• ফুটবল, অন্যান্য
  • " />

     

    ব্রাজিল ১-৭ জার্মানি : কী হয়েছিল সেদিন ব্রাজিলের?

    লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে হুলিও সিজার কেবল নেমেছেন ঢাকা  বিমানবন্দরে। দেড় দিনের সফরে এসেছেন, বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের শুভেচ্ছাদূত হয়ে। পরদিন ঢাকার জ্যাম সঙ্গী করে ছুটতে হবে তাকে।  কই হোটেলে পৌঁছে বিশ্রাম নেবেন, তা না! সাংবাদিকরা ঘিরে ধরেছে তাকে। প্রথম প্রশ্ন, জার্মানির সঙ্গে ৭ গোল খাওয়ার পর কী অনুভূতি হয়েছিল আপনার?

    সিজারের ক্যারিয়ারে অর্জন কম নয়। ইন্টার মিলানের ঐতিহাসিক ট্রেবলজয়ী দলের গোলরক্ষক ছিলেন তিনি। দুই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের গোলবার পাহারার দায়িত্বে ছিলেন। কনফেডারেশনস কাপও জিতেছেন। কিন্তু ঘুরে-ফিরে ওই একই প্রশ্ন তার কাছে। অনুভূতি জানতে চাওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ সংবাদমাধ্যমের জুড়ি মেলা ভার। তবে, সিজারকে কাছে পেয়ে ওই প্রশ্ন জানতে না চাওয়ার লোভ সামলানো কঠিন। এমন সুযোগ তো জীবনে বারবার আসে না।

    পরদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎপর্ব সেরে দুপুর নাগাদ মতিঝিলে সিজার। বিকেলে বাংলাদেশ-বুরুন্ডির সেমিফাইনাল দেখবেন বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে বসে। তার আগে বাফুফে ভবন ঘুরে দেখলেন। কিশোর-কিশোরীদের পেনাল্টি ঠেকালেন, গোলও খেলেন। এরপর আনুষ্ঠানিক সংবাদসম্মেলনের জন্য ঢুকলেন বাফুফের প্রেস কনফারেন্স রুমে। প্রথম প্রশ্ন, ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে ৭ গোল হজম করার পর কী মনে হয়েছিল?

    সিজার হাসিমুখেই জবাব দিয়েছিলেন। বলেছিলেন ওটা তার ব্রাজিলের জন্য কালো অধ্যায়। এই গল্পে কোনো ফুটবলার থাকতে চাইবেন না। গোলরক্ষক হলে তো আরও না। সিজার জানতেন, তিনি ওই গল্পের অংশ হয়ে গেছেন। ৬ বছর পর ফুটবলের অখ্যাত বাংলাদেশে এসে তার সিজার জেনে গেছেন ওই গল্প আজীবন বলে বেড়াতে হবে তাকে।

     


    ****

    জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে হারা ব্রাজিলের ম্যাচ ফুটবল লোকগাথার অংশ এখন। ফুটবলের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল, কিন্তু ব্রাজিলিয়ানরাও জানেন এই ইতিহাস আর পালটানো যাবে না। যতবার বিশ্বকাপ দরজায় কড়া নাড়বে ততোবার ঘুরে ফিরে আসবে ওই গল্প। মারাকানাজোর ‘কুখ্যাত’ ইতিহাস ভুলতে পারেনি ব্রাজিল। ৫ বিশ্বকাপ জেতার পরও না। একটা প্রজন্ম বদলে গেছে ব্রাজিলে, ইতিহাস মাটিচাপা দেওয়ার আগেই নতুন আরেক ট্রাজেডির ‘নায়ক’ হতে হয়েছে ব্রাজিলকে।

    ১৯৫০ এর ফাইনালে উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচের দিন সকালে ব্রাজিলিয়ান এক পত্রিকা শিরোনাম ছাপিয়ে দিল, “আমরাই চ্যাম্পিয়ন”। উরুগুয়ের কাছে হারার পরও ব্রাজিলিয়ানদের মেনে নিতে হয়েছিল। কারণ মেনে নিতে হয়,  মেনে নেওয়ায় গৌরব নেই। অন্য কোনো উপায় থাকে না দেখেই সবাই মেনে নেয়। কিন্তু মনের খচখচানি তাতে ধুয়ে মুছে ফেলা যায় না। ক্যালেন্ডারে জুনের ৮ তারিখ এলে যেমন ঘুরে ফিরে ৭+১ করে ৮ বানিয়ে নেওয়া হয়, ওই তরিকায় কালেভদ্রে হলেও যন্ত্রণা দিয়ে যায় স্মৃতি। আর ফেসবুক, টুইটারের যুগে অন দিস ডের মেমোরি তো আত্মঘাতী। না চাইতেও আপনাকে মনে করিয়ে দেবে অনেককিছুই।

    ২০১৪ বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে বলেছিলেন, দুর্ঘটনা না ঘটলে তার দেশই বিশ্বকাপ জিততে যাচ্ছে। ২০১০ বিশ্বকাপের আরও দুই বছর পর লুই ফিলিপে স্কলারি পেয়েছিলেন ব্রাজিলের দায়িত্ব। “কাপ কোচ” হিসেবে দক্ষিণ আমেরিকায় ভালো নাম ডাক তার। অবশ্য তার পরিচয় আরও আছে। আসল পরিচয় ২০০২ বিশ্বকাপ জয়ী দলের কোচ। স্কলারি ব্রাজিলে ‘ফাদার ফিগার’। খেলোয়াড়দের দেখেন ছেলের মতো। দ্বিতীয় দফায়ও বদলাননি তিনি। নেইমার, অস্কার সবার জাতীয় দলে হাতেখড়ি স্কলারির কাছে।

    বিশ্বকাপের আগের বছর কনফেডারেশনস কাপও ব্রাজিলে। স্পেন তখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, আগের বছর দ্বিতীয়বারের মতো ইউরোও জিতেছে তারা। ইতিহাস লেখা হয়ে গেছে স্পেনের। কনফেডারেশনস কাপের ফাইনালে স্পেনকে নিয়ে ব্রাজিল করলো ছেলেখেলা। ৩-০ তে উড়ে গেল স্পেন। বছর খানেক পরের বিশ্বকাপ ব্রাজিলের ফেভারিট না হওয়ার কোনো কারনই নেই।

    গ্রুপ পর্বে পেরিয়েও তরতর করে ব্রাজিল উঠে গেল সেমিফাইনালে। দ্বিতীয় রাউন্ডে অবশ্য চিলির বিপক্ষে টাইব্রেকারে জিততে হলো। হোর্হে সাম্পাওলির দল ততোদিনে সমীহ জাগানিয়া দল। পরের রাউন্ডে হামেস রদ্রিগেজের কলম্বিয়াও হারলো ব্রাজিলের কাছে। কিন্তু ওই ম্যাচটা হয়ে থাকল ফোরশ্যাডো।

    কলম্বিয়ার সঙ্গে পিঠের চোট নিয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন নেইমার। বিশ্বকাপটাই শেষ হয়ে গেছে তার। থিয়াগো সিলভা হলুদ কার্ডের কোটা পূরণ করে ফেলেছেন, জার্মানির বিপক্ষে সেমিফাইনাল খেলা হবে না তার। ব্রাজিল অধিনায়কের অবশ্য সান্ত্বনা আছে, দল ফাইনালে উঠলে অমৃত ধরা দেবে তার হাতেই।

    ****

    মিনেইরোর ৪০০ কিলোমিটার দূরে নিজ বাড়িতে চলে গেছেন নেইমার। এর আগের কয়েকদিন ব্রাজিলিয়ান গণমাধ্যমে নেইমারকে নিয়ে হাহাকার। গোটা ব্রাজিলেই কেমন একটা অস্বস্তি ভর করেছে। নেইমার নেই। তার আঁচ লেগেছে ব্রাজিল দলেও। জার্মানি শব্দটাই উচ্চারিত হলো সবচেয়ে কম।

    টিম কোচ থেকে স্কলারি দল নিয়ে মিনেইরোতে পা রাখলেন। দলের সবার মাথায় বেইসবল ক্যাপ, তাতে নেইমারের সুস্থ্যতা কামনায় বার্তা। সেবার বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জাতীয় সঙ্গীতের সময়টুকু শিহরণ জাগিয়ে যেত। গায়ে কাঁটাও দিত। এতো আবেগ নিয়েও জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া যায়। ওই আবেগ বুঝতে পর্তুগিজ না জানলেও হয়। ফুটবলের ভাষা বুঝলেই যথেষ্ট। এদিন অবশ্য আবেগ ঝরল আরেকটু বেশি। সেটা বোধ সীমাও অতিক্রম করে গেল। সিজার আর ডেভিড লুইজ জাতীয় সঙ্গীত গাইলেন নেইমারের নাম্বার টেন জার্সি ধরে। ফুটবলের খোঁজ না রাখা পৃথিবীর সবচেয়ে ‘অসামাজিক’ প্রাণী ওই দৃশ্য নেইমার মরে-টরে গেছেন বলে ভুল বুঝতে পারতেন।

    সেমিফাইনাল মানে খেলা হবে ম্যাড়মেড়ে, কাঠখোট্টা ট্যাকটিক্যাল মারপ্যাঁচের ওই ম্যাচ সাধারণের চোখে তৃপ্তি দিতে পারে না বেশিরভাগ সময়ই। সেট পিস থেকে লিলিয়ান থুরাম বা কার্লোস পুয়োলরা গোল করে ম্যাচ জিতিয়ে দেবেন। সেমিফাইনালে মাঠে নামার আগে এইসব জ্ঞান মুখস্থবিদ্যার মতো আওড়ানো যায়।

    ‘আবেগ পর্ব’ সেরে ব্রাজিল মাঠে নেমে ওইটুকুই ভুলে গেল। দুর্যোগের শুরুও সেখান থেকে। জার্মানি প্রথম গোল করলো কর্নার থেকে, ১১ মিনিটে। ওই কর্নার নেওয়ার সময় কাছের পোস্টে ছিলেন ৩ জন জার্মান ফুটবলার, তাদের পাহারা দিতে ছিলেন আরও ৬ জন ব্রাজিলিয়ান। থমাস মুলারকে গোলের সামনে থেকে হেডও করতে হয়নি। সাইড ভলিতে গোল করেছিলেন তিনি। বোল্ড করে লিখতে হয়, সাইড ভলিতে।

    মুলারকে কেউ বাধাও দেননি। বল যখন উড়ে আসছিল, বিপদটা টের পেয়েছিলেন লুইজ। জটলার ভেতর থেকে পেছন ফিরে উদভ্রান্তের মতো দৌড়ও শুরু করেছিলেন। মানুষ ভুল করে, মেশিন তো আর করে না। মুলার তো রমডয়টার, তিনিও ভুল করেননি।

     


    জার্মানি ওই ম্যাচের আগে খুব একটা ছন্দে ছিল না। আলজেরিয়ার সঙ্গে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দ্বিতীয় পর্ব পার করার পর কোয়ার্টার ফাইনালেও ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাড়মেড়ে এক জয়। জার্মানি সেমিফাইনালে উঠেছিল নিজেদের সেরাটা না দেখিয়েই। মুলারের প্রথম গোলের পরের গল্প সবার জানা। ৬ মিনিটের ব্যবধানে ব্রাজিলের ৪ গোল খাওয়ার গল্প। প্রায় সবগুলো গোলের উৎসই ব্রাজিলের বাম প্রান্ত। মার্সেলোর হারিয়ে যাওয়াই তখন জরুরী খবর। ব্রাজিল গোল হজম করছে, দ্বিগুণ উৎসাহে নাকি প্রবল আক্রোশে মার্সেলো আক্রমণেই উঠেছেন। একবার ওজিলকে ওভারল্যাপ করে যাচ্ছেন লাম, আরেকবার আন্ডারল্যাপ করে যাচ্ছেন। ওই প্রান্তে তখন খুনের নেশায় পেয়েছে জার্মানিকে।

    ২৩ মিনিটে মিরোস্লাভ ক্লোজা ভাঙলেন রোনালদোর রেকর্ড। ব্রাজিলের মাঠে ব্রাজিলের সেরা সন্তানের রেকর্ড হাতছাড়া। ঘরের মাঠে সেমিফাইনাল শুরু না হতেই দুই গোল খেয়ে বসা। এর চেয়ে মর্মান্তিক আর কী হয়? হয়। কী হতে পারে সেটা টের পেয়েছিল সেদিন ব্রাজিল।

    টনি ক্রুস,  স্যামি খেদিরারাও স্কোরশিটে নাম লেখালেন। অন্যদলকে নিয়ে ছেলেখেলা করার বাংলা বিশেষণটা আরও অর্থবহ হলো সেদিন। ব্যাপারটা এমন  ব্রাজিলের বক্সের ভেতর যেই যায় সেই গোল করে আসে। ফার্নান্দিনহো একরকম খেলাই ছেড়ে দিয়েছেন। ২৯ মিনিটের পঞ্চম গোলের সময় মাঝমাঠেও খুঁজে পাওয়া গেল না লুইজকে। ওয়াইড অ্যাঙ্গেল ক্যামেরাতেও হারিয়ে গেছেন তিনি।  

