• নিউজিল্যান্ডের অস্ট্রেলিয়া সফর
  • " />

     

    বিষাদ সময়ে, বিস্বাদের বন্দীত্বে

    বাতাসে বাতাসে কানাকানি। পূর্ব হতে পশ্চিম। অস্ট্রেলিয়া থেকে ইংল্যান্ড। মেলবোর্ন থেকে লর্ডস। শূন্য উদ্যান মনমরা সুর তুলে বাতাসে, কানে কানে ছড়িয়ে দেয় গোপন যাতনা-ব্যথা। সবুজ ঘাসে পা ফেলে না কেউ। শূন্য আসনগুলো খা খা করে, হুল্লোড় নেই, দাপদাপি নেই, শিষ নেই, হর্ষধ্বনি নেই, নেই চিৎকার বা হাততালি। কাঁটাতারের এপার-ওপার একই রকম। ভিন্ন কিছু নেই কোথাও। ওয়েংখেড়ের হাওয়া গাদ্দাফীতে ছাড়ে দীর্ঘশ্বাস, কলম্বোর শূন্যতা হাহাকার তোলে ইডেন পার্কেও, হারারে হতে ওয়ান্ডারার্স, কিংস্টন থেকে বেলফাস্ট, সর্বত্র নির্জনতার বেদনাবিধুর সুর ছড়িয়ে দেয় বিষণ্ণ হাওয়ার দল।

    একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণায় ব্যথিত—হোম অব ক্রিকেট, উঁকি দিতে চায় নন্দন কাননে, সেখানেও সঙ্গীহীন নিঃসঙ্গ কাকতাড়ুয়া যেন! কোথাও কেউ নেই। চারদিক চারপাশ খা খা করছে, সবুজ ঘাসের বুকে যেন নেমেছে বিরক্তিকর নির্জনতা।

    সবুজ ঘাসের বুকে পরম মমতায় আছড়ে পড়ে না লাল টুকটুকে চর্মগোলক। বুটজুতার কর্কশ খসখস কাটে না আঁচড়, কবিতার মতো শুদ্ধ অনুভূতি হয়ে ঘাসের পেট ছুঁয়ে দৌড়ায় না বিউটিফুল কাভার ড্রাইভ। লিকলিকে কাষ্ঠকাঠির কান ঘেঁষে বেরিয়ে যাওয়ার দুষ্টুমি নেই বল নামক গোলকটার। গোলক হাতে বাঘের মতো ছুটে আসা বলশালী বীর বাহাদুরদের, ব্যাটসম্যানের ব্যাট-প্যাড ফাঁকি দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখার জো নেই লিকলিকে কাঠিগুলোর। ছুটন্ত গোলার আঘাতে ছত্রখান হবে, নেই সে সুযোগ। দেহের নানান দোলনে, অঙ্গুলির হেলনে কিসব ছলকলা মিশিয়ে পাঠানো গোলকের ঘূর্ণনে ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া হয় না পুঁচকে বেলগুলোর। ছুটন্ত অগ্নিগোলার দূর্ভেদ্য রক্ষণে আটকে পড়লে—কাষ্ঠকাঠির চেপে রাখা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ার প্রয়োজন নেই। নেই মায়াবী ছন্দের ঘূর্ণিতে গুনগুনিয়ে কাঠি ঘেঁষে গোলকের পিছলে যাওয়া। শেষ মুহূর্তে নেমে আসা কাঠ, গোলকটাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে, তিন কাঠিকে চিৎপটাং হতে বাঁচিয়ে দেয়ার অনিন্দ্য সুন্দর মুহূর্ত—ইশ, ফটোগ্রাফার ডেকে তুলে নেয়া যায় যদি কোনো স্থিরচিত্র! ব্যাট নামক কাঠের হুংকার তুলে অবর্ণনীয় শাসন, বল নামক গোলকের বারবার প্রতিদ্বন্ধী হওয়া, স্ট্যাম্প নামক লিকলিকে কাষ্ঠকাঠিগুলোর সোজা টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা ছত্রখান হওয়ার চিত্র—নেই সেসব মুহূর্ত। সর্বত্র শূন্যতা। ধূ ধূ করছে সবখান।


    হুল্লোড় তোলা মানুষগুলো সব আজ বদ্ধ ঘরে বন্দী। মুক্ত হয়েও তাই আনন্দহীন—এই সমস্ত উদ্যান।


    পড়ে আছে গ্লাভস, ইস্ত্রি দিয়ে সযতনে পরিপাটি করে রাখা আছে গৌরবের শ্বেত পোশাক, আলমারির তাকে ক্যাপ-হ্যালমেট, এককোণে পড়ে আছে ছ’আউন্সের চর্মগোলক।

    পৃথিবীতে আপাতত শূন্যতার একচ্ছত্র রাজত্ব।

    তর্ক-বিতর্ক নেই কোথাও। ‘কাভার ড্রাইভ’ এসে বলে না—ধুর হ, ব্যাটা ‘স্ট্রেইট ড্রাইভ’! রাজ্যির সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে বসে আছি আমি। হুংকার তুলে জবাব দেয়ার নেই ‘লেট কাট’-এর। তবে আমি কী হে?

    আভিজাত্য নিয়ে ‘পুল’ এসে বসে না আলোচনায়। সংশয়ের ‘হুক’কে ডাকার তোরজোড় নেই ‘আপার কাট’-এর। ‘স্কয়ার ড্রাইভ’ সাদামাটা সাধারণ সেজে ভান ধরে না এখন, ‘ফ্লিক’-এর রাজকীয়তা দেখানোর ধুম নেই এদকম। পাড়াটা শান্ত-নীরব। বিতর্কহীন।

    গতি আর ঘূর্ণি। চিরকেলে দ্বন্ধ। স্তব্ধ সেসব। ‘সুইং’ ফনা তুলে ছোবল দিতে দাঁড়িয়ে নেই, ‘স্লোয়ার’ বোকা বানাতে হাজির হয়নি, ‘ঘূর্ণি’র ধাঁধিয়ে দেয়ার আয়োজন নেই। নির্ঝঞ্ঝাট পরিবেশ। সব চুপচাপ। সমস্ত চুপচাপ।

    লাল না সাদা?

    সাদা না রঙিন?

    অলস সৌন্দর্যের দীর্ঘতা নাকি ক্ষণিকের চোখে-মুখে মুগ্ধতা? অবশ্য কেউ বলেন—ক্ষণিকের কোনো মুগ্ধতা নেই, আছে শুধুই বিভ্রম!

    ‘লাল চর্মগোলক’ আভিজাত্য আর অহং নিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে নেই, ‘সাদা চর্মগোলক’টার দিকে। ঠোঁট উলটে ‘সাদা’ শুধোয় না এখন—হুঁহ! যা পাও তাতে চলে? মনে তো হয়, বাঁচবে না বেশিদিন। ‘লাল’-এর দায় নেই জবাব দেয়ার—বাঁচব না মানে? প্রায় দেড়শো বছর ধরে আছি। শেকড় গজিয়ে গেছে যে! উটকো ছোঁড়া! কী বুঝবি হে?

    ‘সাদা পোশাক’ জগতের শুদ্ধতা নিয়ে বাঁকা চোখে দেখে না ‘রঙিন পোশাক’কে। রঙিন আয়োজনকে। ‘রঙিন পোশাক’ বিরক্তির সুর তুলে সাদা পোশাকের অর্থহীনতা নিয়ে আলাপ পাড়ে না।

    মাঝখানে হঠাৎ চোখ পড়লে সবচেয়ে নবীন সদস্যের দিকে—সাদা পোশাক ও গোলাপী বল; ন্যাঁকা স্বরে, বলে না কেউই—কি খুকী! ক’দিন আছো? কি মনে হয়, টিকবে তুমি?

    শুনশান চারদিক। কারো আওয়াজ নেই। কোনো কথা নেই।

    ছ’আউন্সের চর্মগোলক—অনুভূতিহীন জড়পদার্থ। লিকলিকে ঢ্যাঙা কাষ্ঠকাঠিও তা-ই। ব্যাট নামক কাঠটাও—প্রাণহীন, জড়। ক্রিকেট শট বা বোলিং আর্টের আলাপ নিতান্তই শিশুতোষ, শ্বেত বা রঙিন ক্রিকেট নেহায়েৎ অশরীরি। সমস্ত আয়োজনটাই ব্যক্তির অনুভূতি ও মস্তিষ্কের উদ্ভট কল্পনাপ্রসূত।

    এসব অনুভূতির রুপায়ন বালখিল্য বৈ কিছুই নয়। তবে যেসব জীবন এই জড় পদার্থ নিয়ে কাজ করেন, জীবন্ত মনে করান, কাব্যিক বা শুদ্ধ রুপ এঁকে দেন সেখানে, সেই তাঁরা কিন্তু অনুভূতিহীন নন। ক্রিকেটারদের অনুভূতি আছে। আনন্দ-বেদনা আছে, মন ভালো—মন খারাপ আছে। সবুজ ঘাসের উদ্যানে, ২২ গজের আয়তক্ষেত্রে তাঁরা কখনো পিকাসো হন, কখনো জয়নুল হন, কখনো হন ক্রিস এঞ্জেল। তাদের হুল্লোড়ে সুর উঠে ক্রিকেট কাননে, জীবন্ত মনে হয় সমস্ত।

    হুল্লোড় তোলা মানুষগুলো সব আজ বদ্ধ ঘরে বন্দী। মুক্ত হয়েও তাই আনন্দহীন—এই সমস্ত উদ্যান।

    আনন্দ?

    ক’দিনের জন্য বুঝি পৃথিবী ছেড়েছে, পৃথিবীকে ছেড়ে দিয়েছে ভয়-আতঙ্ক-একাকীত্ব ও বন্দীত্বের হাতে। এ থেকে মুক্তির তারিখ জানা নেই কারো।