• চ্যাম্পিয়নস লিগ
  • " />

     

    ভয়ঙ্কর মিলানে 'অসুন্দর' ফুটবল

    চোখের সামনে পুড়ছে সান সিরো। মার্কো মাতেরাজ্জি রুই কস্তার কাঁধে কনুইয়ের ভর রেখে সেই দৃশ্য দেখছেন। একজনের গায়ে ইন্টার মিলানের জার্সি, আরেকজন এসি মিলানের। কিছুই যেন করার নেই কারও। এই কুরুক্ষেত্রে খেলা যায় নাকি।

    ২০০৫ সালে মিলান ডার্বির এই ছবিটা ঢুকে গেছে ইতিহাসে। এখনও যতবার মিলান ডার্বি আসে, ততোবার নতুন করে কারও না কারও টাইমলাইনে জায়গা করে নেয় ছবিটি। কী নির্বিকার দুইজন, দুই রঙের দুইজন, দুই ক্লাবের দুইজন, দুই শত্রু- একে অন্যের আশ্রয়ে খুঁজেছেন একটু স্বস্তি। এই ছবির ব্যাখ্যা আপনি যেমন খুশি তেমনভাবে দাঁড় করাতে পারেন।

     


    চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালের ওই ম্যাচটা জার্মান রেফারি মার্কাস মার্ককে পরে বাতিল করতে হয়েছিল। প্রথম লেগে ২-০ গোলে এগিয়ে থেকে দ্বিতীয় লেগ খেলতে নেমেছিল মিলান। আন্দ্রে শেভচেঙ্কোর গোলে আরও একবার এগিয়ে গিয়েছিল রোসোনেরিরা।

    ঝামেলার শুরু হয়েছিল ম্যাচের ৭০ মিনিটের পর। এস্তেবান ক্যাম্বিয়াসোর সমতাসূচক গোল বাতিল করেছিলেন রেফারি। তারও আগ থেকে অবশ্য তেঁতে ছিল ইন্টার সমর্থকেরা। ম্যাচের ২ মিনিটেই শেভচেঙ্কো এক ফাউল করে বসেছিলেন। সান সিরোর নীল অংশে তখন থেকেই শুরু ‘বিক্ষোভের’। তাদের মতে, লাল কার্ড দেখা উচিত ইউক্রেনিয়ানদের। সেই শেভচেঙ্কো যখন ২০ গজ দূর থেকে ফ্রাঞ্চেস্কো টোল্ডোকে কোনো সুযোগ না দিয়েই গোল করে বসলেন তখন বিক্ষোভে ঝাঁঝ বাড়ল আরেকটু। ক্যাম্বিয়াসোর গোল বাতিলের পর যেন সহ্যের সীমা বাধ ভাঙল নেরাজ্জুরি সমর্থকদের।

    ইতালিতে হুলিগানিজম ভালোভাবেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল সে বছর। এর আগে চ্যাম্পিয়নস লিগের গ্রুপ পর্বে রোমা সমর্থকদের হুলুস্থুলে ডায়নামো কিয়েভের সঙ্গেও ম্যাচ বাতিল হয়েছিল ইতালিতে। আর কোয়ার্টার ফাইনালে যখন মিলানের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর দেখা, তার আগে সর্বোচ্চ সতর্কতাতেই ছিল মিলানের নিরাপত্তাকর্মীরা।

    অবশ্য নেরাজ্জুরি আল্ট্রাসদেরন তাতে থোড়াই কেয়ার। এতোসব নিরাপত্তাকর্মীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ফ্লেয়ার নিয়ে মাঠে ঢুকেছিলেন তারা। ইন্টার প্রতিপক্ষের গোলে চিড় ধরাতে না পারলেও বোতলবৃষ্টিতে ভাসল মিলানের রক্ষণভাগ। সঙ্গে ফ্লেয়ার তো আছেই। আগুনের গোলার মতো একটার পর একটা উড়ে আসলো। একটি ফ্লেয়ার গিয়ে লাগল মিলানের ব্রাজিল গোলরক্ষক দিদার ঘাড়ে। ওই অবস্থায় একটা কাজই করার ছিল রেফারির। ৭৩ মিনিটে থমকে গেল ম্যাচ। রেফারি সব খেলোয়াড়কে নিয়ে চলে গেলেন ড্রেসিংরুমে।


    দিদা প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পরও ম্যাচ খেলার অবস্থায় আর যাননি। মিনিট দশেক পর সবাই আবার যখন মাঠে ফিরেছেন তখন মিলান মাঠে নামিয়েছে দ্বিতীয় পছন্দের গোলরক্ষক ক্রিশ্চিয়ান আবিয়াত্তিকে। যদিও তারও আর খেলার সুযোগ হয়নি। বরং ১০ মিনিট আগে যে মাঠ ফেলে ড্রেসিংরুমে গিয়েছিলেন তখনই অবস্থা আরেকটু ঠান্ডা ছিল মনে হয়!

    ইন্টার খেলোয়াড়রা সমর্থকদের অনুরোধও করেছিলেন শান্ত হতে। কিন্তু ততোক্ষণে পরিস্থিতি আর কারও হাতে নেই। সমর্থকেরাও শুনবেন না কারও কথা। বিগড়ে যাওয়া অবস্থায় রেফারিকে পরে খেলা বাতিলই করতে হয়েছিল।

    ২০০১ সালে ইউয়েফা কাপের ম্যাচেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল একই মাঠে। সেবারও দলটার নাম ছিল ইন্টার। এবার আর তাই অল্পতে পার পাওয়ার কোনো সম্ভাবনই ছিল না তাদের। ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় পরের ৬ ম্যাচ (২ম্যাচ কম) ফাঁকা মাঠে খেলার সঙ্গে ৩ লাখ সুইস ফ্রাঁ জরিমানা দিয়ে পার পেয়েছিল ইন্টার।

    এতো বছর পর সেসব মোটামুটি ভুলে গিয়েছে সবাই। বহুবছর পরও শুধু একটা গল্প হয়েই থাকবে এই ম্যাচ। কিন্তু এই ছবিটা দিন যত যাবে ততোই অমরত্বের রূপ নেবে। মিলানে ফুটবলের হারের রাতেও ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’ এক ছবি জুটেছিল জাদুঘরে রাখার মতো।