    ****

    ওইদিন সবচেয়ে ভাগ্যবান ছিলেন বোধ হয় স্টেডিয়ামে থাকা ফোটোগ্রাফাররা। ‘কালজয়ী’ সব মুহুর্ত বন্দী হয়েছিল তাদের ক্যামেরায়। ২৯ মিনিটেই খেলা শেষ, ক্রিকেট ম্যাচের মতো সে রাতে ক্যামেরা খুঁজল গ্যালারির দৃশ্য।  ক্লোভাস ফার্নান্দেজের কথা মনে আছে? একটা বিশ্বকাপ হাতে ব্রাজিলের খেলায় গ্যালারিতে দেখা যেত যাকে। কতো গৌরবগাঁথার স্বাক্ষী তিনি! সেই গোঁফওয়ালা ভদ্রলোক শিরোপাটা কী যত্মে বুকে জড়িয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছেন কোনদিক! ব্রাজিলের মাঠে আর হাসতে দেখা যায়নি ক্লোভাসকে। মিনেইরোর মাঠে অঝোরে কাঁদছে শিশু থেকে বুড়ো সবাই। স্বপ্ন মুখ থুবড়ে পড়ে, তাও এভাবে? ওর কতোদিন পর তারা স্বাভাবিক হতে পেরেছিলেন তা তারাই জানেন।



    কিছু ম্যাচে একটা পর্যায়ে গিয়ে আর ট্যাকটিক্যাল বিশ্লেষণ খাটে না। একটা দল কীভাবে ৩-০ তে এগিয়ে ৪-৩ এ হারে, যোগ করা সময়ে দুই গোল দিয়ে কেউ কীভাবে ম্যাচ জিতে যায়- এসবের ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায়। তবে তাতে জ্ঞান বিজ্ঞানের তাতে চেয়ে আবেগ, অনুভূতি, মানসিকতার প্রভাব থাকে কয়েক গুণ বেশি।

    নেইমার তখনও ক্লাবের হয়ে খেলতেন লেফট সাইডে। ব্রাজিলেও তাই, অস্কার খেলতেন মূলত নাম্বার টেন রোলে। নেইমারের বদলে লেফটে সাইডে জার্মানির সঙ্গে শুরু করেছিলেন বের্নার্ড। নেইমার তখন ২২ বছর বয়সী তরুণ। স্বাগতিক দেশের মূল ভরসা। দেশটা আবার ব্রাজিল। অন্য সববারের চেয়ে সেবার আক্রমণভাগের ফুটবলাররা বেশ সাদামাটা। জাত স্ট্রাইকার স্কোয়াডে দুইজন- ফ্রেড আর জো। নেইমারের কাঁধে চাপ বেশি। দেশের হয়ে চাপ নিতে কখনই পিছপা হননি নেইমার। তার চোটের পর ব্রাজিলে হুমড়ি খেয়ে কান্নার রোল পড়া অস্বাভাবিক কিছু না।

    ম্যাচ শেষে অবশ্য নেইমারকে আর কেউ মিস করেনি। অভাবটা ফুটে উঠেছিল থিয়াগো সিলভার। ওই ম্যাচের আগে লুইজের সঙ্গে জুটি বেঁধে সিলভা খেলেছিলেন মোট ২৬ ম্যাচ। এর একটাতেও হারেননি এই জুটি। জিতেছেন ২১ বার। সিলভার জায়গায় নামা দান্তের অভিজ্ঞতাও কম ছিল না। বায়ার্ন মিউনিখে তার অর্ধেক সতীর্থই তো জার্মানির অংশ। কিন্তু ডিফেন্ডারদের লাগে যোগ্য পার্টনার। আর কোনো কোনো দলের একজন নেতাই যথেষ্ট। সিলভা ছিলেন ব্রাজিলের সেই নেতা। তাকে ছাড়া অসহায় ব্রাজিল।  

    ****

    দক্ষিণ আমেরিকান ধারাভাষ্যে গোল হওয়ার পর উচ্চস্বরে টান দিয়ে “গোওওওওওওওওল” বলার রীতি পুরনো। গ্যালভাও বুয়েনো ব্রাজিলিয়ান ধারাভাষ্যকার। ব্রাজিলের জাতীয় টেলিভিশনে সেদিন তিনিই ম্যাচের ধারাভাষ্য দিচ্ছিলেন। ওই বিশ্বকাপে সুর তুলে আর ওই শব্দ উচ্চারণ করার সৌভাগ্য হয়নি তার। শেষ দিকে যখন অস্কার এক গোল শোধ দিলেন তখন তিনি বললেন, “গোল”। তার কন্ঠ জড়িয়ে আসছিল, গলা শুকিয়ে আসছিল। এমন “গোল” আগে শোনেনি দক্ষিণ আমেরিকা।

    অস্কারের গোলের পর ব্রাজিলের শহরে শহরে পটকাও ফুটেছিল। জমিয়ে রেখে লাভ কী! অমন বিস্বাদময় আতশবাজি বোধ হয় পৃথিবীই আগে দেখেনি।

    দ্বিতীয়ার্ধে জার্মানি আর গোল করতে চায়নি। কী ঘটছে ততক্ষণে সেটা টের পেয়ে গিয়েছিলেন ক্রুস, মুলাররা। একটা দেশে বিশ্বকাপ খেলতে এসেছেন, আতিথ্য দিয়েছে তারা। জার্মানদের বরণ করেছে সানন্দেই। ম্যাচের আগেও স্কলারি উপহারের প্যাকেট তুলে দিয়েছিলেন ইউগি লভের হাতে। খেলায় লজ্জার কিছু নেই, কিন্তু ওই স্কোরলাইন সেই বেদবাক্যও বদলে দিচ্ছিল। বিশ্বকাপের ইতিহাসেই সেমিফাইনালে এতোগুলো গোল হয়নি কখনও। প্রায় ১০০ বছরের বিশ্বকাপের ইতিহাসে কখনও ৩ গোলের বেশিও হজম করেনি ব্রাজিল। আন্দ্রে শারলে অবশ্য ওসব মাথা নিয়ে মাথা ঘামাননি। বদলি হয়ে মাঠে নেমে হয়ত ফাইনালে একটা সুযোগ পাওয়ার আশা করেছিলেন। তিনিই যোগ করেছিলেন আরও দুই গোল। জার্মানি চাইলেই আরও ৪/৫ বার বল জড়াতে পারত সিজারের জালে।

    সিজারের অবশ্য এসব নিয়ে আর অনুযোগ নেই। জীবনে কতোকিছুই মেনে নিতে হয়, সিজারও সেভাবেই মানিয়ে নিয়েছেন। ওই বিশ্বকাপের পর ব্রাজিলের ২৩ জনের স্কোয়াডের ১০ জন আর কখনই ব্রাজিলের জার্সি গায়ে চড়াতে পারেননি। তাদের মধ্যে একজন তিনিও।

    “ওই ম্যাচের পর ড্রেসিংরুমে কেউ কারও সঙ্গে কথা বলেনি। ওই মুহুর্তটা আমার আর আমাদের জন্য অতিবাস্তবের মতো ছিল। ওই ম্যাচে কী হয়েছিল সেটা কেউ বুঝতে পারেনি। ড্রেসিংরুমে সবাই চুপচাপ ছিল কেউ কেউই অনেক কেঁদেছিল। যারা কেঁদেছিল তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম।"- ওই ঘটনার ৬ বছর পর ঢাকায় এসে সেদিনের গল্প বলে গিয়েছিলেন সিজার। এরপর বলেছেন জীবনের গল্পটা। তাতে চাইলে আশা খুঁজে পাওয়া যায়। আবার চাইলে এড়িয়েও যাওয়া যায়।

    "জীবনে এরকম কিছু ঘটতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ মাথা উঁচু করে ভালোবাসার কাজটাই করে যাওয়া।" - সে কাজটা ব্রাজিলিয়ানরা দেরীতে হলেও করতে পেরেছিল বলেই হয়ত ওই ঘটনার পর টানা দুইবার ব্যর্থ হয়েও তৃতীয়বারের চেষ্টায় কোপা আমেরিকা জিতেছে ব্রাজিল। তবে সিজার জানেন, বিশ্বকাপ জিতলেও হয়ত ওই ব্যর্থতা পিছু ছাড়বে না তাদের। ঘরের মাঠে, বিশ্বকাপে, সেমিফাইনালে- অন্যদল ৮ গোল হজম না করলে দগদগে ঘাতে প্রলেপ পড়বে না। প্রবাবিলিট হিসেবেও সেই সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ব্রাজিলিয়ানদের কাছে মারাকানাজোয়ের চেয়ে অপমানজনক হয়ে গেছে মিনেইরোজো। ব্রাজিল আর সিজাররা এই ক্ষত সঙ্গী করেই বাঁচতে শিখে গেছেন। 

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন