• উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ
  • " />

     

    • উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ

    টটেনহামকে হারিয়ে ১৪ বছরের অপেক্ষা ফুরোল লিভারপুলের

    চ্যাম্পিয়নস লিগে এর আগের দুই ফাইনালে খালি হাতে ফিরেছিল লিভারপুল। ইয়ুর্গেন ক্লপের ভাগ্যটাও ছিল একইরকম। দানে দানে তিন দান প্রবাদবাক্যটা খাটলো এবার দুই পক্ষের জন্যই। টটেনহাম হটস্পারকে ২-০ গোলে হারিয়ে ১৪ বছর পর আবার ইউরোপা সেরার মুকুট পরলো লিভারপুল। ছয়বার চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে অলরেডরা এখন ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ সফল দল। সামনে আছে শুধু এসি মিলান ও রিয়াল মাদ্রিদ।

    নখ কামড়ানো মুহুর্ত, রুদ্ধশ্বাস, এরপর চিৎকার করে উল্লাস বা চুপ মেরে যাওয়া- চ্যাম্পিয়নস লিগে এবার রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল এসব। ফাইনালটা হলো অন্যরকম। কিন্তু গল্পের শুরুটা রাতারাতি বদলে গেল না, মিশে থাকল নাটকীয়তার রেশ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হতভম্ব হয়ে গেল টটেনহাম। রুদ্ধশ্বাস তখন ওয়ান্ডা মেট্রোপলিটানোর লাল গ্যালারি। ২৯ সেকেন্ডে টটেনহামের বিপক্ষে পেনাল্টির বাঁশি বাজালেন স্লোভেনিয়ান রেফারি দামির স্কোমিনা। কিক অফ থেকেই টটেনহামের অর্ধে চলে গিয়েছিল লিভারপুল। সাদিও মানে ছিলেন ডিবক্সের ভেতরে ঠিক মাথায়। তার পাশেই ছিলেন মুসা সিসোকো। মানে বল উঠিয়ে মারলেন, সেটা গিয়ে বাহুর নিচের অংশে লাগল টটেনহাম মিডফিল্ডারের। এক্সটেন্টেড হ্যান্ড তাই, রেফারির পেনাল্টির সিদ্ধান্তে ভিএআরও বাগড়া বাঁধানোর প্রয়োজনীয়তা মনে করেনি। কিন্তু তাতে সময় গেল কিছুক্ষণ। তাই মোহামেদ সালাহ যখন পেনাল্টি নিতে গেলেন, ততোক্ষণে ঘড়ির কাটা প্রায় দুই মিনিট ছুঁয়েছে। সালাহ মারলেন সোজাসুজি। হুগো লরিস ঝাপ দিলেন নিজের বাম দিকে। ১ মিনিট ৪৮ সেকেন্ডে এগিয়ে গেল লিভারপুল।



    আগেরবার কিয়েভের ফাইনালে সালাহ মাঠ ছেড়েছিলেন ইনজুরিতে পড়ে, চোখের জলে। এবার ফুটবল বিধাতা তাকে ফিরিয়ে দিলেন দু হাত ভরে। সময় নিলেন না দুই মিনিটও।

    মাউরিসিও পচেত্তিনোর দলকে তাই শুরু থেকেই ছুটতে হলো পিছিয়ে থেকে। এমন কিছুর জন্য নিশ্চয়ই প্রস্তুত ছিলেন না তিনি। চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে এর চেয়ে দ্রুত সময়ে গোল হয়েছে মাত্র একবার। ২০০৫ সালে মিলানের হয়ে লিভারপুলের বিপক্ষে সেবার গোল করেছিলেন পাওলো মালদিনি। তবে আরেকটা প্রবাদ বাক্যও হয়ত তখন সান্ত্বনা দিচ্ছিল টটেনহাম ম্যানেজারকে- গোল হজম করলে শুরুতেই করো, তাতে শোধ করার অনেক সময় পাওয়া যাবে।

     

     

    টটেনহামকে সেই সুযোগটা লিভারপুল দিয়ে রেখেছিলেন ম্যাচ শেষের ৩ মিনিট আগ পর্যন্তও। শেষদিকে হুট করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল টটেনহামের আক্রমণভাগও। কিন্তু ডিভক অরিগি সেটা থামিয়ে দিয়েছেন ৮৭ মিনিটে গোল করে। ইনজুরি সময়ের ৫ মিনিটও তাই নিছক আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থেকেছে মাদ্রিদের ফাইনালে।

    এর মাঝের সময়টাকে আপনি টটেনহামের বলতে পারেন। কিন্তু সেই দাবির পেছনে যুক্তি দাঁড় করাতে পারবেন না। ক্লপের বদলে যাওয়া লিভারপুল এতোদিন গোলের পর গোল করে বিনোদন দিয়েছে সমর্থকদের, কিন্তু শিরোপা পিপাসা মেটাতে পারেনি। সেটা মিটল ক্ল্যাসিক এক পারফরম্যান্সে। ৩৫.৪ শতাংশ বল পজেশন নিয়েও ম্যাচ জিতেছে লিভারপুল। বল পজেশনে পিছিয়ে থেকে শেষবার ফাইনাল জেতা দল হোসে মরিনহোর ইন্টার মিলান। ক্লপের দল ছিল ঠিক ততোটাই গোছানো। খেই হারিয়ে রক্ষণে প্রায় ভুলই করেনি তারা। আর শুরুতে পাওয়া পেনাল্টি বিতর্ক ছড়ালেও সেটা তো পক্ষেই গেছে লিভারপুলের। তাই পুরোটা সময় নিশ্চিন্তেই থেকেছেন অ্যালিসনরা।

    লিভারপুলের গোলরক্ষককে প্রথমার্ধে সেভ করতে হয়নি একবারও। ৪০ দিন পর মাঠে নামা হ্যারি কেইন তেমন সুবিধা করতে পারেননি শুরু থেকেই। লুকাস মউরাকে একাদশে না রেখে কেইনকেই নামিয়েছিলেন টটেনহাম ম্যানেজার। আলি, সন, কেইনরা প্রথমার্ধে ছিলেন চুপ মেরে। লিভারপুলও যে খুব বেশি আক্রমণ করেছে তা নয়, কিন্তু টটেনহামের বারপোস্টের ধারে কাছে গেলেই শট করেছে তারা। তাদের দুই ফুলব্যাক বেশিরভাগ সময় নেতৃত্ব দেন লিভারপুলের রক্ষণে। এদিন দুইজন ওপরে উঠলেন কম। প্রথমার্ধে যে কয়বার উঠলেন তার মধ্যে দুইবারই দুইজন বাজিয়ে দেখলেন হুগো লরিসকে দূর থেকে শট করে।

    দ্বিতীয়ার্ধ অবশ্য আক্রমণে ধার বাড়িয়েছিলেন টটেনহাম। কিন্তু অ্যাটাকিং থার্ডের আগেই সবগুলো চেষ্টা খালি হাতে ফিরেছে তাদের। প্রথমবার অন টার্গেটে শট করতে টটেনহামকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ৭৩ মিনিট পর্যন্ত। সেটা ছিল আলির দুর্বল এক চিপ। আর অ্যালিসনের সহজ এক সেভ।

    তবে এরও আগে দুই ম্যানেজার তাদের আগের দুই ম্যাচের নায়ককে নামিয়ে দিয়েছিলেন মাঠে। লুকাস মউরা নেমেছিলেন ৬৬ মিনিটে। ডিভক অরিগি ৫৮ মিনিটে।  রবার্তো ফিরমিনো একাদশে ফিরলেও তিনি তেমন একটা প্রভাব ফেলতে পারছিলেন না। বদলিটা তাই অনুমেয়ই ছিল।

    দ্বিতীয়ার্ধে টটেনহাম সামাল দিতে জেমস মিলনারকেও নামাতে হয়েছিল ক্লপকে। মিলনার অবশ্য  নেমে অন্য মিডফিল্ডের দখল নেওয়ার বদলে আরও ভালো কাজ করতে পারতেন। একটা সুযোগ পেয়েছিলেন ডিবক্সের সামনে। কিন্তু তার গ্রাউন্ট শট গেল অল্পের জন্য বাইরে দিয়ে। স্রোতের বিপরীতে তখন আর লিভারপুল গোল পায়নি। আরেকবার সিসোকো আর টবি অ্যাল্ডারভাইরেল্ড মিলে গোলবঞ্চিত করেছেন মানেকে। এছাড়া লিভারপুল ব্যস্ত ছিল নিজেদের অর্ধেই।

    অ্যালিসনকে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছে ৮০ মিনিটে। সনে দূর থেকে করা শট ফিস্ট করে সরিয়ে দিয়েছিলেন। পরে সেই আক্রমণ থেকেই আবার বল পেয়ে গিয়েছিলেন মউরা। স্পটকিক নেওয়ার ঠিক কাছাকাছি জায়গা থেকে। প্রায় একই জায়গা থেকে আয়াক্সের বিপক্ষে দ্বিতীয় গোলটি করেছিলেন। একইদিকে মেরেছিলেন, কিন্তু এবার গতি থাকল না তার শটে, অ্যালিসন সহজেই তাই ঠেকিয়ে দিলেন সেই চেষ্টা। ৮৫ মিনিটে ক্রিশ্চিয়ান এরিকসেনের ফ্রি কিক ঠেকিয়ে দিয়ে অ্যালিসন  করলেন ম্যাচের সেরা সেভটি।

    এর দুই মিনিট পরই সেই অরিগির সেই গোল। কর্নার ক্লিয়ার করতে পারেনি টটেনহাম। পরে সেখান থেকে বল যায় ডিবক্সের ভেতর বাম দিকে থাকা অরিগির কাছে। গোল বরাবর কোণাকুণি সোজা শট মেরে লরিসকে পরাস্ত করেন তিনি। ওই গোলেই স্বপ্ন ভঙ্গ টটেনহামের, আর স্বপ্নের পূরণ লিভারপুলের।

    ম্যাচশেষে ক্লপ ওই উৎসবের মধ্যেই আলাদা করে বললেন, অ্যালিসনের কথা। কঠিন সেভও নাকি সহজ বানিয়ে করেন তিনি। ততোক্ষণে লরিস ক্যারিয়াসও লিভারপুলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে টুইট করে ফেলেছেন। ক্লপ হয়ত এবার আফসোস ভুলতে পারেন। আগেরবারের কিয়েভের দুঃখ এবার মনে রাখার আর কোনো দরকারই নেই তার।

    আর শুনশান নীরব ড্রেসিংরুমে পচেত্তিনো কী বলবেন সেটাও আন্দাজ করা যায়। নিজেদের প্রথম ফাইনালে হার মেনেছে তার দল। এখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথাই বলবেন হয়ত তিনি। আর উদাহরণ তো সামনেই আছে। যে দলের কাছে কেবল হেরে এসেছে তারা, সেই লিভারপুল আর ক্লপের চেয়ে বড় উদাহরণ আর কারা হতে পারে এই মুহুর্তে! 

    একাদশ
    টটেনহাম
    লরিস, ট্রিপিয়ের, অ্যাল্ডারভাইরেল্ড, ভের্টনহেন, রোজ, হ্যারি উইংক্স, সিসোকো, এরিকসেন, আলি, কেইন, সন
    লিভারপুল
    অ্যালিসন, আর্নল্ড, মাটিপ, ভ্যান ডাইক, অ্যান্ড্রু রবার্টসন, ফাবিনহো, ওয়াইনাল্ডাম, হেন্ডেরসন, সালাহ, মানে, ফিরমিনো