• ফুটবল, অন্যান্য
  • " />

     

    ফ্রান্সকে হারিয়ে যেদিন বিশ্ব কাঁপিয়ে দিয়েছিল সেনেগাল

    সেনেগালের টিম হোটেলের লবিতে দাঁড়িয়ে আছে দক্ষিণ কোরিয়ার পুলিশ। বিশ্বকাপে মশগুল তখন বিশ্ব। তিনদিন পর প্রথম ম্যাচে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের সঙ্গে খেলবে সেনেগাল। সেনেগালের প্রথম বিশ্বকাপ, প্রথম ম্যাচ। সেই ম্যাচের আগে পুলিশের জেরার মুখোমুখি প্রায় পুরো দল। বাকিরা ছাড়া পেলেন, কালিদু ফাদেগা একা আটকা পড়লেন। পুলিশের সঙ্গে হোটেল ছাড়তে হলো তাকে, চুরির দায়ে। দেগু এক শহরে ১৮ ক্যারেট সোনার এক নেকলেস চুরি করেছেন ফাদেগা।

    কী ন্যাক্কারজনক ঘটনা! ফাদেগা নিজেও স্বীকার করেছেন চুরির ঘটনা। দোকানী অন্যদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। ফাদেগা আর দুই সতীর্থ- এল হাজ দিউফ, সালিফ দিয়াও মিলে বেরিয়ে ছিলেন ঘুরতে। ঘুরতে ঘুরতেই ওই দোকানে ঢুকেছিলেন তারা।  দিউফ আর দিয়াওর মাথায় 'দুষ্টু বুদ্ধি'- "পারলে নেকলেস চুরি করে দেখা তো!" ফাদেগাও রাজি হয়ে গেলেন। চ্যালেঞ্জই তো! চুরি করে পরে সেই নেকলেস সঙ্গে করেও এনেছিলেন ফাদেগা।

    বড় শাস্তি হতে পারত, কোরিয়ান পুলিশ অবশ্য ফাদেকাকে ছেড়েই দিল। বিশ্বকাপ বলেই হয়ত ছাড়া পেয়েছিলেন তিনি।

    একটা দেশের বিশ্বকাপ স্বপ্ন ধুলোয় মিশিয়ে দিতে এর চেয়ে বাজে কিছু বোধ হয় করা সম্ভব ছিল না। অথচ বিশ্বকাপের বাঁশি যখন বাজল তখন সবাই বুঁদ হলো সেই সেনেগালেই। ফুটবল বিশ্ব নাড়াচাড়া দিয়ে চুরির ঘটনা নিমিষেই মিলিয়ে গেল হাওয়ায়। 


    ‘ভূমিকম্প’ চেয়েছিলেন সেনেগাল কোচ ব্রুনো মেতসু। সেনেগাল কোচের বাড়ি ফ্রান্সে, ডানকার্কে জন্ম বলেই হয়ত তার কাছে অলৌকিকতা বলে কিছু নেই। সবই লৌকিক, সবই সম্ভব। ফ্রান্সের সঙ্গে মাঠে নামার আগে মেতসু একটা কথাই বলেছিলেন, “সবকিছু যদি ভুলে যেত চাও ফ্রান্সকে হারাও। বন্ধুকে যদি লজ্জার হাত থেকে বাঁচাতে চাও ফ্রান্সকে হারাও। ফ্রান্সকে হারালে দেখবে গোটা বিশ্বে ভূমিকম্প হয়ে গেছে।” মেতসুর জন্য ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচটা 'ডি ডের' মতো।

    ফ্রান্স অবশ্য চার বছর আগেই একবার বিশ্ব কাঁপিয়ে দিয়ে এসেছে। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ শুরুর আগে তাদের র‍্যাংকিং ছিল ২৫। সেখান থেকে বিশ্বকাপ জিতেছিল ফ্রান্স। দুই বছর পর ইউরোও গেছে তাদের ঘরে। দলের খেলোয়াড়রা সব ইউরোপের নামী-দামী ক্লাবের খেলেন। জিনেদিন জিদান, থিয়েরি অঁরি, প্যাট্রিক ভিয়েরা, ফাবিয়ান বার্থেজরা বিশ্বকাপ ধরে রাখতে এসেছেন জাপান-কোরিয়ায়।

    উলটো অবস্থা সেনেগালের। বিশ্বকাপ দূরে থাক, আন্তজার্তিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতাই কম এই দলের। ২৩ জনের স্কোয়াডের ২১ জনই অবশ্য খেলেন ফ্রেঞ্চ লিগে। একসময় ফ্রান্সের উপনিবেশিক রাষ্ট্র হয়ে ছিল সেনেগাল। সেনেগালের বেশিরভাগ ফুটবলারই ফ্রান্সে ফুটবল খেলে বড় হয়েছেন। অনেকে ফ্রান্সের হয়ে খেলতেও পারতেন। সেনেগালকে ফ্রান্সের ‘বি’ দল বললেও ভুল হত না।

    সেনেগাল অঘটন ঘটিয়ে দেবে- এমন  কিছু নিয়ে আলোচনাও হয়নি ম্যাচের আগে। ভিয়েরা নিজেও ম্যাচের আগে বলেছিলেন, “সেনেগালের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।” আর এশিয়ার প্রথম বিশ্বকাপ, প্রথম ম্যাচ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর পুঁচকে সেনাগালের।  ম্যাচের ফল আপনার জানা, সবারই জানা- তাই প্রথম ম্যাচের আগে ফুটবলের চেয়ে সিউলের আড়ম্বর উদযাপনের গল্প দিয়েই পার করে দিয়েছে বিশ্ব সংবাদমাধ্যমও।

    ম্যাচের আগেই চোটে পড়েছিলেন আগের বিশ্বকাপের নায়ক জিদান। তখনই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল প্রথম দুই ম্যাচ  খেলছেন না তিনি। প্রতিপক্ষের নামগুলো সহজ বলেই হয়ত খুব বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েনি ফ্রান্সও। সেনেগালের ম্যাচ শেষে অবশ্য পুরো চিত্রই পালটে গিয়েছিল। সিউলের ভূমিকম্পে ১৮ ক্যারেটের নেকলেস চাপা পড়েছিল ১৮ ক্যারেটের বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্সেরও নিচে।

    সিউলে ম্যাচের শুরুতে ডেভিড ত্রেজেগে বারপোস্ট দিলেন। অনুমিত শুরুই, এমনই তো হওয়ার কথা। সব পালটে গেল ম্যাচের ৩০ মিনিটে। এল হজ দিউফ ফ্রান্স ডিফেন্ডার ফ্রাঙ্ক লেবফকে জোছনা দেখিয়ে মারলেন ফাঁকি, ঢুকে গেলেন বক্সের ভেতর। এরপর পাস বাড়ালেন গোলের সামনে। বার্থেজ আর পেটিট দুইজন তাদের বিস্তর অভিজ্ঞতা ভুলে গিয়ে করলেন হাহাকার ধরানো এক ভুল। পাপা বুপা দিউপ খালি বল ঠেলে দিলেন খালি জালে। এক দৌড়ে এরপর জার্সি খুলে কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে গিয়ে মাটিতে ফেললেন, সতীর্থরা গোল হয়ে ওই জার্সি ঘিরেই করল উদযাপন। বিশ্বকাপ সেদিনই প্রথম দেখেছিল জার্সি প্রদক্ষিণ করা উদযাপন। এরপর কতশত তরুণ সেটা নকল করে পাড়া মহল্লায় অগুরত্বপূর্ণ গোল উদযাপন করেছেন তার ইয়ত্তা নেই। সেনেগালের গল্পের শুরুও সেদিন থেকে।


    ম্যাচের অবশ্য এরপর আরও এক ঘন্টা সময় ছিল। ওই সময়টাও কোনোমতে পেরিয়ে যাওয়ার পর হয়ে গেল সেনেগালের ইতিহাস। বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা অঘটনের ইতিহাসের। ১৯৯০ এর বিশ্বকাপে তখনকাল চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাও ক্যামেরুনের কাছে হেরে বিশ্বকাপ শুরু করেছিল। সেনেগাল সেই ক্যামেরুনের পথ ধরে হাঁটা ধরল। আর ফ্রান্স ওই বিশ্বকাপ শেষ করল কোনো ম্যাচ না জিতে, কোনো গোল না করে, গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়ে। সেনেগালের কাছে এক হার ফ্রান্সের আত্মবিশ্বাস গুঁড়িয়ে দিয়েছিল মাটির সঙ্গে। আর এক হারের গল্পে বিশ্বকাপ শুরু করা লায়ন্স অফ তেরেঙ্গা তখন বিশ্বের বিস্ময়।

    ফ্রান্সের বিপক্ষে জয়টা যে শুদুই অঘটন ছিল না তার প্রমাণ সেনেগালের পরের ম্যাচ। এবার মেতসুর মন্ত্র আলাদা- নিজেদের যোগ্যতা দেখিয়ে ম্যাচ শেষে থার্ড ব্রাকেটের ভেতর প্রমাণ লিখে আসতে হবে দিউফদের। ডেনমার্কের সঙ্গে ম্যাচে দেখা গেল সেই ‘প্রমাণ’। ১৪ মিনিটে পেনাল্টি পেয়ে এগিয়ে গিয়েছিল ডেনমার্ক। এরপর সেনেগাল যে গোলে সমতায় ফিরল সেটা ফুটবল বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা কাউন্টার অ্যাটাক। নিজেদের অর্ধ থেকে শুরু আক্রমণের। সালিফ পাস একটা দিয়ে দৌড় শুরু করলেন, মোটামুটি ৭০-৮০ গজ অতিক্রম করার পর ডেনমার্কের বক্সের ভেতর পাস এলো তার কাছে। দিয়াও শুধু বল ঠেলে দিলেন এগিয়ে আসা গোলরক্ষকের পেছন দিকে।

    ডেনমার্কের পর শেষ ম্যাচে উরুগুয়ের সঙ্গেও শেষ পর্যন্ত ড্র করেছিল সেনেগাল। ৩-০ গোলে এগিয়ে থেকে প্রথমার্ধ করেছিল তেরেঙ্গার লায়নরা। পরের অর্ধে উরুগুয়ে দিয়েছিল ৩ গোল। তবে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠার পথে আর বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি সেই ফল। গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে নকআউট পর্বে উঠে গিয়েছিল মেতসুর দল। দ্বিতীয় রাউন্ডে প্রতিপক্ষ সুইডেন। আর্জেন্টিনাকে টপকে দ্বিতীয় রাউন্ডে আসা সুইডেন। সে ম্যাচের নিষ্পত্তি হয়েছিল গোল্ডেন গোলে। অনরি কামারা গোল করে ক্যামেরুনের পর আফ্রিকার দ্বিতীয় দল হিসেবে সেনেগালকে গিয়ে গিয়েছিলেন কোয়ার্টার ফাইনালে।

    এরপর অবশ্য ওই গোল্ডেন গোলেই কপাল পুড়েছিল সেনেগালের। তুরস্কের কাছে হেরে কোয়ার্টারেই যাত্রা থেমেছিল সেনেগালের। বিশ্বকাপের পর বিদায় নিয়েছিলেন মেতসুও। আর এরপর সেনেগালকে আবার বিশ্বকাপের টিকেট কাটতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরও ১৬ বছর। ২০০২ বিশ্বকাপে সেনেগালের অধিনায়ক ছিলেন আলিস সিসে। সেই সিসের যখন দলের কোচ হলেন তখনই আবার বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ হলো সেনেগালের। রাশিয়া বিশ্বকাপে অবশ্য গ্রুপপর্ব পার করা হয়নি তাদের। ইতিহাসের প্রথম দল হিসেবে ফেয়ার-প্লের নিয়মে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠতে পারেনি সেবার সেনেগাল।

    সেনেগাল এরপর বিশ্ব ফুটবলে কতোখানি প্রভাব বিস্তার করতে পারবে সে প্রশ্ন অজানাই। তবে কোনোদিন যদি তারা বিশ্বকাপও জিতে যায় তবুও সেই গল্পের শুরু হবে আসলে সিউলের ওই ম্যাচ থেকেই। ফরাসী কোচ মেতসু যেদিন হয়েছিলেন নিজ দেশের হন্তারক, যেদিন ১৮ ক্যারেটের সোনাজয়ীদের হারিয়ে নেকলেস চুরির পাগলামো ভুলেছিল সেনেগাল- সব গল্পের শুরু হবে এই গল্প থেকেই।

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন