• অন্যান্য
  • " />

     

    ইউটিউব লুপ : ‘ইট’স রেড ইন রাশিয়া’

    হয়তো একটা গান দিয়ে শুরু করেছেন, শেষে গিয়ে ঠেকেছেন কোনও ফুড রিভিউয়ে। ইউটিউবের সেই ক্ষমতা আছে, আপনাকে নিয়ে হারিয়ে যাওয়ার। তবে স্পোর্টসফ্যান হলে আপনি মাঝেই মাঝেই ইউটিউবে ঢুঁ মেরে দেখে নেন কোনও ম্যাচের কোনও অংশ, বা হাইলাইটস। সেসব দেখেন বারবার। আমরা এখানে বলেছি এমনই কিছু ভিডিওর কথা...

     

    ফুটবল, ব্লাডি হেল! 

    অম্লান মোসতাকিম হোসেন 


    স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন তখনও অবিশ্বাসের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারেননি। খানিক আগে যা দেখেছেন, সেটার রেশ লেগে আছে তার চোখমুখে। বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে উঠে যে কথাটা বললেন, সেটি ঢুকে গেছে ফুটবল পুরাণে, ‘আই কান্ট বিলিভ ইট, আই কান্ট বিলিভ ইট। ফুটবল ব্লাডি হেল!' ইউরোপিয়ান ফুটবলে তখন পর্যন্ত সেটি ছিল ফিরে আসার সম্ভবত সেরা গল্প। এরপর ইস্তাম্বুল, অ্যানফিল্ড বা ন্যু ক্যাম্পের সেই রাতগুলোতেও ফেসবুক-টুইটারে অনেকের স্ট্যাটাসে ফিরে এসেছে সেই শব্দগুলো, ‘ফুটবল, ব্লাডি হেল!’

    তা কী হয়েছিল সেদিন ন্যু ক্যাম্পে? চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে সেদিন মুখোমুখি হয়েছিল ম্যান ইউনাইটেড ও বায়ার্ন মিউনিখ। ইউনাইটেড সেবার লিগ জিতেছে আগেই, বেকহাম-গিগসরা সেদিন ছিলেন ট্রেবলের অপেক্ষায়। বায়ার্নের সঙ্গে জমজমাট একটা ফাইনালের অপেক্ষায় ছিল ন্যু ক্যাম্প। ম্যাচের ৬ মিনিটেই মারিও বাসলারের ফ্রিকিকটা ইউনাইটেডের মানব দেয়ালের পাশ ঘেঁষে বেরিয়ে জড়িয়ে যায় জালে। প্রথমার্ধে খানিকটা ছন্নছাড়া ইউনাইটেড ফিরে আসার চেষ্টা করে দ্বিতীয়ার্ধে। তবে আক্রমণাত্মক হতে গিয়ে দুইবার বেঁচে যায় একটুর জন্য। পোস্টের জন্য দুইবার গোলবঞ্চিত হয় বায়ার্ন। গোলের জন্য মরিয়া স্যার অ্যালেক্স ৬৭ মিনিটে নামিয়ে দেন টেডি শেরিংহামকে। আর খেলা শেষের ১০ মিনিট আগে সুপারসাব হিসেবে নামেন ওলে গানার সোলশার। কিন্তু গোলটা আসি আসি করেও আসছিল না। ডুইট ইয়র্ক কয়েক গজ দূর থেকে যখন বাইরে মেরে দেন, মনে হচ্ছিল রাতটা বায়ার্নের। 

    সময় প্রায় ফুরিয়ে এসেছে তখন। কর্নার পায় ইউনাইটেড, গোল করার জন্য ওপরে চলে আসেন গোলরক্ষক স্মাইকেল। ডাগআউটে তখন স্যার অ্যালেক্স চুইংগাম চিবুচ্ছেন একটার পর একটা, আর বার বার ঘড়ি দেখছেন। কর্নার হলো, সেখান থেকে গিগসের পা হয়ে শেরিংহামের কাছে চলে গেল বল। পা লাগিয়েই ফেটে পড়লেন উল্লাসে, বল জড়িয়ে গেল জালে। তবে নাটকের বাকি ছিল আরও। আরেকটি কর্নার পেয়ে যায় ইউনাইটেড। আবার বেকহামের কর্নার, এবার শেরিংহামের হেড খুঁজে নিল সোলশারকে। অত কাছ থেকে মিস করেননি, ফার্গুসন তখন ফেটে পড়েছেন উল্লাসে। শেষ মুহূর্তের দুই গোলে অবিশ্বাস্য এক ফেরার গল্প লিখল ইউনাইটেড। 

    সেই সোলশার এরপর ইউনাইটেডের কোচ হয়েছেন, এর মধ্যে আরও অনেক দারুণ ফিরে আসার গল্প লেখা হয়েছে। তবে ২৬ মে, ১৯৯৯ সালের এই ভিডিওটা আমার ইউটিউবে চলেছে অনেক অনেক বার।
     


    ফুটবল, ব্লাডি হেল!



    ‘ওয়াডা প্লেয়া, ওয়াডা ওয়ান্ডারফুল প্লেয়া...’

    প্রিয়ম মজুমদার 


    বছর কয়েক আগে লোকজনের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম, মৃত্যুশয্যায় যদি সুযোগ থাকে তাহলে শেষবারের মতো কোনো গান বা প্রিয় সিনেমার কোনো দৃশ্য কিংবা কোনো গল্পবই বা কবিতা বা খেলার কোন প্রিয় মুহূর্ত দেখার সুযোগ পেলে কী করবেন? একেকজন স্বাভাবিকভাবেই একেকটা মুহূর্তের কথা বলেছিল সেদিন। নিজেও আমি ভেবেছি অনেক, আমি হলে কী করতাম। গান-মুভি-বই বাদ দিলাম, খেলার কোন মুহূর্তটা হবে আমার জন্য। এত এত স্মৃতির মধ্যে একটা খুঁজে বের করা তো খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার সামিল। পরে দেখলাম, যে মুহূর্তটা আমার কৈশোরকে এক টানে কাছে নিয়ে আসে, সেটাই হয়ত দেখতে চাইতাম আমি। 

    শচীন তখন আমাদের শো-কেসে লাগানো স্টিকারে, জমিয়ে রাখা পেপার কাটিংয়ে, বইয়ের ভাঁজে জমানো পেপসির কার্ডে। ছিয়ানব্বই বিশ্বকাপের ৫২৩ রান তখনও ঘোরমাখানো। মুম্বাইয়ের ৯০, দিল্লীর ১৩৭, ইডেনের ৬৫-ও যথেষ্ট হয়না নিঃসঙ্গ শেরপার লড়াইয়ের জন্য। আটানব্বই সালটা অবশ্য পয়মন্ত ছিল শচীনের জন্য, নয়টা ওয়ানডে সেঞ্চুরি এক বছরেই। কুয়াশাঘেরা ঢাকার ইনডেপেনডেন্স কাপে ৭৮ বলে ৯৫ আর ২৬ বলে ৪১ শিরোপা জেতায় দলকে। ‘আরে ভাই শচীন এল, ওরে ভাই শচীন এল’-র মিনি ওয়ার্ল্ড কাপে অস্ট্রেলিয়ার সাথে এক ম্যাচে ১৪১ রান আর ৪ উইকেটও আছে সেই বছরটায়। তবে শারজার ওই মরুঝড়ের সাথে তুলনায় আসেনা আর কিছুই। শচীনের মর্ত্যমানব থেকে ঈশ্বরতুল্য হয়ে যাওয়া বুঝি পরপর দুই ম্যাচের ওই দুই ইনিংসেই। 

    ক্রিকেটে অজি-রাজত্ব শুরু হয় হয় করছে তখন। আটানব্ববইয়ের এপ্রিলে তিন জাতি সিরিজ বসেছিল শারজায়। নব্বইয়ের দশকে প্রচুর ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্ট হত এমন। গ্রুপপর্যায়ের শেষ ম্যাচে সমীকরণটা এমন দাঁড়িয়েছিল, ফাইনালে উঠতে শেষ ম্যাচে জিততেই হবে ভারতকে, অবশ্য হারলেও অল্প ব্যবধানে হারলে কিউইদের টপকানো যাবে রানরেটে। অঘোষিত সেমিফাইনালে বেভান-মার্ক ওয়াহর কল্যাণে ২৮২ করে অস্ট্রেলিয়া; এখনকার ক্রিকেটে যেন সাড়ে তিনশ’র বেশি টার্গেট। শুরুতে গাঙ্গুলিকে হারালেও শচীনের উইলোর তুবড়ি ছোটে শারজার মাঠের চারদিকে। ফ্লেমিং-ওয়ার্ন-কাসপ্রোভিচ কোনোভাবেই বোলিংয়ে লাইন-লেন্থ মাপতে পারছিলেন না লিটল মাস্টারের জন্য। 
     


    শচীন তখন আমাদের শো-কেসে লাগানো স্টিকারে, জমিয়ে রাখা পেপার কাটিংয়ে, বইয়ের ভাঁজে জমানো পেপসির কার্ডে।


    ইনিংসটাকে আরও মোহনীয় করে তুলেছিল কমেন্ট্রি বক্সে টনি গ্রেগের যাদু। শচীনের পঞ্চাশের সময়ই টনি বলছিলেন, সেঞ্চুরি যেন আজ করবেই ছোকরা। অবশ্য সেঞ্চুরির পরেও থামাথামি ছিল না আচরেকার শিষ্যের। স্কয়ার লেগে মারা এক বাউন্ডারির পর উল্লাসিত স্টেডিয়াম দেখে টনির এক মন্তব্য ঢুকে গিয়েছে ক্রিকেট ইতিহাসেই, “দে আর ড্যান্সিং ইন দ্য আইলস ইন শারজাহ।’’ নয় চার আর পাঁচ ছক্কা হাঁকানো ক্যারিয়ারসেরা ১৪৩ করেও অবশ্য জেতানো যায়নি দলকে সেদিন, কিন্তু ঠিকই ফাইনালে চলে গিয়েছিল আজহার এন্ড কোং।  

    দু’দিন পর ফাইনাল। সেদিন আবার জন্মদিন শচীনের। এইদিনও অস্ট্রেলিয়া প্রথমে ব্যাটিংয়ে; স্টিভ ওয়াহ-লেম্যানে ভর করে ২৭২ রান বোর্ডে অজিদের। জবাবে চল্লিশ না পেরোতেই গাঙ্গুলি সাজঘরে। মাঝে শচীনের স্ট্রেট ড্রাইভ প্রপাত-ধরণীতল করে দিয়েছিল গাঙ্গুলিকে। দেখে টনির মন্তব্য, ‘হি নিডস সামওয়ান ডাউন ইন দ্য আদার এন্ড’। মঙ্গিয়াকে সাথে নিয়ে দু’দিন আগের ‘দ্যেজা ভু’ চলছিল যেন মাঠে। ওয়ার্ন-ফ্লেমিং-কাসপ্রোভিচ-মুডি-ওয়াহ কেউই পাত্তা পাচ্ছিল না বোলিং করতে এসে। আজহারকে সাথে করে দুর্গম পথ পাড়ি দিচ্ছিল সেদিন পঁচিশে পড়া শচীন। 

    সেঞ্চুরির পর আরও যেন খাপখোলা তলোয়ার হয়ে যায় শচীনের ব্যাট। টম মুডিকে স্ট্রেট ড্রাইভে সোজা সাইটস্ক্রিনে আছড়ে ফেলার পর টনির আরেক অমর বাণী, “দ্য লিটল ম্যান হ্যাজ হিট দ্য বিগ ফেলা ফর সিক্স! হি’জ হাফ হিজ সাইজ! অ্যান্ড হি হ্যাজ স্ম্যাশড হিম ডাউন দ্য গ্রাউন্ড… ওয়াডা প্লেয়া, ওয়াডা ওয়ান্ডারফুল প্লেয়া…’’ কাসপ্রোভিচের স্লোয়ারে আবারও স্ট্রেট ড্রাইভে ছক্কা হাঁকানোর পর আবারও টনির উদাত্ত গলা, "অহ দিস ইজ হাই… ওয়াডা সিক্স, ওয়াডা সিক্স… ওয়ে ডাউন দ্য গ্রাউন্ড… ইট’স অন দ্য রুফ… ইট’স বাউন্সিং এরাউন্ড অন দ্য রুফ… … দিজ লিটল ম্যান ইজ দ্য নিয়ারেস্ট থিং টু ব্র্যাডম্যান দেয়ার’জ এভার বিন…ওয়াট অ্যা প্লেয়ার হি ইজ!” একই ওভারে অবশ্য বিতর্কিত এক সিদ্ধান্তে শচীন ১৩৪ রান করে সাজঘরে ফিরলেও কোকাকোলা কাপের শিরোপা জিতে নেয় ভারত। 
     
    এই দুই ইনিংসের আগে-পরে আরও টানটান উত্তেজনায় ভরপুর ম্যাচ দেখেছি ক্রিকেটে, শচীনেরই হয়ত আরও সেরা ইনিংস দেখা হয়েছে। সাথে ফুটবলে নব্বই মিনিটের যাদুকরী অনেক মূহূর্ত তো আছেই। তবে শারজার উন্মাতাল দর্শক, শচীনের মোহনীয় সব শট আর সাথে টনি গ্রেগের উদাত্ত গলা... এই ত্রিযোগকে ছাপাতে পারবে না বোধ হয় আর কিছুই। কান পাতলেই যেন শোনা যায় কৈশোরের এক শুক্রবারের সেই সন্ধ্যেবেলাটা। 
     
    সেই চিৎকার! সেই ইনিংস! সেই কমেন্ট্রি! 


    ‘লং বল প্লেইড টুওয়ার্ডস বার্গক্যাম্প...’ 

    ফুয়াদ বিন নাসের


    প্যাভিলিয়ন থেকে যখন ইউটিউবে আমার সবচেয়ে বেশিবার দেখা ভিডিও নিয়ে লিখতে বলা হল, তখন আসলে কোন ক্লিপটা নিয়ে লিখব চিন্তা করতে আমার দু’বারও ভাবতে হয় নি। এই ক্লিপটাতে আমার দেখা সেরা গোলগুলোর একটা তো আছেই, সেই সাথে আছে বেশ কিছু আবেগের স্মৃতি। ‘৯৪ বিশ্বকাপ দেখলেও সচেতনভাবে কোন দল সমর্থন করবার মত জ্ঞান তখনো ছিল না। ‘৯৮ বিশ্বকাপেই আর্জেন্টিনা সমর্থন শুরু আর এই গোলই আলবিসেলেস্তে হিসেবে ভবিষ্যতের হাজারো হৃদয়ের রক্তক্ষরণের প্রথমটা। এই গোলের পরই গোলদাতাকে খুঁজে বের করে পত্র পত্রিকা, টিভির পর্দায় অনুসরণ করা শুরু করি। এবং দুইবছর পর এই গোলদাতার মাধ্যমেই পরিচয় এবং বাগদান হয় আর্সেনাল নামক একটি ক্লাবের সাথে। কাজেই বলা যায় এই ক্লিপের সাথে স্পোর্টস ফ্যান হিসেবে আমার প্রায় সকল দুঃখের ইতিহাসই জড়িত।   

    প্রথম আর্সেনালের খেলা দেখি ১৯৯৯ সালের শেষের দিকে, সরাসরি ছিল নাকি পুনঃপ্রচার তা এখন আর মনে নেই। তবে কানু নামের একজন অমাবস্যা রঙা খেলোয়াড় ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিটে হ্যাট্রিক করে ম্যাচ জিতিয়ে এনেছিলেন এটুকু মনে আছে। মনে থাকার কারণ ছিল, কারণ ঐ ম্যাচে আর্সেনালের পাসিং ছিল স্বপ্নের মতো। স্বপ্নের যেমন কোন ঠিকঠিকানা নাই, ঐ ম্যাচে আর্সেনালের পাসেরও কোন গ্রাম-পরিচয়-ঠিকানা বোঝা যাচ্ছিল না। এর মাঝেও কানুর শেষ গোলটা দেখে চোখ ছানাবড়া হয়ে গিয়েছিল, আর্সেনালের প্রতি ভালবাসা তখনো আসে নি, তবে প্রিমিয়ার লিগের প্রতি একটা আকর্ষণ চলেই এসেছিল তা বলাই বাহুল্য। এই আকর্ষণের কারণেই মাঝে মাঝে কিছু পড়াশোনা করার বিনিময়ে টিভি দেখবার অনুমতি মিললে খেলার চ্যানেলে চলে যেতাম, খুঁজে দেখতাম কেউ বলে লাথি মারছে কিনা। এভাবেই একদিন দেখলাম সেই বার্গক্যাম্প নামের লোকটা খেলছে লাল-সাদা জার্সি পরে। প্রথম আর্সেনালের জার্সি কিনেছিলাম ১০ নাম্বারেরটাই, বার্গক্যাম্পের নাম লেখা। এর পরে বার্গক্যাম্পের অনেক জাদুকরি মুহূর্তই দেখা হয়ে গিয়েছে। তবে বার্গক্যাম্প নামটা মাথায় এলে এই দৃশ্যটাই মাথায় ভাসে, আজীবনই ভাসবে। 

    ‘লং বল প্লেইড টুওয়ার্ডস বার্গক্যাম্প...’
     


    ম্যাজিক ইন মার্শেই : লং বল প্লেইড টুওয়ার্ডস বার্গক্যাম্প...


     

    উড়ে যাবার যে সন্ধ্যা

    রিজওয়ান আবীর


    ‘মামোডোল্লা’র সেই ফ্লাইং কিস, মুশফিকের সেই ধ্রুপদী ব্যাটিং, তাসকিন-মাশরাফির একসাথে গর্জে উঠা, আর ‘চেরি অন দ্য টপ’ এর মতো রুবেলের সেই বিধ্বংসী ইয়র্কার। বাংলাদেশের কোন ক্রিকেটপ্রেমী সেই ম্যাচ কি ভুলতে পারবে? হাঁটি হাঁটি পা করে এগুনো বাংলাদেশের ক্রিকেট সেদিন পেয়েছিল আকাশ ছোঁয়ার পাখা।

    ঐ ম্যাচের উত্তেজনা ফিরিয়ে আনার জন্য হাইলাইটস দেখা অতিরঞ্জন, বর্ণনা করা তো অবান্তর। ঠিক সন্ধ্যা নামার আগে তামিমের ক্যাচ মিস আর তাসকিনের অবিশ্বাসী মুখ নিয়ে এসেছিল বিষাদের চাদর। ‘হ্যাজ হি ড্রপড দ্য ম্যাচ? তামিইইম ইকবাল হ্যাজ ড্রপড ইট!’ – নাসের হুসাইনের গলার কম্পাঙ্ক মনের ভিতর তুলেছিল আশংকার ঝড়। পরে তাঁর কণ্ঠেই ধ্বনিত হয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটের উড়বার ঘোষণাপত্র- ‘গোজ ফর হিরো, বোউল্ড হিম! ফুল অ্যান্ড স্ট্রেইট! দ্য বাংলাদেশ টাইগার্স হ্যাভ নকড দ্য ইংল্যান্ড লায়ন্স আউট অব দ্য ওয়ার্ল্ডকাপ’! তবে সে শোনার সময় তখন ছিল কি আর? রুবেলের সাথে তখন পুরো বাংলাদেশ ছুটছে, গগনবিদারী চিৎকারে আমরা তখন ছুটছি বনশ্রীর রাস্তায়!  


    রুবেলের সাথে তখন পুরো বাংলাদেশ ছুটছে, গগনবিদারী চিৎকারে আমরা তখন ছুটছি বনশ্রীর রাস্তায়! 


    পাঁআআআচ বছর হয়ে গেল সেদিনের! বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি না মাড়ানো সেদিনের ছেলেগুলোও আজ পাশ করে গেছে! সেদিন পাশে থাকা বন্ধুরা আজ গোলকের অপর পৃষ্ঠে! কিন্তু ঐ ম্যাচটার হাইলাইটস একটা টাইম মেশিনের মতো, দেখলেই মন চলে যায় সেই ফাল্গুনের সন্ধ্যাটায়। মনে পড়ে যায় যে সেদিনের রাস্তার বাতিগুলো অনেক উজ্জ্বল ছিল, গাছের পাতাগুলো ছিল অস্বাভাবিক সবুজ, দিন শেষে আসা রাতটা ছিল ভয়ংকর সুন্দর! লাইকড ভিডিওতে থাকা ঐ ম্যাচের হাইলাইটসটা (অবশ্য আগের লিংকটা কাজ করছে না ঠিকঠাক) এখনো সমানভাবে নিউরনে অনুরণন তোলে। বিশ বছর পরেও ইউটিউবের ঐ ভিডিওটা হয়তো একই অনুভূতি দিবে। বয়স চোখ রাঙাবে তখন, কিন্তু অলিন্দে রক্ত প্রবাহ ঘটাবে ঠিক রুবেলের সেই ৪৯তম ওভারের আগের মুহূর্তটার মতো; মস্তিষ্কে সুখময় এক অবশ অনুভূতি হবে উইকেট উড়ে যাবার দৃশ্যটা দেখে, মনে পড়ে যাবে ঠিকঠাক- ৯ মার্চ ২০১৫ সালে, উৎসবের নগরীতে আমিও ছিলাম।       

     

     

    ‘ইট’স রেড ইন রাশিয়া’  
    রিফাত মাসুদ 


    টিভি রিমোটের পাওয়ার বাটনে বুড়ো আঙুল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। জন টেরি এই পেনাল্টি কিক থেকে গোল করলেই খেলা শেষ। মস্কোর সে ম্যাচে অঝোরে বৃষ্টি ঝরেছে। পেনাল্টি স্পটে বল বসাতে খেলোয়াড়রা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি সময় নিচ্ছিলেন তাই, টেরিও নিলেন। টিভি রিমোটের পাওয়ার বাটনে বুড়ো আঙুল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।

    এখান থেকেই গোল হলেই তো শেষ! শেষ পর্যন্ত ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পেনাল্টি মিসটাই ভাগ্য গড়ে দিচ্ছে। ইউরোপে সে বছর রোনালদোর ধারে-কাছেও কেউ ছিলেন না। চেলসির বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালেও গোল করে তিনিই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে এগিয়ে দিয়েছিলেন। সেই রোনালদো টাইব্রেকারে গিয়ে গোল করতে পারেননি। রোনালদো একটু দৌড় নিয়ে, থেমে গিয়ে আবার দৌড়ে পেনাল্টি নিতেন তখনও। সেটাই কাল হয়েছে, আঁচ করতে পেরেছিলেন পিটার চেক। পুরো মৌসুম এমন অতিমানবীয়  খেলেও এই বেচারার ভাগ্যটা এমন হবে? এমন দুর্দান্ত খেলেও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা হবে না? সকালে আবার সামাজিক বিজ্ঞান পরীক্ষা, রাত জেগে কাঁচকলাও জুটল না- দারিদ্রের দুষ্টুচক্রের মতো মাথায় এসব চিন্তা ঘুর-পাক খাচ্ছিল ওই কয়েক সেকেন্ডে।  

     


    সকালে আবার সামাজিক বিজ্ঞান পরীক্ষা, রাত জেগে কাঁচকলাও জুটল না- দারিদ্রের দুষ্টুচক্রের মতো মাথায় এসব চিন্তা ঘুর-পাক খাচ্ছিল ওই কয়েক সেকেন্ডে।


    টেরি পেনাল্টি কিক নিলেই সজোরে বুড়ো আঙুল চাপব। এর পর বাড়ির লোকদের ঘুম ভাঙিয়ে পড়তে বসব। ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের প্ল্যানটাও করা হয়ে গিয়েছিল। টেরি পেনাল্টি কিক নিলেন, আমিও পাওয়ার বাটনে উপর্যুপুরি রাগ ঝাড়লাম। কিন্তু মুহুর্তের ভেতর কেমন খটকা লাগল। টেরিকে তো ছুটতে দেখলাম না, ফন ডার সারকেও মনে হলো উঠে দাঁড়ালেন! তড়িঘড়ি করে সুইচ অন করতে করে দেখি টেরির পিছলে যাওয়ার হাইলাইটসটুকু দেখানো হচ্ছে। ধারাভাষ্যকার মার্টিন টাইলর আর অ্যান্ডি গ্রে এমনিতেই আমার পছন্দের লোক- তাদের মুখে ওই মুহুর্তের বিবরণী কানে গেঁথে গেছে তখন থেকে। তখন আমিও বুঝে গেছি, এই চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডই জিতছে।

    নিকোলাস আনেলকার পেনাল্টি কিক ফন ডার সার ঠেকিয়ে দেওয়ার পর সত্যি হলো সেটা। ইউনাইটেডের সবাই তখন মাঝমাঠ থেকে ছুটছেন ফন ডার সারকে আলিঙ্গন করতে। রোনালদোও দৌড় শুরু করেছিলেন, কিন্তু একটু গিয়েই থেমে গিয়েছিলেন। এর পর উপুড় হয়ে মাটিতে শুয়ে একাই কেঁদেছিলেন কিছুক্ষণ। 

    ২০০৯ সালে তখনও ইন্টারনেট সহজলভ্য হয়নি আমার জন্য। এখানে-সেখানে যেখানে ইন্টারনেট পেতাম, ওই ম্যাচের ক্লিপ খুঁজে আরেকবার দেখে ফেলার চেষ্টা করতাম। এর পর ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পেয়েছিলাম পরের বছরই- হাজার হাজার ভিডিও দেখা হয়ে গেছে। কিন্তু এই ভিডিওটার আবেদন রয়ে গেছে আগের মতোই। তবে আফসোসটা রয়ে গেছে, টেরি আমাকে মুক্তি দেওয়ার মুহুর্তটা তো আর সরাসরি দেখা হয়নি আমার। আরও হাজারবার এই ভিডিও দেখে সেই মুহুর্ত ফিরে পেতে চাওয়াও বৃথাই হবে!            


    “ওহ বেন, হোয়াট আর ইউ ডুইং টু দিস ক্রিকেট ম্যাচ?” + “কাট অ্যাওয়ে, কাট অ্যাওয়ে ফর ফোর…”
    সাইফুল্লাহ্‌ বিন আনোয়ার 


    “বোল্ড’ইম, ট্রেমলেটস দ্য ম্যান। পুট দ্য বিয়ার অ্যাওয়ে, পুট দ্য শ্যাম্পেন অন আইস। টোয়েন্টি ফোর ইয়ারস অফ পেইন ইন অস্ট্রেলিয়া…”

    ইউটিউবের খেলার ভিডিও দুই রকমের হওয়ার কথা। এক- যা দেখিনি। দুই- যা দেখেছি, কিন্তু বারবার দেখে এই সময়ে বসে সেই সময়ে ফেরার একটা চেষ্টা। নাসের হুসেইনের ওপরের কমেন্ট্রি যে ক্লিপের, সেটা আসলে তৃতীয় ক্যাটাগরির।

    সে ম্যাচ লাইভ দেখেছিলাম। কিন্তু সে কমেন্ট্রি লাইভ শোনার উপায় ছিল না। ২০১০-১১ অ্যাশেজ অস্ট্রেলিয়ায়, ফলে সেটির মূল প্রডাকশন চ্যানেল নাইনের, বাংলাদেশে স্টার স্পোর্টস দেখায় বলে চ্যানেল নাইনের প্রডাকশনই টিভিতে। ইউটিউবের সংস্পর্শে এসেছি, তবে তখনকার ব্রডব্যান্ড কানেকশনের গতি সেটি স্মুথ স্ট্রিমিংয়ে সাঁয় দেয় না, আমার জীবনকে ‘সুশৃঙ্খল’ করার ইচ্ছার মতো- মনে আছে, কিন্তু কাজে দেয় না। ইউটিউবের সমস্যার সমাধান হয়ে এলো একটা ডাউনলোডার- জিলিসফট। রাতে ডাউনলোড করতে দিই, সকালে (দুপুরে বা বিকেলে আরকি) রোমাঞ্চ নিয়ে ওপেন করি। তবে মাঝে মাঝেই ধোঁকা খেতে হয়- ভেতরের ফাইলে কেন যেন কিছু থাকে না- করাপ্ট ফাইল। তবে আশরাফুলের ৯৪, তামিমের লর্ডস-ওল্ড ট্রাফোর্ড, শেন ওয়ার্ন-ওয়াসিম আকরামের বোলিং কিংবা ভিভ রিচার্ডসের ব্যাটিং অথবা ডেভিড লয়েডের কমেন্ট্রির কমপাইলেশন- আমার পিসির হার্ডড্রাইভে জমা হতে থাকে। 

    অ্যাশেজ দেখার পরও স্কাইয়ের প্রোডাকশনের দেখার সুযোগ করে দিল ওই ইউটিউব। সেবার স্কাই তার স্কোরবারে নতুন একটা জিনিস যোগ করলো, একদম বাঁয়ে স্ট্রাইক ব্যাটসম্যান আর বোলারের নাম। স্কাইয়ের গ্রাফিকস মোশনের সঙ্গে আসা ‘টিং’ করে সাউন্ডটা এখনও কানে বাজে আমার। ইউটিউবে বারবার দেখা ভিডিও অবশ্য আমার গান শোনার মতো- বদলাতে থাকে, এক লিংকিন পার্ক ছাড়া। বারবার দেখা ইউটিউবের ভিডিও নির্দিষ্ট করা তাই সত্যজিত-উত্তমের সিনেমা বা হ্যারি পটার-মানিবল-রাশ কিংবা ব্যান্ড অফ ব্রাদার্সের মতো ‘সহজ’ নয় আমার পক্ষে। 

    সবার ওপরে নাসের হুসেইনের যে কমেন্ট্রি দেওয়া, সেটি একসময় বারবার দেখার তালিকায় ছিল। ছিল ২০১৫ সালে ‘গোউজ ফর হিরো, বাংলাদেশ টাইগার হ্যাভ নকড দ্য ইংলিশ লায়নস আউট…’-ও। এখন সেটা বদলে গেছে। ২০০৫ অ্যাশেজের ভিডিও ঘুরেফিরে প্রায়ই দেখি, কেভিন পিটারসেন বা অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফের সঙ্গে একটা ঘোরলাগা কৈশোর ফিরে আসে। সাইমন জোন্সের বল লিভ করে মাইকেল ক্লার্ক বোল্ড হওয়ার পর মার্ক নিকোলাসের শ্যাম্পেন বা ওয়াইন টেস্ট করার মতো করে বলা ‘দ্যাট ইজ ভেরি গুড’ তাই ফ্রেম-বাই-ফ্রেম মুখস্থ যেন আমার। 

    তবে ২০১৯-এ এসে এর-চেয়ে-বেশি-কিছু-সম্ভব-নয় ধরনের এক বিশ্বকাপ ফাইনালের পর সেসব বদলে গেল। সে হাইলাইটস বা আইসিসির ফাইনাল মন্টেজ দেখতে গেলে এখনও ম্যাচটা অলৌকিক মনে হয়। তবে বারবার দেখা ভিডিও থেকে সেটিও বদলে গেল হেডিংলির এক ইনিংসে। 

    শেষ অ্যাশেজ শুরুর আগে প্যাভিলিয়নে একটাই ফিচার লিখেছিলাম- ১৯৮১ সালে হেডিংলিতে ইয়ান বোথামের সেই ইনিংস নিয়ে। ক্রিকেট রূপকথা বা লোকগাঁথায় ঢুকে যাওয়া এ ইনিংস নিয়ে জানলেও যেন ঠিক জানা হচ্ছিল না, মানে মন ভরছিল না। সেসব পূরণের সহজ উপায়- লেখা। লিখতে গেলে পড়তে হবে, লিখতে গেলে দেখতে হবে। রিচি বেনোর ‘স্ট্রেইট ইনটু দ্য কনফেকশনারি স্টল অ্যান্ড আউট এগেইন’ বারবার শুনেছি। বোথামের ইনিংস, বব উইলিসের বোলিং দেখেছি বারবার। তবে এবারই সেই হেডিংলির মহাপূরাণ নতুন করে লেখা হবে, সে সম্বন্ধে কোনও ধারণা আমার ছিল না। থাকার কথা নয়ও। 

    ২৫ আগস্ট, ২০১৯- সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমি ব্যস্ত ছিলাম এক হাসপাতালে। একটা শারীরিক পরীক্ষার জন্য, সেটি করতে আবার জেনারেল অ্যানেসথেশিয়া প্রয়োজন পড়ে- মানে আপনি কতক্ষণের জন্য ব্ল্যাক-আউট হয়ে যাবেন। হুট করে সব শেষ হয়ে যাবে, এরপর হুট করেই নিজেকে আবিষ্কার করবেন অন্য কোথাও। হাসপাতাল থেকে বলা হয়েছে, সঙ্গে একজনকে নিয়ে যেতে হবে, মানে একা একা ঘরে ফেরার সামর্থ্য নাও থাকতে পারে সে পরীক্ষার পর। হেডিংলি টেস্টের চতুর্থ দিন কার্যত আমার অফিস থেকে ছুটি তাই। এক বন্ধু সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সঙ্গী আমার। 

    তবে ঘরে ফিরেও অস্থির একটা ভাব। বন্ধুর গাঁইগুঁই উপেক্ষা করেও বেরিয়েছি, টুকটাক কাজ সেরে আবার ঘরে ফিরব বন্ধুকে বিদায় দিয়ে। লাইভস্কোরে নজর। বেন স্টোকস অন্য কিছু করার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। সাত-পাঁচ না ভেবে অফিসগামী হয়ে গেলাম, এমনিতেও আমাদের প্যাভিলিয়নে এই চর্চাটা আছে, এমন দিনে একা একা না থেকে আমরা অফিস চলে যাই বা যেতে চাই। 

    রুট-বেইরস্টোর পর বাটলার রান-আউটে ফিরে গেছেন। জফরা আর্চার নাসের হুসেইনের বারবার উল্লেখিত ‘ওয়েস্টার্ন টেরেস’ বরাবর মারতে গিয়ে ফিরলেন, স্টুয়ার্ট ব্রড এলবিডব্লিউ হলে স্টোকসের সামনে ‘বোথাম’ হয়ে ওঠা ছাড়া উপায় রইল না আর। বোথামের সঙ্গী ছিলেন গ্রায়াম ডিলি, এবার স্টোকসের সঙ্গী জ্যাক লিচ। 
     


    "ওহ বেন, হোয়াট আর ইউ ডুইং টু দিস ক্রিকেট ম্যাচ?"


    স্টোকস সেই রিভার্স শটটা খেলে ফেলেছেন, মাইক আথারটন যেটির নাম বদল করলেন বারকয়েক- যেন কী নামে ডাকি তোমায়। এরপর করলেন স্কুপ। এখন পর্যন্ত এ ভিডিও আমার ইউটিউবের দ্বিতীয় ক্যাটাগরির। আথারটন নাসের হুসেইনের সঙ্গে এ সময়ের প্রিয় ধারাভাষ্যকার আমার। (রিচি বেনো, টনি গ্রেগদের তো আলাদা করে ‘প্রিয়’ বলার প্রয়োজন পড়ে না।) 

    তবে নিকোলাস অন্যরকমের। কে জানে, ক্রিকেট জিরোসেভেনে দুই কন্ঠের একটি তার ছিল বলেই কিনা! নিকোলাস অবশ্য স্কাইয়ের প্যানেলে নেই, তিনি চ্যানেল ফাইভে কমেন্ট্রি দিচ্ছেন তখন। এই ক্লিপটা পেয়েছি আমি এই কিছুদিন আগে।  

    “আপ ইন দি এয়ার, হিজ অল দ্য ওয়ে, হিজনট হি? হি ইজ অল দ্য ওয়ে”, কামিন্সের প্রায় গোড়ালি বরাবর বলটা যখন স্টোকস মিডউইকেট দিয়ে পাঠালেন, হুসেইন বলছিলেন স্কাইয়ে, মানে সনি যা দেখাচ্ছিল (ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার হোম সিজনের স্বত্ব স্টার ঘুরে এ অঞ্চলে সনির কাছে চলে গেছে)। হেডিংলির বাতাসে তখন অদ্ভুত দ্যোতনা ঘুরে-ফিরছে, প্যাভিলিয়নে অ্যানেসথেশিয়ার ঘোরেও তাই সেটি অনুভব করছি তখন। 

    “এএএএ সিক্সসসস, ওহ বেন, হোয়াট আর ইউ ডুইং টু দিস ক্রিকেট ম্যাচ?”, নিকোলাস বলছেন চ্যানেল ফাইভে। মানে ইউটিউবের ওই ক্লিপে। সেখানে শুধুই নিকোলাসের কমেন্ট্রির একটা অংশ রাখা।  

    “আপ ইন দ্য এয়ার এগেইন, ওয়েস্টার্ন টেরেস এগেইন, সিক্স এগেইন”। হ্যাজলউডকে ছয় মেরে ২১ রানে প্রয়োজনীয়তা নামিয়ে এনেছেন স্টোকস। হুসেইন যখন এখানে ‘কবিতা’ পড়ছেন, নিকোলাস তখন যেন গান ধরেছেন আরেক বক্সে, “হিজ গট এগেইন, হিজ গট এগেইন। ইটস সিক্স মোওওওওওওররররর…”, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাইকেল ভনের ‘ও’ বলে টান- দুইয়ে মিলে যে সিম্ফনি, তা আপনাকে এই এতোদিন পরও সেদিনের অলৌকিকতা মনে করিয়ে দেবে। 

    “নো ওয়ে ম্যান”, নিকোলাস যেন পাশে বসা কেউ, কথাচ্ছলে বলছেন ম্যাচ নিয়ে তার মনের অবস্থাটা।

    “ড্যাবল ফর এ কাপল, নাইনটিন রানস টু উইন দ্য ম্যাচ, ইটস বেয়ারলি বিলিবেভল”। নিকোলাসের এ কথা তখন শুনিনি। তবে কাঁপছি তখন। সেই অ্যানেসথেশিয়ার প্রভাবে নাকি চোখের সামনে টিভি পর্দায় যা দেখছি, সেটির প্রভাবে- সে হিসাব মেলানোর মতো মানসিক অবস্থা ছিল না, ম্যান! 

    “নাইন টু উইন, কিপ ইয়োর কুল বেন, ইউ আর অন দ্য ব্রিংক অফ গ্রেটনেস ইফ ইউ আরনট অলরেডি দিয়ার”, ভন বলেন। অবশ্য নিজের ‘কুল’ ধরে রাখাই কষ্টকর হয়ে পড়েছিল সেদিন সবার। 

    ৮ রান দরকার থাকতে লায়নকে টেনে ছয় মারলেন স্টোকস। লং-অফের একটু নাগালের বাইরে দিয়ে গেল তা। এরপরের রিপ্লেটা এই হাইলাইটসে নেই, এটাতে আছে। মারার পর স্টোকস উবু হয়ে দেখছেন, বলটা মারনাস ল্যাবুশেনের নাগালের বাইরে দিয়ে গেল কিনা। স্টোকস সেভাবেই আছেন, সাইড-অন ক্যামেরায় পেছনের স্ট্যান্ডে আবেগের বহিঃপ্রকাশের বৈপরীত্য। ইংলিশ সমর্থকরা উল্লাসে মেতেছেন, এর মাঝে দুজন অস্ট্রেলিয়া সমর্থকের চোখেমুখে হতাশা আলাদা করে বুঝা যায়। স্টোকসের সঙ্গে এক ফ্রেমে এসে হাজির টিম পেইন। আমি অস্কারের জুরি বোর্ডে একচ্ছত্র কেউ হলে এই ফ্রেমটাকে একটা পুরষ্কার দিয়ে দিতাম। 

    ২ রান প্রয়োজন। 

    “দিস কুড বি আ রান-আউট, ওহ হিজ ফাম্বলড। হিজ ফাম্বলড”, হুসেইনের কথা যেন যথেষ্ট নয়, হার্টবিটের এই শিখরে পৌঁছা বুঝাতে। “ওহ ড্রপড ইট, ন্যাথান লায়ন হ্যাজ ড্রপড ইট”, নিকোলাসও চেষ্টা করলেন। 

    “ইটস টু মাচ ফর এভরিবডি। অ্যাজ সিম্পল অ্যাজ দ্যাট। ইটস টু মাচ।” আসলেই তাই নয় কি? 

    ব্রড ড্রেসিংরুমে বাচ্চাদের মতো লাফাচ্ছেন। বাকিরা মাথায় হাত দিয়ে একটু আগে মুখের কাছে বের হয়ে আসা জানটা ফিরে পাঠাচ্ছেন।

    এরপর স্টোকস সুইপ করতে গেলেন, বলটা আছড়ে পড়লো তার প্যাডে। তার চেয়েও বেশি আছাড় খেলো আমার বুক, পাড়ার খেলায় আম্পায়ারিংয়ের সময় এই সিগন্যালটা পাই আমি, এলবিডব্লিউ সিদ্ধান্তের আগে। তবে জোয়েল উইলসন আউট দিলেন না, লায়ন দায়মোচনের সুযোগ পেলেন না। অস্ট্রেলিয়া হেলায় এর আগেই রিভিউ হারিয়ে ফেলার আক্ষেপে পুড়লো। জ্যাক লিচ এরপর নিলেন তার এক জীবনের এক সিঙ্গেল।  

    এরপর। 

    “কাট অ্যাওয়ে, কাট অ্যাওয়ে ফর ফোর। হোয়াট অ্যান ইনিংস, হোয়াট্টা প্লেয়ার। টেক আ বাউ, বেন স্টোকস”, হুসেইন আরেকবার এরপর অসংখ্যবার শোনা গানের একটা লাইন বললেন যেন।

    আর ওপাশে নিকোলাস বললেন, “ফর হেডিংলি নাইননিটিন এইটি ওয়ান, রিড হেডিংলি টুয়েন্টি নাইনটিন।” 

    অ্যাশেজের আগে বোথাম আর একাশির হেডিংলি নিয়ে লিখেছিলাম। এবার লিখব স্টোকস আর উনিশের হেডিংলি নিয়ে।  

    ইউটিউবের খেলার ভিডিও দুই রকমের হওয়ার কথা। এক- যা দেখিনি। দুই- যা দেখেছি, কিন্তু বারবার দেখে সেই সময়ের ওই অনুভূতিটা একটু ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা। এরপর তৃতীয় একটা ক্যাটাগরিতে গিয়েছিলাম, যেখানে ছবি একই, শব্দ আলাদা। 

    এখন চতুর্থ ক্যাটাগরিতে এসেছি। দুটি আলাদা ক্লিপ। ছবি একই প্রায়। শব্দ দুই রকমের। একটির পর আরেকটি দেখি। তবে দুটিই দেখতে হয়। অ্যানেসথেশিয়া কিংবা ক্রিকেট-ঘোরে মাথা চক্কর দেওয়ার ওই মুহুর্তটা ফিরে পাওয়ার আশায়। কিংবা উনিশের টাইম মেশিনে চড়ে একাশির কাছাকাছি কোথাও গিয়ে পড়ার আশায়।

    পুনশ্চ : নিকোলাসের কমেন্ট্রির ভিডিওটা ডাউনলোড করে রেখেছি আমি, যদি আবার কপিরাইটের ফাঁদে পড়ে সেটা সরে যায়, সে আশঙ্কায়। আর পুরোনো সব ভিডিওগুলো হারিয়ে ফেলেছি আমি, হার্ডড্রাইভে ট্রান্সফার করতে গিয়ে মাঝে এক বন্ধুর পিসির শরণাপন্ন হয়েছিলাম। সেটি ক্র্যাশ করেছে। তবে সার্চ করলে এখন মুহুর্তেই চলে আসে- “বোল্ডইম, ট্রেমলেটস দ্য ম্যান, পুট দ্য বিয়ার অ্যাওয়ে...।” 

     

    “অ্যান্ড দেন রোনালদোওওওওওওওওওওওও!”

    নাজমুস সাকীব


    "ওয়াট আ গোল বাই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো! সেনসেইশনাল!! দ্য গ্রেটেস্ট মার্কসম্যান ইন দ্য হিস্টোরি অফ দ্য চ্যাম্পিয়নস লিগ উইথ অ্যান অ্যাবসোলুট বিউটি!"

    "ওহ মাই ওয়ার্ড! অল ইয়ুভেন্তাস ফ্যানস অ্যারাউন্ড আস আর অন দেয়ার ফিট, অ্যাপ্লডিং! ওয়াট অ্যান ইনক্রেডিবল সাইট"

    ধুপ। মধ্যরাতে প্লাস্টিকের বোতলটা পড়ে গেল হাত থেকে, চোখ যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। চোয়াল যতটা সম্ভব বিস্ময়ে, হতবাকে নেমে গেছে নিচের দিকে। "কীরে ঘুমাইতে দিবি না?" পাশের রুম থেকে ভেসে আসল আম্মার বিরক্তিমাখা স্বর। সার্জিও রামোস, মার্সেলো, কাসেমিরোদের আলিঙ্গন থেকে ক্যামেরা ঘুরে গেল রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউটে। আরেকটু হলে ডাগআউট ছেড়ে মাঠেই ঢুকে পড়তেন থিও হার্নান্দেজ, মাতেও কোভাসিচরা।

    তাদের কিছুটা দূরেই জিনেদিন জিদানের মাথায় তখনও হাত, নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না। ইউরো-বিশ্বকাপ-ইউরো জেতা অমর ফ্রান্স দলের নিউক্লিয়াস ছিলেন, ভুগেছেন ২০০৬-এ তীরে এসে তরী ডোবার হতাশায়ও। ফুটবলে তাই জিদানের একেবারে কিংবকর্তব্যবিমূঢ় হতে হলে তাই অবিশ্বাস্যের চেয়ে কম কিছুতে হয়তো হওয়ার কথা নয়। তুরিনে সে রাতে পুরো ফুটবলবিশ্ব থমকে গিয়েছিল এমন কিছু দেখেই। বৃষ্টিস্নাত তুরিনজুড়ে তখন শুধুই জোর করতালির শব্দ। রিয়াল সমর্থকদের সাথে যোগ দিয়েছেন জুভেন্টাস ভক্তরাও।

     


    অল ইয়ুভেন্তাস ফ্যানস অ্যারাউন্ড আস আর অন দেয়ার ফিট, অ্যাপ্লডিং! ওয়াট অ্যান ইনক্রেডিবল সাইট


    দানি কারভাহালের ক্রস থেকে ডিবক্সে থাকা রোনালদোকে মার্ক করতে কয়েক সেকেন্ড দেরি করলেন ফুলব্যাক মাতেয়া দি শিলিও, কাল হয়ে দাঁড়াল সেটাই। ক্যারিয়ারে বাইসাইকেল কিকে ব্যর্থ হওয়ায় বেশ অনেকবারই বিদ্রূপ সইতে হয়েছে পর্তুগিজ ফরোয়ার্ডকে। কিন্তু তুরিনে ব্যত্যয় ঘটল সেবার। হাওয়ায় ভেসে মুহূর্তেই দুর্দান্ত এক বাইসাইকেল কিকে গোল করলেন 'সিআর৭'। গোলবারের নিচে বর্ষীয়ান জিজি বুফন, দি শিলিওয়ের পাশে থাকা জর্জিও কিয়েলিনি- অভিজ্ঞদেরও যেন ভাষা নেই কী হয়ে গেল তার বিপরীতে।

    প্রথমার্ধেই ম্যাচে গোলের খাতা খুলেছিলেন তিনিই, তুরিনে ৩-০ গোলের জয়ে মার্সেলোর শেষ গোলটাও এসেছিল তার পাস থেকেই। কিন্তু সপ্তাহখানেক বাদে রিয়ালকেই সেই ৩-০ ব্যবধানের হার ফিরিয়ে দিচ্ছিল জুভেন্টাস। খেলা যখন গড়াচ্ছে অতিরিক্ত সময়ে, তখন অন্তিম মুহূর্তে বিতর্কিত এক পেনাল্টি পায় রিয়াল। দুদলের ফুটবলারদের হাতাহাতি, মাঝে প্রতিবাদ করায় বুফনের লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়া, ওয়েচেক শেজনির মাঠে নামা- সব মিলিয়ে গোলের ১২ গজ দূরে প্রায় মিনিট দশেক অপেক্ষা করতে হয়েছিল রোনালদোকে। কিন্তু 'আইস কুল নার্ভ' কী, সেটাই সেদিন প্রমাণ করেছিলেন রোনালদো। টপ কর্নারে দুর্দান্ত এক পেনাল্টিতে রিয়ালের সেমিফাইনাল যাত্রা নিশ্চিত করেছিলেন তিনিই। কিয়েভে লিভারপুলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার হ্যাটট্রিকও করে রিয়াল। কাকতালীয়ভাবে বাইসাইকেল কিকের মাস তিনেক পর রিয়ালের সাথে ৯ বছরের গাঁটছাড়া ছিন্ন করে জুভেন্টাসেই পাড়ি জমান রোনালদো।

    তার বদলে এখনও প্রমাণিত কোনো গোলস্কোরিং ফরোয়ার্ডকে দলে ভেড়াতে পারেনি রিয়াল, রোনালদো নিজেও তুরিনে ঠিক সেভাবে প্রমাণ করতে পারেননি নিজেকে। করোনাভাইরাসে বিশ্ব থামকে যাওয়ার আগে এই মৌসুমে একাধিকবার গোল করতে না পারায় পয়েন্ট হারাতে হয়েছে রিয়ালকে। প্রতিবারই স্মরণ করেছি রোনালদোকে, আর ইউটিউব হাতড়ে ফিরেছি রিয়ালে থাকাকালীন সময় তার গোলের। এই ভিডিওটি দেখেছি প্রতিবারই, সামনে যে ব্যতিক্রম হবে না সেটার- নিশ্চিতভাবেই বলে দিতে পারি সেটা।
     

     

    আমার ক্রিকেট প্রেমের প্রথম পাঠ আর রেডিও থেকে ইউটিউবে যাত্রা

    মহিবুল্লাহ ত্বকী


    ক্রিকেটের কথা তখন কেবল শুনতে শুরু করেছি। সে সময়কার ভারত-পাকিস্তান উন্মাদনা বাদ দিলে ভদ্রলোকের খেলাটির সাথে আমার প্রথম পরিচয় বেতারে বাংলা ধারাবিবরণী শুনে, শুরুটা যতদূর মনে পড়ে বাংলাদেশের আইসিসি ট্রফি জয়ের ম্যাচটাতেই। অনেক আবেগের ওই ম্যাচে শামীম চৌধুরি ক্ষমা চেয়ে নিয়ে ইংরেজীর বদলে বাংলায় ধারাভাষ্য দিয়েছিলেন। বয়সকালে এসে দেখা ভিডিওচিত্রে সে আবেগের ভাষান্তর হয় হার্ষা ভোগলের কণ্ঠে, ‘মার্টিন সুজি… দে আর রানিং ফর আ বাই… থ্রোইং টু দ্য স্টাম্প... বাংলাদেশ আর নিউ আইসিসি চ্যাম্পিয়নস...আ ন্যাশন দ্যাট ইজ একজ্যাক্টলি টুয়েন্টি ফাইভ ইয়ার্স ওল্ড!’

    সাতানব্বইয়ের মধ্য এপ্রিল। বেডরুমে ওয়্যারড্রোবের ওপর রাখা রেডিওটা ফুল ভলিউমে বাজছে সকাল থেকে। অতোটা আগ্রহ নিয়ে শুনছি না তখনও। ঢাকার চেয়ে দু’ ঘন্টা এগিয়ে থাকা কুয়ায়ালামপুরের কিলাত কেলাত ক্লাব (বর্তমান টেনাগা ন্যাশনাল স্পোর্টস কমপ্লেক্স) মাঠ থেকে স্বভাবসুলভ ঢংয়ে শ্রোতাদের স্বাগত জানাচ্ছেন জাফরুল্লাহ শরাফত। টস জিতে ফিল্ডিংয়ে নেমেছে টাইগাররা, এই নামকরণটা তখনও হয়েছিলো কিনা ঠিক মনে নেই। 

    প্রথম ওভারেই আসিফ করিমের স্টাম্প উড়িয়ে দিয়ে আশার পারদ চড়িয়ে দিলেন সাইফুল ইসলাম। কুয়ায়ালামপুরের বাতাসে সেদিন শুরু থেকেই ছিলো ঢাকার গর্জন। ইথারে ভেসে সে আওয়াজ কানে এলে মনোযোগ বাড়ে ধারাবিবরণীতে।  সপ্তম ওভারে আবারও সাইফুলের আঘাত, এবার এলবিডব্লুর ফাঁদে কেনেডি ওটিয়েনো। ১৫ রানে ২ উইকেট হারিয়ে হতোদ্যম কেনিয়ার হাল ধরতে আসেন স্টিভ টিকোলো। প্রতিপক্ষ হিসেবে বাংলাদেশকে মনে না রাখলে চোখে লেগে থাকার মতো এক ইনিংসই খেলেছিলেন সেদিন। রেডিও থেকে ইউটিউবে ‘ট্রাভেল’ করলে কমেন্ট্রিতে শোনা যায়, ‘ইউ ডু ওয়ান্ট টু ট্রাভেল মাইলস টু সি দিস... ’। মরিস ওদুম্বের সাথে ১৩৮ রানের জুটিতে দলের প্রাথমিক বিপর্যয় কাটিয়ে ১২ চার আর ৩ ছয়ে ব্যক্তিগত ১৪৭ রানে যখন ফিরলেন, কেনিয়ার সংগ্রহ ২৩০ ছুঁয়েছে।

    বাংলাদেশ শিবিরে দিনের শুরুর সে উচ্ছ্বাস তখন আর নেই। ৫০ ওভারে ২৪১ রানের লক্ষ্য তখন আকরাম খানদের জন্য পাহাড়সমই। বৃষ্টির বাধায় খেলা গড়ায় রিজার্ভ ডে-তে। পাহাড় ভাঙার অভিযানে ইনিংসের প্রথম বলেই বোল্ড ওপেনার নাঈমুর রহমান। আরেক দফা বৃষ্টির পর সেদিন মাঠ শুকোতে গ্রাউন্ডসম্যানদের সাথে নাকি মাঠে নেমেছিলেন বুলবুল-নান্নুরাও। অনেক সাধনার পর প্রস্তুত হওয়া উইকেটে বাংলাদেশের সামনে জয়ের লক্ষ্য দেওয়া হয় ২৫ ওভারে ১৬৬ রানের। সে সমীকরণটা শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়েছিলো ৬ বলে ১১ রানের। খালেদ মাসুদের সাথে উইকেটে তখন শেষ ব্যাটসম্যান হাসিবুল শান্ত। 


    বাংলাদেশ আর নিউ আইসিসি চ্যাম্পিয়নস...আ ন্যাশন দ্যাট ইজ একজ্যাক্টলি টুয়েন্টি ফাইভ ইয়ার্স ওল্ড!’


    ওভারের প্রথম বল, মার্টিন সুজির ফুল টস ডেলিভারি লফটেড ড্রাইভে বাতাসে ভাসিয়ে সীমানা ছাড়া করলেন পাইলট। সে ছক্কার কতো গল্প ছড়িয়েছে পরে, হবু শ্বশুরকে নাকি প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছিলেন। এক বল মিস করে অতিরিক্ত এক রানের পর একটা সিঙ্গেল, স্ট্রাইকে এবার শান্ত। ৩ বল থেকে প্রয়োজন ৩ রান, সুজির বাউন্সারে সজোরে ব্যাট চালালেন, হলো না। গ্যালারি থেকে গর্ডন গ্রিনিজ হাত তোলেন, ‘সিঙ্গেল, সিঙ্গেল…’

    কথাটা শুনেছিলেন কিনা শান্ত জানা হয় নি, তবে পরের গুড লেন্থ বলটা ব্যাকফুটে পুল করে প্রায় সীমানাছাড়া করে দিয়েছিলেন। ডিপ মিডউইকেট থেকে যতোক্ষণে ফিল্ডিং হলো, ২ রানের সুবাদে সমীকরণ তখন ১ বলে ১ রানের। গোটা বাংলাদেশে উত্তেজনা তখন তুঙ্গে, টং দোকানের আড্ডা থেকে মোড়ের রিকশাওয়ালা মামাদের জটলা ঘুরে ঢাকা শহরের সিগন্যালে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা সেডানে, কান তখন কেবলই রেডিওতে। সাত বছর বয়সের স্মৃতির পাতা থেকে ইউটিউবের পর্দায় ফিরে হেলমেটের ফাঁক গলে শান্তর চোখ দুটোয় চোখ পড়ে, অমন নির্লিপ্ত চাহনি দেখে কে বলবে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলটা খেলতে যাচ্ছেন মুহূর্ত বাদেই। 

    মার্টিন সুজি ফুল লেন্থে পিচ করলেন স্ট্যাম্পে, শান্ত গ্লান্স করতে চাইলেন, ব্যাটে-বলে হলো না, তবে পায়ে লেগে বল গেলো লেগ গালিতে, রানের জন্য দৌড়োলেন শান্ত-পাইলট, ফিল্ডারের সরাসরি থ্রোতে যতোক্ষণে  স্টাম্প ভাঙলো, কুয়ায়ালামপুরের গর্জন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায়। 

    পঁচিশ বছর বয়সের বাংলাদেশ সেদিন ক্রিকেট দুনিয়ায় যে নতুন পথচলা শুরু করেছিলো, সেটি মোটেও মসৃণ ছিলো না গত দুই দশককালের যাত্রায়। তবু একটু একটু করে এগিয়ে চলা আমাদের ক্রিকেট স্বপ্ন দেখায় আরও একটা ভোরের, যে ভোরে ক্রিকেটের বিশ্বকাপটা আমাদের হবে। মেয়েদের এশিয়া কাপ আর যুবাদের বিশ্বজয়ে সে স্বপ্নে আরও রং লাগে। আমরা নতুন করে আশাবাদী হই। মাহমুদুজ্জামান বাবুর কথায় ভরসা রাখি, ‘পরশু ভোর ঠিক আসবেই, এই আশাবাদ তুমি ভুলো না...।” 

    সেদিন হয়তো ইউটিউবেই সরাসরি সম্প্রচার হবে খেলা, স্মার্ট টিভিতে পাওয়া যাবে ঘরে বসে গ্যালারির উত্তাপ। তবু হাতের স্মার্টফোনগুলোয় কেউ রেডিও শুনবে কি? 

     

    অম্লান মোসতাকিম হোসেন প্যাভিলিয়নের হেড অফ কন্টেন্ট, প্রিয়ম মজুমদার চিফ অপারেটিং অফিসার ও হেড অফ মার্কেটিং, ফুয়াদ বিন নাসের লিড ডেভলপার, সাইফুল্লাহ্‌ বিন আনোয়ার ও রিফাত মাসুদ অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, নাজমুস সাকিব ও রিজওয়ান আবীর কন্ট্রিবিউটর , মহীবুল্লাহ ত্বকী সাবেক অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর ও কন্ট্রিবিউটর