• ফুটবল, অন্যান্য
  • " />

     

    স্লিভলেস থেকে ওয়ানপিস : ক্যামেরুনের অদ্ভুত জার্সির গল্প

    থ্রি কোয়ার্টার ট্রাউজার, ফুল শার্ট, মোজা, বুট-  ফুটবলের একেবারে শুরুর দিককার পোশাক ছিল এমন। বিবর্তনের ধারায় সেটা এখন বাকি সব ঠিক আছে, থ্রি কোয়ার্টার বাদ পড়েছে বহু আগেই। শর্টসের মাপে অবশ্য তারতম্য এসেছে বহুবার। পেলে, ডিয়েগো ম্যারাডোনা যে আক্ষরিক অর্থেই শর্ট পরে খেলে গেছেন। ডেভিড বেকহ্যামরা নতুনত্ব যোগ করে ঢিলেঢালা শর্টসটাকে প্রায় হাঁটু সমান দূরত্বে নিয়ে গেছেন। একেক জার্সি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান নিত্য-নতুন ঢংয়ে এখন জার্সি প্রস্তুত করছে- তবে ধারাটা থেকে গেছে একই।

    এই ধারাতেই নতুনত্ব যোগ করতে গিয়েছিল ক্যামেরুন ও তাদের জার্সি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান পুমা। শুরুতে বাগড়া না বাধালেও পরে গিয়ে বড়সড় ক্ষতির মুখেও পড়তে হয়েছিল তাদের।


    ২০০২ আফ্রিকান কাপ অফ নেশনে ক্যামেরুন


    ২০০২ সালের আফ্রিকান কাপ অফ নেশনসের আয়োজক দেশ ছিল মালি। সেখানকার তাপমাত্রার সঙ্গে টক্কর দিতে সেবার ক্যামেরুনের জন্য স্লিভলেস জার্সি প্রবর্তন করেছিল পুমা। ক্যামেরুনের সেই দলে ছিলেন রিগুবার্ত সং, রিয়াল মাদ্রিদের জেরিমি, তরুণ স্যামুয়েল ইতোরা। ‘হাতাকাটা’ জামা পরেই সেবার নিজেদের চতুর্থ আফকনের শিরোপা ঘরে তুলেছিল দেশটি।

    ক্যামেরুনের নতুন এই জার্সি নিয়ে অবশ্য তখন থেকেই আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছিল। মার্চে এরপর জার্সি টানকে প্রবেশ করল ফিফাও। ২০০২ জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপের মাত্র ৩ মাস আগে নিয়ম বহির্ভুত বলে ক্যামেরুনের ওই জার্সিকে ‘বাতিল’ ঘোষণা করল তারা। ফিফার তখনকার মুখপাত্র কেইথ কুপার তখন বলেছিলেন, “এটা কোনো শার্ট হয়নি, হয়েছে একটা ভেস্ট”।

    নিয়ম অনুযায়ী ফিফার টুর্নামেন্টে খেলোয়াড়দের জার্সির এক হাতায় থাকবে বিশ্বকাপের লোগো, আরেক হাতায় স্বয়ং ফিফার লোগো। জার্সির যদি হাতাই না থাকে তাহলে সেই নিয়ম ক্যামেরুন মানবে কী করে? আবার এই জার্সি বাতিল করতে হলে ব্যবসায়িক দিয়েও বড়সড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে পুমাকে। বিশ্বকাপ শুরুর কয়েকদিন আগে কী এক উটোকো ঝামেলা!

