• " />

     

    ভুলে গেলেন সেই সাকিবকেই?

    ১.

    ‘৯৯ বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ এক ম্যাচে যেকোনো সময়ের ক্রিকেটেই অন্যতম সেরা ফিল্ডার হার্শেল গিবসের ক্যাচ ফেলার গল্পটা নিশ্চয়ই মনে আছে! যার ক্যাচটা ফেলে ইতিহাস হয়েছেন গিবস, সেই স্টিভ ওয়াহ নাকি তাঁকে পরে বলেছিলেন, “বাছা, তুমি তো বিশ্বকাপটাই ফেলে দিলে”!

    সেবার যদি গিবস ফেলে থাকেন, তবে গত বিশ্বকাপেই কথিত ‘চোকার’দের অধরা বিশ্বকাপটা বোধহয় ফেলেছেন সময়ের আরেক সেরা তারকা এবি ডি ভিলিয়ার্স। সেমিফাইনালে কোরি অ্যান্ডারসনকে সহজ রান-আউটটা করতে গিয়ে স্ট্যাম্পের উপর কি অসহায়ভাবেই না হুমড়ি খেয়ে পড়লেন প্রোটিয়া ক্যাপ্টেন!

    আবার '৯৬ বিশ্বকাপের ফাইন্যালটাই দেখুন। স্কয়ার লেগে অশাঙ্কা গুরুসিংহের তুলে দেয়া সহজ ক্যাচটা ফেলেছিলেন স্টুয়ার্ট ল'। পরে ৬৫ রান করে নিজের দেশকে প্রথমবারের মতন বিশ্বকাপ এনে দেয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাই পালন করেছিলেন অশাঙ্কা। 

    তবে এভাবে বিশ্বকাপ ‘ফেলে দেয়া’র অপরাধে গিবস, স্টুয়ার্ট ল' বা ডি ভিলিয়ার্সদের ক্রিকেটীয় যোগ্যতা, পেশাদারিত্ব কিংবা দলের প্রতি দায়িত্ববোধ নিয়ে কোনোরূপ প্রশ্ন তাঁদের দেশের লোকজন কখনও তুলেছেন বলে শোনা যায় নি।

     

    ভাগ্যিস ঘটনাগুলো বাংলাদেশের নয়! হলে কি হতো সেটা কল্পনা করতেও মাঝে মাঝে ভয় হয়। অবশ্য ঘটনা তো প্রায় ঘটেই গিয়েছিল। গত বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডর বিপক্ষে ম্যাচের একেবারে শেষভাগে ক্রিস ওকসের মহামূল্যবান এক ক্যাচ ছেড়েছিলেন তামিম। ম্যাচটা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ জিতে না গেলে ‘মূল্য’টা তামিমকে কতদূর দিতে হতো, তার অসংখ্য সম্ভাব্য নমুনা সোশ্যাল মিডিয়াতে ম্যাচ জেতার আগ পর্যন্ত ঘুরে ফিরেছিল, দেখেছেন নিশ্চয়ই?

     

    ২.

    তামিম ইকবাল কি গতরাতে একবারের জন্য হলেও ফেসবুকে ঢুঁ মেরেছিলেন? অন্তত লোকমুখে তো শুনেছেন নিশ্চয়ই! বাংলাদেশীদের ফেসবুকে এই মুহূর্তে হাহাকারের বিষয়বস্তু জেনে তাঁর ভাবান্তরটা কেমন হতে পারে একটু কল্পনা করার চেষ্টা করছি। সতীর্থদের অসহায় আত্মসমর্পণের দুঃখে ভারাক্রান্ত রাতেও নিশ্চয়ই তাঁর হাসি পেয়েছে! এক বছর আগে-পরের চিত্রনাট্যে অদ্ভুত বৈপরীত্যটা কি তাঁর ভাবনায় আসে নি? ‘দুই মিনিটের ম্যাগি নুডলস’কেই কিনা এখন ভীষণরকম ‘মিস’ করছে বাংলাদেশ! নিজের দুঃসময়ে দেশবাসীর কাছ থেকে পাওয়া ‘ব্যবহার’টুকু মনে থাকলে তামিম এখন হাসতেই পারেন, সে অধিকার তাঁর নিশ্চয়ই আছে!  

     

    ৩.

    দু’ বছর আগের ঘটনা। শ্রীলংকার বিপক্ষে সিরিজ চলছে বাংলাদেশের। সময়টা ভালো যাচ্ছিল না মাহমুদুল্লাহর। ব্যাট হাতে তো রান পাচ্ছিলেনই না, প্রথম ওয়ানডেতে স্লিপে সেনানায়েকের সহজ এক ক্যাচ ছেড়ে বসলেন। পরের ম্যাচেও ম্যাথিউসের সহজ আরেকটা ক্যাচ ছাড়লেন বাংলাদেশ ক্রিকেটে সময়ের অন্যতম সেরা ফিল্ডার। আশির দশকের মতো মাঠে বেষ্টনী না থাকলে সেদিন সম্ভব হলে মিরপুরের গ্যালারি মাঠে নেমে মাহমুদুল্লাহকে ছিঁড়ে খাওয়ার বাকি রেখেছিল। দর্শকদের তরফে ছুটে আসা অশ্রাব্য মন্তব্যগুলো সীমানা দড়ির সামনে দাঁড়িয়ে নীরবে হজম করে যাচ্ছিলেন। ম্যাথিউসের ক্যাচ ছাড়ার পরের ওভারেই সাঙ্গাকারাকে লং অনে তালুবন্দী করলেন। মুহূর্তেই বদলে গেলো গ্যালারির চিত্র, ‘স্বাভাবিক’ উৎসবে মাতলেন দর্শকরা। কিন্তু মাহমুদুল্লাহ? এখনও চোখে ভাসে ক্যাচটা ধরেই মাথা নিচু করে দু’ হাতে তাঁর মুখ ঢেকে ফেলার দৃশ্যটা। একটু ভুল বলা হল কি...মুখ নয়, চোখের জলই লুকিয়েছিলেন বোধহয়!

     

    ৪.

    গতকাল রোহিত শর্মার ক্যাচটা ফেলে দেয়ার পর সাকিবের চেহারায় একটু ভালোমতো তাকিয়েছিলেন কি? কিংবা তারও আগে মাশরাফির প্রথম ওভারের প্রথম বলটায় ওই রোহিতকেই অল্পের জন্য ধরতে না পারার পর? আরও পরে রোহিত যখন বারবার তাঁর মাথার উপর দিয়েই বলটা সীমানা ছাড়াচ্ছিলেন, তখন? রান আউট থেকে বাঁচতে গিয়ে সাকিব যখন অসহায়ের মতো মাঝ উইকেটে পড়ে গেলেন? ম্যাচ শেষে যখন ভারী পায়ে ড্রেসিং রুমের পথে হাঁটছিলেন?

    ওই চেহারা বর্ণনা করার মতো ভাষাজ্ঞান এখনও হয়ে ওঠে নি বলে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। তবে রাতভর ফেসবুকের নিউজফিড জুড়ে লোকের ভাষার ব্যবহার দেখতে দেখতে অপরাধবোধের জায়গা নিয়েছে লজ্জা। কেবল একটা প্রশ্নই মাথায় ঘুরপাক খেয়েছে, কিভাবে সম্ভব? বছরের পর বছর একটা দলকে ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’র মতো টেনে নিয়ে যাওয়া মানুষটার সব অবদান স্রেফ একটা ক্যাচ ফেলে দেয়ার জন্য এভাবে অস্বীকার করাটা ঠিক কিভাবে আসে?

    আবার আইপিএল খেলার কারণে ভারতের বিরুদ্ধে 'ইচ্ছে করে' খারাপ খেলেন কীনা, এরকম 'শিশুসুলভ' মতামতও শুনতে পাওয়া যাচ্ছে মাঝেমধ্যে। তাদের মনে করিয়ে দেয়ার জন্যই কেবল বলা, ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সর্বশেষ ৪ জয়ে সরাসরি অবদান ছিলো সাকিবের। ২০০৭ সালে পোর্ট অফ স্পেনে মুশফিকের সাথে ম্যাচজয়ী ৮৪ রানের জুটিসহ ৫৩ রান, ২০১২ সালের এশিয়া কাপে ৩১ বলে ঝড়ো ৪৯ রান করে ভারতের ২৯২ রানের পাহাড় টপকানো, গত বছরই ভারতের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক সিরিজজয়ের প্রথম ম্যাচে ৫২ রান আর ২ উইকেট এবং দ্বিতীয় ম্যাচে অপরাজিত ৫১ রান। আর যেসব ম্যাচে পরাজয় বরণ করতে হয়েছিলো, সেসবেও সাকিব ব্যাটে-বলে একাই লড়াই করে একটা 'মানদন্ড' দাঁড় করিয়েছিলেন পারফরম্যান্সের। এমনিতেই কি সারা ক্রিকেট দুনিয়ায় একসময় 'বাংলাদেশ' বলতে কেবল 'সাকিব আল হাসান'-কেই চিনতো সবাই? একদিনেই কি বিশ্বসেরা হয়েছেন সাকিব? 

     

    তাহলে কি বলবেন, ওসব রাগের মাথায় লেখা? দেশের পরাজয়, দলের হার মেনে নিতে না পারার গ্লানি? মানে বলতে চাচ্ছেন দেশপ্রেম? তাহলে বিনয়ের সাথে বলবো এমন দেশপ্রেমিক বাংলাদেশের প্রয়োজন নেই। ক্রিকেট খেলায় 'কেবল' জয় উদযাপনটাই যাদের কাছে দেশপ্রেমিক হওয়ার ‘শর্টকার্ট’ মাধ্যম, তাদের সেই প্রেম বোধকরি দেশের দরকার নেই। যে মানুষটার নেতৃত্বে বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ ক্রিকেটের চেহারা বদলে যাওয়া, সেই মাশরাফি বিন মর্তুজা বলেছিলেন ক্রিকেটকে ভালোবাসাটা দেশপ্রেমের কোন সংজ্ঞায় পড়ে, তিনি জানেন না!

     

    হ্যাঁ, ক্রিকেটীয় দৃষ্টিকোণ থেকে একজন সাকিব আল হাসানের ব্যর্থতার ময়নাতদন্ত আপনি করতেই পারেন। সাকিবের খেলার মানে কোনো নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছে কিনা, এসে থাকলে সেটা কেনো কিংবা সুনির্দিষ্টভাবে যেদিনটায় তিনি নিষ্প্রভ ছিলেন, সেদিন তাঁর খেলার ধরণে কি কি ত্রুটি চোখে পড়েছে...আপনি লিখতে পারেন ক্রিকেট জ্ঞান ব্যবহার করে। আমার সে জ্ঞান যথেষ্ট নয় বলে আমি লিখবো না। কিন্তু সীমাবদ্ধ জ্ঞানে আমার যেমন যা ইচ্ছে তা লেখার অধিকার নেই। যারা লিখছেন তাদের সে অধিকারটা কিভাবে পেয়েছেন, একটু বলবেন কি?

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন