• উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ
  • " />

     

    • উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ

    পাগলাটে ম্যাচে সিটিকে বিদায় করে সেমিফাইনালে টটেনহাম

    আপনি দেখেননি, কেউ দেখেনি। চ্যাম্পিয়নস লিগই এমন কিছু দেখেনি এর আগে। রাহিম স্টার্লিং ম্যাচের ৯৩ মিনিটে গোল করে উদযাপনও করে ফেলেছিলেন। রোমাঞ্চকর ম্যাচে ৫-৩ গোলে জিতে সিটিই তখন সেমিফাইনালে। মাটিতে শুয়ে পড়েছেন টটেনহাম হটস্পার খেলোয়াড়রা। হুগো লরিস জানেন, ম্যাচটা আর বাঁচাতে পারলেন না তিনি। কিন্তু এটা তো আর দশটা ফুটবল ম্যাচের মতো না। ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদল ফুটবলের ধর্ম। কিন্তু সেই ধর্ম নিপাতনে সিদ্ধ হয়ে যে আরও শুদ্ধতম রূপ নিতে পারে- সেটা কে জানত। স্টার্লিংয়ের উদযাপন তখনও থামেনি। কিন্তু রেফারি এরই মধ্যে কানে হাত দিয়ে ফেলেছেন। তিনি প্রথমে জানলেন, এরপর জানালেন। মাঠের জায়ান্ট স্ক্রিনে ভেসে উঠল, নো গোল। অফসাইড। গোলের বিল্ডআপে সার্জিও আগুয়েরো ছিলেন অফসাইডে। গোল বাতিল! এরপর আর কয়েক সেকেন্ড বাকি ছিল। রেফারির শেষ বাঁশির পর এবার লুটিয়ে পড়লেন স্টার্লিংরা। আর লরিসরা মাতলেন উৎসবে।

    ম্যাচ শুরুর ১১ মিনিটের মধ্যে চার গোল। তাও দুই গোল করে দুই দলের! এরপর প্রথমার্ধে ম্যানচেস্টার সিটি গোল করল আরেকবার। কিন্তু তাতেও দুই লেগ মিলিয়ে ৩-৩ এ সমতা। অ্যাওয়ে গোলের নিয়মে টটেনহাম হটস্পারই তখনও এগিয়ে। কিন্তু পুরো এক অর্ধ বাকি বাকি। খেলা যে সেখানেই থামবে না সেটা বোঝাই যাচ্ছিল, থামেওনি। সার্জিও আগুয়েরো আরেকটি 'আগুয়েরোওওও' মুহুর্ত এনে দিয়েছিলেন ইতিহাদে। কিন্তু ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়নি আগুয়েরোর ওই গোলে। বদলি ফার্নান্দো ইয়োরেন্তের ৭৩ মিনিটের গোলে দ্বিতীয় লেগে ৪-৩ ব্যবধানে হেরেও দুই লেগ মিলিয়ে ৪-৪ এ ড্র করে অ্যাওয়ে গোলে এগিয়ে থেকে টটেনহাম হটস্পার বিদায় করে দিয়েছে ম্যানচেস্টার সিটিকে। সেমিফাইনালে তাই আয়াক্সের মুখোমুখি হচ্ছে টটেনহামই।

    ম্যাচটা যেহেতু পাগলাটে। সেটার মীমাংসাও হয়েছে রোমাঞ্চকর। কর্নার থেকে ইয়োরেন্তের লাফিয়ে উঠেছিলেন হেড করতে। কিন্তু বল লাগল তার উরুতে। হাতও খানিকটা ছুঁয়ে গেল বোধ হয়। কিন্তু হাত ছিল শরীরের সঙ্গেই, এক্সটেন্ডেড নয়। কয়েক মিনিট সময় ব্যয় করে পরে রেফারি সুনেত সেকির দিলেন গোলের সিদ্ধান্তই। অথচ ইয়োরেন্তের হয়ত তখন থাকারই কথা ছিল না। প্রথমার্ধে ইনজুরি নিয়ে মাঠ ছাড়া মুসা সিসোকোর জায়গায় নেমেছিলেন তিনি। স্প্যানিশ স্ট্রাইকারই শেষ পর্যন্ত ভাগ্য গড়ে দিয়েছেন ম্যাচের।

    ম্যাচের আগে ঘরের সমর্থকদের কাছ থেকে আলাদা করে সমর্থন চেয়েছিলেন পেপ গার্দিওলা। সেটা পেলেন একেবারে শুরুর মিনিট থেকেই। ম্যাচের মাত্র ৪ মিনিটে রাহিম স্টার্লিং দারুণ এক গোল করে সমর্থকদেরও উদযাপনের উপলক্ষ্য এনে দেন। কেভিন ডি ব্রুইন ছিলেন এবার শুরু থেকেই। তিনিই বাম দিকে বলটা দিয়েছিলেন স্টার্লিংকে। কাট করে ডান পায়ের বাঁকানো শটে গোল করে টটেনহামের প্রথম লেগের গোল শুরুতেই শোধ করে দেন ইংলিশ ফরোয়ার্ড।

    স্টার্লিং বন্দনায় মাতার সুযোগ অবশ্য হয়নি এরপর। দুই ম্যানেজারের ছক কাটা কৌশলও কাজে আসেনি। এরপর হয়েছে যেন বাস্কেটবল। এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে, আর আক্রমণ মানেই যেন গোল! আইমেরিক লাপোর্তে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে ডিবক্সের ঠিক সামনে দিয়ে দিলেন হিউ মিন সনকে। দক্ষিণ কোরিয়ান সুযোগ হাতছাড়া করলেন না, ৭ মিনিটেই আবার টাইয়ে এগিয়ে দিলেন টটেনহামকে। লাপোর্তে এরপর ভুল করলেন আরেকবার। ১০ মিনিটে তার কাছ থেকে বল কেড়ে নিলেন লুকাস মউরা, এরপর ক্রিশ্চিয়ান এরিকসেনের লে অফ প্রায় একই জায়গায় আবার খুঁজে পেল সনকে। তিনি এবারও সফল! চোখের পলকেই ২-১ এ এগিয়ে গেল টটেনহাম। ইনজুরিতে হ্যারি কেইনের মৌসুমটাই শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তাতেও গোল পেতে অসুবিধা হলো না মাউরসিওর পচেত্তিনোর দলের। নতুন নায়ক যেন সনই।

    সিটিকে তখন জিততে হলে করতে হত আরও তিন গোল। কিন্তু খেলা যখন গোলের, তখন অপেক্ষা কীসের! সনও খুব বেশিক্ষণ 'নায়ক' হয়ে থাকতে পারলেন না। পরের মিনিটে গোল। বের্নার্দো সিলভা কঠিন অ্যাঙ্গেল থেকে ড্যানি রোজ আর হুগো লরিসকে ফাঁকি দিয়ে স্কোরলাইন বানালেন ২-২। চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে এতো দ্রুত সময়ে ৪ গোলের রেকর্ড এবারই প্রথম।

    ডি ব্রুইনকে প্রথম লেগে শুরু থেকে না নামিয়ে যে গার্দিওলা ভুল করেছিলেন সেটা আজ বেলজিয়ান ফুটবলার বারবারই প্রমাণ করে গেছেন। ২১ মিনিটে করলেন দ্বিতীয়বারের মতো। ডানদিক থেকে ফারপোস্টে ক্রস করেছিলেন। কোণাকুণি শটে এরপর স্টার্লিং করেন ম্যাচের দ্বিতীয় গোল।



