• লা লিগা
  • " />

     

    সার্জিও রামোস এবং স্ট্রাইকারদের টেক্কা দেওয়া ডিফেন্ডারদের গল্প

    গোল করাটা কোনোভাবেই তাদের কাজ নয়, বরং তাদের করতে হয় ঠিক উল্টোটা। ডিফেন্ডার হিসেবে যেমন সার্জিও রামোস রিয়াল মাদ্রিদের রক্ষণ আগলে যাচ্ছেন এক যুগেরও বেশি সময় থেকে। অথচ রামোসকে সম্ভবত ফুটবল ইতিহাস আর মাদ্রিদিস্তারা মনে রাখবে ২০১৪ চ্যাম্পিয়নস লিগের অন্তিম মুহূর্তে লা ডেসিমা এনে দেওয়ার পথে সেই মহাকাব্যিক গোলের জন্য। রামোসের জন্য গোল করার অভ্যাসটা অনেক পুরনো,  ইদানীং অবশ্য একটু বেশিই সহজ হয়ে গেছে কাজটা। তবে রামোসের মতো গোল করতে ওস্তাদ ডিফেন্ডারদের সংখ্যাও ফুটবল ইতিহাসে কম নয়।

    আগে একটু রামোসের গল্পটা বলে নেওয়া যাক। গোলের দিক দিয়ে অবিশ্বাস্য একটা মৌসুম কাটাচ্ছেন, এই মৌসুমে লিগে এর মধ্যেই ১০ গোল হয়ে গেছে তার। রিয়ালের হয়ে এই মৌসুমে লা লিগায় এর চেয়ে বেশি গোল আছে শুধু করিম বেনজেমার। এই দশকে লা লিগায় আর কোনো ডিফেন্ডারের মৌসুমে ১০ গোল করার কীর্তি নেই। তবে রামোস এই কাজটা অনেক দিন থেকেই এতো ভালো করছেন, গত মাসে রোনাল্ড কোম্যানকে টপকে লা লিগায় ডিফেন্ডার হিসেবে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ডও হয়ে গেছে তার। রামোসের লা লিগায় গোল এই মুহূর্তে ৬৯। অবিশ্বাস্যই মনে হবে,  আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা (৩৫), জিনেদিন জিদান (৩৭), জাভি (৫৮), এমনকি লুইস ফিগোরা (৬৮) লা লিগায় রামোসের চেয়ে কম গোল করেছেন। এই মৌসুমে অনেক প্রথাগত স্ট্রাইকারের চেয়েও বেশি গোল তার। যদিও আপনি বলতে পারেন, বেশির ভাগই তো এসেছে পেনাল্টি থেকে। তবে পেনাল্টি থেকে গোল করার ক্ষেত্রেও তার মতো বিশ্বস্ত এখন বোধ হয় আর কেউ নেই। সব প্রতিযোগিতা মিলে টানা ২২টি পেনাল্টি এখন পর্যন্ত মিস করেননি রামোস।


    রামোসের কথা বললে কোম্যানের কথা এসেই পড়ে। এই ডাচকে বলা হয় সর্বকালের সেরা গোলস্কোরিং ডিফেন্ডার। কোম্যান ছিলেন সেন্টার ব্যাক, ১৯৮৯ সালে তাকে বার্সায় নিয়ে এসেছিলেন ইয়োহান ক্রুইফ। অনেক আয়াক্স গ্র্যাজুয়েটের মতো কোম্যানেরও মানসগুরু ছিলেন ক্রুইফ। আয়াক্সে কোচ হওয়ার সময় থেকেই ক্রুইফ বল প্লেয়িং ডিফেন্ডারদের গড়ে তোলার দিকে মনযোগ দিয়েছিলেন। আজকের রামোস, পিকে বা অন্য সব বল প্লেয়িং ডিফেন্ডারদের আঁতুড়ঘর ছিল সেই আয়াক্স। তখন থেকেই ক্রুইফ তাদের রক্ষণের পাশাপাশি পাসিংয়ের দিকেও মনযোগ দিতে বললেন। তবে কোম্যানের মনযোগ আরেকটু বেশি ছিল গোল করার দিকে। পেনাল্টি থেকেই বেশি গোল করেছেন, তবে ফ্রিকিকও নিতেন দারুণ। সাম্পদোরিয়ার বিপক্ষে বার্সেলোনার ১৯৯২ সালের সেই ঐতিহাসিক ইউরোপিয়ান কাপ (আজকের চ্যাম্পিয়নস লিগ) এসেছিল কোম্যানের ফ্রিকিক থেকেই। সব প্রতিযোগিতা মিলে তার গোলের সংখ্যাটাও অবিশ্বাস্য, ২৩৯!

    কোম্যান নিজেকে সবসময়ই ডিফেন্ডারের চেয়ে বেশি কিছু মনে করেন। একবার বলেছিলেন, ‘আমি আসলে এত বেশি গোল করেছি কারণ আমাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ওই স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। আমার কোচেরা আমার কাছ থেকে সেটাই আশা করতেন। আর আমার সেট পিস তো ছিলই।’ এখন এই কাজটা সাধারণ মনে হলেও লিবেরোর যুগে বল প্লেয়িং ডিফেন্ডারদের খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। সেদিক দিয়ে কোম্যান ছিলেন উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। গোল করার ক্ষুধাটাই তাকে আলাদা করেছিল বাকি ডিফেন্ডারদের চেয়ে।

    লা লিগার গোল স্কোরিং ডিফেন্ডারদের কথা বললে আরও একজনের নামটা সামনে এসে পরে। ফার্নান্দো হিয়েরো রামোসেরই পুর্বসূরি, কাগজে কলমে তার গোল (১০৫) রামোস বা কোম্যানের চেয়েও অনেক বেশি। পেনাল্টিতে তাকে সর্বকালের সেরাদের একজন মনে করা হয়। ফ্রিকিকেও ভালো ছিলেন, সেট পিস থেকেই করেছেন বেশির ভাগ গোল। তবে অফিসিয়ালি তাকে লা লিগার সবচেয়ে বেশি গোল স্কোরিং ডিফেন্ডার বলা যাচ্ছে না। ক্যারিয়ারের অনেকটা সময় ডিফেন্ডার নয়, মিডফিল্ডার হিসেবে খেলেছেন। ডিফেন্ডার হিসেবে তার গোল ৫১টি, সেটাও নিজের সময়ে সবচেয়ে বেশি।

    ডিফেন্ডার হয়েও লা লিগায় গোল করতে বেশি পছন্দ করতেন, এরকম ছিলেন আরও কয়েকজন। রবার্তো কার্লোসের নামটা চট করে আপনার মাথায় চলে আসার কথা। ক্লাব ক্যারিয়ারে তার ৬৬ গোল আছে, এর মধ্যে ৪৭টিই রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে। পেনাল্টি থেকে ফ্রিকিকে গোল করতেই বেশি পছন্দ করতেন। ফ্রান্সের বিপক্ষে তার সেই অবিশ্বাস্য ফ্রিকিক নিয়ে তো এখনও গবেষণা হয়। অনেকেরই সেটি মনে থাকার কথা। লেফট ব্যাক হয়েও আসলে আক্রমণেই বেশি মনযোগ দিতেন সবসময়, গোলের সংখ্যাও সেটি বলছে।  

    ইংলিশ লিগের ইতিহাসেও গোল স্কোরিং ডিফেন্ডারের অভাব নেই। স্টিভ ব্রুস বা গ্রাহাম আলেকজান্ডাররা নব্বই দশক অনেক গোল করেছেন। ব্রুসের তো এক মৌসুমে ১৯ গোল করারও রেকর্ড আছে, যার বেশির ভাগই অবশ্য পেনাল্টি বা সিট পিস থেকে। তবে পেনাল্টি বাদ দিলে প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে বেশি গোল জন টেরির। চেলসির হয়ে কর্নার থেকে গোল করতেন নিয়মিতই, কোনো পেনাল্টি ছাড়াই করেছেন ৪১ গোল। উইলিয়াম গালাসও কোনো পেনাল্টি ছাড়া প্রিমিয়ার লিগে করেছেন ২৬ গোল। 

                       

    ইন্টার মিলান কিংবদন্তি ফাচেত্তি


    একটু সিরি আ তে যাওয়া যাক এবার। ঐতিহ্যগত কারণে ইতালিয়ান লিগে ডিফেন্ডারদের গোল করাটা ঠিক স্বাভাবিক নয়, এই জায়গায় কখনোই খুব বেশি উৎসাহ দেওয়া হয় না তাদের। তবে এর মধ্যেও কয়েকজন ঠিকই নিজেদের চিনিয়েছেন। সিরি আর ইতিহাসে ডিফেন্ডার হিসেবে সবচেয়ে বেশি গোল সম্ভবত ফুটবলের সর্বকালের সেরা ডিফেন্ডারদের একজন, জিয়াচিন্তো ফাচেত্তির। ষাটের দশকে হেরেরার কিংবদন্তি ইন্টার মিলানের হয়ে করেছিলেন ৫৯ গোল। আধুনিক যুগে মার্কো মাতেরাজ্জিদের মতো কারও গোল করার অভ্যাস আছে। ২০০০-০১ মৌসুমে পেরুজিয়ার হয়ে সিরি আতে ১২ গোলও করেছিলেন মাতেরাজ্জি। আর ফ্রেঞ্চ লিগে সবচেয়ে বেশি গোল করার ডিফেন্ডারের রেকর্ডটা লরা ব্লাঁর। মপেলিয়ে, নতে, সেন্ট এতিয়েন, অক্সের, মার্শেইয়ের হয়ে ক্যারিয়ারে ৪৪ গোল করেছেন এই ডিফেন্ডার, ফ্রান্স জাতীয় দলের হয়েও করেছেন ১৬টি।

    বুন্দেসলিগায় রেকর্ডটা হামবুর্গের রাইটব্যাক মানফ্রেড কার্লজ আর ডুইসবার্গের বার্নার্ড ডিয়েটজের। দুজনেই লিগে ৭৬টি গোল আছে। ডিয়েটজের আছে অবিশ্বাস্য একটা কীর্তি, ১৯৭৭ সালে বায়ার্নের বিপক্ষে এক ম্যাচেই ডিফেন্ডার হিসেবে চার গোল করেছিলেন। এর চেয়েও অবিশ্বাস্য, এই চারটি গোলের কোনোটিই পেনাল্টি বা ফ্রি কিক থেকেও নয়, সব ওপেন প্লে থেকে! কিংবদন্তি ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারেরও বুন্দেসলিগায় ৪৪টি গোল ছিল।

    তবে রামোস যেভাবে ছুটছেন, এদের সবাইকেই ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ও সম্ভাবনা, দুইটিই ভালোমতোই আছে তার।   

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন