• ক্রিকেট

মাহমুদউল্লাহর 'অন্যরকম অপেক্ষার' গল্প


অপেক্ষার ফল কতটা মধুর হয়, মাহমুদউল্লাহর চেয়ে ভালো আর কারও বোধহয় এই মুহূর্তে জানার কথা নয়।

একটা অপেক্ষার জন্য তৃষিত ছিলেন আটটি বছর। ২০১০ সালে হ্যামিল্টনে টেস্টে সেই যে সেঞ্চুরি পেয়েছিলেন, এরপর তা হয়ে গিয়েছিল সোনার হরিণ। মাহমুদউল্লাহ ‘টেস্টে চলেন না’- শুনতে হয়েছে এমন কথাও। জিম্বাবুয়ের সঙ্গে এই মাসে মিরপুরে অবশেষে সেই ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বেরুলেন মাহমুদউল্লাহ। কী আশ্চর্য, সেই মিরপুরেই পরের সেঞ্চুরির জন্য মাত্র সপ্তাহদুয়েকের কিছুটা বেশি অপেক্ষা করতে হলো। এই সেঞ্চুরির উদযাপনে তাই আগের বারের মতো বাঁধভাঙা আবেগ মিশে ছিল না। অপেক্ষা অবশ্য আজও করতে হয়েছে তাঁর, তবে সেটা ছিল অন্যরকম।

সকালে অবশ্য মনে হচ্ছিল সেই মুহূর্তটা দ্রুতই এসে যাবে। সাকিব আল হাসান চলে যাওয়ার পর লিটন দাসের সঙ্গে জুটিটা জমে উঠেছিল দারুণ। লিটনই বেশি আগ্রাসী ছিলেন, তবে মাহমুদউল্লাহও খুব বেশি পিছিয়ে ছিলেন না। এরপর মিরাজ এলেন, আরেকটু সাবধানী হলেন। তাইজুল আসার পর খোলসে ঢুকে গেলেন আরেকটু। ৮০ করতে যেখানে ১৪০ বল খেলতে হয়েছে, পরের ২০ রানের জন্য খেলতে হলো ৬৩ বল। সকালে দ্রুত রান তোলার অবশ্য ব্যাখ্যা আছে মাহমুদউল্লাহর, ‘আমার মনে হয় নতুন বল থাকার সময় বল কিছুটা ভালো ব্যাটে আসছিল। ওই সময়টায় স্কোরিং অপশন কিছুটা হলেও ভালো ছিল, যেহেতু বল ব্যাটে আসছিল। বল পুরনো হলে রান করা কঠিন হয়ে যায়।’

লাঞ্চের পর রান তোলা এতোটাই কঠিন হয়ে গেল, নব্বই থেকে একশ পর্যন্ত আসতেই প্রায় ঘন্টাখানেক লেগে গেছে তার। তখন ৮ উইকেট চলে গেছে, তাইজুল যদি আউট হয়ে যেতেন তাহলে আজকের গল্পটা অন্যরকম হতে পারত। তবে মাহমুদউল্লাহ নিজেই বলেছেন, কিছুটা স্নায়ুচাপে ভুগছিলেন। বাকিটা শুনুন তাঁর মুখেই, ‘আজ কিছুটা নার্ভাস ছিলাম। আমি বেশ কয়েকবার চিন্তাও করছিলাম একটা সুযোগ নেব। ডাউন দ্য উইকেটে এসে শট খেলব। তাইজুল বললো যে, "আপনি ভালো ব্যাটিং করছেন, সময় নিন।" তখন চিন্তা করলাম, আস্তেধীরেই এগুই।'

তারপরও তাইজুলের ওপর যে আস্থা রেখেছেন, সেটা বড় ব্যাপারই। তাঁর ৯৫ রানে তাইজুল আউটও হতে পারতেন, ডিআরএসে আম্পায়ারস কলে বেঁচে গেছেন। মাহমুদউল্লাহ বললেন, সতীর্থের ওপর তাঁর বিশ্বাস ছিল, ‘আমার বিশ্বাস ছিল। শেষ ম্যাচে তাইজুল নাঈমের একটা পার্টনারশিপ ছিল। তাইজুল খুবই ভালো ব্যাটিং করেছে, নাঈমও ভালো ব্যাট করছিলো। আমার দুইজনের ওপরেই আস্থা ছিল। আমি তেমন জোরাজোরি করছিলাম না। আমার বিশ্বাস ছিলো যে তাঁরা আমাকে ওই ভারসাম্য দিতে পারবে।’

ক্যারিয়ারজুড়ে টেইল-এন্ডারদের ওপর সেই আস্থা অনেকবারই রাখতে হয়েছে মাহমুদউল্লাহকে। লোয়ার মিডল অর্ডারে ব্যাট করতে হয়েছে ক্যারিয়ারে, আগের সেঞ্চুরিতেও সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলেন মিরাজকে। এমনকি ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরির সময় সতীর্থ হিসেবে পেয়েছিলেন শফিউলকে। তবে সেবার কোনো ঝুঁকি নেননি, শফিউল ক্রিজে আসার পর চার-ছয় মেরেই পৌঁছে গেছেন তিন অঙ্কে। আর ২০১১ সালে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শফিউলের সঙ্গে সেই জুটিটা তো বাংলাদেশের ক্রিকেট পুরাণেরই অংশ হয়ে গেছে। টেইল এন্ডারদের নিয়ে খেলা শুধু নয়, তাঁদের ওপর আস্থা রাখার অভিজ্ঞতাও মাহমুদউল্লাহর কাছে নতুন কিছু নয়।

তারপরও আজকের ইনিংসটা তো অন্যরকমই। শুধু সেঞ্চুরির জন্য নয়, টেস্টের মেজাজ বুঝে সুযোগ মতো নিজেকে মেলে ধরার আর সংযত করার জন্যও। মাহমুদউল্লাহ বার বার বললেন, এই উইকেটে ব্যাটিং করা সহজ ছিল না। প্রতিটা রানের জন্য কষ্ট করতে হয়েছে অনেক। তবে টেকনিক নয়, নিজের মানসিকতার বদলটাকেই সেজন্য কৃতিত্ব দিচ্ছেন, ‘পরিবর্তন বলতে আমি মানসিকভাবে কিছুটা এনেছি। আমি চিন্তা করেছিলাম, টি-টোয়েন্টি আর ওয়ানডের সঙ্গেই আমার ব্যাটিংয়ের ধরনটা যায়। আমি চাচ্ছিলাম যে শুরু থেকেই ইতিবাচক থাকবো। যদি মারার বল প্রথম বলেই পাই, সেটাই করব। জিম্বাবুয়ের সঙ্গে যখন দ্বিতীয় টেস্টটা খেলতে নামি, আমি তখন থেকেই চেষ্টা করছিলাম…বল কি হবে না হবে এইসব আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো না। আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো আমার মানসিক স্থিরতা। ’

মাহমুদউল্লাহ অবশ্য আজ আউট হতে হতেও শুরুতে বেঁচে গেছেন বার দুয়েক। নিজেও পরে স্বীকার করেছেন, ভাগ্যের ছোঁয়া পেয়েছেন কিছুটা। তবে নিজেকে যেভাবে বদলেছেন, তাতে ভাগ্যের কিছুটা সাহায্য পেতেই পারেন। ভাগ্য তো সাহসীদের পক্ষেই থাকে। টেস্টে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পরও যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, মাহমুদউল্লাহকে সাহসী না বলাটা অন্যায়ই হবে!