• চ্যাম্পিয়নস লিগ
  • " />

     

    বায়ার্ন মেশিনে বিপর্যস্ত বার্সা গুনে গুনে খেল ৮ গোল

    বায়ার্ন মেশিনে বিপর্যস্ত বার্সা গুনে গুনে খেল ৮ গোল    

    ফুলটাইম
    বার্সেলোনা ২-৮ বায়ার্ন মিউনিখ
     


    ম্যাজিকের খুঁত আছে। তাতে যতই মায়াজাল তৈরি হোক, বাস্তবতা কঠিন। মেশিনের ভুল হয় না। মেশিন নিজের কাজটাই করে। ম্যাচের আগে সব পরিসংখ্যান আর ফর্ম বলছিল ম্যাচটা বায়ার্ন মিউনিখ মেশিন আর ম্যাজিশিয়ান লিওনেল মেসির। একা মেসি দাঁড়াতে পারলেন না মেশিনের সামনে। লিসবনের রাতে ম্যাজিক পাত্তাও পায়নি মেশিনের কাছে। বিপর্যস্ত এক বার্সেলোনাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে উঠে গেছে জার্মান চ্যাম্পিয়ন বায়ার্ন মিউনিখ। হারেরও ধরন আছে, এই হার কোনো কিছুই মানলো না! গুনে গুনে বার্সাকে ৮ গোল দিলো বায়ার্ন! বার্সা পেল ইউরোপে সবচেয়ে বড় হার।  

    রোম,  অ্যানফিল্ডের পর লিসবনেও বার্সার গল্পটা লেখা হলো হাহাকারের। এই গল্প কোথায় গিয়ে থামবে তা জানা নেই কারও! ফিলিপ কৌতিনহো যখন অষ্টম গোল করলেন, তখন বায়ার্নও আর উদযাপন করতে চাইলো না।  দুর্দান্ত বায়ার্ন মিউনিখের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর উপায় থাকল না বার্সার। বায়ার্নের প্রেসিং শুরু থেকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছিল বার্সাকে। প্রাণ বাঁচানোর কোনো উপায়ই জানা ছিল না কারও। ম্যাচের একেবারে শুরু থেকে বার্সার গলা চেপে ধরেছিল বায়ার্ন।

      


    কিকে সেতিয়েনের দলের দুঃস্বপ্নের শুরু ম্যাচের চতুর্থ মিনিটে। ইভান পেরিসিচ বাম পাশ থেকে বেশ গভীরে ক্রস ফেলেছিলেন। থমাস মুলার নিজেকে ফাঁকা রাখার কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন আরও আগে থেকে। বল পেয়ে রবার্ট লেভানডফস্কিকে পাস বাড়ালেন তিনি, ফিরতি পাসে বক্সের ভেতর ঢুকে মুলারের গোল।

    ম্যাচ একপেশে হবে সেই ইঙ্গিত তখন পাওয়া গেলেও ৩ মিনিট বাদেই ভাগ্য খুলে গেল বার্সার। শুরু থেকেই হাইডিফেন্সিভ লাইনে খেলছিল বায়ার্ন। লং পাস থেকে বাম পাশে বল পেয়েছিলেন জর্দি আলবা। তার ক্রস ক্লিয়ার করতে গিয়েই ডেভিড আলাবা নিজেই গোল দিয়ে বসেন।

    বার্সা এরপর খানিকক্ষনের জন্য ম্যাচে ফিরেছিল। ডান পাশ থেকে করা মেসির অন্তত দুইটি ক্রস থেকে গোল হতে পারত। তবে দুইবারের একবারও বক্সে থাকা খেলোয়াড়রা মাথা ছোঁয়াতে পারেননি ক্রসে। লুইস সুয়ারেজও এর মধ্যে একবার ম্যানুয়েল নয়্যারের সঙ্গে ওয়ান অন ওয়ানে চলে গিয়েছিলেন, কিন্তু নয়্যার তখন দারুণ সেভে আটকে দিয়েছেন তাকে। বার্সার দৌড় সেখানেই শেষ। এসব কেউ কোনোদিন মনে রাখবে। গল্প হবে রাতের বাকি সময় নিয়ে। সেই গল্পের সঙ্গে তুলনা হবে ২০১৪ বিশ্বকাপের জার্মানি-ব্রাজিল ম্যাচের।

    বায়ার্ন অবশ্য জার্মানির অতোখানি নিখুঁত হতে পারেনি ২১ থেকে ৩১ মিনিটে। নইলে ওই সময়ের ভেতর ৩ বারের বদলে মার্ক আন্দ্রে টের স্টেগানকে আরও কয়েকবার বল কুড়াতে যেতে হত নিজের জালে। অন্যপ্রান্তের জার্মান গোলরক্ষক কেন এখনও জাতীয় দলের নাম্বার ওয়ান সে প্রশ্নের জবাবও স্টেগান পেয়েছেন এই ম্যাচে।

    বায়ার্নের প্রেসের জবাব বার্সা দিতে চেয়েছিল একেবারে সিক্স ইয়ার্ড বক্সের সামনে থেকে খেলা বিল্ড আপ করে। সেটা একবারও কাজে দেয়নি। কিন্তু স্টেগানরাও কৌশল বদলাননি। বায়ার্নও একই তালে প্রেস করে গেছে। অ্যাটাকিং থার্ডে পজেশন উদ্ধার করার পর ইভান পেরিসিচ ঢুকে পড়লেন বক্সের ভেতর। অ্যাঙ্গেল কঠিন ছিল। বাম পায়ে আড়াআড়ি শট মারলেন, সেটা বার্সা ডিফেন্ডারের পা ছুঁয়ে জড়াল দূরের পোস্টে।
     


    আরও পড়ুন
    দরকার হলে সবার আগে সরে যাবেন পিকে

    প্লেয়ার রেটিং : বায়ার্নের বিপক্ষে বার্সা খেলোয়াড়রা কতো পাবেন?


    বার্সা তখনও সতর্ক হয়নি। ২৮ মিনিটে গ্যানাব্রি করলেন তৃতীয় গোল। থিয়াগো বল তুলে দিয়েছিলেন জেরার্ড পিকের মাথার ওপর দিয়ে। পিকের হাতে অনেক সময় ছিল, গ্যানাব্রি সেই বলের শেষ মাথায় পৌঁছেছেন, বক্সের ভেতর ঢুকে গোলও করেছেন। পিকে দর্শক বনে ছিলেন তখন। আসলে বার্সার রক্ষণ তখন দর্শকেই পরিণত হয়েছে।

    হানসি ফ্লিক প্রতিপক্ষকে এমন বিপর্যয়ে ফেলতে পারেন। ২০১৪ বিশ্বকাপে জার্মানির সহকারি কোচ ছিলেন তিনি। ব্রাজিলের স্মৃতি তার মতো মুলারের জন্যও উজ্বল। মুলার ৩১ মিনিটেই খেলা শেষ করে দিলেন। ডানপাশ থেকে কিমিখের ক্রস কাছের পোস্টে দৌড়ে গিয়ে পা ছুঁয়ে দিলেন মুলার। বার্সেলোনা ১-৪ বায়ার্ন।



    প্রথমার্ধ শেষেই শেষ বাঁশি শুনতে চেয়েছিল বার্সা। সেতিয়েনের সব কৌশল মুখ থুবড়ে পড়েছে ততোক্ষণে। অ্যান্টোয়ান গ্রিযমানকে বসিয়ে আর্তুরো ভিদালকে খেলিয়েও কোনো ফায়দা হলো না। ম্যাচের আগে ভিদাল যে হুঙ্কার ছেড়েছিলেন, বিরতির সময় সেটা তাকে নিশ্চয়ই তাড়া করেছে। বুন্দেসলিগাতেও এবার কোনো দলের বিপক্ষে এতোগুলো গোল দেয়নি বায়ার্ন।  

    গ্রিযমান দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই নামলেন। ফিরতে নাটকীয় প্রত্যাবর্তন দরকার ছিল বার্সার। কিন্তু খেলা চলল একই ধারায়। এর ভেতর মেসির লং বল ধরে জর্দি আলবা আরেকবার বায়ার্নের হাইলাইনের সুবিধা নিলেন। কাটব্যাক করলেন সুয়ারেজকে। সুয়ারেজ ৫৭ মিনিটে ব্যবধান করলেন ৪-২। নিভু নিভু আশার আলো তখনও ছিল বার্সার।

    সেই আশা শেষ হলো আলফোনসো ডেভিসের দুর্দান্ত এক মুহুর্তে। ১৯ বছর বয়সীর দায়িত্ব ছিল মূলত মেসিকে ডান প্রান্তে আটকানো। সেই কাজে তেমন মনোনিবেশ করতে হয়নি তাকে। আক্রমণেই ঝড় তুললেন। নেলসন সেমেদোকে কিছুক্ষণ নাচালেন বাম প্রান্তে, এরপর বিদ্যুৎ গতিতে ঢুকলেন বাইলাইন দিয়ে গোলের কাছে। তিনি কাটব্যাক করতে করতে অন্যপ্রান্তের আরেক ফুলব্যাক জশুয়া কিমিখ গোলের সামনে এসে গেছেন। তিনি শুধু ডেভিসের পাসটা ঢুকিয়ে দিলেন জালে। বার্সেলোনা ভেবেছিল তখন আর হারানোর কিছু নেই তাদের।  

    মেসি ততক্ষণে মাথা নুইয়ে ফেলেছেন। বাকিরাও হাল ছেড়ে দিয়েছে। আর ফেরা সম্ভব না- সেটা বার্সাও জেনে গেছে। এর চেয়ে বাজে আর কী হতে পারে! মার্ফির ল খাটল এখানেও। বার্সেলোনা ভুল ভেবেছিল। ২০১৪ এর জার্মানি দ্বিতীয়ার্ধে একটা সময় ক্ষান্ত দিয়েছিল। এই বায়ার্ন তেমন কিছু করলো না। এতোজন গোল করলেন, রবার্ট লেভানডফস্কি কেন বাদ যাবেন! ৮২ মিনিটে লেভানডফস্কি গোল করলেন হেডে। গোল করা এতোই সহজ! লেভানডফস্কি গোল করেছিলেন বদলি নামা ফিলিপ কৌতিনহোর অ্যাসিস্টে। বার্সার শেষটা মর্মান্তিক হতে যা যা অনুষঙ্গ প্রয়োজন ছিল তার সবটাই ঘটল মাঠে।

    বায়ার্নের আক্রমণ মানেই যেন গোল। পেশাদার দল আর পাড়ার দলের ফুটবল ম্যাচে কখনও কখনও এর চেয়ে বেশি প্রতিদ্বন্দিতা হয়।  কফিনে শেষ পেরেক কথাটা ক্লিশে হতে পারে। তবে এর চেয়ে ভালো উপমা আর হয় না ম্যাচের শেষটা বর্ণনা করতে। ৮৫ আর ৮৯ মিনিটে  কৌতিনহো গোল করলেন আরও দুইবার। ব্রাজিলিয়ান একবারও উদযাপন করতে চাইলেন না।  

    বার্সেলোনা সবশেষ এক ম্যাচে ৮ গোল খেয়েছিল কোপা ডেল রে তে, সেভিয়ার বিপক্ষে। ১৯৪৬ সালের কথা সেটা। ইউরোপে এর আগে এক ম্যাচে পাঁচের বেশি গোল খায়নি বার্সা। লিসবনে এসব কিছু লেখা হলো নতুন করে। খেলায় লজ্জার কিছু নেই, হার যত বড়ই হোক। পিকে ম্যাচ শেষে এটাকে লজ্জাই বলতে বললেন।

    বার্সায় যখন আকাশ ভেঙে পড়েছে বায়ার্ন তখন দেখিয়ে দিয়েছে কেন তাদের নিয়ে এতো মাতামাতি। চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা একমাত্র দল হিসেবে সেমিফাইনালে উঠেছে তারা। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হয় লিঁও নয় সাবেক কোচ পেপে গার্দিওলার ম্যান সিটি। এই বায়ার্নের ভয় এখন থেকেই শুরু হয়ে যাওয়ার কথা গার্দিওলার! এই বায়ার্ন সম্ভবত তাদের ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা দলে পরিণত হতে চলেছে।  

     

     


     

     

    বার্সেলোনা
    টের স্টেগান, সেমেদো, পিকে, ল্যাংলেট, আলবা, ডি ইয়ং, বুসকেটস, রবার্তো, ভিদাল, মেসি, সুয়ারেজ

    বায়ার্ন মিউনিখ
    নয়্যার, কিমিখ, বোয়াটেং, আলাবা, ডেভিস, থিয়াগো, গোরেতস্কা, মুলার, গ্যানাব্রি, পেরিসিচ, লেভানডফস্কি

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন