ে বকেয়া দোকান বিল রেখে ভেগেছে, তুমি হেসে ফেলেছো ম্যাট প্রায়রকে বোকা বানিয়ে মুশফিকুরের বুদ্ধিদীপ্ত স্টাম্পিং মনে করে। হল ফুটবল বা আন্তঃবিভাগীয় ক্রিকেট ম্যাচ, উত্তেজনায় কাঁপতে থাকা সবুজ মাঠে অমন মাতাল হয়ে ছুটতে থাকার পাগলামিও শিখিয়ে দিয়ে গেছে রুবেল হোসেন, ইয়র্কারে কাইল মিলসের স্টাম্প তোলপাড়- তোমার আর ষোলো কোটির অভিধানে সগর্ব প্রবেশ বাংলাওয়াশে’র। দিন ফুরোলো চোখের পানির, এখন সময় 'ধরে দিবানি’র।

     

    আর তারপর আসতে থাকে উপলক্ষ সব, একের পর এক। বিশ্বকাপ আসে, মাশরাফির কান্না শোনা যায় এগারোটা জার্সির আড়ালে। ৫৮ আসে, ৭৮ আসে। কিন্তু গ্রায়েম সোয়ানকে উড়িয়ে মারা শফিউল ইসলামও তোমার সাথে ছুটতে থাকে পতাকাটা নিয়ে। তোমার গর্বই তো বেশি। এই লাল আর সবুজ তোমার, উনিশশো সাতানব্বইয়ের এক মেঘলা দিনে সাদা পোষাকের আকরাম খানের আটষট্টি এই জার্সি তুলে দিয়েছে তোমার গায়ে- ঐ ৫৮ আর ৭৮-এ তুমি সেটা ফেলে যাবে? ভুলে যাবে গলা উঁচু করে সিডন্সের ড্রেসিংরুমের সাথে তুমিও গাইছো ‘আমরা করবো জয় একদিন’?

     

    তুমি সেই লাল-সবুজের জার্সি ছেড়ে দাও নি তাই। ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচারে, মুশফিকের বাবার প্রার্থনায়, পা হারানোর ঝুঁকিতে থাকা মাশরাফির সর্বস্ব উজাড় করে দেয়া প্রচেষ্টায় সেই সবুজ লাল আগুন থাকে তোমার সাথে। তাই নিউজিল্যান্ড কী ওয়েস্ট ইন্ডিজ কী জিম্বাবুয়েকে ছাড়িয়ে যাবার পথে এশিয়া কাপের ফাইনালও আসে। দুইটা রানের ব্যবধানে এগারোটা লাল-সবুজের জার্সি কাঁদে, তুমিও কাঁদো। প্রতিটা বল তুমিও তো খেলে গেছো মনে মনে, একা শুধু মাহমুদুল্লাহই খেলেনি।

     

    অথচ ধ্রুবক হয়ে থাকা এই লাল-সবুজের আগুনের মাঝেও সমীকরণ পালটায় সময়ের। ক্যাম্পাস শেষে কামলাজীবন। সকালে উঠতে হয়, জ্যাম পেরিয়ে বাড্ডা গিয়ে উপরের ঝাড়ি। কিন্তু তুমি তো জানোই ওদিকেও সবসময়ই মুখিয়ে থেকেছে নভোজোত সিধু আর মন্দিরা বেদী; রমিজ রাজা আর সঞ্জয় মাঞ্জরেকার টুইট করে গেছে। তুমি যেমন বারো ঘন্টা অফিস করছো - ওদিকে আফগানিস্তান কাণ্ড এসেছে, ধরতে ধরতে সিএনজিটা ফসকে বেরিয়ে গেছে - রেডিওতে শুনলে হাতের মুঠো থেকে চলে গেছে আরো একটা ম্যাচ। তিন মোড়ল ক্রমাগত বলে গেছে, ক্রিকেটটা আমরাই খেলবো - তোরা সেখানে বেমানান,অছ্যুত। তবু তোমার অফিসের দৈন্য, সিএনজি সিন্ডিকেটের সামনে তোমার অসহায়ত্ব আর সরকারী ব্যাংকের অফিসারের দেয়া অপমান ঘন্টার পরে ঘন্টা ধরে তুমি সহ্য করে গেছো কেবল একবার টিএসসি’র মিছিলে ছুটে আসতে পেরে। একটু এদিক ওদিক করে দিলে জয় গোস্বামী যেমন ওই কবিতায় বলে গেছে-

     

    ‘তারপর প্রত্যেকটা বল ষোলো কোটি লোক

    খেলেছে নিজের মনে মনে

    শূন্য কিংবা শতরান

    পেয়েছে তারাও।

    যদিও রেকর্ড বইতে কোথাও তাদের নাম নেই।’

     

     

    এশিয়া কাপের ফাইনালের পালটা জবাব দেয়া শুরু করেছে মাহমুদুল্লাহ- দুই সেঞ্চুরির চওড়া ব্যাটে। জবাব দেয়া শুরু করেছে তাসকিন তার গতির তোড়ে। জবাব দিয়েছে সৌম্য, মিড উইকেট থেকে কভারের যত্রতত্র প্রতিপক্ষকে আছড়ে ফেলে। জবাব দিয়েছে তোমার হয়ে। কিন্তু তুমি যেমনটা জেনে গেছো পৃথিবীতে যা ঘটার তা ঘটে না সহজে, বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল তাই হাতছানি দিয়ে হতাশ করে যায়। এগারোটা জার্সি সেটা তোমার সাথে সহ্য করে নেয় বুকে আগুন রেখে। ঝিনুক নীরবে সহো, নীরবে সহে যাও।

     

    ... তুমি আর ষোলো কোটি, সয়ে গেছো। এরপর কমতে থাকা লোডশেডিং আর বাড়তে থাকা গাড়ির জ্যামে চওড়া হয়ে গেছে সৌম্য-তামিমের ব্যাট। দুমড়ে মুচড়ে ছিটকে পড়েছে পাকিস্তান; আরাফাত সানি আর মুশফিকেরা গুঁড়ো গুঁড়ো করে দিয়েছে আফ্রিদি বা আজমল মিথ। নীরবে সইবার দিন শেষে মুক্তো ফলিয়েছে মুস্তাফিজ। অভূতপূর্ব পেস কোয়াট্রেটে ধ্বসে গেছে মহাভারতের রথ, এই মওকায় বড় বিপন্ন দেখিয়েছে কোহলি আর মাঞ্জরেকারদের।

     

    আর তুমি যখন দেখো- ধাওয়াল কুলকার্নিকে নাজেহাল করে সাব্বির মনে করাচ্ছে পাড়ার ক্রিকেট, মরনে মরকেলকে অবলীলায় উড়তে শেখাচ্ছে সরকার আর দু প্লাসি-ডুমিনি বিপর্যস্ত সাকিব-মুস্তাফিজে, টিভির গলায় ‘শিয়ার বেলিজারেন্স ফ্রম দেম- ইটস জাস্ট দ্য নিউ ফেইস অফ বাংলাডেশ ক্রিকেট!’ শুনে তুমি মনে করো সেই আদি অকৃত্রিম জাফরুল্লাহ শরাফতকে, তোমার মনে হয় সেই ঊনিশশো সাতানব্বই, সেই রঙে হাসবার দিনের দেড়যুগ পেরিয়ে গেছে এতোদিনে। প্রতিটা বলে তুমিও তো খেলে গেছো নিজ মনে, সেটা শুধু লেখা নেই কোথাও।

     

    ঈদে বাড়ি ফেরার টিকেট দুষ্প্রাপ্য। তবু তুমি, যে ঈদ করছো রাত জেগে রোগীর পাশে দাঁড়িয়ে, যে ঈদ করছো হাজার মাইল দূরের কোনো দেশের ল্যাবে, যে ঈদ করছো মায়ের সাথে- সেই তুমি তবু খোঁজ রাখো অস্ট্রেলিয়া কবে আসছে। সাদা পোষাকের খেলার কথা ভেবে কিছু শঙ্কা আর অনেক আশা নিয়ে তবু প্রস্তুত হও ভূতের গলির চিপা রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে কোনো সেলুনের পাশে হঠাৎ রিকশা থামিয়ে ‘চাচা, রান কত?’ বলে প্রশ্ন করার জন্যে।

     

    চারপাশে সব বাঁচিয়ে চলার এই যুগেও তাই মাশরাফি যখন বলেন- ‘আমরা নায়ক নই, আমরা শুধু মানুষকে আনন্দ দেই মাত্র। আসল নায়ক তো মুক্তিযোদ্ধারা, আমরা ক্রিকেট খেলতেই পারছি তাদের জন্যে।’- তখন তোমার মনে হয়, মনে হয় আরো ষোলো কোটির, নায়ক না হলেও এরই অধিনায়ক হওয়া সাজে। তুমি তখন কবিতা পড়...

     

    ‘যা যা তোমরা পাওনি জীবনে

    তোমাদের যেখানে যেখানে অপমান

    যারা যারা দুরছাই করলো তোমাদের

    সমস্ত কিছুর পালটা জবাব দেবার জন্যে

    একজন দাঁড়িয়েছে ব্যাট হাতে...’

     

    আর কবিতা পড়ে স্টান্স নিয়ে তুমি আবার একাত্ম হয়েছো সেই ব্যাটটার সাথেই। এগারোটা জার্সির সাথে মিলে মিশে এক হয়ে যেতে থেকে হাসিতে ভাসতে ভাসতে তুমি স্মৃতির আগুনের আঁচে কেঁদে ফেলেছো। সৌম্যের অনুকরণে আকাশের দিকে চেয়ে ক্রিকেট বিধাতাকে তুমি বলেছো, এ আগুন ছড়িয়ে যাক সবখানে...