• " />

     

    'লেডি ইন রাস্টি আর্মার'

    কয়েক বছর পর পরই সবাই বলে, “এই শেষ, আর পারবে না”। ক্রিস এভার্টের মত কিংবদন্তী তাঁর শেষ দেখে ফেলেন বারেবারে। প্যাট ক্যাশ হাসাহাসি করেন তার আবার র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষে ওঠার স্বপ্ন নিয়ে। মুটিয়ে যাওয়া শরীরটাকে টিটকিরি দেয় গ্যালারিতে বসা দর্শকরা, গায়ের রঙ নিয়ে মন্তব্য করে বসে দু’একজন বখে যাওয়া দর্শক। বড় বোনকে গুলি করে মেরে ফেলে দুর্বৃত্তরা, প্রাণঘাতী রোগ বাসা বাঁধে শরীরে।

    নিজেকে একবার কল্পনা করুন তো, এই মানুষটার জায়গায়। বছরের পর বছর এই বোঝাগুলো টানতে থাকলে কোথায় গিয়ে পড়তেন আপনি? কী করতেন? যত যাই করে থাকেন, বাজি ধরে বলতে পারি, একুশটা গ্র্যান্ড স্ল্যাম থাকত না আপনার নামের পাশে।

    নব্বইয়ের মাঝামাঝিতে রিচার্ড উইলিয়ামস যখন তার দুই মেয়েকে নিয়ে আসলেন টেনিস সার্কিটে, তখনই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, মেয়েদের টেনিসে আমূল পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। সেই পরিবর্তন মন থেকে গ্রহণ করেছিলেন কয়জন?

    মেয়েদের টেনিস কখনই শারীরিক শক্তিনির্ভর খেলা ছিল না- সেখানে প্রচন্ড শক্তি আর দুর্দান্ত গতি নিয়ে দুর্বৃত্ত-অধ্যুষিত কম্পটন থেকে উঠে আসা দুই কিশোরী যখন চ্যালেঞ্জ জানালো পুরো বিশ্বকে, বিশ্ব প্রস্তুত ছিল না সেই চ্যালেঞ্জের। এই কুড়ি বছর পরেও টেনিসবিশ্ব  কি সেই চ্যালেঞ্জে অভ্যস্ত হতে পেরেছে? সম্ভবত না। সম্ভবত সেজন্যই একটু পা হড়কালেই হা-রে-রে-রে করে ছুটে আসে সবাই, তাদের বাতিলের খাতায় ফেলার জন্য হাতড়ে মরে কতজন! 

    ভেনাসকে এই ধরণের যন্ত্রণার মুখোমুখি হতে হয়েছে কম। ভেনাসের সার্ভে ভয়ংকর গতি, ছ’ফুটের দীর্ঘ শরীরটা অনেক প্রতিদ্বন্দ্বীকে ছাপিয়ে চলে যায় বেশ কিছু দূর- কিন্তু তারপরও তাঁর খেলায় ক্লাসিক টেনিসের ছাপ ছিল। ছোট বোনের তুলনায় তিনি সুস্থির, এবং, মানুন কি না মানুন- বাণিজ্যিকীকরণের এই দুনিয়ায় তার সুন্দর দেহাবয়ব তাঁকে মানুষের কাছে প্রিয় করে তুলতে সাহায্য করেছিল বেশ।

     


    সেরেনা এই সুযোগ পাননি। সেরেনা দুর্বিনীত, সেরেনা অমনোযোগী, সেরেনা ভয়ংকর। ভেনাসের মত হাত দিতেই সোনা ফলে না সেরেনার। কানাকানি চলে, তাঁকে জেতাতে বয়সে বড় ভেনাস ছেড়ে দিচ্ছেন খেলা। তাঁর প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হতে না হতেই খেলাটার প্রতি তাঁর নিবেদন নিয়ে প্রশ্ন উঠে যায়। খেলার মাঠে মেজাজ হারানো সেরেনা, কোর্টে র‍্যাকেট আছড়ে দুমড়ে ফেলা সেরেনা, লাইন আম্পায়ারের দিকে তেড়ে যাওয়া সেরেনা তাই বোধহয় ছাপিয়ে যান সার্ভ অ্যান্ড ভলির স্টাইলকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বেজলাইন ধরে তীব্র গতিতে ছুটে যাওয়া আর শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে মারা নিখুঁত উইনারের সেরেনাকে।

    যুগে যুগে রাজকন্যা কম পায়নি টেনিস একেবারে- সেই রাজকন্যাদের তালিকায় যেন জায়গা নেই সেরেনার। তাঁর সমসাময়িকদের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি শিরোপা জিতেও তাই তিনি টেনিস বিশ্বের সবচেয়ে 'এন্ডোর্সড' খেলোয়াড় নন, বরং মাঝে মাঝেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাঁকে ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দিয়ে বসে।  

     


    সেরেনা বেজলাইন ধরে খেলেন। তাঁর সার্ভ দুর্দান্ত; ম্যাচের যেকোন সময়ে বিপজ্জনক গতিতে সার্ভ করার ক্ষমতাটা সম্ভবত ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভা- কিন্তু সেইসব সার্ভের প্লেসমেন্ট আর অ্যাকুরেসি তাঁর বছরের পর বছর পরিশ্রমের ফসল। এসবের সাথে ভয়ংকর শক্তিশালী ফোরহ্যান্ড আর টু-হ্যান্ডেড ব্যাকহ্যান্ড এবং দুর্দান্ত গতিতে বলের জায়গামত পৌঁছে যাওয়ার ক্ষমতা - এইসব সেরেনাকে গত ২০ বছরে এনে দিয়েছে ডজন ডজন শিরোপা। ছোট একটা পরিসংখ্যানই সবার চোখ কপালে তুলে দিতে পারে - সেরেনার পেছনে থাকা বর্তমানে টেনিস র‍্যাঙ্কিংয়ের দু’নম্বর খেলোয়াড় মারিয়া শারাপোভা শেষবার সেরেনাকে হারিয়েছেন নয় বছর আগে! কিন্তু এসব খুঁটিনাটি টেকনিক্যালিটি আর পরিসংখ্যানের সাধ্য কি সত্যিকার সেরেনাকে বোঝাবার?        

    খেলার দুনিয়ায় দ্বৈতসত্ত্বার উদাহরণে সেরেনার চেয়ে ভাল কেউ কি আছেন? যে মানুষটার ঝুলিতে সবচেয়ে বেশিবার পেছন থেকে উঠে এসে গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ের রেকর্ড, সেই তিনিই আগের দিন টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পড়ার দুঃখে পরদিনের ডাবলসে টানা চারটি দৃষ্টিকটু ''ডাবল ফল্ট'' করেন। তিনি হতাশাগ্রস্ত হয়ে বিদায় জানান টেনিসকে, তিনিই আবার বোনের মৃত্যুর পর বুকে পাথর বেঁধে খেলতে নামেন। শয়ে শয়ে ইনজুরিতে পড়া শরীরটা যেখানে প্রাণঘাতী 'পালমোনারি এমবলিজম'-র ধাক্কায় সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, সেটাই আবার কামানের গোলা ছুঁড়তে থাকে যখন প্রয়োজন। 

     


    আর এখানেই আসলে সেরেনার শ্রেষ্ঠত্ব। একুশটা একক গ্র্যান্ড স্ল্যাম, ক্যারিয়ার গ্র্যান্ড স্ল্যাম, গোল্ডেন স্ল্যাম, চার-চারটা অলিম্পিক সোনা, সপ্তাহের পর সপ্তাহ র‍্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বরে বসে থাকা, তেত্রিশ বছর বয়সেও হাঁটুর বয়সী প্রতিপক্ষকে কোর্টের চারপাশে নাচিয়ে বেড়ানো- এসব তাই স্রেফ সংখ্যা।

    আসল সেরেনাকে আপনি পাবেন তাঁর দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষ মারিয়া শারাপোভার কথায়, “সে আপনাকে একটা পয়েন্ট, একটা গেমও বিনেপয়সায় দেবে না। স্কোর যা-ই হোক, সে ব্রেক পয়েন্টে এগিয়ে থাকুক, পিছিয়ে থাকুক, কিচ্ছু যায় আসে না- প্রত্যেকটা পয়েন্ট, প্রত্যেকটা গেম তার চাই”।

    আপনি জানবেন, নেটের ওপাশে থাকা সেরেনার বুলেট-সার্ভ কিংবা নিখুঁত উইনার আপনাকে হারাবে না, আপনি হারবেন তাঁর চোয়ালভাঙা প্রতিজ্ঞার কাছে, তাঁর হার না-মানা মানসিকতার কাছে। বারবার ম্যাচ পয়েন্ট পেয়েও জীবন যাকে হারাতে পারেনি, তাঁকে আপনি হারাবেন কীভাবে?

     

    একটু আগে বলেছিলাম, রাজকন্যাদের দলে সেরেনা নেই। আদুরে রাজকন্যাদের ঝলমলে জামা সাজে না সেরেনার গায়ে। সেরেনার গায়ে ইস্পাতের বর্ম, সে বর্মে হাজার আঘাতের আঁকিবুকি। সেরেনা রাজপ্রাসাদে বসে ছড়ি ঘোরান না, নাইটদের মত ডুয়েলে নামেন। রাজকন্যাদের দলে সেরেনা নেই, কারণ রাজকন্যা তিনি নন। সেরেনা জামেকা উইলিয়ামস টেনিস সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী- সব প্রতিকূলতা ছাড়িয়ে, বার বার পিছিয়ে পড়া থেকে যুদ্ধ করে ফিরে এসে একা হাতে যে সাম্রাজ্যের দখল নিয়েছেন তিনি। 

     
    একুশতম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ে সেরেনাকে অভিনন্দন।

     

     

    (শিরোনামটি পিটার অ্যান্ড গর্ডনের 'নাইট ইন রাস্টি আর্মার' গান থেকে ধার নেয়া)

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন