• " />

     

    একটা গোলেই জীবন বদল!

    জুরিখের মঞ্চ থেকে যখন তাঁর নামটা ঘোষণা করা হচ্ছে, ৯ হাজার কিলো দূরত্বে ব্রাজিলের গোইয়ানিয়ার সাদামাটা বাড়িটার বসার ঘরে ছোট্ট টিভিটা ঘিরে ভিড় করা আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব আর পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে পিনপতন নীরবতা। পুরো নামটা শোনার প্রয়োজনও বোধ করে নি কেউ, মুহূর্তের ব্যবধানে গোয়াইয়ানিয়ার আকাশ-বাতাস কাঁপতে শুরু করেছে ঘরের ছেলের বিশ্বজয়ের আনন্দে। বাড়িতে বসে মা কাঁদছেন, দর্শকসারিতে বসে কাঁদছেন স্ত্রী, মঞ্চে কাঁদছেন তিনি...তাঁর কান্নাবিজড়িত প্রতিক্রিয়া কাঁদাচ্ছে অনুষ্ঠানে অভ্যাগত নামী-দামী অতিথিদের, ইথারে ভেসে ভেসে সে কান্না ছড়িয়ে পড়ছে দুনিয়াজুড়ে টিভি পর্দার সামনে বসে থাকা অগুনিত দর্শকদের মাঝেও।

     

    অথচ এই ক’মাস আগেও ওয়েন্ডেল লিরাকে দুনিয়া দূরে থাকুক, ঠিকমতো চিনতো না তাঁর এলাকার লোকেই। ব্রাজিলের মতো ফুটবল তীর্থের দেশে যেখানে হাজারো ছেলে ফুটবল খেলে, সেখানে সাধারণ এক রাজ্য দলের অখ্যাত ফুটবলারটির মধ্যে আলাদা করে চেনার মতো কি-ই বা আছে?

     

    তবে তাই বলে তাঁর গল্পটা একেবারে ‘ঝড়ে বক মেরে ফেলা’র মতো নয়। ২০০৬ সালে ১৬ বছর বয়সে আঞ্চলিক লিগে খেলা শুরু করেন। পরবর্তী দুয়েক মৌসুমে গোল বের করে নিতে তাঁর মুন্সিয়ানা নজর কাড়ে জাতীয় যুব কোচদের। ব্রাজিলের অনূর্ধ্ব-২০ দলের এক প্রাথমিক তালিকায়ও চলে এসেছিল নামটা। এমনকি ইতালিয়ান ক্লাব এসি মিলান তাঁকে কিনেও নিতে চেয়েছিল ৬০ লাখ ব্রাজিলিয়ান রিয়াল মূল্যে। কিন্তু ভবিষ্যতে আরও ভালো দাম পাবার আশায় সে যাত্রায় তাঁকে ছাড়ে নি তাঁর তৎকালীন ক্লাব গোইয়াস।

     

     

    লিরার জীবনের দুঃসময়ের শুরুটা এরপরই। ২০০৮ আর ২০১০ সালে মারাত্মক দুটো ইনজুরির হানায় ক্যারিয়ারটাই ধ্বংস হয়ে যেতে বসে। ক্লাব তাঁকে ছেড়ে দেয়, সংসার চালাতে যোগ দেন ছোটখাটো এক পারিবারিক ব্যবসায়।

     

    ২০১৩ সালে নতুন করে ক্যারিয়ারটা শুরু করলেন বটে, কিন্তু কোথাও থিতু হতে পারছিলেন না। পরবর্তী দুই বছরে তিনি অন্তত ছ’টি ক্লাবে নাম লেখান। দুর্বিষহ সে সময়ের কথা মনে হলে এখনও অজান্তেই শিউরে ওঠেন তিনি।

     

    সেই ওয়েন্ডেল লিরার জীবনে মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার মতো দিনটা এলো গত বছরের ১১-ই মার্চ। নিজের নামটা গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেয়ার মতো অভাবনীয় এক কাজ নিজের অজান্তেই করে বসলেন। বৃষ্টিস্নাত দিনে আঞ্চলিক লিগে তাঁর দল গোয়াইয়ানেসিয়ার ম্যাচ ছিল অ্যাটলেটিকো গোইয়ানেন্সের বিপক্ষে। ডানপ্রান্ত দিয়ে আক্রমণে ওঠার পথে প্রতিপক্ষের ডি-বক্সের বাইরে তাঁর পায়ে এসে পড়া বলটা ডি-বক্সের ভিতর থাকা এক সতীর্থের দিকে বাড়িয়ে দিয়েই নিজে ছোটেন গোল অভিমুখে। আরও এক-দুই পাস হয়ে বলটা যখন তাঁর দিকে আসছে, ক্ষণিকের বুদ্ধিমত্তায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়তে পড়তে ডান পায়ের বাইসাইকেল শটে সেটা জালে জড়িয়ে দেন লিরা। কাকভেজা গ্যালারিতে বসে অসাধারণ গোলটা চাক্ষুষ দেখার সৌভাগ্য হয় মাত্র শ’ তিনেক দর্শকের।

     

    ব্যাপারটা এমন না যে ওই এক গোলে রাতারাতি তারকা বনে যান লিরা। গোটা কয়েক স্থানীয় পত্রিকায় খবর হয়েছিল বটে, কিন্তু তাতে আলোড়ন উঠেছিল সামান্যই। এমনকি তাঁর ক্লাব গোয়াইয়ানেসিয়া পর্যন্ত তাঁর সাথে চুক্তি দীর্ঘায়িত করার প্রয়োজন বোধ করে নি!

     

    ইউটিউবের কল্যাণে একজন, দু’জন করে দর্শকের সৌজন্যে গোলের ভিডিওচিত্র ছড়িয়ে গেলো। অতঃপর ফিফার তরফে যখন বছরের সেরা গোলের মনোনয়ন এলো, ‘বেকার’ লিরা তখন মায়ের ক্যাফেতে ক্যাশিয়ারের কাজ করেন। এবার অনেকটা রাতারাতির ঘটতে লাগলো অনেক কিছু। বাড়িতে টিভি ক্যামেরা এলো, সাংবাদিকদের ভিড় বাড়তে লাগলো। হাসিমুখে সাক্ষাৎকার দিতে দিতেই লিরা চুক্তিবদ্ধ হয়ে গেলেন দ্বিতীয় বিভাগের দল ভিলা নোভার সাথে।

     

    এরপর থেকে লিরার সময়টা কাটছে স্বপ্নের মতোই। মেসি, তেভেজ, কার্লি লয়েডদের মতো বিশ্বখ্যাত তারকাদের নামী দামী সব টুর্নামেন্টে করা গোলকে হারিয়ে তাঁর অখ্যাত গোলটাকেই দুনিয়াজোড়া ভোটারগণ বেছে নিয়েছেন বছরের সেরা গোল হিসেবে! কিংবদন্তী পুস্কারের নামে দেয়া বর্ষসেরা গোলের মালিক এখন তিনিই। অনুষ্ঠানের রাত পর্যন্ত চলা ভোটাভুটিতে মোট ১৬ লাখ ভোটের ৪৬.৭ শতাংশ পেয়েছে লিরার গোলটি। গত মৌসুমে কোপা দেল রে’র ফাইনালে অ্যাটলেটিকো বিলবাওয়ের পাঁচ ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে মেসির করা গোলটি পেয়েছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৩.৩ শতাংশ ভোট।

     

    মেসির মতো জীবন্ত কিংবদন্তীর গোলকে পিছনে ফেলে পুরস্কার জেতা দূরে থাকুক, তাঁর কিংবা নেইমার-রোনালদোর মতো তারকাদের সাথে কোনদিন সামনাসামনি দেখা হবে এই চিন্তাই দূরতম কল্পনাতে কোনদিন আসে নি তাঁর।

     

    সেই স্বপ্ন কিংবা কল্পনা যেটাই হোক...বাস্তব হওয়ার রাতে পৃথিবীর সবচেয়ে আলোকিত মঞ্চটায় উঠে লিরা যখন কাঁদছেন, বাড়িতে বসে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না মা মারিয়া এডুলুইজাও, “ওর নাম শুনে তো ভয়ই হচ্ছিল এই ভেবে যে নিশ্চয়ই ওরা কোথাও কোন ভুল করছে! একদমই বিশ্বাস হচ্ছিল না।”

     

    তবে মায়ের ঠিক উল্টো ধারণা ছিল ভাই থালাসের, “আমাদের বিশ্বাস ছিল যে ও জিতে যাবে। কেননা ভোটটা এখানে সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। এটাই আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল।

     

    কিন্তু লিরা নিজে পুরস্কার গ্রহণের পরও যেন বিনয়ের অবতার, “গোলটা দারুণ ছিল বটে, কিন্তু এর থেকেও ভালো গোল ছিল তালিকায়। আমি তো নিজে আমার গোলটাকে দশের মধ্যে আটের বেশী দেবো না।”

     

    নম্বর যতই দিন, একটা গোলে তাঁর জীবনটাই যে বদলে গেছে তা কি আর অস্বীকার করবার উপায় আছে? নাম-যশের সাথে লিরার এখন রোজগারের ব্যবস্থাটাও হয়ে গেছে বেশ ভালোভাবেই। স্বপ্নের মতো ঘটে যাওয়া সব কিছু লিরার কাছে মনে হচ্ছে ‘যেন আগে থেকেই কেউ লিখে রেখেছিল’!

     

    স্বয়ং পেলের মতো কিংবদন্তী বলছেন “লিরার এই অর্জন ব্রাজিলের ফুটবলকে নতুন করে বিশ্বমঞ্চে ফিরিয়ে এনেছে।” নেইমারের মতো তারকাকে শূন্য হাতে দর্শক সারিতে বসিয়ে রেখে অখ্যাত লিরা যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে গোটা দুনিয়া কাঁদিয়ে ফেলেন, তখন ক্ষণিকের জন্য হলেও তো ব্রাজিলের ‘পোস্টার বয়’ তিনিই!  

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন