• লা লিগা
  • " />

     

    • লা লিগা

    সিজন প্রিভিউ: জিদানের দ্বিতীয় অধ্যায়ের সামনে অনেক প্রশ্ন

    হুলেন লোপেতেগি, সান্তিয়াগো সোলারির ব্যর্থতার পর আবারও তাকে ম্যানেজার হিসেবে ফিরিয়ে এনেছিল রিয়াল মাদ্রিদ। গত মৌসুমের মাঝপথে ফিরে রিয়ালকে অবশ্য তেমন খোলনলচে বদলে দিতে পারেননি জিনেদিন জিদান, মৌসুমও শেষ করতে হয়েছে বার্সেলোনা এবং অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের পেছনে থেকে। নতুন মৌসুমের আগে রিয়াল এবং জিদান থেকে প্রত্যাশার চাপটা পারদসম। ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের অনুরোধে ফেরা জিদানও জানেন, গতবারের চরম ব্যর্থতার পর এবার আর পেছেন তাকানোর সুযোগ নেই তার দলের। 

     

    যারা এলেন, যারা গেলেন

    ২০১৭-১৮ মৌসুমের শুরুতে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ক্লাব ছাড়লেও কোনও ফরোয়ার্ড দলে ভেড়ায়নি রিয়াল। সেজন্য চড়া মাশুলও দিতে হয়েছিল তাদের। এবার অবশ্য সে ভুল করেনি ‘লস ব্লাঙ্কোস’রা। ১০০ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে চেলসি থেকে এডেন হ্যাজার্ডকে দলে নিয়েছে তারা। অবশেষে একজন স্ট্রাইকারকেও দলে ভিড়িয়েছে রিয়াল, ৬০ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে আইনট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে এসেছেন লুকা ইয়োভিচ। লিঁও থেকে লেফটব্যাক ফার্ল্যান্ড মেন্ডিকেও এনেছেন জিদান। পোর্তো থেকে এসেছেন ডিফেন্ডার এডার মিলিতাও। গত বছর সান্তোস থেকে দলে নেওয়া ফরোয়ার্ড রদ্রিগো রিয়ালে যোগ দিয়েছেন এবার। রিয়াল জারাগোজা থেকে ২.৫ মিলিয়ন ইউরোতে ‘নতুন আসেন্সিও’ খ্যাত আলবার্তো সোরোকেও এনেছে তারা, কিন্তু আগামী মৌসুম জারাগোজাতেই ধারে খেলবেন তিনি।

    ‘জাপানিজ মেসি’ খ্যাত তাকেফুসা কুবোকেও দলে ভিড়িয়েছে রিয়াল, কিন্তু আগামী মৌসুম রিয়ালের যুবদল কাস্তিয়ার হয়ে খেলবেন তিনি। নেইমারকে দলে নেওয়া নিয়ে রীতিমত যুদ্ধেই নেমেছে রিয়াল-বার্সা। ২ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে দলবদল বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত তাই নেইমারের রিয়ালে আসার ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না কিছু। পল পগবাকে পাওয়ার আশাও এবার সম্ভবত ছেড়ে দিতে হচ্ছে তাদের। 

     

     

    রিয়াল থেকে অন্য ক্লাবে ফুটবলারদের পাড়ি জমানোর হিড়িকই পড়েছে যেন। এখন পর্যন্ত মোট ১৪জন ফুটবলার রিয়াল ছেড়ে যোগ দিয়েছেন অন্য ক্লাবে। ৪৫ মিলিয়ন ইউরোতে চেলসিতে পাকাপাকিভাবে যোগ দিয়েছেন মাতেও কোভাসিচ। রিয়ালের প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাটলেটিকোতে যোগ দিয়েছেন মার্কোস ইয়োরেন্তে। গত মৌসুম রায়ো ভায়েকানোতে কাটানো রাউল দে টমাসের পরবর্তী গন্তব্য বেনফিকা। থিও হার্নান্দেজ যোগ দিয়েছেন এসি মিলানে। ধারে ক্লাব ছেড়েছেন দানি সেবায়োস (আর্সেনাল), সার্গিও রেগুইলন( সেভিয়া), হেসুস ভায়েহো (উলভস), মার্টিন ওদেগার্ড (রিয়াল সোসিয়াদাদ), আন্দ্রেই লুনিন (রিয়াল ভায়াদোলিদ)। লুনিনের মত কুবোরও ভায়াদোলিদে ধারে যোগ দেওয়ার কথাবার্তা চলছে, জানিয়েছে মার্কা। পুরো গ্রীষ্ম ক্লাব ছাড়ার কথা চললেও এখনও রিয়ালেই আছেন গ্যারেথ বেল। মার্কো আসেন্সিওর ইনজুরির কারণে শেষ পর্যন্ত হয়তো রিয়ালেই থেকে যাবেন তিনি। 

     

    যা জানা আছে

    গত মৌসুমে স্কোয়াড ডেপথের কারণে বেশ ভুগতে হয়েছিল রিয়ালকে। এবার অবশ্য সে অবকাশ থাকছে না জিদানের দলের। রক্ষণ থেকে ফরোয়ার্ড লাইন- এবারের দলবদলে সবখানেই স্কোয়াডের শক্তি বাড়িয়েছে রিয়াল। 

    রক্ষণে সার্জিও রামোস, রাফায়েল ভারান, নাচো ফার্নান্দেজদের সাথে থাকছেন মিলিতাও। ব্রাজিলের হয়ে কোপা আমেরিকা খেলায় প্রাক-মৌসুমে তাকে ঝালিয়ে নেওয়ার তেমন সুযোগ পাননি জিদান, কেবল শেষ দুই ম্যাচেই (রেডবুল সালজবার্গ এবং রোমা) খেলেছেন মিলিতাও। মার্সেলোর বিকল্প হিসেবে লেফটব্যাক পজিশন বেশ দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল রিয়ালের জন্য। তার ‘আন্ডারস্টাডি’ হিসেবে খেলবেন মেন্ডি। স্ট্রাইকার করিম বেনজেমার ‘ব্যাক আপ’ হিসেবে আছেন ইয়োভিচ।

     

     

    পুরো গ্রীষ্ম রিয়াল ছাড়া সময়ের ব্যাপার মনে হলেও হামেস রদ্রিগেজ এখনও আছেন জিদানের দলে। দলবদলের শেষদিকে তাদের অন্য কোনও দলে পাড়ি জমানোর সম্ভাবনাও কম। সেক্ষেত্রে জিদানের প্রথম পছন্দের মিডফিল্ডারদের (ক্রুস, মদ্রিচ, কাসেমিরো) ব্যাকআপ হিসেবে খেলবেন হামেস, ইস্কো। ফরোয়ার্ড লাইনে বেল, হ্যাজার্ডদের সাথে আছেন রদ্রিগো, ভিনিসিয়াস জুনিয়র, লুকাস ভাজকেজও। ইনজুরির কারণে মূল একাদশের কেউ লম্বা সময়ের জন্য দলের বাইরে চলে গেলেও হয়তো বিকল্প নিয়ে খুব একটা ভাবতে হবে না জিদানকে।

     

    যা নিয়ে সংশয়

    খুব সম্ভবত সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে অনিশ্চয়তায় ঘেরা মৌসুম শুরু করতে যাচ্ছেন জিদান এবং রিয়াল। প্রাক-মৌসুমের ফর্মের বিচারে আক্ষরিক অর্থেই লা লিগার সবচেয়ে খারাপ দল তারা। প্রি-সিজনের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে বানানো পয়েন্ট তালিকায় রিয়ালের অবস্থান ২০। গত ৪০ বছরে নিজেদের সবচেয়ে বাজে প্রাক-মৌসুম কাটিয়েছে তারা। একাধিক সমস্যার মধ্যেও গতবারের মত এবারও রিয়ালের মূল দুশ্চিন্তা সেই রক্ষণ নিয়েই। মিলিতাও, মেন্ডিরা আসলেও প্রাক-মৌসুমে খেলা ৭ ম্যাচে মোট ১৮ গোল হজম করেছে তারা; অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের কাছে হারতে হয়েছে ৭-৩ গোলের বড় ব্যবধানে। ১৮ গোল হজমের বিপরীতে ৭ ম্যাচে রিয়াল গোল করেছে মাত্র ১৩টি। হ্যাজার্ড-বেনজেমারাও গোল পাচ্ছেন না প্রত্যাশামত। রক্ষণ মূল সমস্যা হলেও আক্রমণভাগ নিয়েও কম দুশ্চিন্তা নেই জিদানের।

    রক্ষণের এমন তথৈবচ অবস্থার কারণে দলকে প্রাক-মৌসুমে ৩-৫-২ ফর্মেশনেও খেলিয়েছেন জিদান। তাতে অবশ্য লাভ হয়নি খুব একটা। ৩জন সেন্টার হাফ নিয়েও গোল খাওয়া থামেনি রিয়ালের, উল্টো আক্রমণভাগে নিজেদের মেলে ধরে পারেননি হ্যাজার্ডরা। মাঝমাঠের সাথে ফরোয়ার্ডদের বোঝাপড়ার অভাবটা ছিল সুস্পষ্ট। বেলজিয়ান ফরোয়ার্ডকে ‘সেকেন্ড স্ট্রাইকার’ বা বেনজেমার পেছনে ‘ফ্রি রোল’-এ খেলিয়েছেন জিদান, কিন্তু ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ‘৭’ নম্বর জার্সি পাওয়া হ্যাজার্ডও তার মতই বাঁ-প্রান্ত থেকে কাট করে ভেতরে ঢুকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কিন্তু নতুন ফর্মেশনে সেটা সম্ভবপর হচ্ছে না ঠিক। ব্যক্তিগত রেষারেষি থাকা সত্ত্বেও বেলকেও প্রাক-মৌসুমে খেলিয়েছেন জিদান।

     

     

    কিন্তু হ্যাজার্ডের মতই উইঙ্গারবিহীন ফর্মেশনে বেশ বিভ্রান্তই মনে হয়েছে তাকে। ক্রুস-মদ্রিচ-কাসেমিরোও রক্ষণে সাহায্য করবেন, না আক্রমণে পাস বাড়াবেন- এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুগেছেন বেশ। প্রায় এক মাস নিজেদের ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েও দলের ফর্মেশন নিয়ে এখনও হয়তো নিশ্চিত নন জিদান নিজেও। ৩-৫-২, ৩-৪-২-১, না নিজেদের পছন্দের ৪-৩-৩; এ ব্যাপারে এখনও মুখ খুলছেন না তিনি। এতে অবশ্য রিয়ালেরই ক্ষতি হচ্ছে বেশি। প্রতি ম্যাচেই নতুন ফর্মেশন চেষ্টা করায় রিয়ালের খেলায় বোঝাপড়ার অভাবটা চোখে পড়েছে বেশ ভালভাবেই। সেল্টা ভিগোর বিপক্ষে ১৮ আগস্ট মৌসুম শুরু করবে রিয়াল, কিন্তু এখনও অনিশ্চয়তা এবং একাধিক উত্তরহীন প্রশ্নের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে তারা। 

     

    শেষ পাঁচ মৌসুমের রিয়াল

    ২০১৪-১৫: ২য়

    ২০১৫-১৬: ২য়

    ২০১৬-১৭: চ্যাম্পিয়ন

    ২০১৭-১৮: ৩য়

    ২০১৮-১৯: ৩য়

     

     

    গত মৌসুমে ফেরার পরও তার অধীনে রিয়াল তেমন ভাল করেনি। অবশ্য সেবার স্কোয়াড নিজের মত করে বানাতে পারেননি জিদান। ট্রান্সফারের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা চাওয়া জিদানকে ঠিক তাই দিয়েছে রিয়াল এবার, পগবা বাদে এখন পর্যন্ত পছন্দের সবাইকেই দলে নিতে পেরেছেন তিনি। কিন্তু প্রাক-মৌসুমের ফর্ম দুশ্চিন্তার ভাঁজ হয়ে দাঁড়াচ্ছে রিয়ালের জন্য। কিন্তু জিদান আশ্বস্ত করেছেন, রিয়ালের জন্য অপেক্ষা করছে দারুণ মৌসুম। শেষ পর্যন্ত ফলাফল কী হবে, সেটা জানে না কেউই। কিন্তু জিদান হয়তো ঠিকই জানেন, সে রিয়াল তাকে এত অনুনয়-বিনয় করে ফিরে আসতে বাধ্য করেছে, প্রত্যাশা মেটাতে না পারলে আগামী মৌসুমে সেই তারাই হয়তো তাকে দেখিয়ে দেবে বিদায়ের দরজা।

     

    প্যাভিলিয়নের প্রেডিকশন: ৩য় (অনিশ্চয়তা, অগোছালো- এর চেয়ে ভালভাবে হয়তো বর্তমানে রিয়ালকে বোঝানো যায় না। লা লিগার দৌঁড়ে তাদের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাটলেটিকো বা বার্সার এত দুশ্চিন্তা নেই। শেষ পর্যন্ত এই বোঝাপড়ার অভাব, দল সাজানোর অনিশ্চয়তাই রিয়ালের কাল হয়ে দাঁড়াবে। চ্যাম্পিয়নস লিগেও হয়তো বিদায় নিতে হবে সেমিফাইনালের আগেই। মৌসুম শেষে জিদানের রিয়ালের হটসিটে থাকার সম্ভাবনাও তাই হয়তো ক্ষীণ)।