    পুমা সেবার অবশ্য সামাল দিয়েছিল মাথা খাটিয়ে। ওই জার্সির সঙ্গে স্বচ্ছ কালো রঙের দুইটি হাতা যোগ করে দিয়েছিল তারা। অর্থাৎ ভেস্ট এক কাপড়ের, আর হাতায় ‘মসলিনের’ ছোঁয়া। তাতে ফিফার নিয়ম কানুনের ভেতর থেকে পার পেয়ে গিয়েছিলেরন ইতোরা।


    ২০০২ বিশ্বকাপ : মাথা খাটিয়ে হাতা লাগিয়ে সমাধান


    অবশ্য জার্সির যুদ্ধটা থামেনি তখনও। দুই বছর পর আবার আফ্রিকান নেশনস কাপে অংশ নিতে গেল ক্যামেরুন। তিউনিসিয়ায় এবার শিরোপা ধরে রাখার মিশন। কিন্তু শিরোপার চেয়ে জার্সিটাই যেন মুখ্য হয়ে গেল। এবার ক্যামেরুন মাঠে নামল ‘ওয়ান পিস’ গায়ে চাপিয়ে। থাক গুগল করতে ছুটতে হবে না আপনাকে। থ্রি পিস চিনে থাকলে ওয়ান পিস চিনতে আপনাকে গুগলের সাহায্যপ্রার্থী হতে হবে না। মাথা খাটালেই চলবে।


    বিখ্যাত 'ওয়ান পিস'


    এই জার্সির বিশেষত্ব হলো শার্ট আর শর্টস একটাই, যুক্ত করা। স্থিতিস্থাপকতা কাপড়ে আগে পা দুটো ঢুকিয়ে দিতে হবে, এর পর হাতা ঢুকিয়ে গলা পর্যন্ত টেনে নিলেই হয়ে যাবে স্বভাবসুলভ ভদ্রস্থ ফুটবল জার্সি। এবার অবশ্য স্ট্রেস আর স্ট্রেইনের মারপ্যাঁচে ফিফা আর ক্যামেরুনের সম্পর্কটা গিয়ে ঠেকল ফ্র্যাকচার পয়েন্টে। ফিফা প্রেসিডেন্ট সেপ ব্ল্যাটার ওই জার্সি দেখে বললেন, “ফুটবল জার্সির নিয়ম তো খুব সহজ রে ভাই! একটা শর্ট, একটা শার্ট আর একজোড়া মোজা।”

    “আমরা ফুটবলের অভিবাবক সংস্থা। নিয়ম-কানুন প্রয়োগ করার দায়িত্বও আমাদের।”- ব্ল্যাটার হুমকিই দিলেন একরকম। যাক জার্সি যখন বানানো হয়েই গেছে, নতুন জার্সি প্রস্তুত করতেও সময় লাগবে- তাই আফকনের গ্রুপপর্ব পর্যন্ত ওই ‘ওয়ান পিস’ পরে মাঠে নামার অনুমতি মিলল ক্যামেরুনের। কিন্তু তারা তো অপ্রতিরোধ্য  সিংহ। তাদের রুখবে কে? বীরদর্পে কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচেও ওই জার্সি পরে মাঠে নেমে গেল ক্যামেরুন।

    ফিফার কথা এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দেওয়ার শাস্তি কী হতে পারে এর পর সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে আফ্রিকার দেশটি। ধৈর্য্যেহারা ওই জার্সির নিয়ম না মানায় দেড় মিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছিল ক্যামেরুন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে। পুমা অবশ্য দাবি করেছিল টুর্নামেন্ট শুরু আগেই এই জার্সি তারা ফিফা ও সিওএফকে দেখিয়ে অনুমতি নিয়েছে। তাদের অভিযোগ, তখন কেউ কিছু বলেনি, এখন কেন এতো সমালোচনা? পুমা পরে আইনজীবি ভাড়া করে লড়াইও চালিয়েছিল কিছুদিন।

    অবশ্য ক্ষতিটা হয়েছিল ক্যামেরুনেরই। টাকার অঙ্কের সঙ্গে ২০০৬ বিশ্বকাপ বাছাইয়ের তাদের ৬ পয়েন্ট কেটে নিয়েছিল ফিফা। অনুমিতভাবেই এর পর আর জার্মানি বিশ্বকাপে জায়গা হয়নি ইতোদের। এর পর আর কেউ সাহস দেখাবে এমন কিছু করার?