• লা লিগা
  • " />
    X
    GO11IPL2020

     

    মেসির জন্য মঞ্চ প্রস্তুত, কিন্তু মেসি কি প্রস্তুত?

    প্রথম যেবার বদলি হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিলেন লিওনেল মেসির জার্সি নম্বর তখন ছিল ৩০। জার্সি নম্বর বদলে ১৯ এ গেলেন পরের বছর। প্রথমবারের মতো এল ক্লাসিকোতে একাদশে নামলেন ২০০৭ এ। মেসি নামটা ততোদিনে পরিচিত হয়ে গেছে বিশ্ব ফুটবলে। তবে সেই নাম ডাক শুধুই একজন সম্ভাবনায় উঠতি ফুটবলার হিসেবে। ন্যু ক্যাম্পের সেই ম্যাচে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে মেসি করলেন হ্যাটট্রিক। ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে আকর্ষনীয় ম্যাচেই এলো ঘোষণা, নতুন মেসাইয়া পেয়ে গেছে ফুটবল। ১৩ বছর পেরিয়ে গেছে সে ঘটনার। মেসি এখন এল ক্লাসিকোর সবচেয়ে সফল ফুটবলার, সবচেয়ে বেশি গোল তার, সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্টও তার। মেসি ক্লাসিকোর রাজা।

    এই ১৩ বছরে মেসির ক্যারিয়ার পালটেছে বহুভাবে, বহুরুপে। সবচেয়ে বড় বদলটা ঘটল কিছুদিন আগেই, যখন মেসি ঘোষণা দিলেন বার্সেলোনা ছাড়তে চান তিনি। মেসির সে ইচ্ছে পূরণ হয়নি। তবে বার্সেলোনায় যে তিনি থাকবেন সেটাও অনিশ্চিত। মত পরিবর্তন না হলে এই মৌসুম শেষ হলেই ঘরবাড়ি ছেড়ে স্পেন থেকে চলে যাবেন মেসি। ২০২০ বহু নাটক দেখিয়েছে, এখনও বাকি আছে আড়াই মাস। ২০২০ পৃথিবীর ইতিহাসেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ন্যু ক্যাম্পে মেসি শেষ ক্লাসিকো খেলেছিলেন ২০২০ সালে- বহু কারণের সঙ্গে এই কারণেও হয়ত অনেকেই মনে রাখবেন এ বছরটা। যদি না…

    কিছুদিন আগে ঘটেছে আরও একটি ঘটনা, চোখ এড়িয়ে গেলে মিস করে গেছেন আপনি। গেটাফের কাছে ১-০ গোলে হারের পর বার্সা কোচ রোনাল্ড কোমান এমন এক মন্তব্য করেছেন যা আপনি দেখেননি, শোনেননি।
     


    “মেসির হয়ত আরেকটু ভালো খেলা উচিত ছিল।”- গেটাফের কাছে বার্সা কোচ হিসেবে নিজের প্রথম হারের পর সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন কোমান। মেসিভক্ত হয়ে থাকলে প্রথমবার এমন কিছু শুনে আপনার রাগ চড়ে বসতে পারে। তবে বার্সার ডাচ কোচ কি আদৌ ভুল কিছু বলেছেন? এখন পর্যন্ত লিগে ৪ ম্যাচ খেলেছেন মেসি। অর্থাৎ ৩৬০ মিনিটেরও বেশি সময় মাঠে ছিলেন তিনি। অথচ এখনও পর্যন্ত ওপেন প্লে থেকে কোনো গোল নেই তার। একমাত্র গোলটি মৌসুমের প্রথম ম্যাচে করা, পেনাল্টি থেকে। ২০০৫-০৬ মৌসুমের পর এটাই কোনো মৌসুমে মেসির সবচেয়ে বাজে শুরু। গত এক দশকে ম্যাচ প্রতি মেসির গড় শট অন টার্গেট ছিল ২.১৫। এই মৌসুমে সেটা কমে দাঁড়িয়েছে ১.৭৫ এ। কমেছে ম্যাচ প্রতি ড্রিবল অ্যাটেম্পটও, ৮.৫৮ (২০১৯-২০ পর্যন্ত) থেকে কমে সেটা হয়েছে ৪.৭৫।   

    কোমানের অধীনে মেসির পজিশনও বদলেছে। মাঠে তিনি নামেন মূল স্ট্রাইকারের ভূমিকায়। যদিও সেখানে আদতে খুঁজে পাওয়া যায় না তাকে। বেশিরভাগ সময়ি মিডফিল্ডে নেমে যেতে হয় ফাঁকা জায়গায় খুঁজতে। এই ফাঁকা জায়গা মেসির জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। ড্রিবলিংয়ে মরচে পড়ায় আক্রমণভাগে মেসি সফল হচ্ছেন আগের চেয়ে কম। আর স্বাভাবিকভাবেই যে কোনো দল রক্ষণে মেসির ওপর রাখে বাড়তি পাহারা। কার্যকরী ভূমিকায় থাকতে তাই ঘুরে ফিরে নিচেই নেমে যেতে হচ্ছে মেসিকে। যদিও ফিলিপ কৌতিনহো ফেরার পর নাম্বার টেনের ভূমিকায় ছাড়ই দেওয়ার কথা ছিল তার। বয়সের সঙ্গে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো তার খেলার ধরন বদলে ফেলেছেন, মেসিকেও অবধারিতভাবে নতুন পথ খুঁজতে হবে। মেসি কোন পথে গেলেন সেটা হয়ত বোঝা যাবে এই মৌসুম মাঝপথ পেরুলে। তার চেয়েও বড় কথা, মেসি যদি এখনও ক্লাব ছাড়ার ব্যাপারে অনড় থাকেন, সেক্ষেত্রে তার পারফরম্যান্সের উন্নতির সম্ভাবনাও কম। নিদেনপক্ষে হিউম্যান সাইকোলোজি তো তেমনটাই বলে।  

    মাঠে আর মাঠের বাইরে এতো ধরনের সঙ্কটে হয়ে আগে কখনও এল ক্লাসিকোতে মাঠে নামা হয়নি মেসির। আবার এটাও সত্যি যে এক ঝলকে এখান থেকে বেরুনোর রাস্তাও আছে মেসির সামনে। এল ক্লাসিকোর চেয়ে বড় উপলক্ষ্য আর কী দরকার? ক্লাসিকোতে নিজেকে প্রমাণের কিছু বাকি নেই মেসির। মোট ৪১ ম্যাচে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে তার গোল ২৬ টি। দুইয়ে থাকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও তার চেয়ে ৮ গোল পেছনে। শুধুমাত্র লা লিগায় ২৭ ম্যাচে মেসি রিয়ালের বিপক্ষে গোল করেছেন ১৮টি, অ্যাসিস্ট আছে আরও ৯টি। অর্থাৎ পৃথিবীর সবচেয়ে সফল ক্লাবের বিপক্ষে ম্যাচ প্রতি মেসির গোলে অবদান গড়ে ১। গত ১৬ বছরে এই এক মেসিকে সামলাতেই হিমশিম খেয়েছে রিয়াল। মেসিও লা লিগায় বার্সেলোনার কর্তৃত্ব স্থাপন করেছেন নিজ জাদুমন্ত্রে। কিন্তু গত দুই বছরে সেই ক্লাসিকোতেও বিবর্ণ মেসি। রোনালদো রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়ার পর তিনি থেকেও যেন নেই। ২০১৮ এর মে তে সবশেষ ক্লাসিকোতে গোল পেয়েছেন মেসি। ২-২ এ ড্র হওয়া ন্যু ক্যাম্পের ম্যাচে গোল করেছিলেন রোনালদোও। এরপর তারও আর ক্লাসিকো খেলা হয়নি, মেসিরও আর গোল পাওয়া হয়নি এই ফিক্সচারে।

    ওই ৫ ম্যাচের ভেতর লা লিগায় তিনবার আর কোপা ডেল রে তে ২ বার রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে খেলেছেন মেসি। ৫ ম্যাচের একটিতে নেমেছিলেন বদলি হিসেবে। আর লিগের সবশেষ তিন ম্যাচেই গোলের সঙ্গে অ্যাসিস্টের খাতাও শুন্য গেছে মেসির। এল ক্লাসিকোতে একটানা সবচেয়ে বেশি ৬ ম্যাচ গোলহীন ছিলেন মেসি। সেটা ২০১৪ এর এপ্রিল থেকে ২০১৬ এর শেষ পর্যন্ত। তবে সে সময় নিয়মিত গোলে অবদান রেখে গেছেন আর্জেন্টাইন ফুটবলার। এই ৫ ম্যাচে মতো ম্রিয়মাণ মেসিকে কমই দেখেছে ফুটবল।

    মোটা দাগে বিচার করলে জিনেদিন জিদানের রিয়ালের বিপক্ষে মেসির রেকর্ড  খুব একটা সুবিধার নয়। ন্যু ক্যাম্পের ক্লাসিকোতে মেসি সবশেষ জয় দেখেছেন ২০১৫ সালে। ২০১৮ তে রিয়ালকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার ম্যাচে চোটের কারণে খেলা হয়নি মেসির। এছাড়া ২০১৫ এরপর থেকে  লিগে বাকি সব ন্যু ক্যাম্পের ক্লাসিকোতেই রিয়ালের কোচ ছিলেন জিদান। জিদানের অধীনে রিয়ালও কখনও হারেনি ন্যু ক্যাম্পে।

    ক্লাসিকোতে মেসির হয়ত নিজেকে প্রমাণ করার কিছু নেই। তবে রিয়ালের বিপক্ষে সাম্প্রতিক রেকর্ড তো তারও মনে থাকার কথা আলাদা করে। এই ক্লাসিকো যদি সত্যিই ন্যু ক্যাম্পে মেসির শেষ ক্লাসিকো হয় তাহলে তো আরও বেশি তেঁতে থাকার কথা তার। ক্লাসিকোর তিনদিন পর বার্সেলোনা খেলতে যাবে তুরিনে। সেখানে অপেক্ষা করছেন তার পুরোনো আর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। গেল কয়েক মাসের ঝড়-ঝাপটা মেসি হয়ত কাটিয়ে উঠেছেন। জাতীয় দলের হয়েও কিছুদিন আগে ভালো সময় পার করেছেন। কিন্তু বার্সেলোনার মেসি বা মেসির বার্সেলোনার দেখা এই মৌসুমে এখনও পাওয়া যায়নি। মৌসুম শুরু হয়েছে মাত্র, পঞ্চম ম্যাচেই বার্সেলোনার প্রতিপক্ষ রিয়াল মাদ্রিদ। সবমিলিয়ে সাত নম্বর ম্যাচে প্রতিপক্ষ জুভেন্টাস। খারাপ সময় দ্রুত কাটিয়ে উঠতে এর চেয়ে মোক্ষম উপলক্ষ্য এতো তাড়াতাড়ি হয়ত পাওয়ারও কথা ছিল না মেসির। সেটা পেয়ে গেছেন সালটা ২০২০ বলেই। এই দুই ম্যাচে প্রেরণাদায়ী কিছু করতে না পারলে 'খারাপ সময়ের' স্থায়ীত্ব বাড়বে আও কিছুদিন। আগামী সাতদিন ৩৩ বছর বয়সীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ তাই। এক ঝটকায় সব পেছনে ফেলার জন্য এর চেয়ে ভালো সুযোগ কমই পেতেন মেসি।

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন