• ফ্রেঞ্চ ওপেন
  • " />

     

    লাল মাটি, রাফায়েল নাদাল, এবং প্যারিস : পর্ব ১

    লাল মাটি, রাফায়েল নাদাল, এবং প্যারিস : পর্ব ১    

    (লেখাটি একজন নাদালের পাঁড় ভক্তের হাত থেকে বের হওয়া, প্রথাগত টেকনিক/ট্যাকটিকাল এনালাইসিস নয়। ভালবাসা-প্রসূত ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে অনুরোধ করা গেল। লেখাটি দুই পর্বের, এটা প্রথম পর্ব)


    রাফায়েল নাদাল সর্বকালের সেরা টেনিস খেলোয়াড়দের একজন, এই বাক্যটিতে অত্যূক্তির লেশমাত্র নেই। কুড়িটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম, ক্যারিয়ার গ্র্যান্ড স্ল্যাম, দু'বার একসাথে সবরকম কোর্টে গ্র্যান্ড স্ল্যাম টাইটেল, স্পেনের হয়ে অলিম্পিক স্বর্ণপদক, ডেভিস কাপ, ওপেন যুগে সর্বোচ্চ উইনিং পার্সেন্টেজ-- সর্বকালের সেরা হওয়ার জন্য যা যা প্রয়োজন তার সবই হয়ে গেছে নাদালের। যারা টেনিসের সামান্য খোঁজখবর রাখেন, তারা সবাই এই সংখ্যাগুলো জানেন-- সাথে আরেকটা জিনিসও জানেন, সেটা হল এই অবিশ্বাস্য সংখ্যাগুলোর পেছনের রহস্য। লাল মাটি। ক্লে কোর্ট। ঘাসে বা হার্ড কোর্টে নাদাল নিঃসন্দেহে একজন ওয়ার্ল্ড ক্লাস খেলোয়াড়-- কিন্তু লাল মাটির কোর্টে তিনি রীতিমত ঈশ্বর। বার্সেলোনা, রোম, মাদ্রিদ এই কোর্টগুলো নাদালকে এনে দিয়েছে তার এটিপি টাইটেলের সিংহভাগ, আর তার দূর্গ প্যারিসে তিনি জিতেছেন চোখ-কপালে-ওঠানো ১৩টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপা। ফ্রেঞ্চ ওপেনে ১০২টি জয়ের বিপরীতে নাদালের পরাজয় কয়টি জানেন? দুই! স্রেফ দু'বার তাকে খালি হাতে ফিরিয়েছে প্যারিস-- একবার ফর্মের তুঙ্গে থাকা জোকোভিচের কাছে হেরেছেন, আরেকবার হেরেছিলেন সুইডিশ রবিন সোদারলিংয়ের কাছে - যেটাকে ওপেন যুগের সবচেয়ে বড় অঘটন বললে সম্ভবত অত্যূক্তি হবে না। মাটির কোর্টে নাদাল একসময় মোটামুটি অজেয়ই হয়ে গিয়েছিলেন-- টানা ৮১টি ম্যাচ জিতেছিলেন ২০০৫ থেকে ২০০৭এর মধ্যে! ক্লে কোর্টে এই চোখ-ধাঁধানো সাফল্য নাদালকে এনে দিয়েছে "কিং অফ ক্লে" তকমা। তার চেয়ে ভাল লাল মাটির খেলোয়াড় আগে আসেনি, ভবিষ্যতেও আসবে বলে মনে হয় না। 

    যেমন বললাম, ক্লে কোর্টে মাটির রাজার এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের গুষ্টি-ঠিকুজি সবাই কমবেশি জানে। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনের রহস্যটা কী? কেন লাল মাটির কোর্টে নাদাল অজেয়? আজকে থেকে দশ বছর আগে এই প্রশ্ন করলে উত্তর পেতে হয়ত গলদঘর্ম হতে হত, কিন্তু এই ইন্টারনেটের জমানায় সবকিছুই যেহেতু হাতের নাগালে, এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়াও কীবোর্ডের কয়েকটা ট্যাপের মামলা। ব্যাপার হলো, কষ্ট করে এসব টেকনিক্যাল খুঁটিনাটি পড়ার (বা ইউটিউবে ভিডিও দেখার) আগ্রহ বা ধৈর্য আছেই-বা ক'জনের? এর চেয়ে চলুন চায়ের-কাপ-টাইপ এনালাইসিস হয়ে যাক একটা। দেড় দশকের ওপরে হলো স্প্যানিশ ম্যাটাডোরের খেলা দেখছি-- আর কিছু না হোক, চায়ের কাপে ঝড় তোলার হক তো নিশ্চয়ই আছে। 



    নাদালের সাফল্যের রহস্যে যাবার আগে আরেকটা জিনিস খোলাসা করা প্রয়োজন: কোর্ট। একটা কোর্টের পরিচয় হয় দু'টো জিনিসে, সারফেস আর লোকেশন। লোকেশনের ব্যাপারটা সোজা, ইনডোর এবং আউটডোর। যারা কালেভদ্রে হলেও ব্যাডমিন্টন খেলেছেন তারা জানেন ইনডোর আর আউটডোরের তফাৎ-- ইনডোরে আবহাওয়ার বাম হাত ঢোকানোর সুযোগ প্রায় শূন্যের কোঠায়, যে কারণে খেলার পরিবেশ মোটামুটি কনসিস্টেন্ট থাকে পুরোটা সময়। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বাতাসের গতি-- এই ব্যাপারগুলো আউটডোরে একজনের খেলায় বড়সড় প্রভাব ফেলে। টেনিসের বড় টুর্নামেন্টের বেশিরভাগই হয় আউটডোরে, গ্র্যান্ড স্ল্যাম সবগুলোই যেমন আউটডোর (মাঝেমধ্যে ছাদ ঢাকতে হয় প্রকৃতি বাগড়া দিলে, কিন্তু সেটাকে ব্যতিক্রম ধরতে পারি)। কোর্ট সারফেসের ব্যাপারটা তার চেয়ে একটু জটিল। গ্রাস, হার্ড কোর্ট আর মাটি-- মোটা দাগে এই তিন ধরণের সারফেসে টেনিসের মেজর টুর্নামেন্টগুলো হয়। গ্রাসের সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্ট হলো দি চ্যাম্পিয়নশিপ, যাকে উইম্বলডন নামে চেনে সবাই। হার্ড কোর্টে বছরে দু'টো গ্র্যান্ড স্ল্যাম হয় --মৌসুম শুরুর অস্ট্রেলিয়ান ওপেন, আর শেষের ইউএস ওপেন। ফ্রেঞ্চ ওপেন বা রোলাঁ গাঁরো হয় ক্লে'তে, বাংলায় বললে লাল মাটির কোর্টে। এই প্রত্যেকটা কোর্টের কিছু নিজস্ব বিশেষত্ব আছে, তার মধ্যে দুটো আমাদের আজকের ফোকাস, গতি এবং বাউন্স। 

    পৃথিবীর প্রায় সব টেনিস কোর্ট হার্ড কোর্টের ক্যাটাগরিতে পড়ে। তবে বুয়েট মাঠের কোণায় পড়ে থাকা এমেচার হার্ড কোর্ট আর ইউএস ওপেনের সেন্টার কোর্টে কিছু পার্থক্য আছে। বেশিরভাগ এমেচার হার্ড কোর্ট বানানো হয় সিমেন্ট বা এসফল্ট দিয়ে, ঢালাইয়ের ওপরে সাদা দাগ কেটে মাঝে নেট বসিয়ে বানানো টেনিস কোর্টে খেলে বড় হন বেশিরভাগ টেনিস খেলোয়াড়। পেশাদার টেনিস কোর্টে এই ঢালাইয়ের ওপর কম্পোজিটের একটা আস্তর থাকে-- এক্রিলিক বা সিলিকার। এই আস্তরটা কোর্টকে প্লেয়ার-ফ্রেন্ডলি বানায়। কম্পোজিট লেয়ারে গ্রিপ ভাল থাকে, দৌড়ানোর সময় পায়ে চাপ কম পড়ে সিমেন্টের চেয়ে। ইনজুরির রিস্ক কমে আসে অনেক। 

    গ্রাস এবং ক্লে কোর্টের ম্যাটেরিয়াল আছে তাদের নামেই, ঘাস এবং মাটি। ঘাসের কোর্ট ঘাসের আস্তরণের কারণেই সবসময় সবুজ, আর, মাঝে একবার নীল মাটির কৌতুক বাদ দিলে, ক্লে কোর্ট প্রায় সবখানে লালচে বালুর আস্তরণে ঢাকা। এই দুটো ম্যাটারিয়াল দিয়ে কোর্ট বানানো তো বটেই, মেইনটেন করাও বেশ পরিশ্রমের কাজ, তাই এদের সংখ্যাও হার্ড কোর্টের তুলনায় নগন্য। ক্লে কোর্টেই যেমন ধরুন, খেলোয়াড়দের দৌড়ের সময় বা স্লাইডের সময় জুতার সাথে করে বালু উঠে আসে। কয়েকটা সেটের পরপরই ঝাড়ু দিয়ে, নাহলে দড়ি দিয়ে চেঁছে রোল করে কোর্টের বালুর লেয়ার সমান রাখতে হয়, নাহলে বিপদ। 

    যেমন বলছিলাম, এই কোর্টগুলোর দুটো বিশেষত্ব নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা, গতি এবং বাউন্স। বাঙ্গাল হিসেবে যেহেতু আমাদের ক্রিকেট দেখে অভ্যাস, এখানে ক্রিকেটের কিছু দড়ি টানাটানি করব। 

    গতি
    গতির আলাপে আমাদের আলোচ্য আসলে দু'টো, বলের গতি এবং খেলোয়াড়ের গতি। হার্ড কোর্ট নামে হার্ড হলেও কাজে সুবোধ; এখানে বলের গতি মাঝারি, দৌড়ানোও সহজ। এই কোর্টকে ফ্ল্যাট রাখা সহজ, কাজেই খেলোয়াড়রা সহজে এবং নিশ্চিন্তে কোর্টের এক মাথা থেকে আরেক মাথায় ছুটতে পারেন, বল ফেরাতেও পারেন সহজে। ঘাসের কোর্ট এই ব্যাপারে বেশ গোলমেলে-- বলের গতি এখানে অন্য দুই কোর্টের চেয়ে বেশি। এর কারণ হিসেবে বলা হয় ঘাসের ব্লেডের কোণ এবং গ্রিপের কথা। ঘাসে পড়া বল গ্রিপ করে কম, সাথে বলের গতির দিকে ঘাস বেঁকে যাওয়ার কারণে সেটা বলের বাউন্সের পরের গতি বাড়িয়ে দেয় সামান্য। ক্রিকেটে যেমন ঘাসের পিচে ফাস্ট বোলিং খেলতে বিপদে পড়েন ব্যাটাররা, সেই একইভাবে গ্রাস কোর্টে ফিরতি শট খেলতে গলদঘর্ম হতে হয়। এই কারণে সার্ভ এন্ড ভলি (সার্ভ করেই দ্রুত নেটের কাছে চলে আসার স্টাইল) খেলোয়াড়রা ঘাসের কোর্টে অন্যদের চেয়ে ভাল করেন। 

    ক্লে কোর্ট এই গতির ব্যাপারে সবচেয়ে উদ্ভট। বালুতে পড়লে বলের গতি যে কমে আসে এটা আমরা সবাই জানি-- যারা বালু-ঢাকা মাঠে বল দিয়ে কিছু একটা কখনো খেলতে গিয়েছি সেটা হাতেনাতেই দেখেছি। কাজেই তিন ধরণের সারফেসের মধ্যে ক্লে সবচেয়ে ধীরগতির। এতটুকুর পরে কারো মনে হতে পারে, আরে, এটা তো বোধ হয় ভাল, বল আস্তে আসবে, খেলাও তো সোজা। কিন্তু ব্যাপারটা যে এত সহজ নয় এটা বুঝতে বেশিক্ষণ ভাবতে হবে না-- যদি সোজাই হত, ভারতের ডাস্টি পিচে টেস্ট ম্যাচের চতুর্থ ইনিংসে ব্যাটারদের গলদঘর্ম হতে হত না কখনো। সারফেস স্লো হবার কারণে ক্লে কোর্টে বলের গতি বাড়ানোর জন্য খেলোয়াড়দের অনেক জোরে হিট করতে হয়-- যেটা শরীরের ওপর অনেক বেশি চাপ ফেলে। ক্লে কোর্টের আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, বালু ম্যাটারিয়াল হিসাবে আলগা হবার কারণে একটু পিচ্ছিল হয়; যে কারণে দ্রুত ফুটওয়ার্কের খেলোয়াড়রা মাটির কোর্টে একটু বেশি সুবিধা পান। 

    বাউন্স
    বাউন্সের ব্যাপারেও তিন সারফেসে বেশ ভিন্নতা আছে। এখানেও হার্ড কোর্ট মাঝারি। বল হার্ড কোর্টে মোটামুটি সুবোধভাবে বাউন্স করে, উচ্চতা এবং কন্সিস্ট্যান্সি দুই দিকেই। ফ্ল্যাট হার্ড কোর্টে বল কোথায় পড়ার পর লাফিয়ে কতটুকু উঠবে সেটা নিয়ে মোটামুটি ভাল একটা আন্দাজ পাওয়া যায়, যে কারণে হার্ড কোর্টের খেলা সবসময়ই বেশ গতিশীল হয়। গ্রাস কোর্টে বলের বাউন্স কম হার্ড কোর্টের চেয়ে, যে কারণে বলের গতির দিক থেকে হার্ড কোর্ট আর গ্রাস কোর্ট কাছাকাছি হলেও ঘাসের কোর্টে বল অনেক দ্রুত আসছে বলে মনে হয়। তার ওপর ঘাসকে আপনি যত চেষ্টা করুন, ফ্ল্যাট রাখতে পারবেন না হার্ড কোর্টের মত; ঘাসের প্রত্যেকটা ব্লেডকে একটা নির্ধারিত দৈর্ঘ্য দিতে পারা প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার। তার ওপর খেলোয়াড়রা যখন ঘাসে দৌড়ান বা স্লাইড করেন, জুতার সাথে বা শরীরের সাথে ঘাসের লেয়ার উঠিয়ে নিয়ে আসেন, যেটা ঘাসের ইনকনসিস্ট্যান্সি আরো বাড়িয়ে দেয়। 

    তবে বাউন্সের ব্যাপারে ক্লে কোর্টের তুলনা হয়না কোনও। বালুতে বল বেশি গ্রিপ করার কারণে ধীরগতিতে আসলেও, বালুর কোর্টকে ঠিকমত মেইনটেন করতে পারলে এবং ঠিকমত জমাট বাঁধিয়ে রাখতে পারলে ক্লে কোর্ট থেকে সবচেয়ে বেশি বাউন্স পাবেন আপনি। এর কারণটাও হচ্ছে বালুর গ্রিপ। যেহেতু টেনিসে প্রায় প্রতিটা শটেই কিছু হলেও টপ স্পিন থাকে, আলগা বালুতে এই টপ স্পিনের হরাইজন্টাল ভেলোসিটিটা ভার্টিকাল এক্সিসে চলে আসে কিছু, যেটা বলকে খাড়া উপরের দিকে উঠিয়ে দেয় অনেক বেশি। তার সাথে যোগ করুন আলগা বালুর ইনকন্সিস্ট্যান্সি ফ্যাক্টর, এই দুই মিলিয়ে মাটির কোর্টে বাউন্স একজন খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সে অনেক বড় ভূমিকা রাখে।  

    রাফায়েল নাদাল ক্লে কোর্ট সুপার-স্পেশালিস্ট; আরো নির্দিষ্ট করে বললে আউটডোর ক্লে কোর্ট স্পেশালিস্ট। কেন নাদাল ক্লে কোর্টে প্রায় অজেয়, সেটা নিয়ে গল্প হবে পরের পর্বে।


    আরও পড়ুন: দ্বিতীয় পর্ব


     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন