• বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ
  • " />

     

    • বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ

    ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ২০১৮: অনেক আলোর মাঝেও আঁধার

    শেষ ভালো যার, সব ভালো তার- ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে সিরিজ জয়ের পর কথাটা মেনে না নেওয়াটা কঠিন। তবে বাংলাদেশের ওয়ানডেতে এই বছরের পরিসংখ্যান সাক্ষ্য দিচ্ছে, অনেক সঠিক টিক চিহ্নের ভেতরেও চোখ চলে যেতে পারে কিছু কালো দাগের ঘষামাজায়। তারপরও আগাপাশতলা হিসেবে বাংলাদেশের এই বছরের ওয়ানডেতে আঁধারের চেয়ে আলোটাই বেশি।

     

    তৃতীয় সফলতম দল, তৃতীয় সফলতম বছর

     

    শুধু জয়ের সংখ্যা হিসেব করলে এই বছরে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে শুধু ইংল্যান্ড আর ভারতই। এই বছর ২০টি ওয়ানডে খেলে ১৩টি জিতেছে মাশরাফি বিন মুর্তজার দল, হেরেছে ৭টিতে। জয় আর হারের অনুপাতে অবশ্য বাংলাদেশ আছে চার নম্বরে, সেখানে এগিয়ে থাকবে নিউজিল্যান্ড। তবে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ওপরের দিকে উঠতে থাকা গ্রাফটা ২০১৫ সালের পর এবারই সবচেয়ে উজ্জ্বল। বছরওয়ারি ওয়ানডে পরিসংখ্যানও এই সাক্ষ্য দেবে। জয় হারের অনুপাত হিসেব করলে ২০০৯ ও স্বপ্নের ২০১৫ সালের পর এটাই বাংলাদেশের ওয়ানডেতে সফলতম বছর। আর শুধু জয়ের সংখ্যা হিসেব করলে বাংলাদেশ এই বছরের চেয়ে বেশি জয় পেয়েছিল শুধু ২০০৯ ও ২০০৬ সালে। এই বছর ওয়ানডেতে যে তিনটি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বাংলাদেশ খেলেছে, জয় পেয়েছে সবকটিতেই। ২০০৯ ও ২০১৫ সালেই শুধু সবকটি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলে জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ।

     

    চারে আরও উঁচুতে মুশফিক

    ২০১৪ সাল থেকে ওয়ানডেতে নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার যে শুরু, এই বছর সেই পথে অনেকগুলো সিঁড়ি টপকে গেছেন মুশফিকুর রহিম। ৭৭০ রান নিয়ে এই বছর ওয়ানডেতে সেরা দশে জায়গা করে নিয়েছেন মুশফিক। এই বছর চার নম্বরে সবচেয়ে বেশি রানও তাঁর।  ফিট থাকলে প্রায় নিশ্চিতভাবেই শীর্ষ দশে তাঁর সঙ্গী হতেন আরেকজন। তামিম ইকবাল এই বছর ১২ ম্যাচ খেলেই করেছেন ৬৮৪ রান, ৮৫.৫০ গড়টা প্রায় অবিশ্বাস্য। ১২ ম্যাচের দুইটিতে সেঞ্চুরির পাশাপাশি ফিফটি পেয়েছেন আরও ছয়টিতে।

      

    মোস্তাফিজের ফিরে পাওয়ার বছর

    ধুমকেতুর মতো আবির্ভাব ২০১৫ সালে, তবে খুব শিগগিরই মুদ্রার উল্টো পিঠটাও দেখতে হয়েছিল মোস্তাফিজুর রহমানকে। চোটের জন্য পরের বছর প্রায় খেলতেই পারেননি, ২০১৭ সালে যুদ্ধ করতে হয়েছিল ফর্মের সঙ্গে। অবশেষে ২০১৮ সালে এসে ওয়ানডেতে নিজেকে ফিরে পেলেন। এই বছরের ২৯ উইকেট নিয়ে আছেন শীর্ষ বোলারদের তালিকায় আট নম্বরে। তবে তার চেয়েও বেশি স্বস্তি পাবেন  বছরে বাংলাদেশের বেশিরভাগ ওয়ানডেতেই খেলতে পারায়। ২৬ উইকেট নিয়ে শীর্ষ দশে আছেন মাশরাফি বিন মুর্তজাও। ২৩ উইকেট নিয়ে বেশি পিছিয়ে নেই রুবেল হোসেনও। ওয়ানডেতে বাংলাদেশের বোলিংয়ের জোয়াল ছিল এই পেসারত্রয়ীর কাঁধেই।

     

    মিরাজ-আবিষ্কার

    সাদা পোশাকে শুরু থেকেই ছিলেন উজ্জ্বল। রঙিন পোশাকে নিজেকে মানিয়ে নিতে অবশ্য একটু সময় লেগেছে মেহেদী হাসান মিরাজের। তবে ২০১৮ সালে প্রমাণ করেছেন, ওয়ানডেতেও এখন বড় একটা ভরসার জায়গা হয়ে উঠছেন। পরিসংখ্যান দেখে চট করে তা ধরতে পারা কঠিন। ১৫ ম্যাচে ২৯.৭২ গড়ে ১৮ উইকেট এমন আহামরি কিছুই নয়। তবে পরিসংখ্যান একটা জায়গায় তাঁর অবদানের সাক্ষ্য দিচ্ছে। এই বছর মিরাজ ওভারপ্রতি দিয়েছেন মাত্র ৩.৯৯ রান। অন্তত ১৫ উইকেট যারা পেয়েছেন, তাদের মধ্যে মিরাজের চেয়ে কম ইকোনমি রেট আছে ভারতের জাসপ্রিত বুমরাহ ও দুই আফগান- রশিদ খান ও মুজিব উর রেহমানের। আর পরিসংখ্যান বলছে না, এই বছর স্পিনে নতুন বল হাতে নিয়েও দারুণ সফল মিরাজ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ দিয়ে সেই প্রমাণের শুরু, এশিয়া কাপে ছিলেন দারুণ। আর ঘরের মাঠে শেষ ম্যাচে ৪ উইকেট নিয়ে রাঙিয়ে দিয়েছেন বছরের শেষটা।

     

    এবং বিশ্বকাপের মহড়া

    এই বছরের মাঝামাঝি থেকেই বাংলাদেশের ওয়ানডে প্রস্তুতিতে ঘুরে ফিরে এসেছে বিশ্বকাপ প্রসঙ্গ। বছর শেষে বাংলাদেশ একটা জায়গায় নির্ভার হতে পারে, বড় কোনো অঘটন না ঘটলে বিশ্বকাপ দলের অন্তত ১১ জনকে পাওয়া হয়ে গেছে। কাল সিলেটের শেষ ম্যাচে মাশরাফি বিন মুর্তজাও দিয়েছেন ইঙ্গিত, বিশ্বকাপে কমবেশি এই দলটাই থাকবে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ প্রস্তুতির বছরটা ছিল ভুলে যাওয়ার মতো, সে বছর ১৮টি ম্যাচের জিতেছিল মাত্র পাঁচটিতে। ২০১৫ বিশ্বকাপে শেষ আটে ওঠা ছিল সেদিক দিয়ে একটু অভাবিতই। এবার বিশ্বকাপ আরও মাস পাঁচেক দূরে থাকলেও এই বছরের পারফরম্যান্সে বাংলাদেশকে আরও বড় কিছুর স্বপ্ন দেখাতেই পারে।

     

    আলোর পাশেই অন্ধকার

    ট্রফির হাহাকার

    বছরের শুরুটা হতে পারত বাংলাদেশের প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট জয় দিয়ে। কিন্তু দারুণ শুরুর পরেও ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে এসে মুখ থুবড়ে পড়ল বাংলাদেশ, হেরে গেল শ্রীলঙ্কার কাছে। এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারতকে ঠিক বাগে না পেলেও শেষ বল পর্যন্ত খেলাটা নিয়ে যেতে পেরেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হয়নি। একটি ট্রফির আক্ষেপ তাই ঘোঁচেনি এই বছরেও। বিশ্বকাপের আগে হয়তো এটা একটা অশনী সংকেতও, বড় ম্যাচে স্নায়ুর পরীক্ষায় এখনো যে পাশ নম্বর পায়নি বাংলাদেশ!

     

    দল নির্বাচন যখন প্রহসন

    ওয়ানডেতে দল ভালো করলেও দল নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। এশিয়া কাপের মধ্যে যেমন হঠাৎ করে উড়িয়ে নেওয়া হয়েছে ইমরুল কায়েস ও সৌম্য সরকারকে। অথচ ওই সময় হুট করে দলে ফেরার মতো কিছু করেনওনি দুজন। সিদ্ধান্তটা তখন কাজে লেগে গেলেও প্রক্রিয়াটা নিয়ে প্রশ্ন উঠছেই। যেমন উঠছে সাকিব আল হাসানের এশিয়া কাপ খেলা নিয়েও। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ২০-৩০ শতাংশ ফিট থাকার কথা বলেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ওই চোট তাঁকে শেষ দুই ম্যাচে খেলতেই দিল না। সাকিবকে জোর করে খেলানো হয়েছিল কি না, উঠেছে এমন প্রশ্নও।

     

    ব্যাটিং অর্ডারে ‘ডিসঅর্ডার’

    এই বছরটা সবচেয়ে বড় প্রমাণ, মধুর সমস্যা বাংলাদেশের জন্য তিক্ত হয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগে না। চার ওপেনারকে একসঙ্গে রাখার জন্য সৌম্যকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে লোয়ার মিডল অর্ডারে। ওপেনার হয়ে মিডল অর্ডারে খেলতে হয়েছে ইমরুলকেও। আবার সাকিব এই বছর ওয়ানডেতে তিনে উঠে এলেও বছর শেষে আবার চলে গেছেন নিজের পুরনো পজিশনে। সৌম্য শেষ ম্যাচে তিনে নেমে দারুণ করায় চার ওপেনার একসঙ্গে খেলানোর অসারতাও প্রমাণ হয়ে গেছে। আপাতত এই ব্যাটিং অর্ডারটা স্থিতিশীল মনে হতে পারে, কিন্তু বিশ্বকাপের আগে সেটা যে আরো অদ্ভুত পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্যে যাবে না, সেই দিব্যি কে দিতে পারে?