    ২১ মিনিটে তাই ইতিহাদ দেখল ৫ গোলের ট্রেইলার। আর বাকি থ্রিলার জমা ছিল দ্বিতীয়ার্ধের জন্য। প্রথমার্ধের বাকিটা সময় অবশ্য পুরোটাই সিটি গোলের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরেছে। তবে উলটো সন হ্যাটট্রিকটাও করে ফেলতে পারতেন বিরতির ঠিক আগে। তার বাম পায়ের শট তখন অল্পের জন্য লক্ষ্য মিস করে যায়। কিন্তু সিটির গোলের সন্ধানে পুরোপুরি আক্রমণাত্মক খেলা থামেনি একবারের জন্যও। ড্যানি রোজ আর টবি অ্যাল্ডারভাইরেল্ডকে তাই দুটো দুর্দান্ত ব্লক করে টিকিয়ে রাখতে হলো দলকে। রোজ ঠেকিয়েছিলেন ডি ব্রুইনের ক্রস, আর অ্যাল্ডারভাইরেল্ড আগুয়েরোর শট।

    ৩-৩ এ সমতায় থাকা টাইয়ের দ্বিতীয় লেগের দ্বিতীয়ার্ধে আরও ক্ষুরধার সিটির আক্রমণ। ৫০ থেকে ৫৫ মিনিট পর্যন্ত টটেনহামের ওপর দিয়ে চললো স্টিমরোলার। স্টার্লিংয়ের নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে দিলেন হুগো লরিস। পরে রোজ আরেকবার সৌরভ ছড়ালেন টটেনহামের রক্ষণে। ৫৬ মিনিটে আরও একবার লরিস ঠেকালেন ডি ব্রুইনের বুলেট গতির শট।

     

     

    সিটির আক্রমণের তোপে অবশ্য কাউন্টার অ্যাটাকে টটেনহাম অশনী সংকেত দিয়ে রেখেছিল সেসময়টায়। ইয়োরেন্তের দূর্বল হেড একবার এডারসন সহজেই সেভ করেন তখন। আরেকবার সন প্রায় ফাঁকায় পেয়ে গিয়েও সুযোগটা কাজে লাগাতে পারেননি। কিন্তু এসব সিটি ভুলে গেল আগুয়েরোর এক মুহুর্তে ঝলকে। আবারও ডি ব্রুইন থ্রু বল বাড়ালেন, আগুয়েরো ডিবক্সের ভেতর ঢুকে পড়লেন সেটা ধরে। তখনও অনেক কাজ বাকি। অ্যাঙ্গেলটা সহজ ছিল না। কিন্তু আগুয়েরো বাজি খেললেন। মারলেন নিয়ার পোস্টেই। লরিস প্রথম লেগে পেনাল্টি ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন তার, কিন্তু এবার আগুয়েরোই সফল। দুই লেগ মিলিয়ে ৫৯ মিনিটে সিটি এগিয়ে গেল ৪-৩ গোলে।

    কিন্তু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার অবস্থা ছিল না গার্দিওলার দলের। এক গোল লিডের ভরসায় অন্তত এমন ম্যাচে থাকা যায় না। তাই সিটির গোলক্ষুধা কমলো না তাতেও। কিন্তু ৭৩ মিনিটে সেই অশনী সংকেতটাই সত্যি হয়ে গেল সিটির জন্য, কর্নার থেকে ইয়োরেন্তের গোলে।

    লিরয় সানেকে এদিনও দেরিতেই নামালেন গার্দিওলা। সানের একটা ক্রস প্রায় গোল পাইয়ে দিয়েছিল ইলকে গুন্ডোয়ানকে। কিন্তু আহামরি ফিনিশ দরকার ছিল, তার ভলিটা হলো মিডফিল্ডাদের মতোই।

    আর শেষদিকে তো সেই ভিএআর রঙ্গ! সেই রঙ্গে টটেনহামের উৎসবে রং চড়লো আরেকটু বেশি। মাউরিসিও পচেত্তিনো চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নর্থ লন্ডনের ক্লাবকে নিয়ে গেছেন সেমিফাইনালে। নতুন স্টেডিয়ামে, নতুন রেকর্ড- সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো টটেনহামের জন্য। আর উলটো চিত্র গার্দিওলার। আরও একবার ব্যর্থ, আরও একবার সেই ইংলিশ দলের বিপক্ষেই কোয়ার্টার ফাইনালে স্বপ্ন ভঙ্গ তার।